বহুদিন আগে থেকেই আমি ভাবছিলাম কবিতার ভাষা বদলে ফেলার কথা। সেটা দিন না বলে বহু বছর বলা উচিত। আমার কিছুতেই মনে শান্তি ও স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিল আমার ভাষা হয়তো পাঠক বুঝতে পারছে না।। তখন লোকবুলি তথা লোকজ সংস্কৃতির কথা মনে হতে থাকে। গায়ের মানুষেরা যেভাবে ভাবে আমি কি তাদের কাতারে দাঁড়িয়ে কবিতা লিখতে পারব? আমি ও আমরা যে মানভাষা ব্যবহার করি, তা তো গণমানুষের ভাষা নয়। কবিতায় আমি গণবোধন জাগাতে মাঝে-মধ্যে হীরের কুচির মতো কথ্য লোকবুলি ব্যবহার করতে থাকি। কিন্তু মানভাষিক মানুষের পক্ষে তা মানিয়ে নেয়া অতটা সহজ হয় না, যতটা আমি/আমরা ভাবি। কবিতার ভেতরে দু-চারটি করে লোকজ উপাদান টুক করে টুক করে ঢুকে পড়ছিল। অনেকে এটাকে খাপছাড়া বললেন, কেউ কেউ মুচকি হাসলেন।
২. নিজের ব্যক্তিগত কথাবার্তা দিয়ে এই লেখার সূচনা কেন করলাম তার একটা ব্যাখ্যা দিতে পারি। মনে হলো দেয়া উচিত। যেদিন গণ-অভ্যুত্থানের কিশোর-কিশোরীরা ৫ আগস্টকে ৩৬ শে জুলাই লিখল ফুটপাথের দেয়ালে দেয়ালে, সেদিনই বুঝলাম, কেন তারা ৫ আগস্ট না লিখে জুলাইকে টেনে বাড়িয়ে দিলো। তারা শেখ হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক নিষ্ঠুর শাসনকে মানতে রাজি ছিল না। সেটা আমি টের পেয়েছিলাম কোটা আন্দোলনের শুরুতেই। কোটা নিয়ে তারা যেভাবে কথা বলেছে, ঠিক সেভাবেই দেয়াল লিখনকে তারা বলছিল গ্রাফিতি। আমাদের নগরসমাজে গ্রাফিতি ছিল, কিন্তু লোকসমাজে ছিল না। গ্রাফিতি ইংরেজি শব্দ হলেও এর ভিন্ন একটি সাংস্কৃতিক ধ্যান ও দর্শন আছে। তা হলো প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ। প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে গ্রাফিতি আঁকা হয় পশ্চিমা দেশগুলোর শহরের দেয়ালে, দেয়ালে। এরই পাশে উঠে এসেছে র্যাপ গান এবং র্যাপারদের অগ্নিগোলা শব্দে বোনা গানের মর্মের চিৎকার।
দেশটা তোমার বাপের নাকি? এই প্রশ্ন তোলার সাহস ১৬ বছরের আওয়ামী দুঃশাসনের আমলে করলে নিশ্চিত গুম-খুন হয়ে যেত। এ গানশোনার পর আমেরিকান কালো র্যাপারদের কথা মনে হয়েছিল। বিশেষ করে নিউ ইয়র্কের কালো মানুষেরা কবিতাকেই গানের বাজনার ভেতরে ঢুকিয়ে তাদের নিজস্ব কথ্যবুলিতে ঠাসা কথায় প্রকাশ করেছিল। অন্য দিকে শাসক শেখ হাসিনা, মুজিবকে তারই ফ্যাসিবাদের আইকনিক চরিত্র হিসেবে পুনঃপ্রকাশ করছিলেন। দেশের ৪ কোটি ১৭ লাখ মানুষ যখন খাদ্য নিরাপত্তার বাইরে তখন হাসিনা শেখ মুজিবের জন্মশতবর্ষকে শতবর্ষ উৎসবের জন্য মাত্র ১২০০ কোটি টাকা ব্যয় করে তার মূর্তি বানিয়ে চলছিল। এসব দেখে মানুষ ফ্যাসিবাদের আইকন হিসেবে মুজিবকে নতুন করে চিনতেছে তারই মেয়ের শাসনে আরো নিকৃষ্টভাবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রি করতে