আজ আমরা অনেকটা দিশেহারা। শুধু করোনা মহামারীর কারণেই নয়, বিশ্বব্যাপী বন্যা, খরা, ঝড়ঝঞ্ঝা, দাবানল, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প প্রভৃতি ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে চলছে। মেরু অঞ্চলের জমাট বাঁধা বরফ গলে গলে পৃথিবীর অবয়ব গ্রাস করে ফেলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার কারণে। শুধু কি তাই? লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে নোনা পানি, নদী তথা খাল-বিল সর্বত্রই লোনা পানির বিস্তার। করোনার পাশাপাশি আসছে আরো অনেক ধরনের ভয়াবহ ভাইরাসের আগ্রাসন। মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়ায় হাজার হাজার বছরের সুপ্ত এসব ভাইরাস এখন জেগে উঠছে। এগুলো কতটা ভয়াবহ, তা এখনো নিরূপণের অপেক্ষায়। সুতরাং এক করোনাভাইরাসের যত টিকাই আবিষ্কার হোক না কেন সহজে নিস্তার পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।
দাবানলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে এলাকার পর এলাকা। দাবানল কোথায় নয়; অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে ক্যালিফোর্নিয়া, গ্রিস, ফ্রান্স, আমাজন তো বটেই। পরপর তিন বছর আমাজন বন পুড়ছে। জানা যায়, আমাজন ফরেস্টের এক-তৃতীয়াংশ নিঃশেষ। ব্রাজিলে তো বন পোড়ানোর মাতম চলছে। প্রেসিডেন্ট বলসোনারো নাকি আমাজন বন উজাড় করে সেনাবাহিনী ক্যাম্প করেছে। করেছে কৃষি সম্প্রসারণ ও নতুন নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন। এ পর্যন্ত আমাজনে প্রায় ৩০ হাজার অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে বলে জানা যায়।
বিশ্বের তাপমাত্রা এতই উচ্চতায় চলে গেছে যে, শত শত মানুষ প্রাণ হারাল। শুধু মানুষ নয়, অগণিত প্রাণিকুল প্রাণ হারাচ্ছে গরমের কারণে, তাও আবার শীতপ্রধান দেশগুলোর অতীব মনোরম অঞ্চলগুলোয়। যেমন কানাডার মতো দেশে, ব্রিটিশ কলাম্বিয়া অঞ্চলে গত জুলাইতে তাপমাত্রা ৪৯.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়েছে। এমন হারে প্রাণীর মৃত্যু ঘটেছে যে, সমুদ্রের পাড় ধরে হাঁটা যায় না মরা পচার গন্ধে।
বন্যার ছোবল কোথায় নয়? আমাদের দেশের মতো দেশগুলো তো বটেই; চীন, জার্মানি, জাপান কোনো বাছবিচার নেই। জার্মানির মতো দেশে শত শত মানুষ নিখোঁজ, শত মানুষের মৃত্যু। লন্ডনে বন্যা, বন্যার পানি হাসপাতালে ঢুকে রোগীর মৃত্যু। পেরুতে বন্যার পানি হাসপাতালে মৃত্যু ঘটাল। সুদানে ১১ রাজ্যে প্রবল বর্ষণে ৮৪ জনের মৃত্যু, নিখোঁজ ৬৭, আট হাজার ঘরবাড়ি বিনষ্ট।
বিশ্বের যেসব এলাকায় ঘূর্ণিঝড় কল্পনাও করেনি কেউ, সেখানে এসব দুর্যোগে শত শত মানুষ মারা পড়ছে, হাজার মানুষ হয়ে যাচ্ছে নিখোঁজ। ইতালিতে টর্নেডোতে মৃত্যু, আহত, নিখোঁজ আইডার তোপে, প্রবল বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যা নিউ ইয়র্ক ও নিউ জার্সিতে মৃত্যু।
