চিকিৎসা এক মহান পেশা। ইচ্ছে করলেই কেউ চিকিৎসক হতে পারে না। কেবল মেধাবীরা চিকিৎসক হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করে। কিন্তু কেউ কেউ চিকিৎসক হয়ে সেবার কথা ও মানবিকতার কথা ভুলে যান। আজকের এ নিবন্ধে চিকিৎসকের ফি, প্রেসক্রিপশন, ব্যবহার ও একজন মানবিক চিকিৎসকের কথা বলব। তবে কাউকে ছোট করা কিংবা বড় করা উদ্দেশ্য নয়। চিকিৎসা পেশার সবাই খারাপ তা আমি বলছি না। কিন্তু কারো কারো আচরণ এতই খারাপ যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। কিছু দিন আগে আমার ছোট বোনকে দেখানোর জন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালের একজন গাইনি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই। তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে কর্মরত। একপর্যায়ে চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে একটি লেখার কপি তার হাতে দেই। লেখা দেখেই তিনি চটে গেলেন। সাংবাদিক সমাজকে এক হাত নিলেন। বললেন, সাংবাদিকরা চিকিৎসকদের মানসম্মান ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে। ওরা শুধু চিকিৎসকের বদনামই করে। আমি নিশ্চুপ সুপারি গাছের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। শুধু বললাম, ম্যাডাম আপনার চিন্তার সাথে আমি একমত নই। চিকিৎসকের রূঢ় ব্যবহার রোগীকে রুষ্ট করে তোলে। সেবার ব্রত নিয়ে এ পেশায় জড়িতদের সুন্দর ব্যবহার হওয়া প্রয়োজন। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, জজ, ব্যারিস্টার, উকিল কিংবা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হওয়া সহজ। কিন্তু ভালো আচরণ করা কঠিন। একজন চিকিৎসকের ভালো আচরণ যেমন রোগীকে সুস্থ করে দিতে পারে, তেমনি রূঢ় আচরণ আরো অসুস্থতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে আমাদের উচিত মানুষের সাথে ভালো ও সুন্দর ব্যবহার করা। রাসূলুল্লাহ সা: এরশাদ করেন, অশোভন-অশ্লীল কথা ও আচরণের সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। আর যার আচরণ যত সুন্দর তার ইসলাম তত সুন্দর। (মুসনাদে আহমদ)

চিকিৎসা পেশার সাথে বিশ্বস্ততা ও নির্ভরতার সম্পর্ক বিদ্যমান। বিশ্বাসের জায়গা থেকে একজন রোগী চিকিৎসকের কাছে যান। কিন্তু যখন অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে তখন বিশ্বাসের বাঁধন ছিড়ে যায়। সন্তান যেমন মায়ের কোলে নিরাপদ তেমনিভাবে চিকিৎসকের কাছে রোগীও নিরাপদ হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু কখনো কখনো চিকিৎসকের দুর্বোধ্য প্রেসক্রিপশনের কারণে রোগীর জীবন অনিরাপদ হয়ে ওঠে। প্রেসক্রিপশনের লেখা বুঝতে না পারায় বহু রোগী সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে আরো অসুস্থ হয়ে পড়ে। কখনো কখনো ভুল ওষুধ সেবনে রোগীর মৃত্যু হয়। কিছু কিছু চিকিৎসকের হাতের লেখা এতই খারাপ যে, দেখলে মনে হবে তেলাপোকার পায়ে কালি দিয়ে আঁকাআঁকি করা হয়েছে। অথচ সেটিই নাকি চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন।
এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, ২০১৩ সাল থেকে ২০১৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশে এক হাজার ১০২টি ওষুধের পার্শ^প্রতিক্রিয়ার অভিযোগ ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরে জমা পড়েছে। ২০০৬ সালে আমেরিকার ইনস্টিটিউট অব মেডিসিন (আইওএম)-এর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চিকিৎসকের হাতের লেখা বুঝতে না পারার কারণে বিশে^ প্রতি বছর প্রায় সাত হাজার রোগী মারা যায়। এমনকি ভুল ওষুধ সেবন করার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ১৫ লাখ রোগী অসুস্থ হয়ে পড়ে। আমাদের দেশে এ সংখ্যা কত তা জানা যায়নি। প্রেসক্রিপশন স্পষ্টাক্ষরে ‘পড়ার উপযোগী করে’ লেখা এবং জেনেরিক নামসহ ব্লক লেটার বা প্রিন্ট করার মাধ্যমে প্রেসক্রিপশন লেখার নির্দেশনা উচ্চ আদালতের রয়েছে। অথচ অধিকাংশ চিকিৎসক তা মেনে চলেন না। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় হচ্ছে, প্রতিটি প্রেসক্রিপশন সময় নিয়ে লেখা, কম্পিউটারের মাধ্যমে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা যেন সাধারণ রোগীরাও বুঝতে পারে। তবে কিছু চিকিৎসক কম্পিউটারে প্রেসক্রিপশন লিখছেন, যা সত্যি প্রশংসার দাবি রাখে। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন। যেন চিকিৎসকের দুর্বোধ্য হাতের লেখায় কারো জীবন না ফেরার দেশে চলে না যায়।