করতে তাতে কোনো ইমেজ ও ইমেজারি সৃষ্টি করতে না পারলেও, ঘৃণাকে উসকে দিতে পেরেছিল। মাত্র সাড়ে তিন লাখ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে তাদের ভাতা দিয়ে লালন পালন করছিলেন হাসিনা, যারা ছিলেন আওয়ামী রাজনীতির মানুষ এবং তাদের বয়স ৫০ বছরেরও নিচে। অথচ দেশটা স্বাধীন হয়েছিল ৫৩ বছর আগে। মুক্তিযুদ্ধে সাধারণের অবদানকে চুরি করে নিয়ে, লুটে নিয়ে আওয়ামী নেতা শেখ মুজিব আওয়ামী সরকার গঠন করেছিলেন। জনগণ জানে যুদ্ধ করেছে দেশের জনগণ, যারা ছিল মুক্তিকামী কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-জনতা। ক্ষুব্ধ জনগণ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অপেক্ষা করছিল কিভাবে রাষ্ট্রক্ষমতার শ্বাসমূল থেকে উৎখাত করা যায় হাসিনাকে। ভোটের মাধ্যমে তারা সেটা করতে চেয়েছিল, কিন্তু সেই ভোটের অধিকারই হরণ করে নেয় হাসিনা সরকার। ষড়যন্ত্র করে সামারিক ও বেসামরিক সরকারের মাধ্যমে হাসিনা ক্ষমতায় গিয়েই বুঝেছিল, এ দেশের জনগণ তাদের পছন্দ করে না। আর এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা নয়া প্রজন্মের কাছে পরিষ্কার হয়ে ধরা পড়ে। তারা জনগণের ভাষাও বুঝতে অক্ষম। ব্রিটিশদের ফেলে দেয়া রাজনৈতিক কালচারের মধ্যে নিজেদের ঢুকিয়ে নিয়ে যে শাসন তারা করছিল, সেখানে ছিল না মানুষের প্রতি দরদ, দেশপ্রেম, মানব কল্যাণব্রত এবং রাজনৈতিক গণতন্ত্রের প্রতি কমিটমেন্ট। এসব নিয়ে বারে বারেই ফুঁসে উঠছিল কিশোর-যুবকেরা, আগামী দিনের নেতাকর্মীরা। না, তারা কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী নয়, তারা নয়া প্রজন্মের চিন্তক, ভাবনাবাজ সৃষ্টিচেতন ছেলেমেয়ে। এরাই তো গ্রাফিতির নতুন ভাষা, সেøাগানের নতুন ভাষা ও ঢঙ এনেছে।
র্যাপ হচ্ছে বাদ্যযন্ত্র সহযোগে গাওয়া কবিতার মতো গান। নিউ ইয়র্কের কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিক শ্রেণীর মাধ্যমে ১৯৭০-এর দশকে এর যাত্রা শুরু। এরপর সারা দুনিয়াতেই তারুণ্যের সাংস্কৃতিক প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে এই গান। (অনন্য, সেপ্টেম্বর ২০২৪, দ্বিতীয় সংখ্যা, পৃ.১৯৯)
আমাদের বনশ্রীর রাস্তাগুলোতে সেøাগানের বান ডেকেছিল ৪ ও ৫ আগস্টে। কি অদ্ভুত সব সেøাগান আর কথা। শোনো মহাজন, তুমি একা/আমরা অনেকজন। কোথাও কোথাও লেখা হয়েছে... শোনো মহাজন আমরা লক্ষ-কোটি জন। ‘অনেক ফুটপাথের দেয়ালে লেখা হয়েছে বিদ্রোহী কবির কবিতার পঙক্তি। জাগো বন্দী আছো যতো, কারার ঐ লৌহকপাট/ভেঙে ফেল, কররে লোপাট ইত্যাদি।
