অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে গেছে। সেটি হচ্ছে- পতিত সরকার ও তার পৃষ্ঠপোষক ভারতের নানাবিধ ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য। দেশের বর্তমান বাস্তবতা বিশ্বের কাছে প্রতিষ্ঠিত করতে সব দলকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গত বুধবার ৪ ডিসেম্বর ২০২৪ রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপে তিনি এ আহ্বান জানান। এর পরদিন দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতাদের সাথে আরেকটি সভায় প্রফেসর ইউনূস সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের নানা মত, নানা ধর্ম থাকবে কিন্তু আমরা সবাই একই পরিবারের সদস্য। আমাদের শত-পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আমরা পরস্পরের শত্রু নই। আমাদের জাতীয়তা, পরিচয়ের প্রশ্নে এক জায়গায় চলে আসি। আমরা বাংলাদেশী, এক পরিবারের সদস্য।’ উল্লিখিত দু’টি সভায় অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতারা একই সুরে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকার অঙ্গীকার বক্তব্য করেছেন।
রাজনৈতিক নেতাদের সাথে আলোচনা শেষে উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশবিরোধী নানা তৎপরতা চলছে। ভারতে বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনে হামলা, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ, বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা-সভায় এসবের তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। ভারতের এসব পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার যে আত্মমর্যাদাশীল সাহসী ভূমিকা রেখেছে তার প্রশংসা করেছেন রাজনীতিবিদরা। একইভাবে তারা সরকারের সাথে সলিডারিটি প্রকাশ করেছেন।’ তিনি আরো বলেন, ভারতের এসব প্রচারণার বিরুদ্ধে আরো শক্তিশালীভাবে এবং আরো বেগবান করে সেগুলো মোকাবেলার জন্য সংলাপে আহ্বান জানানো হয়েছে।
বস্তুত যে সময়ে প্রতিবেশী ভারত ও তার মিডিয়াগুলো বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের বানোয়াট কল্পকাহিনী বিশ্বময় প্রচার করে বেড়াচ্ছে এবং ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকারের আসকারায় কতিপয় সাম্প্রদায়িক উগ্রপন্থী কলকাতার ডেপুটি হাইকমিশনের সামনে ও আগরতলার সহকারী হাইকমিশন ভবনের ভেতরে তাণ্ডব চালিয়েছে তাতে দেশের নাগরিকদের মধ্যে একটি উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। এরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলায় জাতীয় ঐক্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো একটি জরুরি বিষয় ছিল। প্রফেসর ইউনূসের আহ্বানে সবাই ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। দেখা গেছে, চরম বাম-চরম ডান, সেকুলার সবাই নির্দ্বিধায় একই স্থানে মিলিত হয়ে জাতীয় ঐক্যের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। সারা বিশ্বে জাতীয় ঐক্যের এরূপ একটি বার্তা দেয়া এ সময়ে দারুণ প্রয়োজন ছিল। প্রফেসর ইউনূসের দ্বারাই সেটি সম্ভব হয়েছে। তিনি এখন জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। আমরা আশা করি, সামনের দিনগুলোতে তার নেতৃত্বে জাতি ঐক্যবদ্ধ থেকে প্রতিবেশী বা তার পতিত দোসরদের যেকোনো হুমকি মোকবেলা করতে সক্ষম হবে।
অতি সম্প্রতি আরো দুটো খবর আমাদেরকে উৎসাহিত করেছে। একটি হলো সব ছাত্র সংগঠন একত্রে মিলিত হয়ে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছে। সেখানেও বাম-ডান তথা ইসলামপন্থী, সেকুলার সবাই উদার মন নিয়ে জাতীয় ঐক্যের চেতনায় উজ্জীবিত হয়েছিল। ফ্যাসিবাদী শাসনের জাঁতাকল থেকে মুক্তির জন্য ছাত্র-জনতার যে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে তার মূল চাবিকাঠি ছিল জাতীয় ঐক্য তথা জনগণের সম্মিলিত শক্তির বহিঃপ্রকাশ। জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের ঘটনাটি শুধু বাংলাদেশ বা উপমহাদেশ নয়; পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা। শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে বিশেষ করে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাথে অন্যদের বিরোধ-সংঘর্ষ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। প্রতিপক্ষ সংগঠনের ওপর জুলুম-নির্যাতন-নিপীড়নের যে অপরাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু করা হয়েছিল তা থেকে বেরিয়ে এসে ছাত্রসমাজের সম্মিলিত সভার মধ্যে এক সহিষ্ণু ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির একটি শুভ সূচনার ইঙ্গিত আমরা লক্ষ করছি।
