প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে ঘেরা বাংলাদেশ। এদেশে পর্যটন শিল্পের আছে বিপুল সম্ভাবনা। তবে বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে এই খাতের আয় ও অগ্রগতির দিক থেকে বাংলাদেশ এখনো বেশ পিছিয়ে। বাস্তবসম্মত যৌক্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে পারলে পর্যটন খাত বাংলাদেশের অর্থনীতেতে গতি সঞ্চার করতে পারে।
পর্যটন খাতে যেসব দেশ বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আয় করে সেগুলোর তুলনায় তো বটেই, আমাদের নিকট প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায়ও আমাদের অর্জন অত্যন্ত সীমিত। বিশ্বের পর্যটন আয়ের শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, স্পেন ও ফ্রান্স। একক দেশ হিসেবে পর্যটকদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বছরে ২৫০ বিলিয়নেরও বেশি মার্কিন ডলার আয় করে। বৈশ্বিক জিডিপিতে এই খাতের মোট অবদান প্রায় ১১.১ ট্রিলিয়ন ডলার। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতের পর্যটন আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। অন্যদিকে অর্থনৈতিক সঙ্কটের মধ্যেও শ্রীলঙ্কা পর্যটন থেকে আয় করেছে প্রায় ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার। মালদ্বীপের অর্থনীতির প্রায় ৬৮ শতাংশ সরাসরি পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্ব তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান বেশ তলানিতে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের বার্ষিক আন্তর্জাতিক পর্যটন রাজস্ব ছিল মাত্র ৪৮৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৩ সালে যেখানে এই আয় ছিল ৪৫৩ মিলিয়ন ডলার, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে তা আরো কমে ৪৪০ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। দেশের জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান মাত্র ৪ থেকে ৪ দশমিক ৪ শতাংশের কাছাকাছি, যার  বেশির ভাগই আসে অভ্যন্তরীণ পর্যটন থেকে।
বাংলাদেশে পর্যটনের সম্ভাবনার ক্ষেত্রগুলো হলো : ১. বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার এবং ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। এ ছাড়া সিলেট অঞ্চলের চা-বাগান ও হাওর এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের (রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি)  নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র জীবনধারা পর্যটকদের দারুণভাবে আকর্ষণ করে। ২. বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ, পাহাড়পুরের বৌদ্ধ বিহার (সোমপুর মহাবিহার) এবং মহাস্থানগড়ের মতো হাজার বছরের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে দেশে। গ্রামীণ জীবনযাত্রা, উৎসব ও জাতিগত বৈচিত্র্যের মাধ্যমে এখানে ‘কালচারাল’ ও ‘রুরাল ট্যুরিজম’ বিকাশের দারুণ সুযোগ রয়েছে। ৩. বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। পিকেএসএফের এক প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে— ২০২৭ সালের মধ্যে এই খাতে আরো ১.৫ মিলিয়ন (১৫ লাখ) নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। ৪. বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে স্কুবা ড্রাইভিং, প্যারাসেইলিং, মেরিন ড্রাইভিং এবং গভীর সমুদ্রে ভ্রমণের মতো রোমাঞ্চকর পর্যটন চালুর নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে।
সম্ভাবনা থাকার পরও যথাযথ নীতি ও পরিকল্পনা এবং সমন্বয়ের অভাবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারছে না। এক্ষেত্রে প্রধান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে। অনুন্নত অথবা অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থা, উচ্চ ভ্রমণ ব্যয় ও অতি মুনাফার মানসিকতা বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে পিছিয়ে দিচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ভ্রমণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় একই মানের হোটেল-রিসোর্টের ভাড়া, রেস্তোরাঁর খাবার এবং যাতায়াত খরচ বাংলাদেশে প্রায় দ্বিগুণ। ব্যবসায়ীদের দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার অভাব ও অতি মুনাফার প্রবণতা পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করছে। অভাব আছে দক্ষ গাইডের। ইংরেজি জানা গাইডের অভাব আরো বেশি। পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গাইড ও দক্ষ জনশক্তির ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এ বিষয়ে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। অবকাঠামোগত ঘাটতি পর্যটন বিকাশে বড় অন্তরায়। পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের আবাসন, উন্নত ও নির্ভরযোগ্য যাতায়াত ব্যবস্থা এবং আধুনিক বিনোদন সুবিধার অভাব রয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রচার ও ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব দূর করতে হবে। বিশ্ব পর্যটন বাজারে বাংলাদেশের পর্যটন স্পটগুলোর কার্যকর কোনো প্রচার বা ডিজিটাল মার্কেটিং নেই বললেই চলে। বিদেশী পর্যটকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া বা অন-অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধাও বেশ জটিল। সরকারকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। 
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিদেশী পর্যটক আগমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের গভীর মনোযোগ দেয়া দরকার। 
বাংলাদেশকে পর্যটন মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ভিশন প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি যৌথ অংশীদারত্ব বৃদ্ধি, বিদেশী পর্যটকদের জন্য বিশেষ পর্যটন জোন বা ‘এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন’ তৈরি এবং পর্যটন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। ভারতের মতো ট্রাভেল ব্লগার ও ইনফ্লুয়েন্সারদের মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রচার বাড়াতে পারলে বাংলাদেশও এই খাত থেকে পোশাক শিল্পের মতোই বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হবে।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক