অনেক প্রগতিবাদী বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার সংস্কৃতিকে ‘দুই বাংলার সংস্কৃতি’ এক বলে মনে করেন। বাংলাদেশের পাশেই পশ্চিম বাংলার অবস্থান। এটি ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য বা প্রদেশ। বর্তমানে পশ্চিম বাংলার নামকরণ ‘বাংলা’ করা হয়েছে।
যারা ‘দুই বাংলা’ বলেন, তাদের না বোঝার কথা নয় যে, এটা বললে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের মর্যাদা ক্ষুণœ হয়। একটি দেশ, অন্যটি প্রদেশ। বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র। এর সরকারপ্রধানকে প্রধানমন্ত্রী বলা হয়। অন্য দিকে, পশ্চিম বাংলায় প্রধানমন্ত্রী নেই; আছেন মুখ্যমন্ত্রী। এ দু’জনে মর্যাদায় অনেক পার্থক্য। বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলা সমান গুরুত্ব ও মর্যাদা বহন করে না। একইভাবে, নদী ও শাখানদী সমতুল্য নয়। বাংলাদেশ পশ্চিম বাংলার মতো নিছক একটি প্রদেশ হলে অথবা পশ্চিম বাংলা যদি বাংলাদেশের মতো একটি সার্বভৌম দেশ হতো, ‘দুই বাংলা’ বলাটা যুক্তিযুক্ত হতো। ‘সংস্কৃতি’ বলতে বুঝায় মানুষের জীবনাচার। মানুষের গোটা জীবন পদ্ধতিই সংস্কৃতি। প্রতিদিন মানুষ যে জীবনযাপন করছে সে জীবনযাপনের কর্মপ্রবাহই সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। শুধু কবিতা, গল্প লেখা, নাচ-গান নিয়ে সংস্কৃতি নয়। আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস, খাদ্যাভ্যাস, বেশভূষা, লোকাচার, জীবনচর্চার প্রতিটি উপাদান নিয়েই সংস্কৃতি। এর সাথে আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িত।
‘প্রত্যেক সংস্কৃতি জাতিসত্তার ঐতিহ্যকে প্রকাশ এবং কতকগুলো অপরিবর্তনীয় মূল্যবোধকে প্রতিবিম্বিত করে। প্রত্যেক জাতি নিজের সংস্কৃতির মাধ্যমে পৃথিবীতে তার উপস্থিতিকে চিহ্নিত করে। বাংলাদেশে প্রধানত ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রেরণা সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিষ্টানÑ সবার ক্ষেত্রেই ধর্মবিশ্বাস জীবনের প্রেরণার উৎস। ধর্ম হচ্ছে সংস্কৃতির একটি প্রধান উপাদান। ধর্মবিশ্বাসের কারণে সংস্কৃতিতে বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়।’
সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ভাষা। মানুষের অনুভূতি এবং প্রতিক্রিয়া ভাষার সাহায্যে উন্মুক্ত হয়।
আমেরিকার ইংরেজি ভাষা এবং ব্রিটেনের ইংরেজি ভাষার মধ্যে যেমন পার্থক্য আছে, তেমনি বাংলাদেশের বাংলা ভাষা এবং ভারতের পশ্চিম বাংলার বাংলা ভাষার মধ্যে স্বাভাবিক পার্থক্য রয়েছে। এ বাস্তবতা অস্বীকার করলে বাঙালির হাজার বছরের আত্মপরিচয়ের ইতিহাসকে বিকৃত করা হবে। স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই পদ্মা এবং যমুনা নদীর পানি যেমনভাবে পাশাপাশি প্রবাহিত হয়ে, গায়ে গা লাগিয়ে বয়ে চলেছে অথচ মিশে যাচ্ছে না, তেমনি সীমান্তের ওপার এপারে বাংলা ভাষা দু’টি পৃথক ধারায় প্রবহমান। ভাষার পার্থক্য আছে বলে তাদের কেউ কেউ ‘রেহমান সোবহানকে’ ‘রেরহমান সুজন’, সোহরাওয়ার্দীকে ‘সুরাবর্দি (ব্রিটিশ আমল থেকে লিখে আসছেন), আল মাহমুদকে আল মোহাম্মদ’, ওবায়দুল কাদেরকে ‘বাবাইদুল কাদের’, বাংলা একাডেমিকে ‘বাংলা আকাদেমি’ লিখে থাকেন। তারা সংসদ সদস্য, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ঘাটতি, দোষারোপ করছেন, প্রস্তুত রয়েছে, দোষ চাপানো, অনিয়ম বা কারচুপি, বাঘে মোষে (লড়াই)/ হরতাল, মন্ত্রণালয়, ব্যবসায়ী সংগঠনÑ এসব শব্দের পরিবর্তে যথাক্রমে সাংসদ, বিদেশমন্ত্রী, খামতি, দুষছেন, মুখিয়ে আছে, উতোর চাপানো, নয় ছয়, হাড্ডাহাড্ডি, ও বনধ মন্ত্রক, বণিক সভা ব্যবহার করে থাকেন। এটা তাদের ভাষার স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য। এটা তারা কোনো অবস্থাতেই বর্জন করবেন না।