আরেকটি খবর হলো- হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান কল্যাণ ফোরাম নেতারা গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান সময়ে হিন্দু জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছে জানিয়ে ভারতের গণমাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী মিথ্যা অপপ্রচার বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। ফোরামের চেয়ারম্যান বিজন কান্তি সরকার বলেন, ‘বাংলাদেশে যত মন্দির পোড়ানো হয়েছে তার শতভাগ পুড়িয়েছে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। এমনকি আওয়ামী এমপিদের নেতৃত্বে ও ইন্ধনে হিন্দু বাড়িঘর পোড়ানো হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার প্রভাবে সংবাদমাধ্যমে জামায়াত-বিএনপি কর্মীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। ভারতীয় মিডিয়াও আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে আওয়ামী অনৈতিক অপপ্রচারে সম্পৃক্ত হয়েছে। আওয়ামী লীগ কখনো কোনো নির্যাতন বা দখলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি, বিচার করেনি।’
বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্র্রীতির দেশ বলে সুপরিচিত। কিন্তু মাঝে মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে সাম্প্রদায়িক উসকানির কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের কোনো ইসলামপন্থী দল বা গ্রুপ সাম্প্রদায়িক সঙ্ঘাতের সাথে জড়িত বলে আজ পর্যন্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি; বরং সেকুলার রাজনৈতিক দলের স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীই এরূপ ঘটনার জন্য দায়ী বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। একটি মহল সুযোগ বুঝে রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীস্বার্থ চরিতার্থ করার মতলবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর মাঝেমধ্যে হামলা-নির্যাতন করে থাকে। ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগ সংখ্যালঘুদের অধিকাংশ ভোট পেয়ে থাকে; অবশ্য বিএনপি-জামায়াতও যে তাদের ভোট পায় না তা বলা যাবে না। দেখা গেছে, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিভিন্ন সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় তাদের প্রার্থীরাও জয়লাভ করে থাকে। সেকুলার আওয়ামী সরকারের আমলে সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতনের বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছিল। আওয়ামী লীগ সরকার গৎবাঁধা বুলি আউড়িয়ে বলেছিল, এগুলো বিএনপি-জামায়াতের কাজ। বিএনপি-জামায়াত তীব্র ভাষায় এর প্রতিবাদ করেছে। এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই, পতিত সরকার ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছিল। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তব্যে অবহেলারও অভিযোগ উঠেছিল। তখন প্রশ্ন উঠেছিল কারা এসব ঘটিয়েছে? সরকার তদন্তের আগেই বিএনপি-জামায়াতের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলেও বিভিন্ন মিডিয়ার তথ্যচিত্র থেকে এটি যথেষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, আওয়ামী লোকেরাই এর সাথে জড়িত ছিল। যুক্তির খাতিরে যদি ধরে নেয়া হয়, বিএনপি-জামায়াত তো সংখ্যালঘুদের ভোট তেমন একটা পায় না, তাহলে তারা তাদের ওপর আক্রমণ করলে তো ভোট আরো কমে যাওয়ার কথা। সুতরাং তারা সে কাজটি করবে কেন? অপর দিকে আওয়ামী লীগ সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীন করে তাদেরকে বলতে পারে- দেখো, বিএনপি-জামায়াত নয়; আওয়ামী লীগই তোমাদের একমাত্র ভরসা। বস্তুত বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে ভারতকে এরূপ মেসেজ দেয়া হতো যে, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় না রাখলে সংখ্যালঘুরা নিরাপদে থাকবে না। এভাবে আওয়ামী লীগ সংখ্যালঘুদের নিয়ে নির্মম রাজনৈতিক খেলা খেলত। এ বিষয়ে তথ্য ফাঁস করেছিলেন বহুল আলোচিত নারায়ণগঞ্জের গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক রাফিউর রাব্বি, যার কিশোর ছেলে ত্বকী নির্মমভাবে অপহরণ ও খুন হয়েছিল। তিনি জনসমাবেশে প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছিলেন, আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানের লোকেরা তার ছেলেকে খুন করেছে। এ সময়ে তিনি আরো বলেন, বিগত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে শামীম ওসমান মন্দিরে মূর্তি ভেঙে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, তাকে ভোট না দিলে মন্দির রক্ষা হবে না।
মানবাধিকারকর্মী মিনা ফারাহ লিখেছিলেন- ‘সাম্প্রতিককালের গণহত্যা আর প্রশাসনিক ব্যর্থতা আড়াল করতেই একটি গোষ্ঠী আর দলের নামে মন্দির, গির্জা আর প্যাগোডা পোড়ানোর উৎসব শুরু করেছে।’ এ প্রসঙ্গে প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ লিখেছিলেন- ‘সরকারের অস্তিত্বের জন্য শেষ ফন্দি ছিল সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের জিগির তোলা। দুনিয়াকে বিশেষ করে ভারতকে দেখানো যে, জামায়াতের লোকেরা হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন করছে। বাস্তবে আওয়ামী লীগই অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব করেছে। পুলিশ নিশ্চুপ থাকছে। তারা রামুর দাঙ্গার সময়ে যেমন উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে জেগেও ঘুমিয়েছিল। তখন বেশ কিছু হিন্দু পরিবার স্থানীয় আওয়ামী লীগারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে নিরাপত্তাহীনতার জন্য থানায় এসে আশ্রয় নিয়েছিল। সবাই বিশ্বাস করেন, সরকারের প্রত্যক্ষ মদদ এবং পরোক্ষ ইন্ধন ছাড়া বাংলাদেশে কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় না।’ (দৈনিক আমার দেশ, ১৯ মার্চ ২০১৩) আরো মজার বিষয় হলো- তখন ভারতের আউটলুক পত্রিকায় পশ্চিমবঙ্গের অভিনেত্রী শ্রীলা মজুমদারের স্বামী এসএনএম আবদি লিখেছিলেন- ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো দিকটি হলো, তারা ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কোনো হিন্দুকে হত্যা করে না। সততার সাথে বলতে হয়, ভারতে হিন্দুত্ববাদী কিছু সংগঠনের হাতে যেভাবে মুসলমানেরা নিয়মিত টার্গেটে পরিণত হচ্ছে সেখানে জামায়াত নিষ্ক্রিয়ই। এ দলটি সম্পর্কে এটিই সরলসোজা কথা।’ (মাসুমুর রহমান খলিলী, দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১৫ মার্চ ২০১৩) দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সিনিয়র সহসম্পাদক সঞ্জীব চৌধুরী লিখেছিলেন- ‘কারা কোন স্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের এ অবস্থায় ফেলেছে, তাদের চিহ্নিত ও প্রতিহত করা জাতীয় স্বার্থে জরুরি। এই কর্তব্য পালনের পরিবর্তে জামায়াত-শিবির আর বিএনপির ঘাড়ে দায় চাপিয়ে এ থেকে ফায়দা লোটার চেষ্টা চালাতে থাকলে বিপদ আরো ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে। ... এমন এমন জায়গায় হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা হয়েছে, যেখানে স্বাধীনতা পক্ষের শক্তির দাপটে বাঘে-গরুতে এক ঘাটে পানি খায়। পক্ষান্তরে, সাতকানিয়ার একজন ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দু আমাকে বলেছেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় সদস্যরা চাঁদা তুলে তাদের অর্থ সাহায্য দিয়েছেন, খোঁজখবর নিয়েছেন।’ সুতরাং এটি পরিষ্কার যে, আওয়ামী লীগের লোকেরাই সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে বিরোধী দলের বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের ওপর দোষ চাপানোর অপকৌশল নিয়েছে।
জাতীয় ঐক্যের পথে একটি প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশ্ন। আরেকটি হচ্ছে রাজনৈতিক বিদ্বেষ। ১৯৭১ সালে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ তার যাত্রা শুরু করেছিল সাম্য, সামাজিক সুবিচার ও মানবিক মর্যাদার মূলনীতিকে সামনে রেখে। তারই প্রতিফলন দেখার কথা ছিল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ অনুশীলনের মধ্যে। কিন্তু বিসমিল্লায় গলদ শুরু হয়ে যায়। আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র নেতা শেখ মুজিব পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা ও অন্যান্য উপজাতিদের বাঙালি হয়ে যাওয়ার উপদেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে তারা তো কখনোই বাঙালি ছিল না। তিনি তার বিরোধীদের ওপর লালঘোড়া দাবড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত মুজিবের স্বৈরতান্ত্রিক আকাক্সক্ষার বেদিতে বলী দিতে হয় জনগণের সম্মিলিত প্রত্যাশার গণতন্ত্রকে। একদলীয় বাকশাল গঠন ছিল চরমতম উদাহরণ। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান উদ্ধার করেছিলেন বহুদলীয় গণতন্ত্রকে। শুধু তাই নয়, তিনি সঙ্কীর্র্ণ রাজনৈতিক বিভেদ পরিহার করে সব দল ও মতের লোকদের নিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ার প্রচেষ্টা চালান। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা তাকে সেপথে বেশি দূর চলতে দেয়নি। আওয়ামী-বাকশালী ভূত আবার জাতির ওপর চেপে বসে। তারা ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিহিংসা-বিদ্বেষ-ঘৃণার চর্চা শুরু করে। রাজনৈতিক অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে তারা জাতীয় বিভেদ সৃষ্টি করে। ‘স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ’, সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, জঙ্গি ইত্যাদি পরিভাষা ব্যবহার করে তীব্র কটাক্ষপূর্ণ ভাষায় রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তথা বৃহত্তর সামাজিক কাঠামোতে একটি বড় ধরনের ক্ষত সৃষ্টি করে। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ ছিল ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানোর আনুষ্ঠানিক মঞ্চ। পরিবেশ-পরিস্থিতির এমন অবনতি ঘটে যে, জানাজা নামাজ, ওয়াজ-মাহফিল বা বিয়ে-শাদির মতো সামাজিক অনুষ্ঠানকেও কলুষিত করা হয়। এক রাজনৈতিক ঘরানার সাথে আরেক রাজনৈতিক ঘরানার নতুন আত্মীয়তার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠাও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের মধ্যে পতিত হয়। সব রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান আওয়ামী দলীয়করণের শিকার হয়। এভাবে জাতীয় ঐক্যের প্রধান অন্তরায় ছিল আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থক একটি কট্টর সেকুলার বাম রাজনৈতিক গোষ্ঠী।
ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ফলে আগস্ট বিপ্লবের মধ্য দিয়ে এক দিকে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটেছে এবং অপর দিকে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার একটি শুভসূচনা হয়েছে। নতুন একটি বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ এসেছে। এ গণ-অভ্যুত্থানের একক কোনো নেতা ছিল না। জাতির সম্মিলিত শক্তির যে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তাও কোনো এক নেতার ডাকে ঘটেনি। জাদুমন্ত্রের মতো এক অলৌকিক শক্তির ইঙ্গিতে সব কিছু ঘটেছে। আর তার অনুঘটক ছিল ছাত্র-জনতার ঐক্য। বাংলাদেশের জনগণ প্রমাণ করেছে, তারা দেশের জরুরি প্রয়োজনের সময় ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। সেটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হোক বা রাজনৈতিক প্রয়োজন। ছাত্র-জনতাই আবার পরিবর্তিত বাংলাদেশ পুনর্গঠনের নেতৃত্ব দিয়েছে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে। এখন জনগণের অভিপ্রায় হচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্রের বেশ কিছু জরুরি সংস্কার সম্পন্ন করে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। কাজটি মোটেই সহজ নয়। এ জন্য সরকারের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সে মোকাবেলার জন্য সরকারের দরকার জনসমর্থন। সরকার ও জনগণের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের কাজটি রাজনৈতিক দলগুলো যতটা সহজে করতে পারে, অন্য কারো পক্ষে তা সহজ নয়। বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদ যদি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের দিয়ে পুনর্গঠন করা হয় অর্থাৎ প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বেই একটি জাতীয় সরকার গঠন করা হয় তাহলে তাদের পক্ষে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো সহজ হতে পারে।
লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব
ayubmiah@gmail.com

