গত ৫ আগস্ট ২০২৪ এ গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশে একটি সফল বিপ্লবের পথ প্রশস্ত হয়েছে। একটি বৈপ্লবিক আবেগ ও উদ্দীপনা নিয়ে ছাত্রজনতা গত ১৫ বছরের দুঃশাসন, দুর্নীতি, জুলুম-অত্যাচার থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করার জন্য অকাতরে জীবন দিয়েছে। মাত্র দেড় মাস সময়ের আন্দোলনে প্রায় দেড় হাজার ছাত্র, পেশাজীবী, শ্রমিক, কর্মজীবী জীবন দিয়েছে। চোখ ও হাত-পা হারানোসহ আহত হয়েছে প্রায় ২০ হাজার মানুষ। আর এই অভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরি করেছে বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং প্রতিবাদী ব্যক্তিবর্গ। গত ১৫ বছরে বিএনপি-জামায়াতের হাজার হাজার নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষকে হত্যা করেছে সদ্য বিগত পতিত সরকার। কাজেই এই বিপ্লব অত্যন্ত চড়া মূল্য দিয়ে কেনা অর্জন। এই অর্জন কোনোভাবে বিফল হলে পুরো দেশ ও জাতি ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে। অভ্যুত্থানের পরদিন থেকে দেশের ভেতর-বাহির থেকে চেষ্টা চলছে বিপ্লব ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য। অভ্যুত্থান ব্যর্থ মানেই দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে গৃহযুদ্ধ। এই গৃহযুদ্ধের আগুনে আলু পুড়ে খাওয়ার জন্য আবার প্রস্তুত হয়ে আছে পতিত আওয়ামী সরকারের স্বামীতুল্য আত্মীয় আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মোদি সরকার। সেই ধরনের ভয়াবহ অবস্থা এড়ানোর জন্য আমাদের চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাদি গ্রহণ করা দরকার।

আমাদের নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপত্তা হুমকি। এই নিরাপত্তা হুমকি অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত দুই ধরনের হলেও অভ্যন্তরীণ বা ‘সফট সিকিউরিটি’ চ্যালেঞ্জটিই প্রধান। নিজের ঘর সামলাতে পারলে বাইরের সব বিপদই সহজে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। আমাদের বর্তমান সমস্যার মূলে হলো দু’টি রাষ্ট্রীয় উপাদান; পুলিশ এবং প্রশাসন। পতিত হাসিনা সরকার বিগত ১৫ বছরে দেশ ও সমাজের ফেব্রিকস নষ্ট করে দিয়ে গেছে। মসজিদ কমিটি থেকে শুরু করে বঙ্গভবন পর্যন্ত সর্বস্তরে দলীয়করণ করা হয়েছে এবং তাদের অবাধ দুর্নীতির ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। প্রতিটি নিয়োগ বা মনোনয়নে ‘ডিএনএ’ টেস্ট করে আওয়ামী লীগের লোকদের বসানো হয়েছে। সবচেয়ে বেশি যেখানে এই দলীয়করণ করা হয়েছে তা হলো পুলিশ এবং প্রশাসন। ফলে সরকার পতনের পর পরই এই দু’টি ক্যাডারে ধ্বংস নামে।
পুলিশ ও প্রশাসনে নিয়োগের ক্ষেত্রে গোপালগঞ্জী, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আত্মীয়স্বজন এবং ছাত্রলীগ দেখে দেখে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এদের নিয়োগের পর তিনভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। প্রথম দল হলো মনে-প্রাণে আওয়ামী লীগের সুবিধা পেয়ে আওয়ামী লীগার। দ্বিতীয় গ্রুপ হলো দুর্নীতির ফাঁদে ফেলে আওয়ামী লীগার। তৃতীয় দল হলো কথা ও কাজে মুজিব আর হাসিনা বন্দনা এবং আওয়ামী বিরোধী গোষ্ঠীকে ঠ্যাঙানোর মাধ্যমে প্রমোশন, পোস্টিং, অবাধ দুর্নীতির সুযোগ এবং অবসর পরবর্তী চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের নিশ্চিত করা। সুদীর্ঘ ১৫ বছরের এসব অবৈধ প্রক্রিয়া অনুশীলনের মাধ্যমে পুলিশ কার্যত শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের পাহারাদার হয়ে উঠেছিল। ১৯৭৫ এর পর থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পুলিশ একটি পেশাদার বাহিনী হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। দুর্নীতি যতটুকু ছিল তা বিশে^র সব পুলিশ বাহিনীতেই কমবেশি বিরাজমান থাকে। কিন্তু ২০০৯ সাল থেকেই পুলিশের মধ্যে এই দলীয় জজবা শুরু হতে থাকে যা ২০২৪ সালে এসে দানবীয় রূপ নেয়। পুলিশ নিজ দেশের ছাত্র-নাগরিকের বুকে এভাবে গুলি চালানোর নজির বিরল! এমনকি হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়ে নিরস্ত্র মানুষ হত্যা করা হয়েছে! এখানে পুলিশ একটি বাহিনী হিসেবে কলঙ্কিত হয়েছে মূলত এর নেতৃত্বের জন্য। নেতৃত্বে যারা ছিলেন তারা দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিলেন। ফলে তাদের বেঁচে থাকার তাগিদেই তারা হাসিনা সরকারকে যেকোনো মূল্যে টিকিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এর ফলে মানুষের ঘৃণা, ক্ষোভ, প্রতিশোধস্পৃহা গিয়ে পড়ে পুলিশের ওপর। তাইতো দেখা যায় ৪ ও ৫ আগস্ট ক্ষুব্ধ মানুষ থানায় থানায় ঘেরাও করে হামলা করেছে। এতে নিরস্ত্র মানুষের বুকে পুলিশ আরো গুলি চালালে নিহতের সংখ্যা হাজার ছড়িয়ে যায়! আর সরকার পতনের সাথে সাথে ওই সমস্ত দলীয়কর্মী বনে যাওয়া পুলিশের ‘কমান্ড এশলন’ থেকে শুরু করে ‘কনস্টেবল’ পর্যন্ত সদস্যরা পালিয়ে যায়। ফলে বাহিনী হিসেবে পুলিশ অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। তবে খুব ধীরলয়ে তারা স্বাভাবিক অবয়ব ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার অত্যন্ত বেকায়দায় রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি না হলেও দেশের ওপর অন্তর্বর্তী সরকারের মুষ্টির দৃঢ়তা বেশ দুর্বল মনে হচ্ছে। ফলে মানুষের আইন হাতে তুলে নেয়ার ঘটনা ঘটছে। গত বিপ্লব পরবর্তী দুই মাসে ‘মব জাস্টিসের’ শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ২৮ জন। গার্মেন্ট শিল্পে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ অস্থিরতা। সেই সাথে একের পর এক বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠী তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে সড়ক অবরোধ করছে, প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ঘেরাও করছে। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতার সুযোগ দেশে যেন দাবি আদায়ের মৌসুম শুরু হয়েছে। অন্যদিকে খুন, রাহাজানি, ছিনতাই ইত্যাদি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সড়কে বিশৃঙ্খলা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। কেউ কারো কথা শুনতে চাইছে না। পাবলিক পরিবহনগুলো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে বিভিন্ন সেক্টরে চাঁদাবাজি চলছে নীরবে। আওয়ামী-যুব-ছাত্রলীগের চাঁদাবাজির শূন্যস্থান অন্যরা দখলে নিয়েছে! এই ঢিলেঢালা সরকারি নিয়ন্ত্রণ বিরাজমান থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুব দ্রুত আরো অবনতি ঘটতে পারে। দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি হতে পারে। যার সুযোগ নেবে পতিত সরকারের প্রেতাত্মারা এবং তাদের প্রভু ভারত সরকার।

প্রশাসনের অবস্থা তথৈবচ। আওয়ামী বশংবদের বাইরের আমলা খুঁজে বের করা যাচ্ছে না। পতিত সরকারের সুবিধাভোগীদেরই বিভিন্ন জেলায় ‘ডিসি’ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যদিও অল্প সময়ের মধ্যেই সেসব নিয়োগ বাতিল করতে হয়েছিল। নতুন সরকারে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের বিরুদ্ধেই দুর্নীতি এবং দলবাজির মাধ্যমে ‘ডিসি’ নিয়োগ দানের ভয়াবহ অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। সচিবালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা স্থবির হয়ে দিন পার করছেন। সবাই যেন একটা ত্রিশঙ্কু অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। আমলাতান্ত্রিক