আজকের পত্রিকা

সীমান্তে নতুন নিরাপত্তা সঙ্কট

সীমান্তে নতুন নিরাপত্তা সঙ্কট

আরাকান আর্মির মাদক সাম্রাজ্য

রাখাইন রাজ্যের বড় অংশে সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মির (এএ) নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর সীমান্তজুড়ে মাদক, অস্ত্র, মানবপাচার ও অবৈধ বাণিজ্য নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একটি বিস্তৃত বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আরাকান আর্মি শুধু একটি বিদ্রোহী সংগঠন নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি আন্তর্জাতিক মাদক-নির্ভর অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে, যার অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে নিরাপত্তা পরিস্থিতি গত দুই বছরে নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাখাইন রাজ্যের বড় অংশে সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মির (এএ) নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর সীমান্তজুড়ে মাদক, অস্ত্র, মানবপাচার ও অবৈধ বাণিজ্য নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি পাওয়া একটি বিস্তৃত বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আরাকান আর্মি শুধু একটি বিদ্রোহী সংগঠন নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি আন্তর্জাতিক মাদক-নির্ভর অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে, যার অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু বাংলাদেশ।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখন ইয়াবার অন্যতম বড় বাজারে পরিণত হয়েছে এবং সংগঠনটি সীমান্ত, সমুদ্রপথ ও পাহাড়ি অঞ্চল ব্যবহার করে একটি সুসংগঠিত সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। তবে এসব দাবির কিছু কিছু অংশ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতিক্রিয়াও প্রতিবেদনে নেই।

মাদকের প্রবাহ কেন উদ্বেগের

বাংলাদেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইয়াবা জব্দের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

উল্লিখিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে-২০২৫ সালে বাংলাদেশে চার কোটি ৩৫ লাখের বেশি ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে। এটি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৯১ শতাংশ বেশি। সমুদ্রপথ এখন প্রধান রুটে পরিণত হয়েছে। উদ্ধার হওয়া চালান মোট প্রবাহের খুবই সামান্য অংশ।

সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী ও মাদকবিরোধী সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই সমুদ্রপথে ইয়াবা পাচার বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করে আসছে।

আরাকান আর্মি কিভাবে বদলে গেল

২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত আরাকান আর্মি শুরুতে নিজেদের রাখাইন জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও সামরিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনের অংশ হিসেবে পরিচয় দিত।

কিন্তু ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ তীব্র হলে সংগঠনটির সামরিক সক্ষমতা দ্রুত বাড়তে থাকে।

২০২৩ সালে ‘ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’-এর অভিযানের পর রাখাইনের বিশাল এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এই পরিস্থিতিতে সংগঠনটি সীমান্ত, বন্দর ও বাণিজ্যপথের ওপরও প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়।

প্রতিবেদনটির ভাষ্য অনুযায়ী, এই ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণই পরবর্তীতে মাদক উৎপাদন, সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিক পাচারের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করে।

কেন বাংলাদেশ

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আরাকান আর্মির দৃষ্টিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব কয়েকটি কারণে বেড়েছে- রাখাইন সীমান্তের দীর্ঘ ও দুর্গম এলাকা; নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের সহজ প্রবেশাধিকার; কক্সবাজার উপকূলের বিস্তৃত জলসীমা; পাহাড়ি সীমান্তের দুর্গম ভূপ্রকৃতি; বড় ভোক্তা বাজার; আন্তর্জাতিক রুটে প্রবেশের সুযোগ।

বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি অংশও মনে করেন, সীমান্তের ভূপ্রকৃতি ও চলমান সঙ্ঘাতের কারণে মাদকপাচার প্রতিরোধ আগের চেয়ে জটিল হয়ে উঠেছে।

শুধু মাদক নয়, বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকি

প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, মাদক ব্যবসার অর্থ ব্যবহার করে অস্ত্র সংগ্রহ, মানবপাচার, চাঁদাবাজি এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে।

