ইরানে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধ হওয়ার মতো তথ্য পেয়েছে জাতিসঙ্ঘ। অন্তত দুটো ঘটনায় আমেরিকা এ অপরাধ করে থাকতে পারে। বৈশ্বিক সংস্থাটির একটি সত্যতা যাচাই মিশন এই তথ্য জানিয়েছে। বেশ কয়েক দশক ধরে বিশ্বে যত যুদ্ধ হয়েছে এর বেশির ভাগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আবার বৈশ্বিক মানবাধিকারের ধারক, তাও যুক্তরাষ্ট্র। তাই এসব ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্তরা কোনো প্রতিকার পায়নি। এমনকি তাদের যুদ্ধাপরাধ নিয়ে কেউ কথাও তুলতে পারেনি। তবে এবার জাতিসঙ্ঘ ক্ষীণ স্বরে যুদ্ধাপরাধের যে অভিযোগ সামনে আনছে তার প্রতিকার পাওয়ার আপাত কোনো সম্ভাবনা না থাকলেও কিঞ্চিৎ অগ্রগতি বলা যায়। এই ব্যাপারে বিশ্বসম্প্রদায় জোর গলায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি জবাবদিহি দাবি করতে পারে।
ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধের শুরুতে আমেরিকা একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরে ওই বিদ্যালয়ের শিশুরা দিনের শুরুতে পাঠরত অবস্থায় আক্রমণের শিকার হয়। টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে স্কুলভবন ধ্বংস হয়ে ছিন্নভিন্ন হয় ১২০ কোমলমতি শিক্ষার্থীর দেহ। সব মিলিয়ে ওই হামলায় ১৫০ মানুষ প্রাণ হারান। ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনায় ইরানি প্রতিনিধিরা বিমানে করে হত্যার শিকার কয়েকজন শিশুর ছবি নিয়ে হাজির হন। বেসামরিক স্থাপনায় জঘন্য একটি হামলা হিসেবে এটি তখন বিশ্ববাসীর নজর কাড়ে। একই সময়ে ফার্স শহরে একটি ক্রীড়া স্থাপনায় প্রিসিশান ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এতে আবাসিক ভবন এবং পাশের একটি স্কুল বিধ্বস্ত হয়। এতে ২২ জন মানুষ প্রাণ হারান। দুটো হামলাই নির্বিচারে, যাতে নিশানা হয়েছে বেসামরিক মানুষ ও স্থাপনা।
ইরানবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তথ্যানুসন্ধান মিশনের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। জেনেভায় জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের সভায় এ প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে। মানববিধ্বংসী অস্ত্র চালানোর সময় যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত ছিল না যে, এগুলো সামরিক স্থাপনা। বহু বেসামরিক মানুষ হতাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকার পরও আক্রমণ করতে পরোয়া করেনি দেশটির সামরিক বাহিনী।
স্কুলে হামলার ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ তদন্তে নিজেদের বাহিনী দায়ী থাকার কথা প্রথমে আংশিক স্বীকার করা হয়। পেন্টাগন এ ব্যাপারে বিস্তারিত তদন্তের কথা জানালেও পরে অগ্রগতি জানায়নি। পয়লা সেপ্টেম্বর দক্ষিণ ইরানের একটি শহরে বিয়ে বাড়িতে হামলা চালায়। এতে আশপাশের বাড়িঘরও বিধ্বস্ত হয়েছে, প্রাণহানি হয়েছে পাঁচজনের। গত আট মাসে এই ধরনের আরো বহু আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্র করেছে। ওইসব হামলার ঘটনায় ইরানের পক্ষ থেকে বেসামরিক এলাকায় হামলা চালানোয় যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ তদন্ত করার কথা স্বীকার করলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অভিযোগ অস্বীকার করছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানে এক হাজার ৭০০ বেসামরিক প্রাণহানি ঘটেছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানাচ্ছে। তাদের মধ্যে ২৫৪ শিশু আছে।
ইরানে হামলা চালানোর কোনো অধিকার যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের নেই। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এটি অবৈধ। এই দানবদের বাধা দেয়ারও কেউ নেই। এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জাতিসঙ্ঘের পক্ষ থেকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তোলা একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। প্রয়োজন মানবতার বিরুদ্ধে অব্যাহত অপরাধ চালানো ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করা। বাস্তবতা হচ্ছে— এদের বিচারের আওতায় আনার কোনো শক্তিশালী পক্ষ বিশ্বে এখনো নেই।
