বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সরকারি ও বেসরকারিÑ এ দুটি ধারা বিদ্যমান। বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা শিক্ষাব্যবস্থায় ৯৭ শতাংশ অবদান রাখলেও আবহমানকাল ধরে তারা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ‘শিক্ষাবান্ধব’ হিসেবে পরিচিত বর্তমান সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছেন। তা সত্ত্বেও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নেই পূর্ণাঙ্গ বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব বোনাস, অবসর ভাতা, টিফিন ভাতা, শিক্ষা ভাতা, পাহাড়ি ভাতা ও বদলির ব্যবস্থা।
সরকারি কলেজের প্রভাষকদের সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদে পদোন্নতির সুযোগ থাকলেও এমপিওভুক্ত কলেজের প্রভাষকরা জীবনে মাত্র একটি পদোন্নতি পান। অনুপাত প্রথার শতকরাসহ নানা শর্তারোপ করে পদোন্নতির সুযোগকে সঙ্কুচিত করা হয়েছে। তার ওপর সম্প্রতি উচ্চমাধ্যমিক কলেজ বা মাদরাসা থেকে সহকারী অধ্যাপক পদ বিলুপ্ত করা হয়েছে। ‘এমপিও নীতিমালা-২০১৮’ এ প্রভাষকদের নানা সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়। অনুপাত (৫.২) প্রথা, ৮ বছর পূর্তিতে সপ্তম গ্রেডের পরিবর্তে ১০ বছরে অষ্টম গ্রেডে উচ্চতর স্কেল এবং প্রভাষকদের উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষ পদে আবেদনের সুযোগ বাতিল করা হয় এ নীতিমালায়। বৈষম্যপূর্ণ এ নীতিমালার বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম আন্দোলনের ডাক দেয় কলেজ শিক্ষক পরিষদ, সিলেট। পরে অন্যান্য সংগঠনও এ আন্দোলন শুরু করলে সরকার গত ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে ১০ সদস্য বিশিষ্ট ‘এমপিও নীতিমালা সংশোধন কমিটি’ গঠন করে। ওই কমিটিতে নন-এমপিও শিক্ষক, মাদরাসা ও কারিগরির প্রতিনিধি রাখা হলেও স্কুল-কলেজের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি। অনেক কালক্ষেপণ করে ওই কমিটি নীতিমালা সংশোধনের নামে আরো জটিল করেছে। ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিয়ে ৪ শতাংশ কেটে নেয়ার মতো ১ : ১ তথা ৫০ শতাংশ প্রভাষককে পদোন্নতির বিধান করা হলেও ৪০ বছরের অধিককাল যাবৎ উচ্চমাধ্যমিক কলেজ-মাদরাসায় বিদ্যমান সহকারী অধ্যাপক পদ বিলুপ্ত করে জ্যেষ্ঠ প্রভাষক পদ সৃষ্টি করা হয়। সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি না হওয়ায় প্রভাষকরা আর কখনো উপাধ্যক্ষ বা অধ্যক্ষ পদে আবেদনের সুযোগ পাবেন না। তা ছাড়া এ বিধানের ফলে আইসিটি, বিজ্ঞান শাখা, ব্যবসায় শিক্ষা শাখার বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাষকরা তাদের বিষয়টি ডিগ্রি পর্যায়ে না থাকায় তারাও কখনো সহকারী অধ্যাপক হতে পারবেন না।
গত ২৩ নভেম্বর ২০২০ তারিখে মাদরাসা ও কারিগরি ওয়েবসাইটে এ নীতিমালা প্রকাশিত হয়েছে। স্কুল-কলেজের নীতিমালা শিগগিরই জারি করা হবে এবং এ ক্ষেত্রেও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে জ্যেষ্ঠ প্রভাষক পদ থাকবে বলে নীতিমালা সংশোধনী কমিটির সদস্যরা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন। সরকারি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সমমানের কোনো প্রতিষ্ঠানে নব উদ্ভাবিত জ্যেষ্ঠ প্রভাষক পদ না থাকলেও কোন রহস্যজনক কারণে এমপিওভুক্ত উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে এ পদ সৃষ্টি করা হলো? অথচ সহকারী অধ্যাপক ও জ্যেষ্ঠ প্রভাষক পদের বেতন কোড একই। তাহলে পদবি কেড়ে নেয়ার উদ্দেশ্য কি জাতি গড়ার মহান কারিগরদের অসম্মান করা? আগের কোনো নীতিমালায় উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি কলেজের বা মাদরাসার প্রভাষকদের মধ্যে কোনো বৈষম্য না থাকলেও সর্বশেষ নীতিমালা সংশোধনীতে নতুন করে বৈষম্য সৃষ্টি করায় দেশের প্রভাষকরা ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত। বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক পরিষদ পাঁচ দফা দাবি জানাচ্ছে অবিলম্বে এ নীতিমালা সংশোধনের জন্য। সারা দেশের লক্ষাধিক প্রভাষকের পক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার কাছে বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক পরিষদের পাঁচ দফা দাবি জানায়Ñ ১. উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে সহকারী অধ্যাপক পদ পুনর্বহাল করে ৮ বছর পূর্তিতে সব প্রভাষককে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়া; ২. জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে এমপিওভুক্ত কলেজের প্রভাষকদের সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়া; ৩. আগের মতো অভিজ্ঞ প্রভাষকদের উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষ পদে পদোন্নতি দেয়া; ৪. উচ্চতর স্কেল বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে আগে প্রাপ্ত ইনক্রিমেন্ট যুক্ত করা; ৫. সর্বোপরি, মুজিববর্ষে সব এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা। হ
লেখক : উপাধ্যক্ষ, রোকনউদ্দিন মোল্লøা গার্লস ডিগ্রি কলেজ,
আড়াইহাজার, নারায়ণগঞ্জ
