আগামীতে রাজধানী ঢাকাকে একটি স্মার্ট সিটি হিসেবে উপহার দিতে আন্তরিকভাবে কাজ করার কথা জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী আতিকুল ইসলাম। নয়া দিগন্তকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি স্মার্ট সিটির একটি রূপরেখাও জানিয়েছেন। বিশেষ করে নগরীর যানজট, বায়ুদূষণ, হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ের ক্ষেত্রে আতিকুল ইসলাম আনতে চান অভিনব পদ্ধতি। যদিও তিনি বর্তমানে ডিএনসিসির নির্বাচিত মেয়র কিন্তু মেয়াদকাল পেয়েছেন মাত্র ৯ মাস। তার পরও এই সংক্ষিপ্ত সময়ের লব্ধ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি গড়ে তুলতে চান আগামী দিনের একটি স্মার্ট সিটি।

নয়া দিগন্ত : নগরীর প্রধান সমস্যা এখন যানজট। এই যানজট নিরসনে আপনার পরিকল্পনা কী?
আতিকুল ইসলাম : রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসেন আমাদের বেশ কিছু কাজ চলমান আছে। প্রধান যে কাজটি এখন করা হচ্ছে তা হলো রাজধানীতে ১১টি ইউলুপ নির্মাণের প্রকল্প। দুু’টি ইউলুপ ইতোমধ্যে উত্তরায় চালু হয়েছে। তৃতীয়টি এয়ারপোর্টের কাছে শিগগিরই শুরু হচ্ছে। এ ছাড়া রাজধানীতে একটি সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা গড়ে তোলার চিন্তা করা হচ্ছে। কিছু কাজ এগিয়েছেও। দুই সিটি করপোরেশন এবং পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠন, পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ এবং বিআরটিএ এই কাজে সহায়তা করছে।

নয়া দিগন্ত : রাজধানীতে এলইডি লাইট স্থাপনের কাজটি কতদূর এগিয়েছে?
আতিকুল ইসলাম : রাজধানীকে আলোকিত করতে অনেক আগেই পুরো শহরে এলইডি লাইট স্থাপনের একটি প্রস্তাবনা ছিল। কিন্তু কাজ শুরুর আগেই ওই প্রকল্পের ফাইলটি গায়েব হয়ে যায়। তবে আশার কথা হচ্ছে, আমরা সেই ফাইলটি উদ্ধার করতে পেরেছি। আগামী তিন মাসের মধ্যে পুরো রাজধানীকে আলোকিত করতে সেই এলইডি লাইট স্থাপন প্রকল্পের কাজও ইনশা আল্লাহ শুরু করা হবে।

নয়া দিগন্ত : রাজধানী ঢাকাকে নিয়ে একটি কথা প্রায়ই শোনা যায়, ‘স্মার্ট সিটি’। এটি আসলে কিভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে?
আতিকুল ইসলাম : সত্যি কথা বলতে কী, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট সিটি এখন শুধু একটি স্বপ্ন নয়, এটি এখন বাস্তবতা ও সময়েরও দাবি। আপনারা শুনলে খুশি হবেন, এ বিষয়ে নতুন অ্যাপস অলরেডি প্রস্তুত হয়ে গেছে। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই অ্যাপসটির ধারণা নিয়ে গিয়েছিলাম। তবে এই অ্যাপসটি চালু করতে হলে নগরীর বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বা নলেজ শেয়ারিং করতে হবে। সেই কাজও এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। আশা করি এটাও আমরা শুরু করতে পারব। আশার কথা হলো স্মার্ট সিটির প্রথম যে ধাপ সেই ৩৩৩ নাগরিক সেবার কলসেন্টার চালু হয়েছে। এটি আমাদের জন্য যদিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল কিন্তু আমরা সেই প্রথম ধাপটিও অতিক্রম করতে পেরেছি। এই সেবার মাধ্যমে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী শতকরা ৭৩ ভাগ গ্রাহক কল করে তারা সেবা পাচ্ছেন। তবে আমরা চাইছি বাকি কতভাগ গ্রাহক সেবা চেয়েও পাচ্ছেন না সেটিও কিন্তু এখান থেকেই জানা যাবে।

