দেশের পোশাক শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে চলছে এক ধরনের তামাশা। যাদের কষ্টার্জিত ঘামে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে আজ তারা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। সর্বনিম্ন মজুরি নিয়ে তারা এক ধরনের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। তার কারণ, মালিকপক্ষ এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে মজুরি বোর্ডে যেভাবে উপস্থাপন করেছে তাতে দেখা যায় তাদের চাওয়া-পাওয়াটা উপেক্ষিতই থেকে যাবে। ছয় হাজার ৪০০ টাকায় বর্তমান বাজারব্যবস্থায় কি কোনোভাবে চলা যায়? একজন মানুষ পরিবার নিয়ে বসবাস করতে হলে তার ঘর ভাড়া কত পরিশোধ করতে হয়? জীবন ধারণের জন্য চিকিৎসা, যাতায়াত খরচ, পরিধানের কাপড়চোপড় এবং খাওয়া বাবদ কত টাকার প্রয়োজন হয়? ২০১৩ সালে যে মজুরি কাঠামো ছিল তার সাথে বর্তমান প্রেক্ষাপট কি আদৌ মিলবে? শ্রমিকেরা তাদের বেতনের টাকা দিয়ে বিলাসিতা করার কোনো ধরনের চিন্তা করেন না, শুধু বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু প্রয়োজন সেটুকুই তাদের দাবি।
যাদের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে যেসব মালিকপক্ষ বিলাসবহুল গাড়ি হাঁকিয়ে চলেন, এসিতে থাকেন, দামি সিগারেট ফুঁকান তারা কি একবারের জন্য ভেবে দেখছেন, তাদের শ্রমিকটি কতটা অমানবিক জীবন যাপন করছেন। তার এক প্যাকেট সিগারেটের মূল্যও কি শ্রমিকদের দিচ্ছেন। দেশের অর্থনীতির ভীত এখন পোশাক খাতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্সে ধস নামায় বাংলাদেশ ব্যাংকের রিভার্জ এখন নিম্নমুখী। সে কথা চিন্তা করতে গেলে পোশাক খাতের অবদান দেশের জন্য বিরাট। কিন্তু যে শ্রমিকের ঘামে অর্জিত অর্থে রাষ্ট্রের চাকা সচল হচ্ছে তাদের পক্ষে না আছে মালিকপক্ষ না আছে রাষ্ট্রপক্ষ। ২০১৩ সালের একটি মানবিক উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে তাদের জীবনের চাওয়া-পাওয়ার হিসাবটা কতটা কঠিন। ছোট সাইজের একটা ইলিশ ২০১৩ সালে ছিল ৪০ টাকা। সেই মাছের দাম বর্তমান প্রেক্ষাপটে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার কম নয়। সরকার ছোট ইলিশ ধরা বন্ধ ঘোষণা করেছে। কিন্তু যখন গরিব পোশাক শ্রমিকদের দেখি তখন ভাবনা এসে যায়। তাদের পক্ষে আদৌ একটি বড় ইলিশ এক হাজার থেকে ১২০০ টাকায় কি কিনে খাওয়া সম্ভব? মালিকপক্ষ তাদের বাসার ভাড়া ধরেছেন এক হাজার ৪০০ টাকা যেখানে সরকার গ্যাস বিল বাড়িয়ে ৮০০ টাকা করেছেন সেখানে কী করে একজন শ্রমিক এক হাজার ৪০০ টাকা ভাড়া থাকবেন। মালিকপক্ষ সর্বনিম্ন ছয় হাজার ৩৬০ টাকা মজুরি প্রস্তাব করেছেন মজুরি বোর্ডে। এর মধ্যে মূল মজুরি তিনি হাজার ৬০০ টাকা, বাসা ভাড়া এক হাজার ৪০০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৩০০ টাকা, যাতায়াত ভাতা ২৪০ টাকা এবং খাদ্য ভাতা ৭৮০ টাকা। যেখানে শ্রমিক সংগঠনগুলো সর্বনিম্ন ১৬ হাজার টাকা মজুরির জন্য আন্দোলন করেছিল, সেখানে তাদের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে শ্রমিকপক্ষের সাথে আলাপ-আলোচনা না করেই কিভাবে মজুরি বোর্ডে জমা দিলো তা একটি বিস্ময়কর ঘটনা। যেখানে তাদের স্বার্থ কায়েম করাই ছিল এ সংগঠনের প্রধান লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যে। তা না করে একটি দলের পক্ষ নিয়ে শ্রমিকদের এহেন প্রতারণা ছিল উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত। দেশের মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে একজন শ্রমিকের জীবন যাত্রার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ একটি বেতন কাঠামোই ছিল তাদের প্রাপ্য। সেখানে মালিকপক্ষে ছিলেন বিজিএমইয়ের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান এবং জাতীয় শ্রমিক লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক বেগম শামছুন্নাহার ভূঁইয়াকে শ্রমিকদের পক্ষে শ্রমিক প্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়। আর এখানেই বর্তমানে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। উপেক্ষিত হচ্ছে শ্রমিকদের চাওয়া-পাওয়ার ভাগ্যটুকু। মজুরি বোর্ডে ১২ হাজার ২০ টাকার প্রস্তাব দেয়ায়, ১২ শ্রমিক সংগঠনের জোট গার্মেন্ট শ্রমিক আন্দোলনের নেতারা মজুরি বোর্ডের সামনে বিক্ষোভ করছেন। তা ছাড়া গার্মেন্টশ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের নেতারাও মালিক এবং শ্রমিকপক্ষের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। মালিকপক্ষের বক্তব্য হলোÑ শ্রমিকদের দাবি মেনে নিলে তাদের পোশাক কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে। মালিকপক্ষের এহেন বক্তব্যে কোনো ধরনের বাস্তবতা নেই। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সব মিলিয়ে রফতানি পণ্য রফতানি থেকে আয় হয়েছিল তিন হাজার ৬৬৬ কোটি ৮১ লাখ ডলার। তার মধ্যে শুধু পোশাক খাত থেকেই আয় এসেছে তিন হাজার ৬১ কোটি ৮৭ লাখ, যা মোট রফতানির ৮৩ দশমিক ৪৯ শতাংশই এ খাতের অবদান; যা বিগত কয়েক বছরে ছিল নাজুক দশা। ২০১৬-২০১৭ সালেই এ ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। তখন রফতানি হয়েছিল শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ। দেশের পোশাক খাতের জন্য বহির্বিশ্বে একটা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে রানা প্লাজা ধ্বংসের পর থেকে এ খাতকে একটি বিশেষ সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। কারখানাগুলোতে ছিল না তখন শ্রমিকদের কাজ করার ন্যূনতম পরিবেশ। মধ্যপ্রাচ্য যখন অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছিল তখন ক্রেতারা সেখান থেকে আমাদের রাজনৈতিক অবস্থা এবং সঠিক সময়ে পণ্য পাঠানোর অনুকূল পরিবেশ থাকায় বিশ্বের বাঘা বাঘা কোম্পানিগুলো লাইন ধরেছিল আমাদের দেশে। কিন্তু শ্রমিকদের দুরবস্থার কারণে তারা আবার পিছিয়ে যায়। ঘন ঘন পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটা এবং তাতে বিপুল শ্রমিক মারা যাওয়াই ছিল প্রধান কারণ। ক্রেতাদের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ তৈরি জন্য কারখানার অবকাঠামো বদলানোর শর্তে তারা আবার ফেরত আসার ইঙ্গিত দেন। তাতেই মালিকপক্ষের টনক নড়ে। তারা তাদের পোশাক খাত শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ এবং কর্মপরিবেশ তৈরি করায় তারা আবার ফিরে এসেছে। কিন্তু সেই জটিলতা আবার যদি তৈরি হয়, তাহলে দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বর্তমানে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নিয়ে যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে তার বাস্তব সমাধানই হবে সরকার এবং মালিকপক্ষের প্রধান কাজ। নইলে দেশের অর্থনীতির একমাত্র চালিকাশক্তি পোশাক খাতে কোনো ধরনের নৈরাজ্য ফিরে এলে তাতে দেশের কোনো মঙ্গল বয়ে আনবে না এবং তখন সরকার ও মালিকপক্ষ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হ