আজকের পত্রিকা

টরন্টো উৎসবে অ্যান্ড্রু স্কট

ইন্টারনেটের সমালোচনা আসলে ক্ষণস্থায়ী শোরগোল

ইন্টারনেটের সমালোচনা আসলে ক্ষণস্থায়ী শোরগোল
অ্যান্ড্রু স্কট

শরতের মিষ্টি রোদ আর লেক অন্টারিওর হিমেল হাওয়ায় তখন মেতে আছে টরন্টো শহর। ৫১তম টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের রঙিন আবহে চারপাশ সরগরম। উৎসবের প্রাণকেন্দ্র ‘কিং স্ট্রিট ওয়েস্ট’ ধরে হেঁটে টরন্টোর ঐতিহ্যবাহী ‘রয়েল আলেকজান্দ্রা থিয়েটারে’ পৌঁছাতেই দেখা গেল চলচ্চিত্রপ্রেমীদের দীর্ঘ সারি। সবার গন্তব্য উৎসবের অন্যতম সেরা আকর্ষণ ‘ইন কনভারসেশন উইথ...’ বা বিশেষ কথালাপ পর্ব। যেখানে মঞ্চ আলো করে বসবেন আন্তর্জাতিক সেলুলয়েড অঙ্গনের বহুল আলোচিত ও সমাদৃত আইরিশ অভিনেতা অ্যান্ড্রু স্কট।

আলমগীর কবির, টরেন্টো, কানাডা থেকে

শরতের মিষ্টি রোদ আর লেক অন্টারিওর হিমেল হাওয়ায় তখন মেতে আছে টরন্টো শহর। ৫১তম টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের রঙিন আবহে চারপাশ সরগরম। উৎসবের প্রাণকেন্দ্র ‘কিং স্ট্রিট ওয়েস্ট’ ধরে হেঁটে টরন্টোর ঐতিহ্যবাহী ‘রয়েল আলেকজান্দ্রা থিয়েটারে’ পৌঁছাতেই দেখা গেল চলচ্চিত্রপ্রেমীদের দীর্ঘ সারি। সবার গন্তব্য উৎসবের অন্যতম সেরা আকর্ষণ ‘ইন কনভারসেশন উইথ...’ বা বিশেষ কথালাপ পর্ব। যেখানে মঞ্চ আলো করে বসবেন আন্তর্জাতিক সেলুলয়েড অঙ্গনের বহুল আলোচিত ও সমাদৃত আইরিশ অভিনেতা অ্যান্ড্রু স্কট।

পর্দায় কিংবা মঞ্চে অ্যান্ড্রু স্কটের অভিনয়ের গভীরতা আর মনস্তাত্ত্বিক বৈচিত্র্য সম্পর্কে চলচ্চিত্র বিশ্ব ওয়াকিবহাল। তবে টরন্টোর রাজকীয় এই হলে বসে তাকে সরাসরি শোনার অভিজ্ঞতা এক অন্য মাত্রা যোগ করল। বিকেলের আলো-আঁধারিতে কিথ বেনির সঞ্চালনায় স্কট যখন বেগুনি রঙের জাম্পার পরে মঞ্চে এলেন, পুরো হল গমগম করে উঠল লাল কারপেটের উষ্ণতা আর দর্শকদের করতালির গর্জনে।

এবারের উৎসবে স্কট এসেছেন তার নতুন বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র ‘এলসিনোর’-এর কানাডিয়ান প্রিমিয়ার উপলক্ষে। এর আগে টেলুরাইড ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বিশ্ব প্রিমিয়ারের পরই ছবিটি ঘিরে অস্কারের প্রবল আলোচনা শুরু হয়েছে। ১৯৮০-র দশকে রয়্যাল ন্যাশনাল থিয়েটারে ‘হ্যামলেট’ নাটকে অভিনয় করতে গিয়ে কালজয়ী অভিনেতা ড্যানিয়েল ডে-লুইস অসুস্থতার কারণে মাঝপথে মঞ্চ ত্যাগ করলে তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন তরুণ ব্রিটিশ অভিনেতা ইয়ান চার্লসন। এইডস ট্র্যাজেডির মরণঘাতী থাবায় আক্রান্ত হয়েও চার্লসনের সেই ঐতিহাসিক থিয়েটার যুদ্ধ এবং জীবনের শেষ দিনগুলোর গল্প নিয়েই নির্মিত হয়েছে ‘এলসিনোর’। ছবিতে চার্লসনের চরিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি স্কট এই প্রথমবার কোনো প্রযোজকের ভূমিকাতেও অবতীর্ণ হয়েছেন। তিনি জানান, চার্লসনের স্মৃতিকে সম্মান জানাতে এবং এই আবেগঘন গল্পটি যেন ভুলভাবে উপস্থাপিত না হয়, সেই তাগিদ থেকেই তিনি প্রযোজনার দায়িত্ব নিয়েছেন।

দীর্ঘ এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই কথামালায় স্কট তার অভিনয় জীবনের পথচলা, ভয়, সাফল্য এবং সামাজিক মাধ্যমের তৈরি করা কৃত্রিম ও ক্ষতিকারক প্রভাব নিয়ে অত্যন্ত খোলামেলা আলোচনা করেন।

সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য উঠে আসে বিবিসির বিখ্যাত সিরিজ ‘শার্লক’-এ তার দুর্দান্ত খল চরিত্র ‘মোরিয়ার্টি’ প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে। রাতারাতি বিশ্বব্যাপী খ্যাতি পাওয়া এই অভিনেতা জানান, ক্যারিয়ারের শুরুতে ইন্টারনেটের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখে তিনি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে স্কট বলেন, আমার জীবনে জনমতের মুখোমুখি হওয়ার প্রথম অভিজ্ঞতা ছিল সেটি। তখন টুইটারের (বর্তমান এক্স) খুব জোয়ার। সেখানে গিয়ে লোকদের নানা ট্রোল ও কটু মন্তব্য পড়ে আমার মন ভীষণ খারাপ হতো। বিশ্রী আর ভয়ানক সব কথা লেখা হতো আমাকে নিয়ে। আমি তো রীতিমতো বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম যে নির্মাতা হয়তো আমাকে সিরিজ থেকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে কাস্টিং করবেন।

তবে সময় গড়ানোর সাথে সাথে এই অনর্থক ভয় ও মানসিক চাপ কাটিয়ে উঠেছেন তিনি। অ্যান্ড্রু স্কটের স্পষ্ট বক্তব্য, আমি কিন্তু বাদ পড়িনি, কাজটাও থেমে থাকেনি। সব কিছু দিনশেষে ঠিকঠাক হয়ে গিয়েছিল। তখন বুঝলাম, ইন্টারনেটের সমালোচনা আসলে স্রেফ একটা ক্ষণস্থায়ী শোরগোল মাত্র। বাস্তব জীবনে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব থাকা উচিত নয়। যে কারণে আমি এখন আর ইন্টারনেট ব্যবহার করি না, এ সবে কান দেয়ারও প্রয়োজন নেই।

কথোপকথনে স্কটের শৈশবের এক অজানা মানবিক অধ্যায়ও উন্মোচিত হয়। আইরিশ উচ্চারণে কথা বলা এই গুণী অভিনেতার ছেলেবেলায় প্রচণ্ড তোতলামি বা বাকত্রুটি ছিল। মাত্র সাত বছর বয়সে তার মা তাকে স্পষ্ট উচ্চারণের ক্লাসে ভর্তি করিয়ে দেন। সেখানেই কবিতা আবৃত্তি ও তাৎক্ষণিক নাটকের মহড়ায় অভিনয়ের প্রেমে পড়েন তিনি। কোনো ড্রামা স্কুলে না পড়েও শুধুমাত্র ছেলেবেলার সেই আনন্দের ছলে শেখা অভিনয়ই আজ তার মূল ‘মেথড’ বা ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মঞ্চে উঠে আসে তার দীর্ঘ থিয়েটার জীবনের প্রসঙ্গও। লন্ডনের বিখ্যাত ওয়েস্ট অ্যান্ডের আগে ১৫০ বারেরও বেশি ‘হ্যামলেট’ চরিত্রে একক অভিনয় করেছেন স্কট। অথচ ‘এলসিনোর’ ছবিতে একই চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে তাকে নতুন করে শেক্সপিয়ারের সংলাপ শিখতে হয়েছে। স্কট জানান, নিজের আগে শেখা অভিনয়ের ঢং ভুলে ইয়ান চার্লসনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ডায়ালগগুলো রপ্ত করাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

পাশাপাশি ‘ফ্লিব্যাগ’ সিরিজের ‘হট প্রিস্ট’ চরিত্রে তার অভিনীত ব্যাপক জনপ্রিয় অধ্যায়টিও আলোচনায় স্থান পায়। ব্যক্তিজীবনে খোলাখুলিভাবে সমলিঙ্গ অনুরাগী পরিচয়ের কারণে ইন্ডাস্ট্রি তাকে মূল রোমান্টিক নায়ক হিসেবে মেনে নেবে কি না, তা নিয়ে একসময় মানসিক দ্বিধা ছিল। তবে দর্শকরা যে শিল্পীকে তার যৌন পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে গ্রহণ করতে জানেন, তা এই চরিত্রের বিপুল সাফল্য প্রমাণ করেছে।

