সরকারি চাকরিতে কোটা বৈষম্য নিরসনে ২০১৮ সালে একটি আন্দোলন হয়। শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এক পর্যায়ে সরকার চাকরিতে সব ধরনের কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি করে। পরবর্তীতে গত ৫ জুন হাইকোর্ট সেই পরিপত্রটিকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় ঘোষণা করেন। এ রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে কোটা সংস্কার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা আন্দোলন শুরু করে। শুরুতে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে আন্দোলন শুরু করি। পরবর্তীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলন শুরু হয়।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে রাস্তায় নামে দেশের শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা। এই আন্দোলন ছিল শহরের উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে প্রান্তিক অঞ্চলের মধ্যবিত্ত, নি¤œ মধ্যবিত্ত পরিবারের থেকে উঠে আসা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। তৎকালীন সরকার এই নায্য দাবিকে গ্রাহ্য না করে; বরং আন্দোলন দমানোর জন্য ছাত্রলীগ পুলিশসহ বিভিন্ন সরকারি ফোর্সকে হামলার নির্দেশ দেয়। তারই ধারাবাহিকতায় ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার করে ছাত্রলীগ। এতে নারী শিক্ষার্থীসহ কয়েকশ শিক্ষার্থী আহত হয়। এই ঘটনাটি দেশের মানুষের হৃদয়ে নাড়া দেয়। পরে দেশের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, আওয়ামী ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তিকামী সাধারণ মানুষ সবাই রাস্তায় নেমে আসে। শিক্ষার্থী থেকে সাধারণ জনতার এই আন্দোলনে পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ বিভিন্ন ফোর্স সশস্ত্র হামলা করতে থাকে। এতে অসংখ্য ভাইবোন শাহাদাতবরণ করেন। এক পর্যায়ে জনআকাক্সক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে ফ্যাসিবাদের বিলুপ্তি ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তে এক দফার দাবি জানানো হয়।
দীর্ঘ ১৫ বছর আওয়ামী লীগ দেশের মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল। স্বৈরাচারী কায়দায় দেশের মানুষকে বাকরুদ্ধ করে ফেলেছিল। যে মুহূর্তে ভোটাধিকার হরণ, মানবাধিকার হরণ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ, দুর্নীতিসহ সর্বশেষ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অতর্কিত হামলা করেছে তখন দেশের জনগণ আর ঘরে বসে থাকতে পারেনি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে জনগণ রাস্তায় নেমে এসেছে। এসব কারণেই স্বৈরাচার হাসিনার পতন ঘটাতে মানুষের গণজাগরণ শুরু হয়েছিল।
এই আন্দোলনের মূল শক্তির জায়গা নৈতিকতা। নৈতিকতার জায়গা আমরা একটুও পিছপা হইনি। গুম খুন জেল জরিমানা কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই আন্দোলন চালিয়েছি। তার পরও বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখেছি অভিযোগ করা হয়েছে যে এই আন্দোলনে প্রচুর টাকা পাচ্ছে সমন্বয়করা। আসলে কোটা সংস্কার থেকে সরকার পতনের অভ্যুত্থানটি হয়েছে জনআকাক্সক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে। আর এই আন্দোলনটি দেশের সর্বস্তরে ছড়াতে বড় ধরনের একটি ভূমিকা ছিল সোশ্যাল মিডিয়ার। আমরা বিভিন্ন সময়ে ফেসবুক গ্রুপ খুলেছি, অনলাইনে জুম মিটিং করেছি। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আমাদের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। এটিও ঠিক যে, আমরা দীর্ঘদিন সংগঠনের সাথে ছিলাম তাই সেই অভিজ্ঞতাটাকেও কাজে লাগিয়েছি। এখানে রাজনৈতিক দলগুলোও বিভিন্ন জায়গায় তারা কাজ করেছে। সবার প্রচেষ্টায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সফল হয়েছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, সাধারণ জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই ছিল আমাদের মূল প্রেরণা।
এখন রাষ্ট্র মেরামতের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দেশের আইনশৃঙ্খলাকে সমুন্নত করা। অনেক পুলিশ সদস্যদের কর্মবিরতির কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিভিন্ন জায়গায় অন্যায় অরাজকতা হচ্ছে। আমরা দেখেছি ফ্যাসিবাদ পতনের পরও তাদের দোসররা এখনো ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারকে বিতর্কিত করতে বিভিন্ন সময় অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে চাচ্ছে। তাদের এই ষড়যন্ত্রকে শক্ত হাতে মোকাবেলা করতে হবে।
