শান্তি ও মানবতাবাদীরা বুদ্ধের জীবনদর্শনকে গভীরভাবে অনুধাবন করেন এবং শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞাসম্প্রযুক্ত কর্মে সতত নিবেদিত হন। গৌতম বুদ্ধের মানবতাবাদী শিক্ষা ও তার জীবনদর্শন অত্যন্ত মহৎ ও তাৎপর্যপূর্ণ। উত্তম মানবজীবন গঠনের লক্ষ্যে সত্য, সুন্দর ও আলোকিত আদর্শের এক অপূর্ব শিক্ষা পাওয়া যায় বুদ্ধের বাণীতে, যা ইহজাগতিক এবং পারমার্থিক উভয় জীবনের জন্য অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি মানব জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সমাজে বসবাস সুখকর হয় তখনই যখন সবার সাথে পারস্পরিক প্রীতি ও মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বসবাস করা যায় এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ অবস্থান তৈরি করা যায়।
বৌদ্ধমতে শীল সমাধি প্রজ্ঞাময় জীবনের মধ্য দিয়েই একজন মানুষের সর্বোত্তম জীবন গড়ে ওঠে, যেখানে তিনি হন নীতিবান, বিবেকবোধসম্পন্ন এবং আত্মসচেতন। তাই আমাদের প্রত্যেককে ভাবা উচিত আমি কে? আমার করণীয় কী? ভালো মন্দ কী কাজ আমার করা উচিত বা অনুচিত এ সম্পর্কে। এ ছাড়া আমার কর্মে আমি নিজেই সন্তুষ্ট কিনা? সর্বোপরি আমার কর্মে মানবজাতি উপকৃত হচ্ছে কিনা এসব বিষয় চিন্তা করাই হলো পণ্ডিত, জ্ঞানী এবং বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমানের কাজ। এটিকে বলা হয় বৌদ্ধ ভাবনা। একজন মানুষ এসব চিন্তা করতে গেলেই তার জীবন সম্পর্কে, জীবনের করণীয় সম্পর্কে এবং নিজ কর্মের শুভাশুভ সম্পর্কে অনায়াসে ভাবতে পারেন। এতে আত্মজীবন যেমন বিশ্লেষণ করা যায়, তেমনি আপন জীবন সচেতনতাও বৃদ্ধি পায়। এ জন্যই বুদ্ধ বলেছেন-
উত্তিট্ঠ নপ্প মজ্জেয়্য, ধম্মং সুচরিতং চরে,
ধম্মচারী সুখং সেতি অস্মিং লোকে পরম্হিচ।
অর্থাৎ উদ্যমশীল হও, প্রমত্ত হয়ো না। সুন্দররূপে ধর্মাচরণ করো। অন্তর্মুখী শীল সমাধি প্রজ্ঞা সাধনা করো। ধর্মচারীগণ ইহ-পরলোকে সুখী হন। এতেই তোমার মানবজীবন সার্থক। বৌদ্ধধর্মে ধর্মের ছয়টি গুণ বর্ণনায় আরো বলা হয়েছে- ‘স্বাক্খতো ভগবতো ধম্মো সন্দিট্ঠিকো অকালিকো, এহিপস্সিকো ওপনাযিকো পচ্চত্তং বেদিতব্বো বিঞ্ঞূহীতি।’ অর্থাৎ বুদ্ধের ধর্ম সুন্দররূপে ব্যাখ্যাত, সংদৃষ্টিক, এসে দেখার যোগ্য, কালাকালহীন এবং বিজ্ঞজন কর্তৃক জ্ঞেয়। এর অর্থ হলো তুমি তোমাকে জানো, দেখো, সম্যকভাবে পর্যবেক্ষণ করো। এ ধর্ম সংদৃষ্টিক, অন্ধভাবে দেখার, বিশ্বাস করার ধর্ম নয়, প্রত্যক্ষ ফল প্রদানকারী। মহামতি বুদ্ধের এই অভূতপূর্ব জীবনদর্শন ও বাণী যুগে যুগে দার্শনিক, চিন্তাবিদ ও মনীষীদেরকে প্রভাবিত করেছে গভীরভাবে।
মানবজীবনকে সৎ, সুন্দর এবং নীতিবান করাই হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্মের প্রধান উদ্দেশ্য। এ জন্য মানুষের নৈতিক ও চারিত্রিক সাধনার বিষয়টিকে বৌদ্ধধর্ম বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে। বৌদ্ধমতে শীলময় জীবন, সমাধি এবং প্রজ্ঞাময় জীবনই মানুষকে সদ্ পথে পরিচালিত করে এবং সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারে। তাইতো বৌদ্ধশাস্ত্র বলে, যে মানুষ যত বেশি শীলাচারণসম্পন্ন, সমাধিপরায়ণ এবং প্রজ্ঞাসম্পন্ন হবেন সেই মানুষ তত বেশি জীবনে সুখী, নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ অবস্থানে বসবাস করতে পারবেন। বর্তমানে আমরা দেখি মূল্যবোধহীন অনৈতিক জীবনযাপন। আবার অধিকাংশ লোকের মূলমন্ত্র হলো অনৈতিকভাবে অর্থ উপার্জন এবং সাম্রাজ্য বিস্তার ও ‘পরের ওপর প্রভুত্ব’। কী উপায়ে এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তির ধনসম্পদ, অর্থ আত্মসাৎ করবে, কে কার ওপর কর্তৃত্ব করবে, কী কৌশলে এক জাতি অপর জাতির ওপর আধিপত্য স্থাপনে সমর্থ হবে, পরের ওপর আত্মপ্রভাব প্রকাশ করবার প্রকৃষ্ট উপায় কী- ইত্যাদিই ওদের শিক্ষার প্রধান বিষয়। তাদের মতে পরকে লাঞ্ছিত, অপমানিত বা নিহত করে আত্মশক্তি প্রকাশই প্রকৃত পৌরষ্যত্ব এবং যারা এরূপ পুরষকার প্রকাশ করতে পারেন জগতে তারাই বীর। অতীতে আলেকজান্ডার, জুলিয়াস সিজার, নেপোলিয়ন বোনাপার্ট প্রভৃতি শক্তিশালী ব্যক্তিগণই এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। বর্তমান বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রনায়ক, রাষ্ট্রপ্রধানও এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত।
এখানে বুদ্ধের উপদেশ হলো ‘আত্মদর্শন’ ও ‘আত্মজয়’। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন- ‘পরকে জয় করা অপেক্ষা আপনাকে জয় করাই শ্রেয়।’ যিনি নিজকে জয় করেছেন তাকে কেহই পরাজয় করতে পারে না। যিনি কাম, ক্রোধ-লোভ, অভিমান প্রভৃতি অভ্যন্তরীণ শত্রুনিচয়কে জয় করেছেন তিনিই প্রকৃত বীর। যুদ্ধশিবিরে হাজার হাজার সৈন্যকে জয় করার চেয়ে আত্মজয়ই সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয়। এ যেন বুদ্ধের অসাধারণ বাণী।
তাই বৌদ্ধজীবন পদ্ধতিতে এবং বৌদ্ধমানস গঠনের লক্ষ্যে প্রথমে পঞ্চশীল বা পঞ্চনীতির কথা বলা হয়েছে, যেখানে একজন ব্যক্তি তার জীবনের প্রথম থেকেই এই সদ্গুণ চর্চার মাধ্যমে তার জীবনকে আদর্শায়িত করতে পারেন। এই পঞ্চনীতিতে আমি শুধু নিজেই যে ব্যক্তি পর্যায়ে নীতিপরায়ণ হবো তা নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্যকেও নীতিবান করার জন্য অনুপ্রাণিত করব, উৎসাহিত করব। এ জন্যই আমাদের ব্যবহারিক জীবনের সব পর্যায়ে বৌদ্ধ পঞ্চনীতির শিক্ষা সার্থকভাবে অনুশীলন করা উচিত। বৌদ্ধ পঞ্চনীতিতে বলা হচ্ছে ১. কোনো ধরনের প্রাণীকে বধ কিংবা আঘাত করা উচিত নয়। ২. কোনো ধরনের চৌর্যবৃত্তি করা উচিত নয়। ৩. কোনো প্রকার মিথ্যা কামাচার কিংবা অবৈধ ব্যভিচার করা উচিত নয়। ৪. কোনো প্রকার মিথ্যা, অসত্য কথা বলা বা কর্কশ ও রূঢ় বাক্য বলা উচিত নয়। ৫. কোনো ধরনের নেশা বা মাদকদ্রব্য সেবন করা উচিত নয়। এখন নিজকে প্রশ্ন করুন এ নীতিগুলো যদি আমি এবং আমরা সবাই পালন করি তাহলে কখনো কি আমরা অন্যের ক্ষতির কারণ হতে পারি? আমরা কি কখনো জীবনে সহিংসতা, যুদ্ধ কিংবা কোনো ধরনের আঘাত বা সঙ্ঘাত করতে পারি? আমরা কি পারি অনৈতিক, অসামাজিক ও অমানবিক কাজ করতে? শীল পালনের গুরুত্বকে তাই বুদ্ধ সবিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। জীবনের সব ক্ষেত্রে এই পাঁচটি নীতি অনুশীলন করলে ‘শ্রেয় জীবন’ গঠন করা যায়। এ কাজগুলো সম্পূর্ণ অনৈতিক, গর্হিত ও অনুচিত কর্ম। এ জন্য এই গর্হিত পঞ্চকর্ম থেকে বিরত থাকার কথা বৌদ্ধনীতিতে বলা হয়েছে।
অন্য দিকে বৌদ্ধ নীতিবিজ্ঞান ও কার্য-কারণ তত্ত্বে বলা হচ্ছে ‘একটি বৈরিতা থেকে আরেকটি বৈরিতা সৃষ্টি হয়’। একটি অশুভ কর্ম বা চিন্তা থেকে আরেকটি অশুভ কর্মের জন্ম হয়। একটি সদ্ চিন্তা যেমন আরেকটি সদ্ ভাবনা তৈরি করে তেমনি। অশুভ চিন্তা কখনো শুভ চিন্তার জন্ম দিতে পারে না। এ শাশ্বত সত্যটি আমাদের অবশ্যই বোঝা উচিত।
তাই বৌদ্ধধর্মে সদজীবন গঠন ও সদজীবন পরিচালনার জন্য আটটি বিশুদ্ধ পথের কথা বলা হয়েছে যাকে বৌদ্ধ পরিভাষায় বলা হয় ‘আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ’; যেমন- সদ্ দৃষ্টি, সদ্ বাক্য, সদ্ কর্ম, সদ্ জীবিকা, সদ্ সংকল্প, সদ্ প্রচেষ্টা, সদ্ স্মৃতি এবং সদ্ সমাধি। এগুলো ব্যক্তির ব্যবহারিক ও পারিবারিক জীবনে যেমন প্রয়োজন তেমনি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর অনিবার্যতা আমরা লক্ষ করি। এর প্রত্যেকটি বিশুদ্ধ নীতি দিয়েই আমাদের জীবন যদি গঠন করা যায়, আমরা যদি সমাজে এর প্রত্যেকটিকে যথার্থরূপে ব্যবহার করতে পারি তাহলে আমরা কোনো দিন কারো অশুভ, কারো অমঙ্গল বা অকল্যাণ করতে পারি না। পারি না সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা বিশ্বের কোনো ধরনের ক্ষতি বা সঙ্ঘাত সৃষ্টি করতে।
বৌদ্ধ মতে সামাজিক অস্থিরতা, অসাম্য, বঞ্চনা, শোষণ, পীড়ন ও নিষ্ঠুরতার মূলে যেই আর্থ-সামাজিক শর্তগুলো ক্রিয়াশীল হয় তা মানুষেরই সৃষ্ট, তা দৈব সৃষ্ট বা ঈশ্বর কর্তৃক সৃষ্ট নয়। মানুষ সততার সাথে চেষ্টা করলে তা দূর করতে পারে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান তৈরি করতে পারে। হিংসার ব্যবহারে তিক্ততার সৃষ্টি হয় এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের তন্ত্রে তন্ত্রে তা অনুপ্রবিষ্ট হয়। পরবর্তী সময়ে তা সঙ্ঘাত ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ-বিগ্রহের জন্ম দেয়। তাই বুদ্ধ ও বৌদ্ধধর্ম ব্যষ্টিগত ও সমষ্টিগত জীবনে প্রতি মুহূর্তে অহিংসপরায়ণতার কথা বলেছেন।
আমরা জানি ‘আত্মশক্তি’ জীবনের এক পরম সম্পদ। মানবজীবনে এই শক্তি উদ্বোধনের জন্য প্রতিটি মানুষকে বৌদ্ধধর্ম শ্রেষ্ঠত্বের আসন দিয়েছে, সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করেছে। মানুষ হিসেবে আমি যেমন শ্রেষ্ঠ, আত্মশক্তিতেও আমি শ্রেষ্ঠ। সুতরাং আমি যদি উত্তম হই, সর্বশ্রেষ্ঠ হই, তাহলে আমার প্রতিটি কর্ম এবং চিন্তাও হবে উত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ। কারণ উত্তম মানুষ কখনো অধম কাজ করতে পারে না। শাস্ত্র বলছে, ‘হীনধম্ম ন সেবেয়্য, পমাদেন ন সংবসে, মিচ্ছাদিটইঠং ন সেবেয্য ন সিয়া লোকবন্ধনো’ অর্থাৎ কখনো হীন আচরণ করিও না, প্রমত্ত হয়োনা, এমনকি মিথ্যা দৃষ্টিও না। এতে দুঃখ বর্ধিত হয়। সুতরাং সব প্রকার দুঃখ-যন্ত্রণা এবং নির্বাণ লাভের জন্য মন থেকে সব প্রকার মলিনতা, চিত্তের হিংসা, ক্রোধ পরিহার করা উচিত। দুর্নীতি, নৈরাজ্য ও নানা ধরনের অপকর্ম থেকে নিজকে ও সমাজকে বিরত রাখা উচিত। এ জন্য ধর্মপদে বলা হয়েছে ‘কায়িক সংযম সাধুকর, বাচনিক সংযম সাধুকর, আর মানসিক সংযম সাধুকর; যিনি ত্রিবিধ দ্বারে সংযত তিনিই সর্বোত্তম সাধুকর।’ কী অসাধারণ বাণী বৌদ্ধধর্মের। এগুলো নিয়ে চিন্তা করলে সমাজের প্রতিটি মানুষ হবে সৎ, সুন্দর এবং নীতিবান। নীতিবান জীবনই একজন ব্যক্তির আদর্শ জীবন, মহৎ জীবন।
লেখক : (একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ) সুপারনিউমারারি প্রফেসর, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন-বাংলাদেশ চ্যাপ্টার
