ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) বিরুদ্ধে বিএনপির দলীয় বক্তব্যের আদলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিবৃতি দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাম্প্রতিক বিবৃতির ভাষা ও বক্তব্যের ধরন দেখে মনে হয়েছে, এটি কোনো নিরপেক্ষ প্রশাসনিক বক্তব্য নয়, বরং বিএনপির দলীয় বিবৃতির মতো।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি দেশের বাইরে থাকায় প্রো-ভিসির (শিক্ষা) সাথে ডাকসুর একটি প্রতিনিধিদলের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

ফরহাদ বলেন, ‘আজ প্রো-ভিসি বলেছেন, জিন্নাহর ছবির কারণে নাকি আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তারা ডাকসুর বিরুদ্ধে কঠোরভাবে প্রতিহত করবে। কেন? মনে হচ্ছে, বিএনপির কোনো দলীয় পোস্ট কপি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পেজে দেয়া হয়েছে। অথবা এমনও হতে পারে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পেজের অ্যাডমিন এতদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ছিলেন, এখন বিএনপির সাথে সংশ্লিষ্ট কাউকে সেই পেজের অ্যাডমিন বানানো হয়েছে। এই দুটির কোনো একটি হতে পারে। ডাকসুর ব্যাপারে লেখা একটি দলীয় বক্তব্যকে হুবহু কপি করে দেয়া হয়েছে। এ কারণে নাকি ডাকসুর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

ফরহাদ আরো বলেন, “বিএনপি আওয়ামী আমলের ১৫ বছরের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পরিচালনার নীতিকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী আমলে আমরা এরকম দেখিনি। এমনকি তার আগের সামরিক শাসন, বিএনপি আমল বা তারও আগের সময়েও গত ৫৫ বছরের ইতিহাসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘কঠোরভাবে প্রতিহত’ করার মতো ভাষায় কোনো ঘটনা ঘটার সাথে সাথে বিবৃতি দেয়ার ঘটনা নিন্দনীয়।”

তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম, বরং আপনারা ব্যবস্থা নিন তাদের বিরুদ্ধে, যারা বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আক্রমণ করেছে এবং অনেক ছবি ও সম্পদ ভাঙচুর করেছে।’

এফএইচ হলের ঘটনায় শিক্ষার্থী ইব্রাহিমকে প্রভোস্ট কর্তৃক নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ফরহাদ বলেন, ‘এ ঘটনার একটি রেকর্ড ইতোমধ্যে কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘কী বিভৎস চিত্র ছিল। তারা তদন্ত কমিটির নাম করে দীর্ঘদিন সময় কাটিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আমরা স্যারকে স্পষ্টভাবে জিজ্ঞেস করেছি, আমাদের হাতে গণমাধ্যমের মাধ্যমে যে রেকর্ড এসেছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে শিক্ষার্থীকে মানসিক ও শারীরিকভাবে অত্যন্ত বাজেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, তাকে ট্রমাটাইজ করা হয়েছে, মামলার হুমকি দেয়া হয়েছে এবং তার কাছ থেকে সবকিছু ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। প্রভোস্ট রুমের দরজা বন্ধ করে স্টাফদের সহযোগিতা নিয়ে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে বলে আমরা রেকর্ডে দেখেছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘তদন্ত চলাকালে আমরা জানতে চেয়েছি, কেন ওই প্রভোস্টকে উল্টো পুরস্কৃত করা হচ্ছে? কেন তাকে বিভিন্ন কমিটিতে রাখা হচ্ছে? কেন বিভিন্ন পুরস্কার দেয়া হচ্ছে? এসব বিষয়ে তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি।’

ছাত্রদল নেতা হামিমের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে ডাকসু জিএস বলেন, ‘তিনি আজ গর্ব করে বলছেন, কোটি কোটি টাকা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় চলে। প্রতিবছর যে বাজেট সরকার থেকে দেয়া হয়, সেটার যতটুকু সরাসরি বাজেট বা সরাসরি ট্যাক্স থেকে আসে, তার বেশির ভাগই আসে ইনডিরেক্ট ট্যাক্স থেকে।’

তিনি বলেন, ‘ইনডিরেক্ট ট্যাক্স মানে কী? রিকশাওয়ালার শ্রম, গার্মেন্টস শ্রমিকের টাকা, মাটির ভাটায় কাজ করা মানুষের টাকা, ইটভাটায় কাজ করা মানুষের টাকা। অর্থাৎ হতদরিদ্র ও নিম্নআয়ের সব শ্রেণির মানুষের ট্যাক্সের টাকা থেকেই এই ব্যয় চলে।’

ফরহাদ বলেন, “আপনি নিজে মানুষের টাকায় পড়াশোনা করছেন, তারপর এসে বলছেন না যে, ‘আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকা দিয়ে পড়তে চাই না, আমি নিজে বেতন দেব।’ বরং গরিব-দুঃখী মানুষের টাকায় পড়াশোনা করে এখানে শোডাউন করে বেড়ান এবং বড় বড় বক্তব্য দেন। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।”

ছাত্রদল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা ছাত্রদলের হতাশা বুঝি। তারা মার্কেট থেকে চাঁদার ভাগ পান না, আমরা জানি। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের দোকান থেকে ভাগ পান না। আমাদের ১৮টি হলের এতগুলো ক্যান্টিন ও দোকান থেকে আপনারা গত এক বছরে কত কোটি টাকা সংগ্রহ করতে পারতেন, সেটাও আপনারা জানেন। এখন সেটা বন্ধ হয়ে গেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আপনারা শহরের সামনে আনন্দবাজারের ব্যবসায়ীদেরও জিজ্ঞেস করতে পারেন। ব্যবসায়ীরা নিজেরাই বলেন, আগে জোর করে ভাগ নেয়া হতো, এখন কেউ ভাগ নেয় না। আপনারা এগুলো ফিরিয়ে আনতে চান। চাঁদাবাজির ভাগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে আপনাদের এই হতাশা।’

ডাকসুর বিরুদ্ধে ছাত্রদলের বক্তব্যের প্রসঙ্গে ফরহাদ বলেন, ‘এমনকি সাহস করে কেউ বলে না, ডাকসুর তফসিল দিন। কারণ তারা মনে করেন, তফসিল দিলে তারা আবার হারবেন এবং চাঁদাবাজি করতে পারবেন না।’