আগস্ট বিপ্লবের পর থেকে গা ঢাকা দিয়ে আছে গত দেড় দশক ধরে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণকারীরা। অনেকে একেবারেই লাপাত্তা। আবার অনেককে এলাকায় মাঝে মধ্যে দেখা যাচ্ছে। এরাই দীর্ঘ দেড় দশক ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করেছে। তাদের কাছে রয়েছে অস্ত্রের বিশাল মজুদ। কারো কারো বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার প্রমাণ রয়েছে। এসব সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার ও তাদের কাছে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার সম্ভব না হলে অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা অব্যাহত থাকবে বলে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার গডফাদার বলে খ্যাত সলিমুল্লাহ সলু গ্রেফতার হলেও তার বিশাল বাহিনীর সদস্যরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। স্থানীয় সূত্র জানায়, এই বাহিনীর হাতে রয়েছে অগণিত অস্ত্র। সলুর পরিবারে অন্তত ২০টি অস্ত্র রয়েছে লাইসেন্সকৃত।

মোহাম্মদপুরের আরেক গডফাদার জহুরী মহল্লার সামিউল আলিম চৌধুরী। মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক হওয়ার পর ওই এলাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করত এই সামিউল। তার ভাই আরিফ, মফিদুল এবং স্থানীয় সন্ত্রাসী পাট্টু, সজল, মাদক ব্যবসায়ী পাপিয়ার স্বামী পাচু সামিউলের বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করত। এলাকার মাদক ব্যবসা, অস্ত্র ব্যবসা, চাঁদাবাজি এদেরই নিয়ন্ত্রণে ছিল। সামিউল আলিমের ছেলে পলু এলাকার কিশোর গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রক ছিল। ছাত্র আন্দোলনে এই পলু তার কিশোর গ্যাংকে নিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর প্রকাশ্যে হামলা চালায়।
ওই এলাকার আরেক গডফাদার সাবেক কাউন্সিলর রাজিব। এই রাজিবেরও রয়েছে বিশাল বাহিনী। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ওই এলাকায় সাধারণ ছাত্র-জনতাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য তাদের ওপর প্রকাশ্যে এই রাজিব বাহিনী গুলি চালিয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। এই বাহিনীর হাতে বিপুল পরিমাণ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে বলে জানা গেছে।

সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজের দুই ভাই তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী হারিস ও জোসেফ বিদেশে অবস্থান করলেও ঢাকায় তাদের বিশাল বাহিনী রয়েছে। এই বাহিনীর হাতে বিপুল আগ্নেয়াস্ত্র মজুদ আছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে এই হারিস-জোসেফ বাহিনী রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছে।
কামরাঙ্গীরচরের কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেনের বিশাল বাহিনীর হাতে রয়েছে বিপুল আগ্নেয়াস্ত্র। সিরাজ তালুকদার, জাবেদুল ইসলাম জাবেদ, লালচান সুমন, তাইজুদ্দিন আহম্মেদ রনি, শাহাবুদ্দিন ওরফে নাডা শাহাবুদ্দিন, জামাল দেওয়ান, শুক্কুর, লবন হচ্ছে এই মোহাম্মদ হোসেনের ক্যাডার। যারা প্রত্যেকেই অস্ত্রধারী। এ ছাড়া ওই এলাকার আরেক কাউন্সিলর সাইদুল মাতবরের রয়েছে বিশাল বাহিনী। এদের হাতেও রয়েছে বিশাল অস্ত্রের ভাণ্ডার। এসব অস্ত্র প্রকাশ্যেই ব্যবহার হয়েছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমাতে ঢাকায় এসেছিল গোপীবাগের নাসির। ইতালি প্রবাসী এই নাসিরকে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ঢাকায় নিয়ে আসেন আন্দোলন দমানোর জন্য। মাইকেল, গ্যাদা সেলিম, রশিদ, জন, ভাগ্নে রিপন, জহির, রানা, রমজান হলো নাসির বাহিনীর অন্যতম সদস্য। এই বাহিনীর হাতে বিপুল আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে বলে জানা গেছে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পলায়নের পর এই নাসির আবারো দেশ ছাড়ার চেষ্টা করে; কিন্তু তা সফল হয়নি বলে একটি সূত্র জানায়। সে এখনো ঢাকাতেই অবস্থান করছে।

