- নিয়োগ, পদোন্নতি টেন্ডারবাজির নিয়ন্ত্রণ
- হলভাড়ার লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ
দেশের সবচেয়ে বৃহৎ পেশাজীবী সংগঠন কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (কেআইবি)। প্রায় ৩৬ হাজার কৃষিবিদ সদস্যের এই শীর্ষ সংগঠনের প্রধান কার্যালয় রাজধানীর খামারবাড়ি সড়কে। ‘কেআইবি কমপ্লেক্স’ নামের এই নান্দনিক ভবনটি সদস্যদের পেশাগত দক্ষতা অর্জন ও কল্যাণে প্রায় শত কোটি টাকা সরকারি ব্যয়ে নির্মিত হলেও বিগত আওয়ামী আমলে এটি হয়ে ওঠে কৃষি খাতের লুটপাটকারীদের আস্তানা হিসেবে। কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ভুক্ত বিভিন্ন দফতর, সংস্থা ও অধিদফতরে নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন এবং প্রকল্পের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ হয় কেআইবিতে বসে। কৃষি খাতের লুটপাটের পাশাপাশি কেআইবির নেতা ও তাদের অনুসারীরা হলরুম ভাড়া, খাবার সরবরাহ ও সাজসজ্জা থেকে প্রতি মাসের আয় থেকেও লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি চক্র। গত ৫ আগস্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের পর কেআইবির নিয়ন্ত্রণ নেন বিএনপিপন্থী কৃষিবিদরা। কিন্তু এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের মধ্যেও গ্রুপিং দেখা যায়। কেআইবি থেকে আয়ের অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে মারামারির অভিযোগও ওঠে। যদিও এরপর দিনই কেআইবিতে প্রশাসক নিয়োগ দেয় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। জানা যায়, দীর্ঘ প্রায় দেড়যুগে কেআইবিকে দলীয় কার্যালয়ে পরিণত করেছিলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমসহ সংশ্লিষ্টরা। বিনাভোটে বছরের পর বছর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পায় তিনি ও তার অনুসারীদের। কৃষিবিদ তথা কেআইবি সদস্যদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন সভা, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপ আয়োজন, গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা, কৃষি বিষয়ক প্রযুক্তি ও জ্ঞানসহ বৈজ্ঞানিক অর্জনগুলো কৃষকের মাঝে হস্তান্তর, বিস্তার ও উন্নয়ন, কৃষি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণের আয়োজন, কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে সমস্যাগুলো চিহ্নিতকরণ এবং তা সমাধানে সরকারকে সম্ভাব্য উপায় ও পরামর্শ প্রদানের লক্ষ্যে একটি শিক্ষামূলক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষে ১০২ কোটি টাকা ব্যয়ে সরকারি অর্থায়নে বর্তমান নান্দনিক ‘কেআইবি কমপ্লেক্স’টি নির্মাণ করা হয়। ‘এস্টাবলিসমেন্ট অব কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কমপ্লেক্স (কেআইবি কমপ্লেক্স) শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই)। ২০১০ সালের মার্চ থেকে প্রকল্পটি শুরু করে শেষ হয় ২০১৪ সালের জুনে। শুরুতে এর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৬৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। পরে তা সংশোধন করে প্রায় ১০২ কোটি টাকা করা হয়। আটতলা বিশিষ্ট ‘কেআইবি কমপ্লেক্স’-এ পাশাপাশি দু’টি ভবন রয়েছে, যা সংযোগ ব্রিজের মাধ্যমে সংযুক্ত। বহুমুখী ব্যবহারের লক্ষ্যে দক্ষিণ ব্লকে রয়েছে ১০৫০ আসন বিশিষ্ট অডিটোরিয়াম, ৫০০ আসনের কনভেনশন হল, সেমিনার হল/ট্র্রেনিং কক্ষ এবং উত্তর ব্লকে রয়েছে ডরমেটরি, প্রফেশনাল অফিস, লাইব্রেরি, কেআইবি অফিস, টেকনোলজি গ্যালারি, জিমনেশিয়াম, সুইমিং পুল, ডে কেয়ার সেন্টারসহ নানা কিছু। এ ছাড়া ভবনের নিচে রয়েছে ২টি বেজমেন্টে ২০০র অধিক গাড়ি পার্কিয়ের ব্যবস্থা।
ভোট ছাড়া ১৫ বছর : ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর ৯ম জাতীয় নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। এরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করলেও তা ছিল সাজানো, বিতর্কিত। জাতীয় নির্বাচনের মতোই কৃষিবিদদের এই শীর্ষ সংগঠনেও ২০০৯ সালের পর আর ভোট হয়নি। বিনাভোটে বিগত প্রায় ১৫ বছর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে বঙ্গবন্ধু কৃষিবিদ পরিষদ। ২০০৯ সালের এই নির্বাচনে সভাপতি হন কৃষিবিদ ওয়াসিউজ্জামান আকন্দ। মহাসচিব হন আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। বিএনপিপন্থী কৃষিবিদরা নির্বাচনে অংশ নিলেও সদ্য ক্ষমতায় আসা বঙ্গবন্ধু কৃষিবিদ পরিষদ জয় পেয়ে কেআইবির দখলে আসে। এরপর ভোটের ঘোষণা দিয়ে তফসিল দেয়া হলেও আওয়ামী পন্থীদের মধ্য থেকেই কেআইবির কমিটি গঠিত হয়। সর্বশেষ ২০১৬ সালের নভেম্বরে তফসিল দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় সভাপতি হন কৃষিবিদ এ এম এম সালেহ, মহাসচিব হন মো: খায়রুল আলম প্রিন্স। এরপর তফসিল হলেও আওয়ামীপন্থী কৃষিবিদদের মধ্যে চরম দ্বন্দ্বে নির্বাচন আটকে যায়। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম গ্রুপের এই দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাতে রূপ নিয়ে তা মামলা পর্যন্ত গড়ায়। ফলে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী দুঃশাসনের পতনের আগ পর্যন্ত আর নির্বাচন হয়নি। এমনকি একাধিকবার প্রশাসক নিয়োগ দেয়ার উদ্যোগ নিলেও তা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সাল থেকে হাসিনা সরকার পতনের আগ পর্যন্ত কেআইবির একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের। তিনি শুরুতে সংগঠনের মহাসচিব এবং পরে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তার অনুসারীদের দিয়েই পরিচালিত হয় কেআইবি। বঙ্গবন্ধু কৃষিবিদ পরিষদের পাশাপাশি কৃষক লীগের নেতাদেরও আস্তানা হয়ে ওঠে কেআইবি। কৃষক লীগ সভাপতি সমির চন্দ্র চন্দ, কেআইবির মহাসচিব খায়রুল আলম প্রিন্স, মিজানুর রহমান, আমিনুল ইসলাম, তাসদিকুর রহমান সনেট, মোফাজ্জল হোসেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী মশিউর রহমান হুমায়নসহ তাদের অনুসারীরা কেআইবিকে পুঁজি করে খামারবাড়িসহ ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ভুক্ত বিভিন্ন দফতর ও সংস্থায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।
নাম না প্রকাশের শর্তে কয়েকজন কৃষিবিদ সরকারি কর্মকর্তা বলেন, খামারবাড়ি তথা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর এবং প্রাণিসম্পদ অধিদফতরে নিয়োগ, বদলি থেকে শুরু করে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং টেন্ডার-সব কিছুরই নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হতো এই কেআইবি থেকে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার কর্মকর্তাদের সাথে মাস্তানি করতেন। কথা না শুনলে শারীরিক লাঞ্ছনার ঘটনাও আছে। পিডিদের কেআইবিতে ডেকে নিয়ে শাসাতেন কোনো কোনো নেতা। এক কথায় কৃষি খাতের কোটি কোটি টাকা যে লুটপাট হয়েছে, তার নিয়ন্ত্রণ হতো এই খামারবাড়ি থেকে।
সূত্রে জানা যায়, কৃষিবিদদের শীর্ষ এই সংগঠনে নির্বাহী কমিটির পাশাপাশি পরিচালনার জন্য একটি সেক্রেটারিয়েটও রয়েছে। যার প্রধান একজন সিইও। ৫০ জন অফিস স্টাফ এবং আরো ২৫ জন আউট সোসিংয়ে কাজ করছেন। হলরুম ভাড়া ছাড়াও ডরমিটরি, জিমনেশিয়াম, সুইমিং পুল এবং সদস্যদের চাঁদা থেকে আয় হয়। মাসে প্রায় ৬০-৬৫ লাখ টাকা আয় হয় এসব খাত থেকে। কেআইবির হলরুম বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভাড়া আয়ের প্রধান উৎস। এসব অনুষ্ঠানের খাবার সরবরাহ ও সাজসজ্জার জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির নিয়ম থাকলেও ‘ইকবাল ক্যাটারিং’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী অনুষ্ঠানে অতিথি প্রতি ১০০ টাকা কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনকে দিতে হয় ইকবাল ক্যাটারিংকে। কিন্তু এক হাজার অতিথি উপস্থিত থাকলে তা অর্ধেকেরও কম দেখিয়ে তা ভাগবাটোয়ারা করে নেয়া হয়।
অনিয়ম থেমে থাকেনি : গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর কেআইবির নিয়ন্ত্রণ নেন বিএনপিপন্থী কৃষিবিদদের সংগঠন এগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এ্যাব)। সংগঠনের আহ্বায়ক রাশিদুল হাসান হারুন এবং বিএনপির গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক কৃষিবিদ শামীমুর রহমান শামীমসহ আরো একাধিক গ্রুপ ও অনুসারীদের মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব সংঘর্ষে রূপ নেয়। অভিযোগ ওঠে, আগের মতোই কেআইবি থেকে খামারবাড়িসহ কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে গ্রুপিং শুরু হয়। বিএনপিপন্থী কৃষিবিদ নেতারাও ঠিক একই পথে হাঁটেন বলে অভিযোগ ওঠে। হলরুম ভাড়া ও খাবারের টাকার ভাগবাটোয়ারার দ্বন্দ্ব নিয়ে গত ১৭ জানুয়ারি দুই নেতার অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০ জানুয়ারি লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) মো: আব্দুর রব খানকে কেআইবির প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে আদেশ জারি করে সমাজসেবা অধিদফতর। ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন শেষে নতুন কার্যনির্বাহী কমিটির হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন বলে আদেশে বলা হয়।
জানা যায়, অতীতে কেআইবিতে যে অনিয়ম দুর্নীতি হয়েছে তা তদন্তের উদ্যোগ নিচ্ছেন প্রশাসক। এ বিষয়ে কেআইবির প্রশাসক মো: আব্দুর রব খান জানিয়েছেন, ২০১৭ সাল থেকে কেআইবির আয় ব্যয়ের অডিট করা হবে। আগামী সপ্তাহেই ভালো একটি ফার্ম নিয়োগ করা হবে। তিনি জানান, প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে কেআইবির নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে।