মঞ্চে স্কট হাসতে হাসতে বলেন, দর্শকদের আমরা যতটা বোকা ভাবি, তারা আসলে ততটা নন। থিয়েটারে আমরা যখন ‘ব্যাটম্যান’ দেখতে যাই, তখন কি কেউ বলি ‘আরে, লোকটা তো সত্যি সত্যি বাদুড় নয়!’ তাহলে স্ক্রিনে একজন সমলিঙ্গ অনুরাগী অভিনেতা সোজা বা হেটেরোসেক্সুয়াল রোমান্টিক চরিত্রে অভিনয় করলে দর্শক তা মেনে নেবে না কেন? এটা স্রেফ একপ্রকার কুসংস্কার, যার কাছে নতিস্বীকার করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথা জানাতে গিয়ে এই আইরিশ তারকা জানান, সুযোগ পেলে তিনি ক্লাসিক এমজিএম ধাঁচের বড় বাজেটের ড্রামাটিক ‘মিউজিক্যাল’ সিনেমা করতে চান, যেখানে গানের তালে অভিনয়ের স্বাধীনতা থাকবে। পাশাপাশি শেকসপিয়ারের ‘ওথেলো’ নাটকের কুখ্যাত খলনায়ক ‘ইয়াগো’ এবং ‘মাচ অ্যাডু অ্যাবাউট নথিং’-এর ‘বেনেডিক’ চরিত্রে অভিনয় করা তার দীর্ঘদিনের ইচ্ছে।

উৎসবের পর্দা ওঠার পর থেকেই টরন্টোর সুশীল সমাজ ও আন্তর্জাতিক সিনেবোদ্ধাদের মুখে মুখে ঘুরছে স্কটের এই ‘এলসিনোর’ ছবির কথা। অস্কারের প্রায় শতবর্ষের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে এমন কোনো পরিচয়ের পুরুষ অভিনেতা ‘সেরা অভিনেতা’ বিভাগে অস্কার পাননি। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচকরা মনে করছেন, চার্লসনের জীবনের এই মানবিক দস্তাবেজে অ্যান্ড্রু স্কটের অনবদ্য অভিনয় এবার হয়তো অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের সেই নতুন ইতিহাস রচনা করবে।

টরন্টোর ঐতিহ্যবাহী থিয়েটার হলের আলো যখন নিভে আসছিল, বাইরে তখন সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার হিমেল হাওয়া। রয়্যাল আলেকজান্দ্রা থিয়েটারের প্রাঙ্গণ ছেড়ে বেরিয়ে মনে হলো একজন সত্যিকারের শিল্পীর আসল শক্তি তার কাজের সততায়, যা সামাজিকমাধ্যমের অসার শোরগোল টপকে জীবনের গভীর সত্যকে দর্শকদের হৃদয়ে চিরন্তন করে তোলে।

এই বিষয়ে আরও

১
এআইকে বন্ধু হিসেবে ভাবছে জেন জি, বলছে গবেষণা

এআইকে বন্ধু হিসেবে ভাবছে জেন জি, বলছে গবেষণা

মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ৫:৪৯ পিএম

৫
কাজে ফিরতে ভয় পাচ্ছেন স্টাফরা : সংবাদ সম্মেলনে আইএসপিএবি

সন্ত্রাসী হামলা কাজে ফিরতে ভয় পাচ্ছেন স্টাফরা : সংবাদ সম্মেলনে আইএসপিএবি

চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে হামলার ঘটনায় গ্রেফতার নেই

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ৭:৫৮ পিএম

এই সম্পর্কিত আরও

সাত মিনিটে এক মাইল দৌড়াতে হবে

সাত মিনিটে এক মাইল দৌড়াতে হবে

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

ডিআরইউ গেমসের পুরস্কার বিতরণ

ডিআরইউ গেমসের পুরস্কার বিতরণ

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

পিএসজির প্রথম জয়

পিএসজির প্রথম জয়

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

ঝিলি-বর্ষার লক্ষ্য মূল জাতীয় দল

ঝিলি-বর্ষার লক্ষ্য মূল জাতীয় দল

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

পাকিস্তানের পতনে শক্ত অবস্থানে টাইগাররা

পাকিস্তানের পতনে শক্ত অবস্থানে টাইগাররা

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

ইউএস ওপেনের নতুন চ্যাম্পিয়ন জভেরেভ

ইউএস ওপেনের নতুন চ্যাম্পিয়ন জভেরেভ

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৩ এএম