আলজাজিরার বিশ্লেষণ
সংস্কারগুলোকে কি হত্যা করছে বাংলাদেশ
বাংলাদেশের নতুন সংসদ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর জবাবদিহিতা বাড়াতে প্রণীত বেশ কয়েকটি সংস্কার অধ্যাদেশ বাতিল করেছে। তাতে অনেক সংস্কার অকার্যকর হয়ে পড়ায় এ নিয়ে বিরোধী দলের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। উদ্বেগের কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর অর্জিত গণতান্ত্রিক অগ্রগতি থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশের নতুন সংসদ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর জবাবদিহিতা বাড়াতে প্রণীত বেশ কয়েকটি সংস্কার অধ্যাদেশ বাতিল করেছে। তাতে অনেক সংস্কার অকার্যকর হয়ে পড়ায় এ নিয়ে বিরোধী দলের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। উদ্বেগের কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর অর্জিত গণতান্ত্রিক অগ্রগতি থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে।
১৩৩টির মধ্যে অধিকাংশ অধ্যাদেশ অনুমোদিত হলেও বিচারিক তদারকি, দুর্নীতি দমন এবং পুলিশি ব্যবস্থা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপসহ অন্তত ২৩টি অধ্যাদেশ সাংবিধানিক সময়সীমার মধ্যে সংসদীয় অনুমোদন পেতে ব্যর্থ হওয়ায় হয় বাতিল করা হয়েছে অথবা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এ অধ্যাদেশগুলোকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, স্বচ্ছতার অভাব এবং দুর্বল জবাবদিহিতার জন্য দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ব্যাপকভাবে দেখা হয়। বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ গোষ্ঠী এবং বেশ কয়েকজন বিশ্লেষক এই পদক্ষেপকে অভ্যুত্থানের পর গৃহীত মূল সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর পশ্চাদপসরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং সতর্ক করেছেন যে এটি তদারকিকে দুর্বল করে স্বৈরাচারী কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতাকে পুনরায় কেন্দ্রীভূত করতে পারে। তবে, সরকার বলছে ত্রুটি সংশোধন এবং আলোচনার পর আরো শক্তিশালী আইন পুনরায় প্রবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত পর্যালোচনা চলছে।
এই বিবাদ দ্রুত সংসদের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিরোধী জোটগুলো বিক্ষোভ করেছে এবং দেশব্যাপী আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে, অন্য দিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বিতর্কটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের গতিপথ নিয়ে এক গভীরতর সংগ্রামের প্রতিফলন- যা সংসদের ভেতরে এবং রাজপথে উভয় স্থানেই উন্মোচিত হচ্ছে।
মানবাধিকার কমিশন : কী পরিবর্তন হয়েছে এবং কেন তা গুরুত্বপূর্ণ
রাষ্ট্রীয় সংস্থা মানবাধিকার কমিশনকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত করার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল বলে একে আরো স্বাধীন ও কার্যকর করতে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত , তদন্তের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা, ক্ষতিপূরণ ও জবাবদিহিতার জন্য সুস্পষ্ট বিধান এবং বৃহত্তর প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের ক্ষমতা দেয়া হয়। কিন্তু অধ্যাদেশটি বাতিল করে ২০০৯ সালের একটি আইন পুনর্বহাল করা হয়েছে, যেখানে কমিশন স্বাধীনভাবে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারে না। এর ফলে কমিশনের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তবে, সরকার যুক্তি দিয়েছে যে অধ্যাদেশটিতে আইনি অস্পষ্টতা রয়েছে এবং আরো পর্যালোচনার প্রয়োজন, বিশেষ করে তদন্তের ক্ষমতা, শাস্তি এবং পদ্ধতিগত স্বচ্ছতার মতো ক্ষেত্রগুলোতে। তারা আরো বলেছে যে আলোচনার পর তারা একটি সংশোধিত সংস্করণ আনার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু একটি খোলা চিঠিতে, পাঁচজন বিদায়ী কমিশনার এই ব্যাখ্যাকে চ্যালেঞ্জ করে যুক্তি দিয়েছেন যে, সরকারের উল্লিখিত আপত্তিগুলো আইনের প্রকৃত বিধানগুলোকে প্রতিফলিত করে না।
সাবেক কমিশনার নাবিলা ইদ্রিস আলজাজিরাকে বলেন, ‘সরকার অধ্যাদেশগুলো নিয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছে। আইনি সুরক্ষা দুর্বল করার ব্যাপকতর পরিণতি হতে পারে। বলা হচ্ছে আইনি সুরক্ষা দুর্বল হলেও শুধুমাত্র রাজনৈতিক সদিচ্ছাই যথেষ্ট। কিন্তু জবাবদিহিতা এভাবে কাজ করে না।’
গুম তথা বলপূর্বক অন্তর্ধান : একটি গুরুতর আইনি শূন্যতা
বাতিলকৃত অধ্যাদেশটি গুম তথা বলপূর্বক অন্তর্ধানকে একটি নির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে, তদন্ত ও বিচারের জন্য পদ্ধতি স্থাপন করে এবং ভুক্তভোগীদের পরিবারকে ন্যায়বিচার চাওয়ার জন্য একটি আইনি ভিত্তি প্রদান করে এই বিষয়গুলোর সমাধান করতে চেয়েছিল। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (এনএইচআরসি) সাবেক কমিশনার ইদ্রিস বলেন, ‘যদি কোনো অপরাধের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা না থাকে, তবে তার শাস্তি দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে, বর্তমান আইনে বলপূর্বক অন্তর্ধানের কোনো সুস্পষ্ট আইনি সংজ্ঞা নেই। বিষয়টি অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে।’
বিচার বিভাগীয় সংস্কার
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আকবর হোসেন বলেছেন, ‘যদি প্রশাসনিক ও নিয়োগ প্রক্রিয়া নির্বাহী বিভাগের প্রভাবাধীন থাকে, তা হলে সেই স্বাধীনতা বাস্তবে সীমিত হয়ে পড়ে।’ বিরোধী নেতারা সম্পূর্ণ ভিন্ন মত পোষণ করেছেন এবং এই পদক্ষেপকে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর করা সংস্কার প্রতিশ্রুতি থেকে বিচ্যুতি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাদের যুক্তি এই পদক্ষেপ জুলাই মাসের জাতীয় সনদকে দুর্বল এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য জনগণের দেয়া জনসমর্থনকে ক্ষুণœ করার ঝুঁকি তৈরি করে। সংসদ সদস্য ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) উপ-প্রধান আখতার হোসেন বলেন যে সরকারের এই পদক্ষেপ সম্মত সংস্কার পথ থেকে সরে আসারই প্রতিফলন। হোসেন সতর্ক করে বলেছেন যে, শুধুমাত্র প্রচলিত সংসদীয় পদ্ধতির উপর নির্ভর করলে সংস্কারের পরিধি দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
সংসদের বাইরের বিরোধী নেতারা আরো কঠোর বক্তব্য দিচ্ছেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর (বিজেআই) কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য এবং বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির আলজাজিরাকে বলেন, ‘এই অধ্যাদেশগুলো ছিল সুবিচার, স্বচ্ছতা ও সুষম বণ্টনের জন্য। এগুলো তুলে নেওয়ার ফলে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূতই থাকছে। আর কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা সব সময়ই বিপজ্জনক। বিশেষ করে গুম এবং দুর্নীতির ক্ষেত্রে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘যদি এই আইনি সুরক্ষাগুলো না থাকে, তা হলে অনেক মামলা হয়তো তদন্ত পর্যায় পর্যন্তও পৌঁছবে না।’
জামায়াত প্রধান শফিকুর রহমান সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সম্প্রতি এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘আন্দোলন ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।’ সংস্কার কর্মসূচি পুনর্বহাল না হওয়া পর্যন্ত তিনি সমর্থকদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
বিশ্লেষকরা আরো গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
একজন অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন কূটনীতিক যিনি বাংলাদেশে কর্মরত ছিলেন সেই জন ড্যানিলোভিচ বলেছেন যে এই পশ্চাদপসরণ অভ্যুত্থানের পর প্রতিষ্ঠিত প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। দেশের অভ্যন্তরে, বিশ্লেষকরা এই পশ্চাদপসরণকে একটি গভীরতর রাজনৈতিক অভিপ্রায়ের সঙ্কেত হিসেবে দেখছেন।
ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও সহযোগী গবেষক মুবাশার হাসান বলেছেন, সংস্কারগুলো নিয়ে সরকার যে প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে, তা এটাই প্রমাণ করে যে, সরকার জনগণের আস্থা অর্জনে হিমশিম খাচ্ছে, বিশেষ করে নীতি পরিবর্তনের পেছনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে। এই স্বচ্ছতার অভাব অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই বিভ্রান্তি ও সংশয় সৃষ্টি করেছে। (সংক্ষেপিত)