যত রকম বিপর্যয়, তার সবগুলোর পেছনেই আছে তথাকথিত আশরাফুল মাখলুকাত, স্রষ্টার সেরা সৃষ্টি মানুষের ভূমিকা, অন্য কোনো জীবের নয়। এই মানব নামের দানবই দখলে দূষণে বিশ্বকে করে ফেলছে নিঃস্ব। আদিকাল থেকে আগ্রাসনের মাধ্যমে দখল হয়েছে এক দেশ অন্য দেশ দ্বারা। এই দখলদার মোড়লরা একেকটি দেশ লুটেপুটে নিয়ে নিজের দেশকে করেছে ধনাঢ্য। স্বার্থের লালসায় করেছে দূষণও, যেমন পরদেশী গাছ লাগিয়ে একক চাষের মাধ্যমে স্বল্পসময়ে পয়সা অর্জন করেছে। বারোটা বাজিয়েছে প্রকৃতির স্বাস্থ্যের। এর জন্য ধ্বংস করেছে দখলকৃত দেশের বনজঙ্গল, করেছে স্বল্প সময়ের মধ্যে অত্যধিক পয়সা অর্জনের ব্যবসা, যা তার নিজের দেশে করেনি। লুটতরাজের একটি গল্প আছে আমার কাছে। গল্পটি এখানে তুলে ধরছি।
আমি ডক্টরেট করেছি ফ্রান্সে। আমাদের গবেষণা চলাকালে ফরাসি সরকার সিদ্ধান্ত জানাল, বিভিন্ন দেশ থেকে আগত স্কলারশিপ হোল্ডারদের এক মাসের জন্য প্যারিসে রেখে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস ও তার আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলো দেখাবে। মোট ১৮টি দেশের সবাই প্যারিসে একটি বড় বাড়িতে আমরা। প্রতিদিন ভোরে বাসে করে নিয়ে যায় এবং সন্ধ্যায় আবার নামিয়ে দিয়ে যায়। এক দিন আমাদের দর্শনীয় স্থান বিখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়াম। আমরা অনেক কিছু দেখে যখন মিসরের মমি সেকশনে এলাম এবং গাইডের বর্ণনা শুনে শুনে দেখে যাচ্ছিলাম রাজার মমি, প্রজার মমি, শিশুর মমি, মায়ের মমি প্রভৃতি তখন মিসরীয় স্কলার, ওর নামটা এখন আর মনে নেই; হঠাৎ একটি কাচের তৈরি মমি লাথি বসিয়ে ভেঙে তছনছ করে দিলো এবং বুক উঁচিয়ে বলতে থাকল, ‘তুইয়ে মোয়া’ অর্থাৎ আমাকে মেরে ফেল। ওকে ধরে নিয়ে গেল দু-তিনজন মানুষ। মনে মনে ভাবলাম তোমার পিএইচডি শেষ, ঠিকানা জেলখানা মৃত্যু অবধি। খুব মন খারাপ হলো ওর জন্য। সন্ধ্যায় আশ্রয়ে ফিরে এলাম। সবাই বিমর্ষ। কিন্তু দেখি, অবাক কাণ্ড। ওই মিসরীয় স্কলার কেক কফি খাচ্ছে বাড়ির বিশাল হল রুমের মতো ডাইনিং রুমে। ওকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার তো জেলখানায় থাকার কথা, এখানে?’ বলল, ‘চোর বাটপারের জাত আমাকে জেলখানায় নেবে? লজ্জা কোথায় রাখবে লুটেরা সব? চোরেরা সব মমি নিয়ে এসেছে গবেষণার ভাঁওতা দিয়ে। হাজার বছরে কিছু জানতে পারবে? অথচ আমাদের পিরামিডে মমি নেই।’ পিএইচডি নিয়ে আমি দেশে ফিরে আসার পথে লন্ডন হয়ে এলাম। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে ঢুকে আমার মাথা গরম হয়ে গেল আমাদের জিনিসগুলো দেখে। আমারও ইচ্ছা হচ্ছিল মিসরীয়টার মতো একটা কিছু করি। নিজেকে খুব কষ্টে প্রশমিত করলাম।
এখন আসি আমাদের নিজেদের কর্মকাণ্ডের নমুনা বর্ণনায়। আমাদের দু’বার স্বাধীন হতে হয়েছে। একবার দুই শ’ বছর গোলামির পর ব্রিটিশদের হাত থেকে, আবার ২৪ বছর পর পাকিস্তানিদের হাত থেকে। এখন আমরা স্বাধীন ও আমরা নিজেরাই লুটেরা ও শোষক। দেশের কিছু প্রভাবশালী দানব তাদের বিশেষ শক্তিধরদের ম্যানেজ করে দখলে দূষণে ব্যাপৃত। কী না দখল করছে! আপনার এক টুকরো জমি, পোড়ো বাড়িটা, ক্ষেতখামার, কি না! দখল করছে নদী, খাল-বিল, বন, পাহাড় সবই। বন কেটে সাফ করে কাঠ পাচার, নদী দখল করে হাউজিং, শিল্পকারখানা। দেখবে কে? যারা