সরাসরি বর্তমান সরকারের অধীনে আগামী দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে চায় না দেশের নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল। নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলের বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে চায়। আবার কেউ কেউ চায় একটি নির্বাচনকালীন সরকার। এছাড়া অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর বেশির ভাগের দাবি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার।
উল্লেখ্য, দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে বরাবর পরস্পর বিরোধী অভিমত প্রকাশ করে আসছে। বিএনপি দীর্ঘসময় ধরে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কথা বলে আসছে। আর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে বদ্ধপরিকর। গতকাল শুক্রবার দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে কথা বলে তাদের এসব অভিমত জানা যায়।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা দলগতভাবে জাতীয় সরকারের দাবি করেছিলাম। জাতীয় স্বার্থে ‘গণতন্ত্র মঞ্চের’ সাথে জোটগতভাবে আমরা একটি নির্বাচনকালীন অন্তবর্তী সরকারের দাবি জানাচ্ছি। কারণ দলীয় সরকারের অধীনে কখনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।
লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. অলি আহমদ (বীর বিক্রম) বলেন, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীন ছাড়া কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না। তাই নির্বাচনকালীন সময় অবশ্যই নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমেদ আব্দুল কাদের নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা ইসিকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছি নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ সরকার থাকতে হবে। কোনো দলীয় সরকারের অধীনে আমরা নির্বাচন চাই না।
বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব:) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম (বীর প্রতীক) বলেন, একটি নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকারই কেবল পারে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে। তাই মানুষের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ সরকারের বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না। তাই একটি নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমরা চাচ্ছি। যারা একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন উপহার দিবে।
গণফ্রন্টের সভাপতি মো: জাকির হোসেন বলেন, আমি নির্বাচনকালীন একটি রাজনৈতিক সরকার চাচ্ছি। ১৯৭২ সাল থেকে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো থেকে প্রতিনিধি নিয়ে একটি নির্বাচনকালীন সরকারের কথা বলে আসছি। সেখানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি উভয় থাকবে। তাহলেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব।
জাতীয় পার্টি (জেপি) সাধারণ সম্পাদক শেখ শহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা ১৪ দলের শরিক দল। আমাদের জোটে এ বিষয়ে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি। আমরা জোটগতভাবে সিদ্ধান্ত নিবো।
বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল) মহাসচিব শেখ জুলফিকর বুলবুল চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা এই সরকারে অধীনে কোনো নির্বাচন চাই না। আমাদের দাবি একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এই সরকারের সব এমপিকে পদত্যাগ করে সংসদ ভেঙে দিতে হবে। তারপর একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে হবে।
বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান আল্লামা এম এ মতিন বলেন, সংবিধানে স্বাধীন নির্বাচনের কথা বলা হলেও এটা এখন আই ওয়াশ। তাদের হাতে স্বাধীনভাবে কাজ করার কোনো ক্ষমতা নেই। আমরা একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন চাই। সে জন্য আমরা আমাদের দাবি জানিয়ে আসছি।
বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মহাসচিব কাজী আবুল খায়ের বলেন, আমরা নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণে তাদের ডাকা সংলাপে গিয়েছিলাম। সেখানে আমরা স্পষ্টভাবে বলেছি, দলীয় সরকারে অধীনে কোনো দিন সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। তাই আমরা প্রস্তাব দিয়েছিলাম, স্বাধীনতার পর যেসব রাজনৈতিক দল অন্তত দুইবার সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছে তাদের মধ্য থেকে একজন করে সদস্য নিয়ে অন্তত ৬০ বা ৯০ দিনের জন্য একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হোক।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (বাংলাদেশ ন্যাপ) চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি বলেন, বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থায় দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না। তবে আমরা নির্বাচন কমিশনকে ইভিএম বাদ দেয়াসহ কিছু পরামর্শ দিয়েছি। সেসব পরামর্শ যদি ইসি বাস্তবায়ন করতে পারে তবে নির্বাচনকালীন কোনো সরকার হলো সেটা সমস্যা না।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সহসভাপতি মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক বলেন, আমরা সবসময় একটি নিরপেক্ষ সরকার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন চাই। সেটা আমরা লিখিতভাবে আমাদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে জানিয়েছি।
ন্যাশনাল পিপলস্ পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান শেখ ছালাউদ্দিন ছালু বলেন, গাইবান্ধায় যে উদাহরণ দেখিয়েছে সেটা যদি দেখাতে পারে তবে সংবিধান অনুযায়ী এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে আপত্তি নেই। তবে ৩০০ আসনে সেটা পারবে কিনা দেখার বিষয়।
বাংলাদেশের সাম্যবাদী দলের (এম.এল) সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট। সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের অধীনে আমরা নির্বাচন চাই।
ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান সৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী বলেন, আমরা স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের জন্য অনেক আগে থেকে দাবি জানিয়ে আসছি। দলীয় সরকারের অধীনে সেটা সম্ভব না। তবে আমরা কোনো অনির্বাচিত সরকারের হাতে দেশ ছেড়ে দেয়ার পক্ষে না।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সভাপতি অ্যাডভোকেট এনামুল হক বলেন, সরকার যেই থাকুক নির্বাচনকে প্রভাবমুক্ত রাখতে ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনে যে আন্দোলন প্রয়োজন তাতে আমরা একমত।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, আমরা কোনো অসাংবিধানিক সরকার চাই না। সংবিধান অনিুযায়ী নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা করবে।