মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তিন দিনের দ্বিপক্ষীয় সফরে এখন কুয়ালালামপুরে অবস্থান করছেন। এক যুগের পর এই প্রথম বাংলাদেশর কোনো সরকার প্রধান মালয়েশিয়া সফর করছেন।
সফরের মূল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে মঙ্গলবার (১২ আগস্ট), যেখানে দু’ দেশের সরকার প্রধান পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক বৈঠক, একাধিক সমঝোতা স্মারক (MoU) ও নোট বিনিময় (Exchange Notes) সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য পাঁচটি সমঝোতা স্মারকের মধ্যে রয়েছে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, জ্বালানি খাতে এলএনজি ও পেট্রোলিয়াম সরবরাহ এবং অবকাঠামো উন্নয়ন, দু’ দেশের নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মিমোসের মধ্যে চুক্তি এবং এফবিসিসিআই ও মালয়েশিয়ার শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনের মধ্যে সহযোগিতা। এছাড়া তিনটি এক্সচেঞ্জ নোটের মধ্যে থাকছে হালাল ইকোসিস্টেম উন্নয়ন, দু’ দেশের ফরেন সার্ভিস একাডেমির মধ্যে প্রশিক্ষণ সহযোগিতা এবং উচ্চশিক্ষা খাতের উন্নয়ন। এ সফরে দীর্ঘ সময় ধরে অমীমাংসিত বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের প্রত্যাশা প্রাপ্তির স্বপ্ন দেখছেন প্রবাসীরা।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো: তৌহিদ হোসেন জানিয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস ও প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের ব্যক্তিগত সম্পর্ক দু’ দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশীদের সুযোগ বাড়ানো এবং আসিয়ান জোটে বাংলাদেশের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার প্রচেষ্টায় এ সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এদিকে, প্রবাসীরা বলছেন, মালয়েশিয়ার সরকার ২০২৩ সালে অবৈধ অভিবাসীদের বৈধকরণ প্রক্রিয়া হঠাৎ বন্ধ করে দেয়, সেই থেকে এখনো বৈধকরণ প্রক্রিয়া চালু না হওয়ায় চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে কয়েক লাখ বাংলাদেশী প্রবাসী। তাদের দাবি, কলিং ভিসায় বাংলাদেশ থেকে কর্মী আনার আগে তাদেরকে বৈধতার আওতায় আনা হোক।
মঙ্গলবার (১২ আগস্ট) সকালে পুত্রজায়ায় দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিক সই অনুষ্ঠান ও মধ্যাহ্নভোজ অনুষ্ঠিত হবে। বিকেলে অধ্যাপক ইউনূস মালয়েশিয়ায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের সাথে মতবিনিময় করবেন এবং রাতে মন্ত্রী, নাগরিক সমাজ, ব্যবসায়ী ও আমলাদের সাথে নৈশভোজে যোগ দেবেন। বুধবার (১৩ আগস্ট) মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি কেবাংসান থেকে প্রধান উপদেষ্টাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করা হবে। এ উপলক্ষে আয়োজিত সমাবর্তনে বক্তৃতা দেবেন তিনি।
সফরে প্রধান উপদেষ্টার সাথে থাকবেন পররাষ্ট্র, জ্বালানি, প্রবাসী কল্যাণ, জাতীয় নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ খাতের শীর্ষ উপদেষ্টারা, যা এ সফরের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।
প্রবাসীরা আশা করছেন, বছরের পর ঝুলে থাকা সমস্যাগুলো প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তুলে ধরবেন এবং আশানুরূপ ইতিবাচক সমাধান হবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- বৈধতাকরণ ছাড়াও আছে উচ্চ অভিবাসন ব্যয় হ্রাস, প্রবাসীরা মারা গেলে সরকারি খরচে তাদের লাশ দেশে ফেরত পাঠানো, পাসপোর্ট নবায়নে দীর্ঘ সূত্রতা ও প্রবাসীদের ঘাটে ঘাটে চরম ভোগান্তির সমাধান, পাসপোর্ট নবায়নে দুর্নীতির আঁতুড়ঘর আউটসোর্সিং থার্ড পার্টি কোম্পানি ইএসএক কেএল-এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াসহ কলিং ভিসায় সিন্ডিকেট বন্ধ করা, যেখানে ভারত নেপাল থেকে মালয়েশিয়ায় কলিং ভিসায় কর্মী যেতে খরচ হয় এক লাখ টাকারও কম অথচ সিন্ডিকেটের কারণে বাংলাদেশের কর্মীদের গুনতে হয় পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা। এতে করে প্রবাসীরা মালয়েশিয়ায় পা রেখেই ঋণের জালে আবদ্ধ হয়ে দিশেহারা হয়ে বেশি রোজগারের আশায় বিভিন্ন কোম্পানিতে কাজ করতে গিয়ে অবৈধ হয়ে পড়ে। কিছু কিছু কোম্পানি মুনাফার লোভে কর্মী মালয়েশিয়ায় নিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার পর কাজ দিতে না পেরে জিম্মি করে রাখে, পরে তাদের ফেলে পালিয়ে যায়, প্রবাসীরা মনে করেন, এসব দুর্নীতি ও সমস্যা সমাধান হলে প্রবাসীরা দেশটিতে যেমন নিরাপত্তা পাবেন তেমনি অধিক আয় করতে পারবেন আর এ রেমিট্যান্স প্রবাহে বাংলাদেশ হবে আরো সমৃদ্ধ।















