দেশ ও জনগণের কল্যাণে ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী যে অবদান রেখে গেছেন তাতে মানুষের মনে অমর হয়ে থাকবেন বলে মন্তব্য করেছেন সমাজবিদ, রাজনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদরা। গতকাল বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তারা এসব কথা বলেন।
এ সময় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জনস্বাস্থ্য চিন্তাবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন সর্বস্তরের মানুষ। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের কয়েকজন মন্ত্রী, শতাধিক রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয় ফুলেল শ্রদ্ধা। ব্যক্তিগত পর্যায়েও অনেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এ দিন সকাল ১০টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত তার লাশ সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য শহীদ মিনারে রাখা হয়। শহীদ মিনারেই তাকে দেয়া হয় রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে নীল কাগজের শোকবইয়ে মির্জা ফখরুল লেখেন, ‘ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আমৃত্যু দেশ, জাতি এবং মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে তার অবদান অসাধারণ।’


দেশের গণস্বাস্থ্য, গণতন্ত্র নিয়ে আজীবন সংগ্রামী ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে ‘একজন সাচ্চা দেশপ্রেমিক, সৎ, সাহসী, স্পষ্টবাদী, গণতন্ত্রকামী অসাধারণ... আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন’ উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল লিখেন, ‘তার চলে যাওয়ায় জাতির যে শূন্যতা হলো তা পূরণ হওয়ার নয়।’ তিনি আরো লিখেছেন, ‘দলের পক্ষ থেকে, গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী দেশনেত্রী খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে তাকে জানাই অপরিসীম শ্রদ্ধা।’ ‘এই মহান মানুষটি’ সম্বোধন করে তার রূহের মাগফিরাত কামনা করেন মির্জা ফখরুল।
শোকবইয়ে নিজের অভিব্যক্তি লেখার আগে দলের সিনিয়র কয়েকজন নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মরদেহে শ্রদ্ধা জানান তিনি।
এ সময় মহাসচিবের সাথে আরো শ্রদ্ধা জানান, বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান মেজর অব হাফিজ উদ্দিন আহমেদ (বীর বিক্রম), অধ্যাপক ডা: এ জেড এম জাহিদ হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ডাক্তার আব্দুল কুদ্দুস, ইশতিয়াক আজিজ উলফাৎ, সাদেক খান, বিএনপি নেতা শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, খায়রুল কবির খোকন, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, ইশরাক হোসেন, কৃষিবিদ শামিমুর রহমান শামিম প্রমুখ।


শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে গণমাধ্যমকে রাশেদ খান মেনন বলেন, জাফরুল্লাহ ভাই আমার ছাত্রজীবনের সহযোদ্ধা থেকে মুক্তিযুদ্ধের সহযোদ্ধা ছিলেন। এই দীর্ঘ সময় মানুষের শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে আমাদের যে লড়াই সেই লড়াইয়ে তিনি পাশে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকার অর্থেই জনযোদ্ধাই ছিলেন তিনি। তিনি শুধু মুক্তিযুদ্ধ শেষ করেননি।
এরপরও তিনি মুক্তিযুদ্ধের লড়াই চালিয়ে গেছেন। শুধু দেশের মধ্যে নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তার লড়াই ছিল অবিচল। আমাদের দেশের ওষুধ নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তার প্রচেষ্টাতেই আমরা এটিতে লাভবান হচ্ছি। তিনি রাজনীতি করেননি ঠিকই, কিন্তু রাজনীতিতে বিবেকের কণ্ঠস্বর হিসেবে তিনি থেকেছেন। পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরীর এই বিদায় আমাদের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে এক বিরাট ক্ষতির কারণ। তিনি শুধু বীর মুক্তিযোদ্ধাই ছিলেন না, ডাক্তারও ছিলেন না, তিনি আমাদের ইতিবাচক পরিবর্তনে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন। বাঙালি জাতিকে পৃথিবীতে বাঙালি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা জ্ঞান-বিজ্ঞানে জাতিকে ভূষিত করা এবং পৃথিবীর সব মহান কাজে তিনি অগ্রসৈনিক ছিলেন। তার প্রতি আমি আমার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা জানাই। ষাট বছরেরও বেশি সময় ধরে আমি উনাকে চিনি। তার পরিবারে আমি গিয়েছি। তার পিতামাতার সাথে আমি খেয়েছি। ভাইবোনের সাথে কথা বলেছি। এ এক অসাধারণ পরিবার। অসাধারণ এর মধ্যে অসাধারণ জাফরুল্লাহ চৌধুরী।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো: আক্তারুজ্জামান বলেন, ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী খ্যাতিমান মানুষ ছিলেন। তার অনেক প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি নিজেও অনেক সম্মানিত বোধ করতেন। অত্যন্ত বিনম্র চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন। অনেক কারণেই এই মানুষটি মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে থাকবেন। একটি হলেন তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা। মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অসাধারণ অবদান রেখেছেন। খুব সরল প্রকৃতির, খুব সাদামাটা জীবন তিনি যাপন করতেন। এটা নিঃসন্দেহে অনুকরণীয়। গণমানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে তিনি যে ভূমিকা রেখেছেন সেটি অতুলনীয়। নানা মাত্রায় নানা বিবেচনায় জাফরুল্লাহ চৌধুরী মানুষের মনে অমর হয়ে থাকবেন। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে তিনি সেই সম্মান পেয়েছেন। তিনি যে মহানুভবতা এবং মানবিক কাজ করেছেন সেটি অনুকরণীয়।