এ ছাড়া পাহাড়ি সীমান্তে সক্রিয় কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগ থাকারও দাবি করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর বক্তব্যও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত নেই।

বাংলাদেশের সামনে কী প্রশ্ন

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়।

এটি একই সাথে-সীমান্ত নিরাপত্তা, জাতীয় অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, যুবসমাজ, উপকূলীয় নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সাথে যুক্ত।

যদি রাখাইনে দীর্ঘমেয়াদি সঙ্ঘাত অব্যাহত থাকে, তবে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে মাদকপাচারের চাপ আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশমুখী পাচারের রুট কতটা বিস্তৃত

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পর বাংলাদেশ সীমান্তের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, উন্মুক্ত উৎসের বিশ্লেষণ এবং সাম্প্রতিক একটি গোয়েন্দাধর্মী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সংগঠনটি শুধু সঙ্ঘাত পরিচালনা করছে না; বরং সীমান্ত ও উপকূলীয় ভূগোলকে কাজে লাগিয়ে একটি সুসংগঠিত মাদক পরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।

৩ স্তরের রুট

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মাদক পাঠাতে অন্তত ১৭টি রুট ব্যবহার করা হয়। এগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে- পাহাড়ি স্থলপথ; নাফ নদীপথ এবং বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রপথ।

পাহাড়ি করিডোর : বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম এবং রাঙ্গামাটির দুর্গম পাহাড়ি এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্ত নজরদারির জন্য চ্যালেঞ্জ।

প্রতিবেদনটির দাবি, রাখাইনের পালেতোয়া ও চিন রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব বনাঞ্চল হয়ে ছোট ছোট চালানে ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক বাংলাদেশে আনা হয়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ঘন বন, দুর্গম পাহাড় এবং সীমিত অবকাঠামোর কারণে এই করিডোরে নিয়মিত নজরদারি কঠিন।

নাফ নদী : সবচেয়ে সংবেদনশীল জলপথ : বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ নাফ নদী।

প্রতিবেদনটির ভাষ্য অনুযায়ী, রাখাইনের মংডু ও বুথিডং অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর নাফ নদীর বিপরীত তীরের বহু ছোট খাল ও জলপথ ব্যবহার করে রাতের অন্ধকারে ছোট নৌকায় চালান পাঠানো হয়।

এসব নৌযান টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ, লেদা কিংবা উখিয়ার বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছায় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) অতীতে নাফ নদী দিয়ে ইয়াবা পাচারের একাধিক চালান আটক করেছে। তবে বর্তমানে কী পরিমাণ প্রবাহ ঘটছে, তার নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়নি।

সমুদ্র এখন বড় চ্যালেঞ্জ : প্রতিবেদনটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো- বাংলাদেশে প্রবেশ করা ইয়াবার প্রায় ৮০ শতাংশ এখন সমুদ্রপথে আসে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে গভীর সমুদ্রে ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, স্থলসীমান্তে নজরদারি বাড়ার পর পাচারকারীরা বঙ্গোপসাগরের রুটকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে।

কক্সবাজার উপকূল থেকে শুরু করে মহেশখালী, কুতুবদিয়া, বাঁশখালী ও আনোয়ারা পর্যন্ত বিস্তৃত উপকূল এ কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

চার ধাপের সরবরাহব্যবস্থা

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, আরাকান আর্মির মাদক সরবরাহব্যবস্থা সাধারণ চোরাচালানের মতো নয়; বরং এটি চার স্তরে পরিচালিত হয়।

প্রথম স্তরে রয়েছে অর্থায়ন ও সংগ্রহ। দ্বিতীয় স্তরে সীমান্ত নিরাপত্তা ও নিরাপদ করিডোর নিশ্চিত করা হয়। তৃতীয় স্তরে সীমান্তের দুই পাশের মধ্যস্থতাকারীরা যোগাযোগ ও লজিস্টিক সমন্বয় করেন। সবশেষে স্থানীয় বাহক বা কুরিয়াররা ছোট ছোট চালান নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেয়।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বিভক্ত কাঠামো থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে কী দাবি