দেশ যেভাবে এগিয়েছে সে তুলনায় চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি। করোনাকাল চোখে আঙুল দিয়ে তা জানান দিয়েছে। এখনো গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকামুখী হতে হয়। আমাদের দেশের অধিকাংশ নাগরিক মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত। তারা চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে পারছে না। অথচ সেদিকে কারো মাথা ব্যথা নেই। এমনিতে দ্রব্যমূল্যের পাগলাঘোড়ার সামাল দিতে জনগণ হিমশিম খাচ্ছে, টিসিবির ট্রাকের পেছনে ছুটছে, সেখানে তারা কী করে ১৫০০ টাকা ভিজিট দেবে? সেবার নামে এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা কেন? রাজধানীর নামী-দামি হাসপাতালের কথা না হয় বাদ-ই দিলাম। মাঝারি ধরনের হাসপাতাল ক্লিনিক কিংবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসকের দরজার বড় অক্ষরে লেখা থাকে, ‘প্রথম ভিজিট ১০০০-১৫০০ টাকা। রিপোর্ট দেখানো ৭০০ টাকা। সাত দিন পর আবার রোগী দেখালে ১৫০০ টাকা।’ অথচ সরকারি হাসপাতালে নামমাত্র টাকায় রোগী দেখানো যায়। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কথা চিন্তা করে সরকারি হাসপাতালে সন্ধ্যার পরও রোগী দেখার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের ফি নির্ধারণ করে দেয়া যেতে পারে যেন রোগীদের ভোগান্তি দূর হয়। অধিকাংশ চিকিৎসক প্রথম সাক্ষাতে কমপক্ষে ১০টি টেস্ট হাতে ধরিয়ে দেয়। কিন্তু চিন্তা করে না রোগী তার ব্যয়ভার বহন করতে পারবে কি না। আবার কেউ কেউ বলে দেন, অমুক ডায়াগনিস্ট সেন্টার থেকে করাতে হবে। সরকারি হাসপাতালে কমমূল্যে টেস্টের ব্যবস্থা থাকলেও ভোগান্তির কারণে রোগীরা সেখানে যায় না। এই ভোগান্তি দূর করা প্রয়োজন যেন রোগীরা সরকারি হাসপাতালমুখী হয়।

শেষ করব একজন মানবিক চিকিৎসকের কথা বলে। সাতক্ষীরার সাবেক সিভিল সার্জন ডা: মো: এবাদুল্লাহ প্রায় চার দশক ধরে ৫-১০ টাকায় রোগীদের সেবা দিচ্ছেন। কয়েক বছর আগেও পাঁচ টাকায় রোগী দেখেছেন। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা নিতে যেখানে ১৫০০-২০০০ টাকা গুনতে হয় সেখানে তিনি মাত্র ১০ টাকা ফি নেন। এ কথা কারো কারো কাছে অবিশ^াস্য মনে হতে পারে! কিন্তু অবিশ^াস্য হলেও সত্য যে, চিকিৎসক এবাদুল্লাহ মানুষের সেবায় নিয়োজিত। তিনি সাতক্ষীরা জেলা শহরের পাকাপুলের মোড় এলাকায় ‘নওয়াব ক্লিনিক’ পরিচালনা করেন। মানব দরদি চিকিৎসক বলেন আমার দাদা নওয়াব আলী সরদার। দাদা আমাকে বলেছিলেন, মানুষের জন্য ডাক্তার হও। এটা ব্যবসা নয়। দেখো, সব শ্রেণী পেশার মানুষ যেন তোমার সেবা পায়। দাদার কথা আমি আজো মনে রেখেছি। ফলে ক্লিনিকের নামও রেখেছি নওয়াব ক্লিনিক। রোগীদের অগাধ বিশ^াস তার ওপর রয়েছে। তার কাছে আসা রোগীদের ভাষ্য হচ্ছে- তিনি ভালো ব্যবহার করেন এবং যতœ করে দেখেন। এই যুগে এরকম চিকিৎসক বিধাতার দান। মনে হয় না, আমরা ৫-১০ টাকার রোগী। তিনি যে ওষুধ দেন তাতেই আমাদের রোগ সেরে যায়। চিকিৎসক এবাদুল্লাহ বলেন, আমি মানুষের কাছে টাকা নয়, দোয়া চাই। আমার কাছে যারা চিকিৎসা নিতে আসে তাদের অধিকাংশই ভ্যানচালক, রিকশাচালক, খেটে খাওয়া মানুষ। পথেঘাটে দেখা হলে ওরা আমাকে সালাম দেয়, সম্মান করে, এটাই আমার বড় পাওয়া। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ^র।’ চিকিৎসক এবাদুল্লাহ এর অনন্য দৃষ্টান্ত। এরকম দৃষ্টান্ত অন্যান্য চিকিৎসকরা স্থাপন করবে, এমনটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা।