অভিনয় থেকে দূরে, হাসান মাসুদ মগ্ন ইবাদতে
হজের পর বদলে গেছে জীবনযাপনের ছন্দ
সেই ক্যামেরার আলো থেকে এখন অনেকটাই দূরে তিনি। নিয়মিত অভিনয় ছেড়ে দিয়েছেন। নাটক কিংবা সিনেমায় ফেরারও নেই কোনো পরিকল্পনা। জীবনযাপনে এসেছে বড় পরিবর্তন। এখন তার দিনের বড় একটি অংশ কাটে ইবাদত ও ধর্মীয় অনুশাসন পালনে। সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের এই পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন হাসান মাসুদ। তার ভাষায়, জীবনে এমন একটি পরিবর্তন এসেছে, যার পর নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছেন তিনি।
এক সময় ক্যামেরার সামনে তার উপস্থিতিই ছিল আলাদা। সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন থেকে সাংবাদিকতা, তারপর অভিনয়-বহুমাত্রিক এক পেশাজীবন পেরিয়ে দর্শকের কাছে জনপ্রিয় অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন হাসান মাসুদ। নাটক, টেলিফিল্ম কিংবা চলচ্চিত্র-বিভিন্ন চরিত্রে তার স্বতন্ত্র অভিনয় জায়গা করে নিয়েছিল দর্শকের মনে।
কিন্তু সেই ক্যামেরার আলো থেকে এখন অনেকটাই দূরে তিনি। নিয়মিত অভিনয় ছেড়ে দিয়েছেন। নাটক কিংবা সিনেমায় ফেরারও নেই কোনো পরিকল্পনা। জীবনযাপনে এসেছে বড় পরিবর্তন। এখন তার দিনের বড় একটি অংশ কাটে ইবাদত ও ধর্মীয় অনুশাসন পালনে। সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের এই পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন হাসান মাসুদ। তার ভাষায়, জীবনে এমন একটি পরিবর্তন এসেছে, যার পর নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছেন তিনি।
‘আমি নিজেকে আসলে একটু গুটিয়ে নিয়েছি। আমি এখন আর অভিনয় করি না। একটা পরিবর্তন এসেছে আমার জীবনে। সেই কারণেই এখন শুধুমাত্র বিজ্ঞাপনের কাজ পেলে করি, না হলে করি না। একটু ভাববাদী হয়ে গিয়েছি। মানে ধার্মিক হয়ে গিয়েছি।’
হজের পর বদলে গেল ছন্দ
হাসান মাসুদের কথায়, তার এই পরিবর্তন হঠাৎ করে আসেনি। তবে হজ পালনের পর তা যেন আরো গভীর হয়েছে। সম্প্রতি হজে গিয়ে মক্কা ও মদিনায় ৪১ দিন অবস্থান করেন তিনি। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা তার জীবনকে নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করেছে বলে জানান এই অভিনেতা।
‘আমি এবার হজ করেছি। যে কারণে ৪১ দিন ছিলাম ওখানে- মক্কা-মদিনায়। তবে আসলে আমার পরিবর্তনটা এসেছে আরো আগে থেকে। এখন পুরোপুরিই আমি পরিবর্তিত, সেটা বলতে পারেন।’
হজ থেকে ফেরার পর তার জীবনযাপনের ধরন আরো বদলে যায়। বিনোদনজগতের ব্যস্ততা কিংবা বৈষয়িক বিষয় থেকে নিজেকে সরিয়ে এনে ধর্মীয় জীবনেই মনোযোগী হয়েছেন তিনি।
তবে অভিনয়কে পুরোপুরি বিদায় জানানোর কথাও সরাসরি বলেননি। তার কাছে এখন অভিনয় আর নিয়মিত পেশা নয়। ভালো কোনো বিজ্ঞাপনের প্রস্তাব এলে কেবল ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে পারেন। নাটক বা চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয়ের ইচ্ছা নেই।
১,২০০ বইয়ের সাথে বিদায়, কেন এমন সিদ্ধান্ত?
জীবনের পরিবর্তনের সাথে বদলে গেছে তার দীর্ঘদিনের আরেকটি অভ্যাস-বই পড়া।
এক সময় প্রচুর বই পড়তেন হাসান মাসুদ। দীর্ঘদিন ধরে গড়ে তুলেছিলেন প্রায় এক হাজার ২০০ বইয়ের একটি ব্যক্তিগত সংগ্রহ। কিন্তু সেই সংগ্রহও শেষ পর্যন্ত নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন তিনি। নীলক্ষেতে পুরনো বইয়ের দোকানে বিক্রি করে দিয়েছেন প্রায় সব বই-তাও খুব কম দামে।
হাসান মাসুদের ব্যাখ্যাটি তার জীবনদর্শনের পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে।
‘আসলে বই পড়ার অধ্যায়টা আমার অনেক আগে শেষ হয়ে গেছে। আমি এত বেশি পড়েছি যে শেষের দিকে আমি যন্ত্রের মতো হয়ে গিয়েছিলাম। আমার ভেতরে কোনো ভাবাবেগ কাজ করত না।’
অতিরিক্ত পড়াশোনা তাকে একসময় মানুষের আবেগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছিল- এমন উপলব্ধির কথাও জানিয়েছেন তিনি। উদাহরণ হিসেবে নিজের একসময়কার মানসিক অবস্থার কথা বলতে গিয়ে বলেন, কোনো দুর্ঘটনায় একজন মানুষের মৃত্যু হলেও তখন তার মধ্যে স্বাভাবিক আবেগ তৈরি হতো না।
‘আমার সামনে যদি একটা ট্রাকে চাপা পড়ে একজন মারা যেত, তখন আমি ভাবতাম- লোকটার ভুলেই তো লোকটা মারা গেছে। এরকম যন্ত্রের মতো হয়ে গিয়েছিলাম। কোনো সেন্টিমেন্ট আমার ভেতরে কাজ করত না।’
সেই উপলব্ধির পরই বইয়ের সাথে দূরত্ব তৈরি করেন তিনি।
‘এরপর আমি প্রায় ১২০০ বই নীলক্ষেতে বিক্রি করে দিয়েছি, একেবারে পানির দামে। এরপর থেকে আমি আর বই পড়ি না।’
সেনাবাহিনী থেকে সংবাদমাধ্যম, তারপর অভিনয়
হাসান মাসুদের জীবনপথ অবশ্য শুরু থেকেই অভিনয়কেন্দ্রিক ছিল না। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন তিনি। প্রায় সাত বছর পর ১৯৯২ সালে ক্যাপ্টেন পদে অবসর নেন।
সেনাবাহিনীর পর পেশা হিসেবে বেছে নেন সাংবাদিকতা। ‘দ্য নিউ ন্যাশন’-এ কাজ করার পর ১৯৯৫ সালে ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এ ক্রীড়া প্রতিবেদক হিসেবে যোগ দেন। পরে ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিবিসি বাংলার সংবাদদাতা হিসেবেও কাজ করেছেন।
অর্থাৎ অভিনয়ে আসার আগেই তার পেশাগত জীবনে ছিল সেনাবাহিনী ও সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা- দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগৎ।
২০০৩ সালে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর পরিচালনায় চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে অভিনয়জগতে প্রবেশ করেন হাসান মাসুদ। এরপর নাটক ও টেলিফিল্মে তার উপস্থিতি ক্রমেই পরিচিত হয়ে ওঠে।
‘হাউসফুল’, ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’, ‘এফডিসি’, ‘বউ’, ‘খুনসুটি’, ‘গ্র্যাজুয়েট’, ‘রঙের দুনিয়া’, ‘আমাদের সংসার’, ‘গণি সাহেবের শেষ কিছুদিন’ ও ‘বাতাসের ঘর’-এর মতো নাটকে তার অভিনয় দর্শকের প্রশংসা পেয়েছে। অভিনয়ের পাশাপাশি সঙ্গীতের সাথেও যুক্ত ছিলেন তিনি।
দীর্ঘ এই পথ পেরিয়ে এখন অবশ্য সেই পরিচিত ব্যস্ত জীবন থেকে অনেকটাই সরে দাঁড়িয়েছেন হাসান মাসুদ।
ক্যামেরার সামনে নিয়মিত দেখা যাবে না তাকে- এ সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত। বদলে গেছে তার সময় কাটানোর ধরন, বদলে গেছে আগ্রহের জায়গাও। একসময় যে মানুষটি বইয়ের বিশাল সংগ্রহ নিয়ে বসতেন, সেই মানুষ এখন সেই বইগুলোও ছেড়ে দিয়েছেন।
অভিনয়ের আলো থেকে তার এই সরে যাওয়া তাই শুধু পেশা পরিবর্তনের গল্প নয়। এটি একই সাথে একজন মানুষের নিজের জীবনকে নতুনভাবে দেখার গল্প- যেখানে দীর্ঘ পেশাজীবন, খ্যাতি, বই আর ক্যামেরার ব্যস্ততার পর এখন তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ধর্মীয় অনুশাসন ও ইবাদত।
হাসান মাসুদের জীবনের এই নতুন অধ্যায় কতটা দীর্ঘ হবে, তা সময়ই বলবে। তবে আপাতত ক্যামেরার আলো থেকে দূরে, নিজের মতো করেই সময় কাটাতে চান তিনি।