কোন মানুষের কথা বলা হচ্ছে এখানে? পারশা মাহজাবীন পূর্ণী ধিক্কারের (নাকি শ্লেষ!) সাথে লিখছেন, ‘বেঁচে থাকো তুমি বেঁচে থাকি আমি, লাশের উপরে দাঁড়িয়ে’। এই তরুণের হৃৎপিণ্ডে জেগে আছে শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ কাজী মুগ্ধ। পারশার গানে তারা আছে। তারা আছে মুক্তিচিন্তার মানুষের হৃদয়-অন্তরে। গানটি এখানে তুলে আনা যাক। গানটি শুরু হয় এভাবে :
‘ভুলে যাই আমি ভুলে যাও তুমি ভুলে যাক পুরো জাতি
কীভাবে মানুষ মরেছে অকালে কীভাবে কেটেছে রাতি
আমি ভুলে যাই কীভাবে বুলেট ছিদ্র করেছে মুগ্ধকে
তুমি ভুলে যাও আবু সাঈদের বিশ্বাসে ভরা বুকটাকে
জাতি ভুলে যাক কালরাত আর স্মরণ করুক রেলটাকে
চলে যাক নেট, নিভে যাক জাতি, হায়নাতে খাক দেশটাকে’
অন্ধকার সময়ে বসে অন্ধকারের গল্প বলছে গানটি। একদিকে আছে চলমান বীভৎস হত্যার বয়ান, অন্য দিকে বলা হচ্ছে চলো ভুলে যাই এসব। অর্থাৎ মনে করি এ রক্তে রঞ্জিত হত্যার উল্লাসে ভাসা দেশ আমার নয়। এটা নেহাতই একটা স্বপ্ন। এই যে চোখে দেখাকে বিশ্বাস করতে না পারা স্বপ্ন ভাবা শুধু পারশা নয়, গণ-অভ্যুত্থানের দিনগুলোয় দেশের বেশির ভাগ মানুষেরই ওই অবস্থা হয়েছিল। বিশ্বাস করতে পারছিল না কিভাবে শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকতে নিরীহ, নিরপরাধ ছাত্র-জনতাকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা যায়! এ বীভৎসতার প্রকোপে ঘুমাতে পারছিল না মানুষ। রাতের পর রাত। কিন্তু গানটা কি আসলে আমাদের এসব ভুলে যেতে বলছে? না। বরং বলছে এ বীভৎসতা-পশুত্ব কখনই ভুলে যাওয়া যাবে না, আরো বেশি করেই মনে রাখতে হবে। যে রাজনৈতিক দল কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে মানুষের জীবনের চেয়ে মেট্রোরেল বড়, নিজের দেশের মানুষের মৃত্যুতে যাদের বুক কাঁপে না, অস্থিরতা বোধ করে না যে পিশাচের দল, তারা মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। মানুষের হত্যায় যে রাষ্ট্রপ্রধানের (সরকারপ্রধান) কিছু যায় আসে না, বরং চোখে জল আসে রেলের ধ্বংস দেখে, তার কাছে মানুষ-জাতি-দেশ কোনোভাবেই নিরাপদ না। দেশ এখানে একটা বিশেষ অর্থে ধরা দেয়। দেশ মানে শুধু একটা ভূখণ্ড কিংবা কিছু মানুষের সমষ্টি নয়। কিংবা রাষ্ট্রের স্থাপনা-উন্নয়নও দেশ নয়। গানের এক জায়গায় বিদ্রƒপের সুরে বলা হয়- চলো শহীদ মুগ্ধ, আবু সাইদ, ফাইয়াজদের হত্যা ভুলে দেখে নিই ‘বাতাবি লেবু লটকনে’ ভরা দেশকে, ‘কেঁদে ফেলি ফ্লাইওভার আর মেট্রোরেলটা জড়িয়ে’। কার দিকে আঙুল তোলা হচ্ছে আমাদের বুঝতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা কে অস্বীকার করবে? কিন্তু উন্নয়নের সাথে যদি সাধারণ মানুষের আত্মিক সম্পর্ক তৈরি না হয়, সে উন্নয়ন মানুষের হয়ে ওঠে না। জনগণের টাকায় করা, জনগণের ওপর চাপানো ঋণে নির্মিত রেলসেতু মনে হয় যেন একটা গোষ্ঠীর, শ্রেণীর সম্পত্তি; আবির্ভূত হয় নিষ্পেষণ-অত্যাচার-দুর্নীতির প্রতীক হিসেবে। এ ধরনের প্রতীক যত বড় হয়, তার সামনে মানুষ তত ছোট হতে থাকে। উন্নয়ন তখন মানুষের সুখের উপলক্ষ না হয়ে পরিণত হয় দুঃখের প্রতীকে। গানে পরিষ্কার ইঙ্গিত আছে যে এ চাপিয়ে দেয়া উন্নয়নের, মানুষের মর্যাদায় আঘাত হানা দেশ তরুণদের নয়। (বণিক বার্তা, ১৭ অক্টৈাবর, ২৪)