আ স ম আব্দুর রব বলেন, ডা: জাফরুল্লাহর প্রতি আমাদের ঋণ অপরিসীম। তার ঋণ কোনো দিন পরিশোধ হবে না। তার প্রতি জাতির কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা উচিত। বাংলাদেশে আরেকটা জাফরুল্লাহ তৈরি হবে না। আমরা যারা গরিব-মেহনতি মানুষের পক্ষে রাজনীতি করি এর বাইরেও সর্বস্তরের মানুষ তাকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী একজন অসাধারণ মানুষ ছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন। তার আগেও তিনি মুক্তিযুদ্ধের যেই চেতনা, সমাজ পরিবর্তন ও রাষ্ট্র সংস্কার সেই চেতনা তিনি ধারণ করতেন। ১৬ ডিসেম্বরের পরে তিনি উপলব্ধি করলেন, মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়নি, তার আরো কাজ আছে। বিশেষ করে দু’টি ক্ষেত্রে ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অসামান্য অবদান রয়েছে। তার একটি হচ্ছে স্বাস্থ্য, অপরটি শিক্ষা। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে তিনি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র চালু করেছেন, শিক্ষা ক্ষেত্রে গণবিশ্ববিদ্যালয় চালু করেছেন।
তিনি নারীদের উন্নয়নের জন্যও কাজ করেছেন। তার প্রতিষ্ঠানে কর্মচারী-কর্মকর্তাদের মধ্যে শতকরা চল্লিশ ভাগ নারী। তিনি সামাজিক মালিকানায় বিশ্বাস করতেন। আর এটি আমাদের দেশে অনন্য দৃষ্টান্ত। ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী আমাদের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছেন। আমাদের মুক্তিয্দ্ধু যত অগ্রসর হবে, ততই ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরীর স্মৃতি উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, তিনি আমাদের চেয়ে অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন, অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু তারপরও যেকোনো সরকারের আমলে তিনি যেকোনো অন্যায় এবং অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে সবসময় সোচ্চার ছিলেন। উনার অবস্থান দেখে, আমাদের ইতস্তত লাগত, লজ্জা লাগত এই ভেবে যে উনি অসুস্থ অবস্থায় এত প্রতিকূল অবস্থায় এরকম প্রতিবাদী থাকতে পারেন, তাহলে আমরা কেন সত্য-ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে পারব না। জাফরুল্লাহ চৌধুরী দল মত নির্বিশেষে সবার ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। এটা দেখে আমার খুব ভালো লাগছে। কিন্তু উনি যখন জীবিত ছিলেন উনার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অনেকে অনেক কথা বলেছে। কিন্তু আজ উনি মারা যাওয়ার পরে সবাই শোক জানাচ্ছে। ভালোবাসা জানাচ্ছে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যারা নিজের স্বার্থের কথা চিন্তা না করে মানুষের জন্য কথা বলে, কাজ করে তারা সবার ভালোবাসা পায়। এই ভালোবাসাটা আমাদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।


ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নূর বলেন, জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জীবনী অতুলনীয় এবং অনুকরণীয়। এ রকম একজন মহান ব্যক্তির জীবনী পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানাই। তার জীবন মানুষকে অনুপ্রেরণা দেবে। এরকম একজন মানুষ কিভাবে আজীবন সমাজের জন্য কাজ করে গেছেন, তার জীবনী পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার মধ্য দিয়ে আমি মনে করি তার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের সাবেক শিক্ষক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, জাফরুল্লাহ চৌধুরীর শারীরিক মৃত্যু হলেও তিনি তার কর্মের মাধ্যমে অমর হয়ে থাকবেন। স্বাধীনতার আগে ও পরে দেশের সাধারণ মানুষের জন্য তার মহান কীর্তিগুলো চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফরহাদ মজহার বলেন, মুক্তিযুদ্ধ করার মানেই এ দেশের গরিব এবং লাঞ্ছিত মানুষের জীবন ও জীবিকা নিশ্চিত করা। মুক্তিযুদ্ধ মানেই সারা পৃথিবীতে আমাদের তরুণদের সাহসের সাথে নেতৃত্ব দেয়ার সক্ষমতা তৈরি করা। গণস্বাস্থ্যের অভিজ্ঞতা ডা: জাফরুল্লাহকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বিকল্প কোনো কিছু হতে পারে না। তাকে হারিয়ে জাতির যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তা কখনোই পূরণ হওয়ার না।
ভাসানী অনুসারী পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু বলেন, ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী কখনো নিজের এবং পরিবারের চিন্তা করেননি। তার পুরোটা জীবন জনগণের জন্য চিন্তা করেছেন, দেশের জন্য চিন্তা করেছেন। এ রকম মানুষ বিরল। তার মৃত্যুতে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল।