আমার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি দেশের অন্যতম প্রাচীন দৈনিক সংগ্রামে। দুই দফায় আমি সংগ্রামে কাজ করেছি প্রায় ২৫ বছর। কষ্টে-শিষ্টে এবং সুখ-আনন্দে সেই ২৫ বছর যেন চোখের পলকে জীবন থেকে খসে গেছে। বলেছি, সংগ্রামের দিনগুলোতে সম্পাদকসহ আমাদের সবার জীবন এমনভাবেই কেটেছে। কখনো কখনো একচিলতে সুখ-আনন্দ আমাদের স্পর্শ করেছে। তখন ওইটুকু প্রাপ্তিই আমরা সবাই ভাগাভাগি করে তার স্বাদ গ্রহণ করেছি। এটাও সবার জানা দুঃখী মায়ের সুখী সন্তানও থাকে। সংগ্রামের বেশ কিছু সুখী সন্তানও ছিল। এদের মধ্যে একজন দেশের সর্বোচ্চ আদালত তথা আপিল বিভাগের সম্মানিত বিচারপতির পদেও সমাসীন হয়েছেন, কমপক্ষে অর্ধডজন সদস্য রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে সচিব পদে অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। সংগ্রাম পরিবারের দু’জন সদস্য দু’টি ব্যাংকের এমডি ছিল। সংগ্রাম পরিবারে এক সদস্য আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিকদের একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। আমেরিকা-প্রবাসী সেই সদস্য এখন বিশ্বের চিরায়ত সাহিত্য ভাণ্ডার থেকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ কাজে সময় কাটাচ্ছেন যা বাংলা অনুবাদ সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করছে। তার অনুরাগীদের সংখ্যা বিপুল। দেশের অর্থনীতিবিষয়ক রিপোর্টিং-এ যারা গত শতাব্দীর একেবারে শেষ ধাপে এসে বিশেষ অবদান রেখেছেন। তিনি দৈনিক ‘নয়া দিগন্তর’-এর নির্বাহী সম্পাদক, অত্যন্ত দক্ষতা ও যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। দৈনিক সংগ্রামে আর সারা জীবন সংগ্রামী জীবনযাপন করে গেছেন। রুহুল আমিন গাজী, যিনি সাংবাদিকদের দাবি-দাওয়া আদায়ের সর্বোচ্চ ‘বারগেনিং ফোরাম’ বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নে একাধিকবার সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। দুঃখ-ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আজ স্মরণ করছি আমাদের গাজীকে এখন যিনি আর আমাদের মাঝে নেই। আমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে সংগ্রাম বহু উচ্চমানের সাংবাদিক তৈরি করেছে, সাংবাদিক ইউনিয়নের তথা সাংবাদিকদের অনেক নেতাও বানিয়েছে। সে সারিতে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের বর্তমান সভাপতি স্নেহভাজন শহিদও আছেন। আমি তাকেও অনুপ্রেরণা দিতে চাই। এখানে ছোট একটা কথা দিতে চাই, প্রিয় গাজীর সাংবাদিক ইউনিয়নের সাথে সম্পর্ক অনেক দিনের। ১৯৭৮ সালের কথা যখন ইউনিয়ন অখণ্ড ছিল। সে বছর দেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরীর নেতৃত্বে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের যে প্যানেলটি বিজয়ী হয়েছিল, সেখানে রুহুল আমিন গাজী ও আমি নির্বাহী পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলাম। সেখান থেকে গাজীর নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত হতে থাকে।
সংগ্রামে আমরা যে যখনই কাজ করেছি, আমাদের কেউ কখনোই পরিবার-পরিজন নিয়ে ‘কারো জীবনেই স্বাচ্ছন্দ্যের ছোঁয়া ছিল না বটে। তবে সংগ্রামের প্রতিটি সাংবাদিক এ কথা অবশ্যই বুক ফুলিয়ে বলতে পারতেন, সংগ্রামের কলম সৈনিকরা কখনো অপসাংবাদিকতা করে না। দেশ-জাতির স্বাধীনতা সার্বভৌমের সাথে কখনই আপস করে চলেননি। অনেকেই জানে না যে, পতিত প্রধানমন্ত্রীকে যে ‘রং হেডেড’ তকমা সর্বোচ্চ আদালত দিয়েছিল, সেখানে সংগ্রামের কিঞ্চিৎ অবদান ছিল। আর একটা কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করি সংগ্রামের পাঠককুল সংগ্রামকে বরাবর এতটা ভালোবাসতো যে, তার উদাহরণ হয়তো নেই। একদিন পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘রং হেডেড’ বলে উচ্চ আদালত সাব্যস্ত করেছিল, তার পটভূমিটা উল্লেখ করার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না বলে দুঃখ প্রকাশ করছি। তখন আমি সংগ্রামের চিফ রিপোর্টারের দায়িত্ব পালন করছিলাম। সরকারের তথ্য দফতর থেকে জানানো হলো কাল প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন। সে সময় সংগ্রামের সিনিয়র রিপোর্টার আযম মীর প্রধানমন্ত্রীর যাবতীয় অ্যাসাইনমেন্ট কভার করতেন। তাকে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস কনফারেন্স কভার করার দায়িত্ব দেয়া হলো। আযম মীরের একটা গুণ ছিল, কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট কভার করার সময় বহনযোগ্য টেপ রেকর্ডার নিয়ে যেত। সন্ধ্যায় অফিসে ফিরে বলল, বাবর ভাই প্রধানমন্ত্রী কিন্তু কনফারেন্সে সর্বোচ্চ আদালত নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। সে আমাকে রেকর্ডকৃত কথাগুলো শুনাল। আদালত অবমাননাকর কথাগুলো রিপোর্ট করা (সে সময়) খুবই রিস্ক ছিল। আমি রেকর্ডার নিয়ে সম্পাদক আসাদ ভাইয়ের কক্ষে গিয়ে তাকে প্রধানমন্ত্রীর সংশ্লিষ্ট বিষয়ের কথাগুলো শোনালাম। তিনি মৃদু হেসে বললেন, সে কি পাগল নাকি! তারপর আমাকে নির্দেশ দিলেন, আদালতের বিষয় নিয়ে শেখ হাসিনার কথাগুলো ‘কোট আন কোট’ করে আযমকে লিখতে বলেন। আযম সেটাই করল। পরদিন আমাদের পত্রিকায় সেভাবে রিপোর্ট প্রকাশ পেল। কিন্তু প্রায় সব পত্রিকায় ওই রিপোর্ট প্রকাশ পেল, ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি গোছের। আসাদ ভাইয়ের নির্দেশ ছিল। ওই রেকর্ডটি আরো কয়েকটি কপি করে রাখা। কয়েকজনের কাছে সেগুলো সংরক্ষণ করা। যথারীতি সেটা করা হলো ওই ঘটনার দু’দিন পর। রাত ৮টার দিকে আমি আমার ডেস্কে কাজ করছিলাম। এ সময় টেলিফোন রিং হলো। টেলিফোন করেছেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। বাবর কাল কি তুমি সন্ধ্যার পর আমার চেম্বারে আসতে পারবে? জরুরি কথা আছে, টেলিফোনে বলা যাবে না। পরদিন আমি ঠিক সময় মওদুদ সাহেবের চেম্বারে পৌঁছাই। আমার উপস্থিতির খবর পেয়ে তিনি ওনার খাস কামরায় আসতে বললেন। প্রথমে আমার ও আমাদের পত্রিকার খবরাখবর নিলেন। তারপর বললেন গত পরশু তোমাদের পত্রিকায় উচ্চ আদালত সম্পর্কে হাসিনার গর্হিত মন্তব্য নিয়ে যে রিপোর্ট তোমরা করেছ তেমনভাবে আর কোনো পত্রিকা করেনি, তোমরা ‘কোট আন কোটে’র মধ্যে ওর সব কথা লিখেছ। নিশ্চয় তোমরা ওর (হাসিনার) কথা টেপ করেছ। আমি বললাম জি। সেই টেপ থেকে একটা কপি দাও। আমি উত্তর দিলাম, একটা শর্তে আপনাকে দেবো। বিষয়টি কেবল আপনার ও আমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। তিনি সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন, অবশ্যই। পরদিন তার চেম্বারে গিয়ে তার হাতে টেপের কপি দিলাম। তখন তিনি বললেন এর আরো ৫টা কপি করে আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির হাতে পৌঁছাব। সবাই জানেন আপিলেট ডিভিশনের অন্যতম বিচারক বিচারপতি মোস্তফা কামাল আব্বাসী এ মর্মে রায় দিয়েছিলেন যে, তিনি (প্রধানমন্ত্রী) রং হেডেড।
আমার সব সম্পাদক ও গুণী অগ্রজ সাংবাদিকদের কথা আজও অবসরে অবকাশে মনে পড়ে এবং তাদের দেয়া উৎসাহ উদ্দীপনা, সহযোগতিা ও ভালোবাসাকে পাথেয় করে আজ পর্যন্ত চলে এসেছি। তাদের আশীর্বাদ শুভেচ্ছা এখনো আমাকে কাজ করতে অনুপ্রেরণা জোগায়। অথচ প্রথমে কখনো ভাবিনি সংবাদপত্রের কর্মী হবো। আমার উর্দুভাষী এক সুহৃদ সংবাদপত্রে কাজ করা নিয়ে আমাকে বলেছিলেন, ‘স্যার আপ তো দারু পিনা শুরু কিয়ে।’ আসলে সংবাদপত্রে যারা কাজ করেন তারা শুরু থকে শেষ দিন পর্যন্ত একটা ঘোরের মাঝে বুঁদ হয়ে জীবন কাটিয়ে যান। সমাজ, রাষ্ট্র আর মানুষের জন্য কাজ করতে, তথা সত্য সুন্দর আর কল্যাণের জন্য কাজ করাকে সবসময়ই তাদের আনন্দ দেয়। এ আনন্দই বহুজনকে এ পেশায় আবদ্ধ করে রেখেছে এবং রাখছে। আমি এমন অনেককে জানি যারা তাদের মেধা, জ্ঞান-গরিমা ও যোগ্যতার বলে অন্য সব লোভনীয় পেশায় কাজ নিয়ে তরতর করে অনেক ওপরে ওঠতে পারতেন। অনেক বিত্তবৈভব নিয়ে নিরাপদ ঝুঁকিহীন জীবনযাপন করতে পারতেন। হ্যাঁ, এমন বহু উদাহরণ আছে যারা নিরোপদ্রব জীবনযাপনের জন্য সাংবাদিকতা থেকে সরে গিয়ে সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে এবং ব্যাংক-বীমার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে গিয়েছেন। তবে তাদের অনেকের কাছ থেকে এ কথাও শুনেছি তারা এখনো স্বপ্ন দেখেন সংবাদপত্রের বার্তা কক্ষকে। এখন আর নিজেকে নিয়ে এতটুকু হতাশ হই না। আমাদের তো দেখার সুযোগ হয়েছে জীবনযুদ্ধে অক্লান্ত ওইসব যোদ্ধার। যখন সংবাদপত্রে এমন প্রতিবেদন প্রকাশ পায় যা পাঠ করে রাষ্ট্রপতিকে চঞ্চল করে তুলেছিল, এক প্রধানমন্ত্রী সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক দুঃখী মানুষের জীবনের গল্প পড়ে চোখে পানি ধরে রাখতে পারেনি। তখন আনন্দ অশ্রু মুছতে হয়েছে বহুবার। তখন নিজেদের জীবনের স্বার্থকতা খুঁজে পেয়েছি। এর চেয়ে বড় ও বেশি কিছু পাওয়ার কী আর থাকতে পারে একজন কলম সৈনিকের।
মানুষ আসে আবার চলে যায়; এটাই তো জীবনের ধারা। আমাদের সাথে কাজ করেছেন শ্রদ্ধেয় মোহাম্মদ হোসেন ভাই। হাসানুল করিম ভাই, আবদুল কাদের, মওলানা জুলফিকার আহমদ কিসমতি, সালেহউদ্দিন জহুরী, কাজী শামসুল হুদা ভাই, মরহুম আবদুল হাকিম ভাই, শাফি আবদুস সালাম ভাই সংগ্রামের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাজ্জাদ হোসাইন খান। গভীর শ্রদ্ধা জানাই। অনুজ প্রতিম, সৈয়দ মুহাম্মদ ইসহাক, হেলাল হুমায়ুন এবং হুমায়ুন সাদেক চৌধুরীসহ আরো অনেকেই। তারা জীবনের সব লেনদেন চুকিয়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তাদের গন্তব্য আমাদেরও হবে সেটাই।