যখন গানের ভেতরে আমরা রাগ আর ক্ষোভের সাথে লোকবুলির গালি-গালাজ শুনি, সেগুলোই ধরা দেয় অনিবার্য় সমাজ-সত্য হিসেবে। মানুষ যে কিভাবে তাদের রাগ বা ক্ষোভ প্রকাশ করে, সেই লোকবুলি না শুনলে তো সেই ভাষার আদিরূপ আর শক্তি অনুধাবন করা প্রমিতজীবীদের পক্ষে সম্ভব নয়।
‘আওয়াজ উডা বাংলাদেশ’ গানটি যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দেয় বলেছেন আল মামুন। হান্নান লিখেছেন আবু সাঈদের গুল্লি করলি/অর্ডার দিলি কই থেক্কা?/এইবার রাস্তায় হাজার সাঈদ কইলজা থাকলে ঠেকাগা!
এই কথাবুলি প্রতিটি গ্রামীণ মানুষের ভাষাভঙ্গি যেমন- তেমনি তাদেরই মনের কথাগুলো হান্নান লিখেছেন।
৩০ জুলাই আপলোড করা চব্বিশের গেরিলা গানটিতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে আমরাই যখন রাজাকার তাইলে ক তুই রাজা কার?
এই র্যাপগুলো আমাদের প্রতিবাদের ভাষাই কেবল নয়, আমাদের ভাষার দিগন্তে যেন লোকজ সংস্কৃতির বিশাল আকাশ ও বিশাল দিগন্ত অবমুক্ত করেছে। আমাদের মানভাষায় ওই লোকজ ভাষা পাঙতেয় নয়। অর্থাৎ পাতে উঠানোর যোগ্য নয়। ফলে মানভাষার মালিকেরা শ্রমজীবী মানুষের হৃদয়ের ভাষা বুঝতে পারছে না। তারা বিচ্ছিন্ন জনগণ থেকে। তারা বিচ্ছিন্ন গণমানুষের মনন ও মেধা থেকে। তারা বিচ্ছিন্ন দেশের মানুষের প্রেম ও মহব্বত থেকে। কেন না, তারা জনগণের ভোট-চোর, কেননা তারা জনগণের আমানত লোপাটকারী ফ্যাসিস্ট আইকন।
তাদের ১৫ বছরের লাজ-লজ্জাহীন অপরাধকর্ম যদি বিচারের পাল্লায় ওঠে, তাহলে তাদের অনেক কঠিন সাজা ভোগ করতে হবে। নতুন যে বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় তারা একবার ২০১৮-তে শুরু করেছিল সেই রাষ্ট্রসংস্কারের নোটিশ তো ফুটপাথেই দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল তারা। তারা রাস্তা সংস্কারকেও তাদের কর্মের একটি বলে মনে করত। রাষ্ট্রসংস্কার কেবল সংবিধান সংস্কার বা পুনরায় লিখবার কাজ নয়, শাসকগোষ্ঠীর, ওই শ্রেণীর মন ও মননের সংস্কারও জরুরি কাজ। সেটাই বলতে চেয়েছে তারা ২০১৮ সালেই আজ ২০২৪-এ এসে তারা সফল হয়েছে। রাতারাতি কোনো সংস্কার সম্পন্ন করা যাবে না। শেখ হাসিনার মতো একজন প্রতিশোধপরায়ণ নারী গত ১৫ বছরে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোই কেবল ধ্বংস করেনি, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন, এটা মনে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে কেন তরুণেরা ২৪-এর বিজয়কে নয়া স্বাধীনতা বলছে।