ধীর গতিতে এখন আর কোনো গতি নেই বলে মনে হচ্ছে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য, বাজার ব্যবস্থাপনা, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রায় সবারই একটা গাছাড়া ভাব চলে এসেছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। প্রশাসনের এই বিশৃঙ্খল অবস্থার দ্রুত নিরসন না করতে পারলে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। পুলিশের বিপর্যয় এবং প্রশাসনের বিশৃঙ্খলাই মূলত বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকিকে বেগবান করছে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের পরিকল্পিত বাংলাদেশ বিরোধী কর্মকাণ্ড। প্রথমেই বলতে হয় যে, হাসিনার পতনকে ভারত তাদের নিজেদের পরাজয় হিসেবে বিবেচনা করছে। পরপর চারটি নির্বাচনে হাসিনাকে ক্ষমতায় বসতে সাহায্য করে ভারত হাসিনাকে তাদের ক্রীড়নকে পরিণত করেছিল। বিনিময়ে তারা বিনা শর্তে তাদের সব ধরনের সুবিধা বাংলাদেশ থেকে আদায় করে নিচ্ছিল। আর হাসিনাও ভারতকে ক্ষমতার উৎস বিবেচনা করে অবারিতভাবে সব চাওয়া দিয়ে দিচ্ছিলেন ক্ষমতায় বসানোর ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যে। ভারত-বাংলাদেশের এমন একটি ‘উইন-ডিফিট’ পরিস্থিতিতে হাসিনার পতনকে ভারত কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। তারা কূটনৈতিক সৌজন্য আচরণ থেকে শুরু করে সব ধরনের উসকানিমূলক তৎপরতা চালাচ্ছে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। তারা সারা বিশে^ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু নির্যাতনের মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। তাদের এদেশীয় এজেন্টের মাধ্যমে বিভিন্ন সেক্টরে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। আনসার বিদ্রোহ, পোশাক শিল্পে অস্থিরতা, অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের রাজপথে নামানো, মব জাস্টিস, পুলিশ ও প্রশাসনের অভ্যন্তরে নাশকতামূলক তৎপরতা ইত্যাদির মাধ্যমে অরাজকতা সৃষ্টির পেছনে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার ইন্ধন রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা অভিযোগ উত্থাপন করছেন। সেই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামে জাতিগত দাঙ্গা লাগানোর বিভিন্ন প্লট তৈরির প্রচেষ্টা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। আমাদের দেশের নদী-নালার মতোই ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ জাল বিস্তার করে রয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এর পূর্বেও আশির দশকে ‘শান্তিবাহিনীর’ মাধ্যমে প্রায় দুই দশক ধরে ভারত আমাদের রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছিল। এ সমস্ত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করার জন্য আমাদের প্রথমে আমাদের নিজেদের দুর্বলতাগুলোকে চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রথমেই আমাদের বুঝতে হবে আমাদের উপদেষ্টা পরিষদের মধ্যে দৃঢ়তার ঘাটতি রয়েছে কিনা। উপদেষ্টারা যার যার কর্মক্ষেত্রে সেরা হলেও তারা একেকজন একেক ‘ডিসিপ্লিন’ থেকে এসেছেন। তারা অর্থনীতি, শিক্ষা, মানবাধিকার, পরিবেশ, সামরিক ইত্যাদি বিষয়ে প্রশংসনীয় অবদান রাখলেও রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন না। তারা রাজনীতির পর্যবেক্ষক-সমালোচক ছিলেন। রাজনীতির চর্চা বা অনুশীলনের মাধ্যমে তারা বেড়ে ওঠেননি। ফলে তাদের ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক অনুসারী বা শক্ত বুনিয়াদে ঘাটতি রয়েছে। কাজেই তাদের নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় এবং অভ্যন্তরীণ রেজিমেন্টেশন প্রক্রিয়ার অভাব থাকলে তা সর্বাগ্রে দূর করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের মূল উদ্দেশের প্রতি সব উপদেষ্টাকে সমন্বিতভাবে ফোকাস করতে হবে। একই সাথে সরকার এবং সংস্কার পরিচালনার মধ্যে বেগ এবং ওজনের সংমিশ্রণ ঘটাতে হবে।