দেখার তারা তো টাকার তোড়ে বিদেশে স্বপ্নের আবাসের নেশায় মত্ত, এরা বিদেশে টাকা পাচারে ব্যস্ত। দখলদারীই কি শুধু দখলদার? পাহাড় কেটে বন উজাড়, খুপড়ি ঘর করে ভাড়া দেয়া প্রভৃতি জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। পাহাড়ধসে মরণ অসহায় মানব সন্তানদের, বন্যপ্রাণী হত্যা তো চলছেই, বন্যপ্রাণী ব্যবসার যেন মাতম লেগেছে, বিশেষ করে এ করোনাকালেও। করোনাকালে যত কিছু নোট করে আসছি তা বর্ণনাতীত। স্বাভাবিক কালের চেয়ে বহুগুণ বেশি। প্রাণী হত্যা চলছে নিশান উড়িয়ে, চলছে জমজমাট ব্যবসা, পাচার। এই প্রকৃতিকে বিধ্বস্ত করা, বিকলাঙ্গ করা একই একপ্রকার প্রকৃতির ইজ্জতহানি করা নয়? প্রকৃতি কেন তার সম্ভ্রম হারিয়ে চুপ করে থাকবে, কেন ফুঁসে উঠবে না? কেন সব তছনছ করে দেবে না, প্রতিশোধ নেবে না? প্লাস্টিকের বর্জ্য শিল্পকারখানার বর্জ্য, হাসপাতালের বর্জ্য, পারিবারিক বর্জ্য দ্বারা অনবরত দূষণ সংঘটিত হচ্ছে রাস্তাঘাট, নদী-খাল, মানুষ ও প্রাণীর আবাস। এসব নিয়ন্ত্রণ বা প্রশমনের কথা ভাবার যেন কেউ নেই। বনদস্যু দ্বারা সুন্দরবন তো একেবারে ফোকলা হয়ে আছে। তার উপরে সুন্দরবনের বুকজুড়ে প্লাস্টিকের আবরণ। কিভাবে হবে ৎবমবহবৎধঃরড়হ? সুন্দরবন তো ধঁঃড় ৎবমবহবৎধঃরড়হ এর ওপর নির্ভরশীল। নদী সাগরের তলদেশে উঁচু হয়ে গেছে প্লাস্টিক বর্জ্য,ে তিমির পেটে প্লাস্টিক, কচ্ছপ মারা যাচ্ছে প্লাস্টিক খেয়ে, কতশত বড় বড় পাখিরা। দূষণ যে গতি পেয়ে গেছে, যেন রোধ করার কেউ নেই। আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রের অপার মহিমা এতই যে তারা যখন শুষ্ক মৌসুমে নিজেদের স্বার্থে ফারাক্কা তথা সব নদীর বাঁধগুলোর স্লুইসগেট বন্ধ রেখে আমাদের উত্তরাঞ্চল মরুতে পরিণত করে, তেমনে বর্ষার মৌসুমে নিজেরা প্লাবিত হবে, তা তো হতে পারে না! ছেড়ে দেয় সব স্লুইসগেট। প্লাবনে ভেসে যায় আমাদের সাড়া দেশ। পানির তোড়ে নদীর পাড় ভেঙে প্রতি বছর অসংখ্য বাড়িঘর, কৃষিক্ষেত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আমাদের নদীগুলো পলিতে পলিতে নাব্য হারায়, নদী হয়ে পড়ে ক্ষুব্ধ। পরবর্তী বছরে তার দুর্ধর্ষ মূর্তি হয় আরো ভয়াবহ! আমরা যাবো কোথায়?
বিশ্ব নেতারা বড় বড় মিটিং করছেন, ফলাফল তো শূন্যই। বিশ্বের দুই মাথা অর্থাৎ অর্থনৈতিক শক্তিধর মোড়ল যুক্তরাষ্ট্র ও চীন নিজেরা ভুক্তভোগী হলেও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে চুক্তিতে পৌঁছাতে পারছে না। অথচ এ দু’টি দেশই সবচেয়ে বড় দূষণকারী দেশ। এ পর্যন্ত জানা গিয়েছিল, ২০৫০ সালের মধ্যে কোনো এক গ্রীষ্মকালে আর্কটিক অঞ্চলের সমুদ্র বরফমুক্ত হয়ে যাবে। এখন বলা হচ্ছে, ২০৩৫ সালেই তা হয়ে যাবে। অনবরত প্রকৃতিকে নানাভাবে দূষণে দূষণে কালিমাময় করা হচ্ছে। প্রকৃতির রোষ ক্ষোভ হবে না? প্রকৃতির মেজাজ গরম হবে না? প্রকৃতি এ মেজাজ গরমই কাল হলো অবিমৃষ্যকারী মানব নামের দানবের জন্য। কোনো উপায় কি আছে? হ

লেখক : পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, সাবেক চেয়ারম্যান,
প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়