এ ছাড়াও, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, যথাযথ আইন প্রণয়ন ও এর সঠিক প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে এর যথাযথ বাস্তবায়ন করা সম্ভব। জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিটের সাথে বেমানান এমন কাজ থেকে ছাত্র শিক্ষক, সাধারণ জনতাকে দূরে থাকতে হবে।
আমরা জানি, স্বাধীনতার ৫৩ বছর অতিবাহিত হলেও দেশে এখন পর্যন্ত দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধ করা যায়নি। বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বেড়ে উঠতে হবে। দেশকে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত ও উন্নয়নশীল দেশে পরিণত করার স্বপ্নও বাস্তবে রূপ দিতে হবে। এ জন্য আমাদের প্রয়োজন মজবুত প্রশাসনিক কাঠামো, বাকস্বাধীনতা, জবাবদিহিতা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। তাই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি বড় চ্যালেঞ্জ দুর্নীতি দমন। সেই সাথে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও নিশ্চিত করতে হবে। এ দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণ হবে অন্যতম। অবিলম্বে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও স্বার্থান্বেষী সিন্ডিকেট বাণিজ্য ভেঙে দিতে হবে। নতুন এই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে জরুরি ভিত্তিতে চলমান শিক্ষাব্যবস্থারও পরিবর্তন দরকার। শিক্ষার মানোন্নয়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকেও দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। সব মিলিয়ে দেশের সর্বসাধারণের অধিকার নিশ্চিত ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়াই আমাদের প্রত্যয়।
আমরা বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার জন্য আন্দোলন করেছি। সরকারি চাকরিতে যে কোটা পুনর্বহাল করা হয়েছিল তারই প্রতিবাদে আমরা মাঠে নেমেছিলাম। জুলাই অভ্যুত্থানে জোয়ারের মূল উদ্দেশ্য স্বাধীন দেশটির সংস্কার। দেশের বর্তমান তরুণ প্রজন্মের রাষ্ট্র মেরামতের আগ্রহ ও দেশপ্রেম এ দেশের মানুষ জুলাই অভ্যুত্থানে দেখেছে । ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার পদত্যাগের পর দেশে অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে এই প্রজন্ম যে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে এবং তারা ইতোমধ্যে তার প্রমাণ দিয়েছে।
এ দেশের ছাত্ররা অন্যায়ের প্রশ্নে যেমন আপসহীন, দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও শৃঙ্খলা রক্ষায়ও তেমনি অঙ্গীকারবদ্ধ। তাই আগামীর বাংলাদেশ এই সাহসী তরুণদের কাছেই নিরাপদ থাকবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্বপ্ন ছিল একটি বৈষম্যহীন, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠন। এই স্বপ্ন পূরণের জন্য প্রয়োজন সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। যার মাধ্যমে একটি সাম্যভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। স্বাধীনতা ‘অর্জন করার চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন’-এ সত্য আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। আমরা দেখেছি গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে সমন্বয়ক কার্ড ব্যবহার বিভিন্ন জায়গায় অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছে। এই সমস্যা সমাধানে ইতোমধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চার সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেছি। এতেই একটি সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত থাকবে। যারা নেতৃত্ব দিয়ে আন্দোলন সুসংগঠিত করেছেন তাদের একাত্ম হয়ে কাজ করতে হবে। আমরা তা-ই করব। সেই সাথে দেশে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত করা হবে আমাদের অন্যতম কাজ। জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিট ধরে রেখে প্রকৃত দেশ সংস্কারই হবে আমাদের অন্যতম লক্ষ্য।
লেখক : সমন্বয়ক, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন
