আজকের পত্রিকা

হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্সের পাহাড়

হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্সের পাহাড়

নিম্ন আদালতে রায় হলেও শেষ হয় না অপেক্ষা

বিচারিক আদালতে সাজা ঘোষণাই কি ন্যায়বিচারের শেষ কথা, নাকি চূড়ান্ত আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর মিলবে স্বস্তি? দেশের উচ্চ আদালতে ঝুলে থাকা মামলার জট এই প্রশ্নকেই দিনে দিনে আরো ঘনীভূত করছে। বর্তমানে হাইকোর্টে অন্তত এক হাজার ২৩০টি ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) মামলা সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আটকে রয়েছে। এক দিকে স্বজনদের বিচার পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস, অন্য দিকে চূড়ান্ত সত্য উন্মোচিত হওয়ার আগেই আসামিদের বছরের পর বছর কনডেম সেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটানো; এই দুইয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট দেশের বিচার ব্যবস্থা।

বিচারিক আদালতে সাজা ঘোষণাই কি ন্যায়বিচারের শেষ কথা, নাকি চূড়ান্ত আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর মিলবে স্বস্তি? দেশের উচ্চ আদালতে ঝুলে থাকা মামলার জট এই প্রশ্নকেই দিনে দিনে আরো ঘনীভূত করছে। বর্তমানে হাইকোর্টে অন্তত এক হাজার ২৩০টি ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) মামলা সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আটকে রয়েছে। এক দিকে স্বজনদের বিচার পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস, অন্য দিকে চূড়ান্ত সত্য উন্মোচিত হওয়ার আগেই আসামিদের বছরের পর বছর কনডেম সেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটানো; এই দুইয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট দেশের বিচার ব্যবস্থা।

সম্প্রতি ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় হাইকোর্টের দেয়া রায়টি দেশের উচ্চ আদালতের এই নির্মম দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি জটিলতার চিত্রকে আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।

২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল নুসরাত হত্যা মামলায় সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ জন আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেন। রায়টি দ্রুত আসলেও মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের (ডেথ রেফারেন্স) জন্য হাইকোর্টে আসতে লেগে যায় দীর্ঘ সময়।

সম্প্রতি বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে প্রধান দুই আসামি সাবেক অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হলেও চারজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয় এবং ১০ জন আসামিকে পুরোপুরি খালাস দেয়া হয়।

নুসরাতের পরিবার যখন বছরের পর বছর চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে, ঠিক তখনই খালাস পাওয়া ১০ জন আসামিকে নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও বছরের পর বছর কনডেম সেলের বন্দী জীবন সহ্য করতে হয়েছে।

এই রায়ে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের বিচারকের ঢালাও মৃত্যুদণ্ড দেয়ার মানসিকতাকে ‘মাইন্ডলেস সেন্টেন্স’ (বিচারিক মানসিকতাহীন সিদ্ধান্ত) বলে পর্যবেক্ষণ দেন। একই সাথে সংশ্লিষ্ট বিচারককে অবিলম্বে ফৌজদারি বিচার ও দণ্ড দেয়ার (পেনাল ও সেন্টেন্সিং) ক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নেয়ার জন্য আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেয়া হয়। নুসরাত মামলার এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হলে কীভাবে বাদি-বিবাদি উভয় পক্ষকেই বিচারিক দীর্ঘসূত্রতার চরম মূল্য দিতে হয়।

বাংলাদেশের ফৌজদারি আইন অনুযায়ী, নিম্ন আদালত কাউকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও হাইকোর্টের অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) ছাড়া তা কার্যকর করা যায় না। কিন্তু নিম্ন আদালতের রায় ঘোষণার পরপরই সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে সাধারণ কক্ষ থেকে সরিয়ে ‘কনডেম সেল’-এ পাঠানোর নিয়ম রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মানবাধিকার কর্মী বিভিন্ন সময় কারাগার পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা থেকে জানান, সুদীর্ঘ অনিশ্চয়তার মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে অনেক বন্দী দ্রুত কেসের নিষ্পত্তি অথবা ফাঁসি হয়ে যাওয়াকেও শ্রেয় মনে করেন।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুহাম্মদ ইয়াসিন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘উচ্চ আদালত এখনো সাজা নিশ্চিতই করেনি, অথচ চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগেই একজন মানুষকে বছরের পর বছর কনডেম সেলে ফেলে রাখা হচ্ছে। এটি মানবাধিকারের মারাত্মক লঙ্ঘন।’

উচ্চ আদালত সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে হাইকোর্টে সাধারণত ২০১৮ ও তার আগের বছরগুলোর ক্রমানুসারে ডেথ রেফারেন্সের শুনানি চলছে। এই ধীরগতির পেছনে বেশ কিছু কারিগরি ও প্রশাসনিক সঙ্কট কাজ করছে। প্রথমত, ডেথ রেফারেন্স শুনানির পূর্বশর্ত হলো বিস্তৃত ‘পেপার বুক’ তৈরি করা, যাতে মামলার এফআইআর, চার্জশিট, সাক্ষীদের জবানবন্দি ও রায়ের কপি সঙ্কলিত থাকে; সরকারি প্রেসে এই কাজ শেষ হতেই বছরের পর বছর কেটে যায়। দ্বিতীয়ত, হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য নির্ধারিত বেঞ্চের সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। আর তৃতীয়ত, যেহেতু এটি জীবন-মৃত্যুর মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়, তাই বিচারকদের প্রতিটি নথিপত্র অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা করতে হয়, ফলে শুনানিতে প্রচুর সময় লাগে।

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মামলাজট নিরসনে প্রথাগত ধারার বাইরে এসে পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ এস এম শাহজাহানের মতে, পেপার বুক তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনে আসামিপক্ষ বা রিট আবেদনকারীদের নিজস্ব উদ্যোগে পেপার বুক প্রস্তুতির সুযোগ দেয়া উচিত।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারওয়ার আহমেদ বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ডের মতো স্পর্শকাতর মামলা নিষ্পত্তিতে অভিজ্ঞ বিচারকদের সমন্বয়ে স্থায়ী ও ডেডিকেটেড বেঞ্চ গঠন করা সময়ের দাবি।’ এর পাশাপাশি বিচারিক অবকাশকালীন ছুটিতে অতিরিক্ত বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে পুরনো মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিরও প্রস্তাব দেন অনেকে।

উল্লেখ্য, সাবেক প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর মেয়াদে এক বছরে সর্বোচ্চ ১৬৭টি ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তির নজির তৈরি হয়েছিল। এতে স্পষ্ট হয় যে, প্রশাসনিক সদিচ্ছা ও অগ্রাধিকার থাকলে এই জট কমানো সম্ভব।

হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্সের অবসান ঘটলেও আইনি প্রক্রিয়ার এখানেই শেষ নয়। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ বা আসামিপক্ষ আপিল বিভাগে যাওয়ার অধিকার রাখে।

এর অন্যতম উদাহরণ ২০১৪ সালের আলোচিত নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাতখুন মামলা। ২০১৭ সালে নিম্ন আদালত ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন এবং ওই বছরই হাইকোর্ট ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। তবে হাইকোর্টের রায়ের পর প্রায় ৯ বছর অতিক্রম হতে চললেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এখনো চূড়ান্ত শুনানি সম্পন্ন হয়নি।

সম্প্রতি মিরপুরে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার বিচারে নিম্ন আদালত দ্রুততম সময়ে রায় দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের সুবিশাল জটের বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। চূড়ান্ত আইনি সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত না মেলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মানসিক স্বস্তি, না শেষ হয় কনডেম সেলের বন্দীদের যন্ত্রণার প্রহর। ‘দেরিতে বিচার পাওয়া মানে বিচার না পাওয়ারই শামিল’ বিচারব্যবস্থার এই বহুচর্চিত আক্ষেপ দূর করতে এখন ডেথ রেফারেন্স জট কমানোই উচ্চ আদালতের প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

বিষয়সমূহ

এই সম্পর্কিত আরও

সাত মিনিটে এক মাইল দৌড়াতে হবে

সাত মিনিটে এক মাইল দৌড়াতে হবে

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

ডিআরইউ গেমসের পুরস্কার বিতরণ

ডিআরইউ গেমসের পুরস্কার বিতরণ

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

পিএসজির প্রথম জয়

পিএসজির প্রথম জয়

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

ঝিলি-বর্ষার লক্ষ্য মূল জাতীয় দল

ঝিলি-বর্ষার লক্ষ্য মূল জাতীয় দল

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

পাকিস্তানের পতনে শক্ত অবস্থানে টাইগাররা

পাকিস্তানের পতনে শক্ত অবস্থানে টাইগাররা

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

ইউএস ওপেনের নতুন চ্যাম্পিয়ন জভেরেভ

ইউএস ওপেনের নতুন চ্যাম্পিয়ন জভেরেভ

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৩ এএম