নয়া দিগন্ত : বয়স্ক নাগরিকদের জন্য কী ধরনের সেবা চালু করতে চান?
আতিকুল ইসলাম : দেখুন, আমাদের কিন্তু অনেকেরই বয়স হয়ে গেছে। অনেক বৃদ্ধ মা-বাবা আছেন যারা বাড়িতে বা ঘরে একা থাকেন। তার সন্তানকে প্রয়োজনের তাগিদেই দিনের বেলায় অফিসে বা বাইরে থাকতে হয়। আমরা এ ধরনের চলাচলে অক্ষম বা বৃদ্ধ মা-বাবাদের জন্য একটি নতুন সেবা চালু করার চিন্তা করছি। এখানে নতুন একটি মোবাইল সিমের মতো ডিভাইস ওই বৃদ্ধ বাবা-মা কিংবা চলাচলে অক্ষম ভাইবোনদের হাতে কোনো কিছুর মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করা হবে, যাতে তিনি বাথরুমে কিংবা মেঝেতে পড়ে গেলে বা অন্য কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাইরে থাকা সন্তানের বা স্বজনরা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মেসেজ চলে যাবে। এতে ঘরে থাকা বৃদ্ধ বাবা-মা অনেকটা নিরাপদে থাকতে পারবেন। এটাও স্মার্ট সিটির একটি কনসেপ্ট।
এ ছাড়া স্কুলের শিশুদের জন্যও এমন একটি ডিভাইস চিপস চালু করা হবে; যাতে ওই শিশু স্কুলে প্রবেশের সাথে সাথেই মা-বাবা মেসেজ পেয়ে যাবেন। শিশুদের স্কুল ব্যাগের সাথে এই ডিভাইসটি লাগানো থাকবে। আমরা বেশ কিছু স্কুলের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনাও করেছি। তারা বেশ আগ্রহ দেখিয়েছেন। এভাবে পর্যায়ক্রমে প্রতিটি সেক্টরে আমরা ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নিচ্ছি। নাগরিকরা অভ্যস্ত হয়ে গেলে আমাদের সেই কাক্সিক্ষত স্মার্ট সিটি বাস্তবায়নও সহজ হবে যাবে।

আরেকটি বিষয় নিয়েই প্রায়ই অভিযোগ শোনা যায় সেটি হলো হোল্ডিং ট্যাক্স দিতে ভোগান্তি। একজন গ্রাহক তার হোল্টিং ট্যাক্স দিতে গেলে ১৭টি ভলিউমের মধ্যে এন্ট্রি করতে হয়। আগে এখানে অনেক দুর্নীতি হতো। আমি ব্যবস্থা নিয়েছি। এ পদ্ধতি ডিজিটালাইজেশন করা হচ্ছে। অনেক দুর্নীতিবাজকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ঘরে বসে বিকাশ কিংবা ক্রেডিট কার্ড মাধ্যমে অনলাইনেই ট্যাক্স পরিশোধ করার ব্যবস্থা হচ্ছে।
আয় বাড়াতে হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানোর নেট বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। জিআইএস ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে হোল্ডিং নির্ধারণ করা হবে। এনালগ পদ্ধতি থেকে বের হয় ডিজিটাল পদ্ধতিতে এগোতে হবে। সব সেক্টরকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হবে।

নয়া দিগন্ত : নগরবাসীকে কিভাবে আইন মানার প্রতি উদ্বুদ্ধ করবেন?
আতিকুল ইসলাম : আইন যেখানে আছে সেখানে অমান্য করা হলে ফাইনও করতে হবে। আইন ভাঙলে তাকে ফাইনের আওতায় আনতে হবে। বিত্তশালীরা অনেকেই ফাইন দিয়ে চলে যেতে চান। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বলেছেন শুধু ফাইন নিয়েই বসে থাকলে হবে না। কারা আইন ভাঙছে এবং ফাইন দিচ্ছে সেখানে টিভি ক্যামেরা নিয়ে গিয়ে তাদের ছবি দেশবাসীকে দেখাতে হবে; যাতে তারা সামাজিক মর্যাদার কথা চিন্তা করে আইন ভাঙার মানসিকতা পরিহার করেন।

নয়া দিগন্ত : মেয়র নির্বাচিত হলে আপনি কী করবেন?
আতিকুল ইসলাম : দেখুন পরিকল্পনা তো আপনাদের কাছে। আপনারা অর্থাৎ নগরবাসী কেমন ঢাকা শহর দেখতে চায় সেটিই বাস্তবায়ন করার জন্য চেষ্টা করা হবে। এখানে আপনারা কী ধরনের শহর দেখতে চান? নিশ্চয় একটি ক্লিন ঢাকা শহর, গ্রিন ঢাকা শহর। সর্বোপরি একটি সুন্দর পরিকল্পিত ঢাকা শহর দেখতে চাইবে সবাই। এটিই হলো একটি স্মার্ট ঢাকা শহর। এটিই কিন্তু আমাদের সবার জন্য চাওয়ার বিষয়।
কয়েক মাস আগে কালশী খাল উন্নয়ন হয়েছে। বৃষ্টি হলে সেখানে গাড়ি ডুবে যেত। এ ছবি টিভিতে পত্রিকায় দেখেছি। ভালো খবর হলো সেই খালের উন্নয়ন হয়েছে। এখন অনেক বৃষ্টি হলেও সেখানে পানি জমে না।

নয়া দিগন্ত : বিলবোর্ড সরাতে কী কী পদক্ষেপ নেবেন?
আতিকুল ইসলাম : বিলবোর্ড নয়, জনপ্রতিনিধিদের স্থান করে নিতে হবে জনগণের দিলে বা অন্তরে। তা হলেই রাজধানীতে আর কোনো বিলবোর্ড লাগানোর প্রয়োজন হবে না। যুগ অনেক এগিয়েছে। এখন ডিজিটাল যুগ। ডিজিটাল পদ্ধতিতে সব ধরনের প্রচার চালাতে হবে। বিলবোর্ড আর ব্যানার-ফেস্টুন লাগিয়ে শহরকে নোংরা করা যাবে না।