নৈরাজ্য বা অস্থিরতার পেছনে ‘ষড়যন্ত্র হচ্ছে’ বয়ান বাদ দিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। ‘ষড়যন্ত্র’ চিহ্নিত হওয়ার আগে বা ‘ষড়যন্ত্র’ মাঠে গড়ানোর আগেই তা নির্মূল করতে হবে। এজন্য বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থায় আওয়ামী বশংবদদের বিতাড়িত করে দেশ প্রেমিকদের বসাতে হবে। ‘ষড়যন্ত্র’ হলো আওয়ামী আমলের তত্ত্ব। ষড়যন্ত্র কার্যকর হওয়ার পর চিহ্নিত করার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই। সেটা না হতে দেয়াটাই সরকারের দায়িত্ব। পুলিশ ও প্রশাসনে যে ঘাটতি বা শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা দ্রুত পূরণের ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ ‘বিসিএস’ পরীক্ষার মাধ্যমে স্বচ্ছতার সাথে যোগ্যদের দ্রুত নিয়োগ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে পূর্বের ‘বিসিএস’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও রাজনৈতিক দৃষ্টিতে বাদ দেয়া প্রার্থীদের নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। তাছাড়া যে কয়েকটি ‘বিসিএস’ পরীক্ষা শেষ করে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে সেগুলো তরান্বিত করতে হবে। পুলিশ কনস্টেবল থেকে অফিসার পর্যন্ত বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে দ্রুত নিয়োগ দিয়ে স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণ শেষে আত্মীকরণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ক্যাপ্টেন ও মেজর পদবির সামরিক অফিসারদের ডেপুটেশনে নিয়োজিত করা যেতে পারে। যোগ্য অবসরপ্রাপ্ত সামরিক ও পুরিশ অফিসারদের নিয়োগের বিষয়েও বিবেচনা করা যেতে পারে।
সংখ্যালঘুদের ওপর কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর আক্রমণ হচ্ছে না তা সবারই জানা। আওয়ামী দুর্বৃত্তদের ওপর হামলা হয়েছিল কিছু কিছু স্থানে। সেসব হামলা হয়েছিল দেশ যখন সরকারহীন ছিল বা তার আগে-পরে কয়েক দিন। এসব আক্রমণ হয়েছিল আওয়ামী অত্যাচারীদের সহযোগী হওয়ার কারণে; কোনো ধর্মীয় পরিচয়ে নয়। কিন্তু এই ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে আওয়ামী প্রেতাত্মারা মাঠে নামার চেষ্টা করছে এবং ভারত এটাকে পুঁজি করার চেষ্টা চালাচ্ছে। কাজেই যেকোনো মূল্যে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে অনুষ্ঠিতব্য দুর্গাপূজায় সর্বাত্মক নিরাপত্তার প্রস্তুতি রাখতে হবে।

ফ্যাসিবাদের বেশ কিছু মূল নেতৃত্ব পালিয়ে ভারতে আশ্রয়ে নিয়েছেন। তাদের পলায়নের বিষয়ে আওয়ামী সহমর্মী পুলিশ-আমলাদের সহায়তা রয়েছে বলে অনেকেই মনে করে। সেইসব পলাতকরা কলকাতায় বসে ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসনের ফন্দি-ফিকির করছেন। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো পলাতক হাসিনার ভারতে অবৈধভাবে অবস্থান। এসব পলাতকদের ভারতের আশ্রয় না দেয়ার জন্য কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে।
অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মামলা এবং আসামি করার প্রক্রিয়ায় বড় ঘাটতি হচ্ছে বলে আইনজ্ঞরা মনে করেন। ঢালাওভাবে মামলা দিয়ে অগণিত আসামি বানানো ফ্যাসিবাদী আমলের অনুকরণ করা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। সেই একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে সুষ্ঠু বিচার সম্পন্ন করা এবং প্রকৃত দোষীদের বিচারের আওতায় আনা খুবই কঠিন হয়ে পড়বে। কাজেই সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা এবং আসামি করতে হবে যেন আইনের কোনো ফাঁকফোকর খুনিরা বের করতে না পারে।
শিক্ষাব্যবস্থাকে সঠিক ট্র্যাকে নিয়ে আসা আরো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কমপক্ষে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের জন্য মাধ্যমিকের পাঠ্যসূচিকে সঠিক জায়গায় আনতে হবে। এখানে সমস্যা হলো পতিত সরকারের প্রেতাত্মারাই পাঠ্যসূচি নির্ধারনের স্থানটিতে বসে আছে, যাদের হাত ধরে গত ১৫ বছরে দেশের শিক্ষার ১২টা বাজানো হয়েছে। আমাদের দেশের জন্য উন্নত বিশে^র ফিনল্যান্ডভিত্তিক কারিকুলাম চাপিয়ে দেয়া ছিল অসামঞ্জাস্য ও অযৌক্তিক চিন্তা এবং একটি ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া। সেই সাথে ভুলে ভরপুর এবং দেশের ৯৫ শতাংশ মানুষের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি পরিপন্থী একটি পাঠ্যসূচি চাপিয়ে দিয়েছিল এই চিহ্নিত কুশিলবরাই। তাদের দ্বারা স্বল্পমেয়াদি ভিত্তিক আগামী দুই বছরের জন্য সঙ্কলিত পাঠ্যসূচিতে বিপ্লবের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব হবে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সম্পর্ক সমন্বয় করে চলা। গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক দল এবং অন্যান্য ফ্যাসিবাদ বিরোধী ব্যক্তিবর্গের অবদানকেও স্বীকৃতি দিতে হবে। অবশ্যই তরুণরা রিলে রেসের ফিনিসিং দৌড়টি দিয়েছে। কিন্তু আন্দোলনের বুনিয়াদ গত দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে অনেক ত্যাগের বিনিময়ে তৈরি হয়েছিল। কাজেই আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ বলে কাউকে মহিমান্বিত করতে গেলে অন্যান্য অবদানকারীদের মহিমান্বিত করা থেকে বঞ্চিত করা হয়ে যায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের একটি কঠিন সমস্যা হলো অভ্যুত্থানের সময় মাসাধিককাল ধরে পুলিশ এবং লীগ বাহিনীর গুলিতে আহত ছাত্র-জনতার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা। অনেকে চোখ হারিয়েছেন, অনেকেই পঙ্গু হয়েছেন, অনেকেরই অঙ্গহানি ঘটেছে। বিশ হাজারেরও বেশি এ সমস্ত আহতদের অনেকেরই দেশ-বিদেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। সেইজন্য যথাযথভাবে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠ তালিকা করে জরুরিভিত্তিতে তাদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। সেই সাথে সব শহীদদের স্বচ্ছ তালিকা প্রস্তুত করে তাদের যথোপযুক্ত সম্মাননা এবং পরিবারের সদস্যদের দেখভালের ব্যবস্থা নিতে হবে।
যেকোনো বিপ্লবে চ্যালেঞ্জ থাকবেই। বিপ্লবের পথ কখনো মসৃণ হয় না। এগুলো মোকাবেলা করেই বিপ্লবকে সফল করতে হবে। ড. মোহাম্মদ ইউনূসের ব্যক্তিগত কারিশমা এবং যোগ্যতা বলে কূটনৈতিকভাবে বৈদেশিক স্বীকৃতি এবং সাহায্য অবশ্যই সফলতার সাথে আনা সম্ভব হবে, যার লক্ষণ ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। তবে ভারত এ বিষয়ে ব্যতিক্রম। কারণ, ভারতের সাথে যে প্রতিবেশী দেশেরই সম্পর্ক খারাপ থাকবে বুঝতে হবে সেই দেশ সার্বভৌমত্ব এবং সমমর্যাদার শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেই অর্থে আমাদের বৈদেশিক নীতিও সঠিক পথেই আছে বলে স্বীকৃত হচ্ছে। কাজেই আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলো পেশাদারিত্বের সাথে মোকাবেলা করতে পারলে এই বিপ্লব সফল হবেই। ২০২৪ বিপ্লবের এবং ১৯৭১ এর স্বাধীনতার শহীদদের রক্ত আমরা বৃথা যেতে দিতে পারি না।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক
Email: maksud2648@yahoo.com