যাত্রাবাড়ী থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রিপন হোসেন ফাহিমের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বিপুলসংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্র। ক্ষমতায় থাকাকালীন কথায় কথায় মানুষকে অস্ত্র উঁচিয়ে হুমকি দিতে দেখা যায় ছাত্রলীগের এই নেতাকে। এমনকি, দলীয় নেতাকর্মীরাও এই সন্ত্রাসীর হাত থেকে রেহাই পায়নি। এই সন্ত্রাসীর একসময়ের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ওসি মফিজুল আলম।
ইস্কাটনের কামরুল ইসলাম হান্নান ওরফে ছোট হান্নানের রয়েছে বিশাল বাহিনী। স্থানীয় সূত্র জানায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে এই বাহিনীর সদস্যরা প্রকাশ্যেই আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালিয়েছে। ৫ আগস্টের পর এরা সবাই গা ঢাকা দিয়েছে। তবে রাজধানীতেই তারা অবস্থান করছে বলে জানা গেছে।
বাড্ডার চঞ্চল, মালিবাগের জিসান, পুরান ঢাকার ওমর ফারুক কচি, কাওরান বাজারের প্রকাশ-বিকাশ, মোহাম্মদপুরের নবী হোসেন, মিরপুরের শাহাদাত, মতিঝিলের জাফর আহমেদ মানিকসহ বেশ কিছু সন্ত্রাসী এখন বিদেশে অবস্থান করলেও তাদের সহযোগীরা ঢাকায় সক্রিয়। গত দেড় দশক এদের নিয়ন্ত্রণেই ছিল ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড। ৫ আগস্টের পর ঢাকায় অবস্থানকারী ওই সব সন্ত্রাসীর অনেকে গা ঢাকা দিলেও এবারের যৌথ অভিযানে তারা গ্রেফতার হবে বলে অনেকেই আশাবাদী। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকে বিদেশে অবস্থান করলেও ঢাকায় তাদের সহযোগীরা গ্রেফতার হলেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং মাদক ব্যবসা অনেকাংশে কমে যাবে।

যৌথবাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান শুরু
পূর্বঘোষণা অনুযায়ী অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও মাদকের গডফাদারসহ দাগি অপরাধীদের গ্রেফতারে গতকাল মধ্যরাত থেকেই শুরু হয়েছে যৌথবাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান। তবে রাতে কোথায় কোথায় অভিযান চালানো হয়েছে তা জানা যায়নি। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার সকালে সচিবালয়ে নিজ দফতরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে বৈঠকের পর অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মো: জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী যৌথ অভিযান শুরু হওয়ার তথ্য সাংবাদিকদের জানান।
এসময় তিনি বলেন, একইসাথে মাদক নিয়ন্ত্রণে মাদক চোরাচালানের সাথে সম্পৃক্ত গডফাদারদেরও ধরা হবে।
উপদেষ্টা বলেন, আজকের সভাটি ছিল আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম সভা। এ সভায় প্রধানত দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে কথা হয়েছে। কিভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করা যায় সেসব নিয়ে কথা হয়েছে। এ ব্যাপারে আমরা কিছু কিছু পদক্ষেপ নেব।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মঙ্গলবার রাত ১২টা পর্যন্ত ছিল সব বৈধ এবং অবৈধ অস্ত্র জমা দেয়ার শেষ সময়। রাত ১২টার পর থেকে আমাদের যৌথবাহিনীর অপারেশন শুরু হবে হাতিয়ারগুলো উদ্ধারের জন্য। আমরা যেন অবৈধ অস্ত্রগুলো সংগ্রহ করতে পারি। আমি এ ব্যাপারে আপনাদের সহযোগিতা চাই।

এদিকে গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা ফয়সল হাসানের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক সর্বসাধারণের জ্ঞাতার্থে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে।
এতে জানানো হয়, ‘কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং দফতরে জানাতে হবে, কোনোভাবেই কোনো প্রতিষ্ঠান ঘেরাও বা কোনো রকম সহিংস আচরণ করা যাবে না। সরকারের পক্ষ থেকে তল্লাশি ও মামলা গ্রহণে প্রচলিত আইন যথাযথভাবে মেনে চলা হবে এবং হয়রানিমূলক পদক্ষেপ দূর করার ব্যবস্থা নেয়া হবে।