দেশ স্বাধীন হওয়ার তিন বছর পর ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি কোনো আলোচনা ছাড়াই কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সংসদে আনা হয়েছিল সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী সংশোধনীর ফলে জাতির ঘাড়ে চেপে বসে একদলীয় শাসনব্যবস্থা। এরই ধারাবাহিকতায় ওই বছর ১৬ জুন বিতর্কিত বাকশাল সরকার প্রণয়ন করে ‘দ্য নিউজ পেপার এমেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট’। আসলে সংবাদপত্রের ব্যবস্থাপনা নয় এমনকি কেবল নিয়ন্ত্রণও নয়, ইচ্ছেমতো পত্রিকা নিধনের লক্ষ্যেই এই কলঙ্কজনক আইন প্রবর্তন করা হয়েছিল।
সংবাদপত্রে অনেক কিছুই লেখা যেত না। ‘এটা লিখো না, ওটা লিখো না, বাংলাদেশের ইতিহাসে ঐ ঘোরকৃষ্ণ অধ্যায়ের সরকারের স্বেচ্ছাচারের শিকার হয়ে প্রায় আট হাজার সাংবাদিক ও সংবাদপত্রসেবী পেশাচ্যুত হয়েছিল। বেকার অবস্থায় দীর্ঘ দিন সপরিবারে অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করতে হয়েছে বহু সাংবাদিককে। চার শতাধিক পত্রিকার মধ্যে শুধু সরকারের নিয়ন্ত্রণে চারটি পত্রিকা বের হতো। এগুলো হলোÑ দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ অবজারভার ও বাংলাদেশ টাইমস। যে ইত্তেফাকের জন্মই হয়েছিল আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবকে সমর্থনের জন্য সেই ইত্তেফাকের প্রায় দুই যুগের ইতিহাস মুছে ফেলে সরকারের নির্দেশে প্রথম পৃষ্ঠায় লিখতে হয়েছিল ‘১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা’। অবশ্য ১৫ আগস্টের পর ইত্তেফাক ২৪ আগস্ট পূর্বের সিরিয়ালে ফিরে আসে আটষট্টি দিনের এপিসোডের পর এবং দৈনিক বাংলা তার পূর্ব সিরিয়ালে ফিরে যায় ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর।
বর্তমান সরকার সংবাদপত্রের দমন-পীড়নের কাজটি করেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন প্রথমবারের সরকার ১৯৯৯ সালে টাইম-বাংলা ট্রাস্টের চারটি পত্রিকা বন্ধ করে দেয়। ২০০৯ সালে দ্বিতীয় দফায় রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর থেকে ‘চ্যানেল ওয়ান’, ‘দিগন্ত টেলিভিশন’, ‘ইসলামিক টিভি’, ‘দৈনিক আমার দেশ’সহ বেশ কিছু গণমাধ্যমের ওপর খড়গ চালানো হয়।
ফেনীর জয়নাল হাজারী যুগের পর শাসকগোষ্ঠীর উচ্ছৃঙ্খল নেতারা কারণে-অকারণে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়ে চলেছেন। মেধাবী সাংবাদিক ‘যায়যায়দিন’ খ্যাত শফিক রেহমান, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ ও ‘আমার দেশ’ পত্রিকার নির্ভীক সম্পাদক মাহমুদুর রহমানসহ বহু সাংবাদিককে জেলে বন্দী ও দৈহিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, হচ্ছে। এমনকি নৃশংস খুনের শিকার হতে হয়েছে অনেক সত্যানুসন্ধানী কলমসৈনিককে। সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে তথা ফ্যাসিবাদী আচরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেই রাষ্ট্ররোষের কবলে পড়তে হচ্ছে।
এ ছাড়া সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি ও ফরহাদ খাঁ হত্যার লোমহর্ষক ঘটনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তোলপাড় সৃষ্টি করে। সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস সত্ত্বেও দীর্ঘ দিন পার হলেও খুনিরা ধরা পড়েনি। বিশ্ব গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের দুই ধাপ অবনমন ঘটেছে। সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার সাথে খোদ সরকার বা সরকারদলীয় সংসদ সদস্য, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসনের যোগসূত্রতায় মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করলেও পরিস্থিতির এতটুকু উত্তরণ ঘটছে না।
বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা ফ্রান্সভিত্তিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস ১৮০টি দেশের গণমাধ্যম পর্যালোচনা করে সর্বশেষ চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল যে সূচক প্রকাশ করে, তাতে দেখা যায় বিশ্বে স্বাধীন গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান আগের বছরের তুলনায় দুই ধাপ পিছিয়েছে। সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৬তম। গত বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৪। এবারের সূচকে বাংলাদেশের সার্বিক স্কোর ৪৮.৩৬, যা গত বছর ছিল ৪৫.৯৪। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস জানায়, ‘বিশ্বব্যাপী স্বৈরাচারী সরকারের উত্থানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়েছে। এর আগে এমন হুমকিতে আর কখনো পড়তে হয়নি।’
ওয়াকিবহাল মহল বলছেন, ’৭৫ আর বর্তমান শাসনামলের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে উটকো বিড়ম্বনা এড়িয়ে চলতে গণমাধ্যম নিজেরাই সেন্সরশিপ করছে। সংবাদপত্রগুলোয় সরকারের উন্নয়ন স্তুতি গাওয়া হচ্ছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন, আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি, দুর্নীতি, লুটপাট, জনবিরোধী চুক্তি, পরিবেশবিরোধী প্রকল্প ইত্যাদির ব্যাপারে থোরাই প্রতিবেদন হচ্ছে গণমাধ্যমে।হ
Email:zarifzahid140@gmail.com