পশ্চিম বাংলায় যারা বাস করেন তারা বাংলাভাষী এবং শুধু বাঙালির পরিচয়ে তারা সন্তুষ্ট নন। দেশসত্তায় তারা ভারতীয় নাগরিক। প্রত্যেকে নিজেকে ভারতীয় বলে গর্ববোধ করেন। তাদের মধ্যে কেউ কখনো নিজেদের ভারতীয় সত্তারবহির্ভূত বলে মনে করেন না। ভারতের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সাথে, ঐতিহ্যের সাথে, উন্নয়নের সাথে এবং ভারতের শত্রুদের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধতা প্রকাশের ক্ষেত্রে তারা এক এবং অভিন্ন। সোজা কথায়, তারা ভারতীয়। দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের কিছু বুদ্ধিজীবী আছেন যারা নিজেদের পশ্চিম বাংলার মানুষের সাথে অভিন্ন বাঙালি বলে ঘোষণা দেন। পশ্চিমে বাংলার মানুষ সাধারণভাবে ভাষাগত সূত্রে আমাদের সাথে একাত্ম হলেও আধুনিক অর্থে, জাতিগত সূত্রে আমাদের স্বভাবের নন। কর্মসাধনার ক্ষেত্রেই জাতিতে জাতিতে, মানুষে মানুষে সাংস্কৃতিক বিভাজন গড়ে উঠেছে। পৃথিবীর সব মানুষই খাদ্য গ্রহণ করে এবং এ ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু বিবিধ প্রকার খাদ্য বিভিন্ন আকারে মানুষ গ্রহণ করে থাকে এবং খাদ্য প্রস্তুতকরণ ও পরিবেশন প্রক্রিয়ার দিক থেকে তাদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। খাদ্য গ্রহণ সর্বজনীন, কিন্তু খাদ্য গ্রহণের উপায় আর পদ্ধতিটা এক নয়।
আমরা চায়ের সাথে দুধ ও চিনি মিশাই। মাছ, গোশত, তরিতরকারি ইত্যাদি মরিচ, ঝাল, মসলা, তেল দিয়ে রান্না করি। এটা আমাদের সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য। আবার অনেক দেশে শুধু গ্রিন টি খাওয়া হয়। তারা দুধ, চিনি মেশান না। তরিতরকারিতে তেল, মরিচ, মসলা দেন না। সিদ্ধ, অর্ধসিদ্ধ করে খান। আবার অনেকে কাঁচা খান। এটা তাদের খাদ্যাভ্যাস, যা সংস্কৃতির অঙ্গ। চীন, কোরিয়ার লোকেরা সাপ খায়। আমরা তা খাই না। আমাদের দেশে কোনো কোনো উপজাতি হাতির মাংস খায়। কিন্তু আমরা খাই না। এটা আমাদের সংস্কৃতির একটি অঙ্গ।
আমাদের ঘরে কোনো অতিথি এলে আমরা তাকে চা-নাশতা দিয়ে আপ্যায়ন করি। এ জন্য তিনি খেতে না চাইলেও আমরা অনুরোধ করি। কারণ এটা আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গ। পশ্চিম বাংলার লোকেরা আমাদের মতো অতটা কাউকে আপ্যায়ন করেন কি?
এক ব্যক্তি তার মেয়েকে দেখার জন্য দীর্ঘ দিন পরে কলকাতা গিয়েছিলেন। তার মেয়ে বিয়ের পরেই পশ্চিম বাংলা নিবাসী। তার ইচ্ছা ছিল, কিছু দিন মেয়ের সাথে কলকাতায় থাকবেন। মেয়ে তাকে দেখে বললেন, ‘বাবা, তুমি তো আজ চলে যাবে, পরের বার এলে এখানে কিছু দিন থাকবে।’ আরেক ব্যক্তি তার বন্ধুর বাড়ি গেলে সে বন্ধু তাকে চা দিতে বললেন। তখন মেহমান জানালেন, তিনি তো এখনো নাশতা করেননি। তাকে আর চা দেয়া হলো না। আমাদের দেশ হলে তখন চা আর নাশতা দুটোই দেয়া হতো সে অতিথিকে। লোকসংস্কৃতি আমাদের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। মানুষের খাদ্য স্বভাব ও আহরণ, কৃষিকাজ, বনভূমি সংরক্ষণ, নদী এবং মানুষের সাথে নদীর সম্পর্ক, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কার এগুলো নিয়ে আমাদের লোকসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের বয়াতিরা গেরুয়া বসন ভূষণ পরিধান করেন না। এই বেশভূষা পশ্চিম বাংলার রাঢ় অঞ্চলের বাউলদের ঐতিহ্য। কুষ্টিয়ার লালনের অনুসারী বাউলরা গেরুয়া আলখাল্লা বা পাগড়ি পরে না, যা কিনা পশ্চিম বাংলার বাউলরা পরে থাকেন। বাংলাদেশের বয়াতিরা বাবড়ি রাখেন, দোতরা বাজিয়ে গান করেন। বাংলাদেশের ঐতিহ্য বাঙালি জাতির পূর্বসূরিদের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য। এটাকে মুছে ফেলা যায় না। আমাদের সংস্কৃতিতে আমাদের মাটি ও মানুষের সম্পর্ক রয়েছে। তা অস্বীকার করার অর্থ হচ্ছে আমাদের জাতীয় অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। ‘দুই বাংলার সংস্কৃতি এক’ বলা সঙ্গত কি না এটাই আমাদের প্রশ্ন।হ