ফ্লোটিলা নতুন কোনো উদ্যোগ নয়। আগের ফ্লোটিলাগুলোর সময় আমি সরাসরি যুক্ত ছিলাম না, তবে যুক্ত হতে চেয়েছিলাম। পরবর্তীতে যোগাযোগ ও নিরাপত্তাজনিত কারণে সরাসরি অংশগ্রহণ সম্ভব হয়নি। পরে জানতে পারি একটি বিশেষ ফ্লোটিলা সাংবাদিক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে যাচ্ছে। নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘের অধিবেশনে থাকাকালে একজন বন্ধু আমাকে হুয়াইদা আরাফের সাথে যুক্ত করেন। তিনি প্রথম দিকের ফ্লোটিলায় অংশ নিয়েছিলেন এবং পরবর্তী অভিযানগুলোতেও সক্রিয় ছিলেন। তার সহযোগিতায় আমি অংশ নেয়ার সুযোগ পাই।

শেষ মুহূর্তে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ইতালির ওত্রান্তোতে পৌঁছাতে হয়। ঢাকায় ফিরে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে রোম হয়ে দীর্ঘ যাত্রার মাধ্যমে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছাই। বিভিন্ন পরিবহন পরিবর্তন করে একদিন দেরিতে পৌঁছালেও পরবর্তী অভিযানের আগে আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম।

প্রশ্ন : গাজায় পৌঁছাতে না পারায় কি মিশন ব্যর্থ হয়েছে?

শহিদুল আলম : শুরুতেই উল্লেখ করেছিলাম- প্রথম দিকের ফ্লোটিলাগুলো গাজায় পৌঁছেছিল। পরবর্তীগুলো বাধার মুখে পড়ে। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল অবরোধকে চ্যালেঞ্জ করা এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্ন তোলা। ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে- এ ধরনের অন্যায়ের সময় আপনারা কোথায় ছিলেন? আমরা দেখাতে চেয়েছি যে আমরা নীরব ছিলাম না।

আমাদের জাহাজ ‘কনসেন্স’ ছিল বহরের সবচেয়ে বড় জাহাজ। এতে ৯২ জন ছিলেন। এর আগে এটি দুইবার ড্রোন হামলার শিকার হয়েছিল, পরে মেরামত করা হয়। ফ্লোটিলার মাধ্যমে আন্দোলনের সমন্বয় আরো শক্তিশালী হয়। বিভিন্ন দেশের সংসদ সদস্য, ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিনিধি ও কর্মীরা একসাথে যুক্ত হন। এর মাধ্যমে একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক সংহতি গড়ে ওঠে।

প্রশ্ন : প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল কি?

শহিদুল আলম : সম্ভাবনা ছিল এবং সেটি আমরা সবাই জানতাম। তাই আইনগত ও নিরাপত্তামূলক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল। যাত্রাপথ ট্র্যাক করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল এবং প্রয়োজনে আইনজীবীরা প্রস্তুত ছিলেন। ব্যক্তিগত ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন ছিলাম, তবে আমাদের প্রস্তুতি ছিল যথাযথ।

প্রশ্ন : কারাগারের অভিজ্ঞতা থেকে কী শিক্ষা পেয়েছেন?

শহিদুল আলম : নেগেভ মরুভূমির উচ্চ নিরাপত্তা কারাগারে আমাদের রাখা হয়েছিল। একপর্যায়ে এক সহযাত্রীর ওষুধের প্রয়োজন দেখা দেয়, কিন্তু তা দেয়া হচ্ছিল না। আমরা প্রতিবাদ হিসেবে সম্মিলিতভাবে গান গাইতে শুরু করি। প্রতিবাদী গান গাওয়ার সেই মুহূর্ত আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নিরস্ত্র অবস্থায় ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর ছিল আমাদের শক্তি।

প্রশ্ন : সমুদ্রযাত্রা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল?