প্রতিবেদনটিতে বেশ কিছু উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিযোগ করা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে- এআইএস (অঁঃড়সধঃরপ ওফবহঃরভরপধঃরড়হ ঝুংঃবস) বন্ধ রাখা মাছ ধরার ট্রলার বা তথাকথিত ‘ঘোস্ট বোট’; জিপিএস-চিহ্নিত ভাসমান কনটেইনার; ড্রোনের মাধ্যমে সীমান্ত পর্যবেক্ষণ; স্যাটেলাইট ফোন; এনক্রিপটেড মেসেজিং অ্যাপ; ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ লেনদেন।

এসব দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব না হলেও আন্তর্জাতিকভাবে সংগঠিত অপরাধচক্রের ক্ষেত্রে ড্রোন, স্যাটেলাইট যোগাযোগ ও ডিজিটাল অর্থ ব্যবহারের প্রবণতা গত কয়েক বছরে বেড়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গোপসাগর

বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গোপসাগর এখন শুধু বাণিজ্যের করিডোর নয়; এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা রাজনীতিরও অন্যতম কেন্দ্র।

যদি সঙ্ঘাতপ্রবণ রাখাইন উপকূল কার্যকরভাবে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকে, তবে এর প্রভাব শুধু বাংলাদেশ নয়; ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও আন্দামান সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, সমুদ্রসীমা, উপকূলীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত গোয়েন্দা তথ্য এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে একই সাথে শক্তিশালী করা।

সামনে কী

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে কেবল অভিযান বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না।

প্রয়োজন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি, উপকূলীয় রাডার ও সামুদ্রিক গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থপাচার প্রতিরোধে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার সক্ষমতা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সহযোগিতা আরো শক্তিশালী করা।

অন্য দিকে, রাখাইনের চলমান সঙ্ঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে সীমান্তজুড়ে অবৈধ বাণিজ্য ও মাদকপাচারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা।

আরাকান সঙ্ঘাতের অভিঘাতে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সঙ্ঘাত বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি সীমান্ত সঙ্কট নয়; এটি ধীরে ধীরে জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির জটিল ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে। আরাকান আর্মি মাদক পাচার থেকে অর্জিত অর্থ ব্যবহার করে একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে, যার অন্যতম প্রধান প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের ওপর।

বাংলাদেশে ইয়াবার বিস্তার শুধু একটি আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতিরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মাদকাসক্তির কারণে কর্মক্ষমতা হ্রাস, চিকিৎসাব্যয় বৃদ্ধি, অপরাধ দমন ব্যয়, বিচারব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং অবৈধ অর্থপ্রবাহ, সব মিলিয়ে অর্থনীতির ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি হয়।

প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়েছে, মাদক কারবারের মাধ্যমে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ বিভিন্ন পর্যায়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। তবে এই হিসাবের পদ্ধতি ও ভিত্তি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অন্য দিকে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায়ও মাদক অর্থনীতিকে ‘শ্যাডো ইকোনমি’ বা ছায়া অর্থনীতির অন্যতম বড় উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অর্থপাচারের নতুন কৌশল

প্রতিবেদনটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বলা হয়েছে, নগদ অর্থের পাশাপাশি হুন্ডি, অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থা, ক্ষুদ্র মোবাইল আর্থিক লেনদেন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে অর্থ স্থানান্তরের চেষ্টা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া মাদকের বিনিময়ে চাল, ভোজ্যতেল, ওষুধ, জ্বালানি কিংবা অন্যান্য পণ্য বিনিময়ের অভিযোগও করা হয়েছে।

এই ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। আন্তর্জাতিকভাবে সঙ্ঘাতপ্রবণ এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই বৈধ ও অবৈধ বাণিজ্যকে একসাথে ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করে বলে গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে।

পার্বত্যাঞ্চল কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

প্রতিবেদনটিতে সবচেয়ে স্পর্শকাতর দাবি করা হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে।