শহিদুল আলম : ভয় ছিল, তবে প্রস্তুতিও ছিল। জাহাজে চিকিৎসক ছিলেন, ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে ছিল। ছবি ও তথ্য পাঠানো ছিল গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অভিযান চলাকালে হেলিকপ্টার থেকে লেজার লক্ষ্য করার ঘটনা ঘটে। সে সময় নিরাপত্তার স্বার্থে ইলেকট্রনিক ডিভাইস সমুদ্রে ফেলে দেয়া হয়। কারণ তথ্য যেন কারও বিপদ ডেকে না আনে- সেটিই ছিল বিবেচ্য।

প্রশ্ন : আগের অংশগ্রহণের সাথে এবারের পার্থক্য কী?

শহিদুল আলম : এবার উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল- একটি বাংলাদেশী উদ্যোগে সংগৃহীত অর্থে কেনা নৌযান। এটি এখনো সমুদ্রে অবস্থান করছে। এ ছাড়া এবার ব্যক্তিগতভাবে অংশ নিতে না পারলেও দলগত প্রস্তুতি আরো বিস্তৃত ছিল। জাহাজে থাকা সহকর্মীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।

প্রশ্ন : এবার একটু বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

শহিদুল আলম : জুলাই ছিল একটি অসাধারণ ঘটনা। দেশে যে অন্যায় ও স্বৈরাচারী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে আমরা অনেকেই নানা ভূমিকা রেখেছি। ব্যক্তিগতভাবে আমার অভিজ্ঞতাও আপনারা জানেন। তবে এমন একটি গণ-আন্দোলন না হলে সরকারের পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হতো বলে আমি মনে করি না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ যেমন আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছিল, জুলাই আন্দোলনও তেমনি ভিন্ন বাংলাদেশ গড়ার আরেকটি সুযোগ তৈরি করেছে। সত্যিকার অর্থে আমরা একটি নতুন পথের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারব কি না, সেটি আলাদা বিষয়। তবে জুলাইয়ে অংশ নেয়া মানুষরা বহু ত্যাগের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি তৈরি করেছেন।

01

প্রশ্ন : আপনি ব্যাংক আমানতকারীদের আন্দোলনের সাথেও যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে কর্মসূচিও হয়েছে। এর কারণ কী?

শহিদুল আলম : সাধারণ মানুষ কষ্টার্জিত অর্থ নিরাপদে রাখতে চান- সন্তানের ভবিষ্যৎ, পরিবারের নিরাপত্তা, দুর্দিনের কথা ভেবে তারা সঞ্চয় করেন। আমানতকারীরা ছিলেন শিক্ষক, সাংবাদিক, কর্মজীবী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী- অর্থাৎ সাধারণ নাগরিক। তারা সরকার-অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে টাকা রেখেছিলেন। এমন পরিস্থিতি ঘটতে পারে- এটা তারা ভাবেননি।

আমাদের একটি পারিবারিক ট্রাস্ট রয়েছে, যার অর্থ দিয়ে বৃত্তি দেয়া হতো দরিদ্র শিক্ষার্থীদের। সেই কার্যক্রমও এই পরিস্থিতির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক আমানতকারী চিকিৎসার অভাবে কষ্ট পাচ্ছেন। স্বৈরাচারী শাসনের সময় লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সরকারগুলোর কাছেও মানুষ আশা করেছিল সমাধান হবে। এখন একটি নির্বাচিত সরকার থাকায় নাগরিকরা স্বাভাবিকভাবেই জবাবদিহি চেয়েছে। কিন্তু যথাযথ উদ্যোগ দেখা যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে গিয়ে আমানতকারীরা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের দাবি জানিয়েছিলেন। সেখানে তাদের ওপর জলকামান ব্যবহার ও আটক করার ঘটনা ঘটেছে- এটি কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আচরণ হতে পারে না বলে আমি মনে করি। সেই প্রতিবাদেই আমি সেখানে গিয়েছিলাম।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

শহিদুল আলম : এখানে দু’টি বিষয় আছে। একদিকে দীর্ঘ সময় স্বাধীনতা ছিল না। অন্য দিকে যখন তুলনামূলক স্বাধীনতা এসেছে, তখন অনেক ক্ষেত্রে আমরা সেটি যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারিনি। দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের কারণে সাংবাদিকদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তবে এখন সময় এসেছে সত্যিকারের প্রশ্ন করার।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু সাংবাদিকদের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব। একটি সরকার যদি গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে, তবে সেটি প্রকৃত স্বাধীনতার পরিপন্থী। একটি ভিন্ন বাংলাদেশ গড়ার দাবি যদি সত্যি হয়, তাহলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাই হবে তার অন্যতম পরীক্ষামাপক।

প্রশ্ন : আগের সরকারের সময়ে আপনাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সে অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলবেন?

শহিদুল আলম : নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীরা ন্যায্য দাবিতে রাস্তায় নেমেছিল। আমি একজন সাংবাদিক হিসেবে ঘটনাগুলো নথিবদ্ধ করছিলাম। ৪ আগস্ট আমার ওপর হামলা হয়, যন্ত্রপাতি ভেঙে ফেলা হয়। ৫ আগস্ট নতুন যন্ত্র নিয়ে আবার কাজ শুরু করি। সেদিন রাতে বাসায় ছবি আপলোড করার সময় নিরাপত্তা বাহিনী আমাকে আটক করে নিয়ে যায়। পরে রিমান্ডে রাখা হয় এবং আদালতে আমি নির্যাতনের কথা প্রকাশ্যে বলেছিলাম।

আইন অনুযায়ী আদালতে দেয়া অভিযোগ তদন্তের সুযোগ থাকা উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে আমাকে পুনরায় রিমান্ড ও পরে কারাবন্দী করা হয়। একাধিকবার জামিন নাকচ করা হয়। শেষ পর্যন্ত জামিন পেলেও উদ্দেশ্য ছিল আমাকে চুপ করানো। কিন্তু আমি মুক্ত হয়েও কথা বলেছি। আমি মনে করি, ভয় দেখিয়ে সত্যকে থামানো যায় না।

প্রশ্ন : আপনার প্রিয় প্রতিষ্ঠান ‘দৃক গ্যালারি’ সম্পর্কে বলুন।

Shahidul Alam-02

শহিদুল আলম : ‘দৃক আলোকচিত্র গ্রন্থালয়’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৯ সালে। তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব প্রধানত পাশ্চাত্যের আলোকচিত্রীরা করতেন। তারা অনেক সময় দেশকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতেন। আমাদের দেশের সমস্যা আছে- এটা সত্য। কিন্তু সৌন্দর্য, সম্ভাবনা ও সৃজনশীলতাও আছে। সেই গল্পগুলো তখন উপস্থাপিত হতো না।

এই বাস্তবতা থেকেই দৃকের যাত্রা। লক্ষ্য ছিল দেশের গল্প দেশের মানুষই বলবে- আলোকচিত্র, চলচ্চিত্র ও লেখালেখির মাধ্যমে। পরে ‘পাঠশালা’ প্রতিষ্ঠা করি, যেখানে গণমাধ্যমকর্মী ও আলোকচিত্রীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এরপর ২০০০ সালে ‘ছবিমেলা’ ফেস্টিভ্যাল শুরু করি, যাতে আন্তর্জাতিকভাবে এই কাজগুলো প্রদর্শিত হয়। নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে আছে এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।

প্রশ্ন : ‘দৃক’ নামটি কেন?

শহিদুল আলম : ‘দৃক’ একটি সংস্কৃত শব্দ, যার অর্থ দৃষ্টি। এটি শুধু চোখের দৃষ্টি নয়, অন্তর্দৃষ্টির প্রতীকও। আমরা বিশ্বাস করি, সত্যিকারের দেখা মানে শুধু চাক্ষুষ দেখা নয়- মন ও বিবেচনা দিয়ে উপলব্ধি করা। সেই অন্তর্দৃষ্টি থেকেই ভিন্ন বাংলাদেশের চিত্র বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার আকাক্সক্ষা ছিল আমাদের।

প্রশ্ন : ধন্যবাদ আপনাকে সময় দেয়ার জন্য।

শহিদুল আলম : আপনাদেরও ধন্যবাদ।