সেখানে বলা হয়েছে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা শুধু মাদক পরিবহনের করিডোর নয়; বরং এটি সীমান্তের দুই পাশের সঙ্ঘাত, অবৈধ বাণিজ্য ও অস্ত্রপাচারের জন্যও ব্যবহৃত হতে পারে।

প্রতিবেদনটিতে আরো অভিযোগ করা হয়েছে যে, কিছু স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে আরাকান আর্মির যোগাযোগ রয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম ভূপ্রকৃতি দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ। ফলে এ অঞ্চলে কার্যকর গোয়েন্দা নজরদারি ও আন্তঃসংস্থার সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে ইয়াবা-সঙ্কটের সবচেয়ে বড় শিকার তরুণ প্রজন্ম। মাদকাসক্তি শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে না; এটি শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, পারিবারিক সহিংসতা, সন্ত্রাসী ও অপরাধচক্রে জড়িয়ে পড়া এবং কর্মক্ষমতা হ্রাসের মতো বহুমাত্রিক সামাজিক সমস্যার জন্ম দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকবিরোধী অভিযান যতটা জরুরি, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক শিক্ষা, পুনর্বাসন এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ।

সমুদ্র নিরাপত্তার নতুন বাস্তবতা

বাংলাদেশের ৭১০ কিলোমিটারের বেশি উপকূলরেখা এবং বিস্তৃত সামুদ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইজেড) এখন কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি নিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

যদি সঙ্ঘাতপ্রবণ রাখাইন উপকূল থেকে সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধচক্র সমুদ্রপথ ব্যবহার করে, তাহলে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও অন্যান্য সংস্থার জন্য প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আরো জরুরি হয়ে পড়বে।

সামুদ্রিক রাডার, উপকূলীয় সেন্সর, ড্রোন নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় ছাড়া এই ধরনের নেটওয়ার্ক মোকাবেলা কঠিন হতে পারে।

কী করা যেতে পারে

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সীমান্তে টহল বাড়িয়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সম্ভব নয়। একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল প্রয়োজন। তার মধ্যে থাকতে পারে- সীমান্ত ও উপকূলে সমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা; বিজিবি, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী, পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর এবং আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানো; মাদক ও অর্থপাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা; রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সীমান্তবর্তী এলাকায় অপরাধচক্রের অনুপ্রবেশ রোধে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া; পার্বত্যাঞ্চলে উন্নয়ন, প্রশাসনিক উপস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলা সক্ষমতা বৃদ্ধি করা; যুবসমাজকে লক্ষ্য করে প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি ও পুনর্বাসনব্যবস্থার সম্প্রসারণ।

রাখাইনের সঙ্ঘাত বাংলাদেশের তৈরি নয়, কিন্তু এর প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্ত, অর্থনীতি ও সমাজে পড়ছে। মাদকপাচার, মানবপাচার, অস্ত্রের অবৈধ প্রবাহ এবং সীমান্ত অপরাধ- এসব ইস্যু পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। তাই এগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

এই বিষয়ে আরও

এই সম্পর্কিত আরও

সাত মিনিটে এক মাইল দৌড়াতে হবে

সাত মিনিটে এক মাইল দৌড়াতে হবে

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

ডিআরইউ গেমসের পুরস্কার বিতরণ

ডিআরইউ গেমসের পুরস্কার বিতরণ

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

পিএসজির প্রথম জয়

পিএসজির প্রথম জয়

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

ঝিলি-বর্ষার লক্ষ্য মূল জাতীয় দল

ঝিলি-বর্ষার লক্ষ্য মূল জাতীয় দল

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

পাকিস্তানের পতনে শক্ত অবস্থানে টাইগাররা

পাকিস্তানের পতনে শক্ত অবস্থানে টাইগাররা

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

ইউএস ওপেনের নতুন চ্যাম্পিয়ন জভেরেভ

ইউএস ওপেনের নতুন চ্যাম্পিয়ন জভেরেভ

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৩ এএম