আমার সাংবাদিকতার জীবনে প্রথম সম্পাদক ছিলেন অধ্যাপক আখতার ফারুক। তিনি দীর্ঘদিন তদানীন্তন পাকিস্তান আমলে ‘কায়েদে আযম’ কলেজের (অধুনা সোহরাওয়ার্দী কলেজ) বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। তার একটা গুণ আমাকে গভীরভাবে আকর্ষণ করত। তার হাসি, হাসি না বলে বরং অট্টহাসি বলা ঠিক হবে। প্রচুর পান খেতেন। অট্টহাসি হাসতে গিয়ে তার মুখের পান-সুপারি আশপাশে ছিটকে পড়ত। তার উপস্থিত বুদ্ধি ছিল প্রখর, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তার জিবের অগ্রভাগে যুৎসই জবাব যেন তৈরি থাকত। একদিন আমাদের সম্পাদক মহোদয় একটি পাঁচ তারকা হোটেলে তদানীন্তন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান (যাকে আজ পর্যন্ত দেশের সফল অর্থমন্ত্রী হিসেবে মনে করা হয়) সব পত্রিকার সম্পাদকদের এক মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ জানান। অধ্যাপক আখতার ফারুক সেই ভোজসভায় যোগ দেন। দুর্ভাগ্যবশত সেদিন দৈনিক সংগ্রামের অর্থনীতিসংক্রান্ত এক রিপোর্টে অর্থমন্ত্রীর নাম সাইফুর রহমানের স্থলে ছাপা হয়েছিল ছয়ফুট রহমান। অর্থমন্ত্রী অধ্যাপক আখতার ফারুকের দৃষ্টিতে সেটা তুলে ধরলেন। অধ্যাপক ফারুক তার স্বভাবসুলভ অট্টহাসি দিয়ে জবাব দিলেন, স্যার আমরা তো আপনাকে খাটো করতে পারি না। একদিন রিপোর্টারদের মিটিং অধ্যাপক ফারুক একটা কথা জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের মধ্যে কে কে বিবাহিত, হাত তোলো। মাত্র একজন হাত তুললো। বাকিদের বললেন তোমরা বিয়ে করছো না কেন। আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম (তখন ১৯৭৭ সাল) ফারুক ভাই আমার বেতন এখন ৪৫০ টাকা মাত্র। একটু গুছিয়ে নেই তখন দেখা যাবে। জবাব দিলেন, এখন তো একটা সুতাও কিনো না। বিয়ে করলে সুতার সাথে সুচও কিনবে। শোনো এভাবেই সংসার গোছাতে হয়।
জীবনকে মোকাবেলায় কখনো বিমুখ থেকো না। আমরা হয়তো অনেক সময় ভুলে যাই। মানুষের সীমাবদ্ধতার কথা। অধ্যাপক আখতার ফারুক তো মানুষই ছিলেন। যে কারণে তারও সীমাবদ্ধতা ছিল। সেই ১৯৭৭ সালে তিনি তখন দৈনিক সংগ্রামের সম্মানিত সম্পাদক ছিলেন। এটা যেকোনো ব্যক্তির জন্য জীবনের অনেক বড় পাওয়া, তা নিয়ে তার সন্তুষ্ট থাকা, শুকরিয়া আদায় করাই ছিল সর্বোচ্চ বোধ বিবেচনার বিষয়। হঠাৎ করে তিনি দৈনিক সংগ্রামের মালিক হতে চাইলেন। যতদূর জানি, এ জন্য তিনি কোনো ‘সিড ম্যানি’ দেননি। এমন চিন্তার সহযোগী ছিলেন দৈনিক সংগ্রামের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিক হওয়ার একটা অর্থ হচ্ছে লাভ-লোকসানের হিসাবে জড়ানো। তখন সংগ্রামের মূল ইনভেস্টারগণ এ বিষয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ পর্যন্ত পৌঁছায়। সেখান থেকে যে রায় এলো, সেটা জনাব ফারুকের মান-সম্মানকে ভূলুণ্ঠিত করেছিল। আদালত তাকে ভর্ৎসনা করেছিল এবং জরিমানা করেন। জনাব ফারুক কর্তৃক যে মামলা রুজু হয়েছিল সেখানে জনাব ফারুক প্রথম অভিযুক্ত করেছিলেন সংগ্রামের নতুন প্রকাশ সর্বজন শ্রদ্ধেয় হুমায়ুন ভাইকে। বিএফইউজে সদ্য সাবেক সভাপতি মরহুম রুহুল আমীন গাজী ছিল ৭ নং আসামি আর এ অবার্চিন ছিল ৮ নং আসামি।
নিঃসন্দেহ সেই অধ্যাপক আখতার একজন সৃজনশীল লেখক ছিলেন। তার লেখার গতি ছিল বিদ্যুতের মতো। আর তির্যক, ক্ষুরধার। তারপরও তিনি তো মানুষ। কোনো মানুষ যেমন সীমাবদ্ধতার বাইরে নয়; প্রতি মুহূর্তে নিজেকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম না হলে পদস্খলন অনিবার্য। আমার প্রথম সম্পাদক নিজেকে সুরক্ষিত করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। লোভ-লালসার কাছে তিনি হেরে গিয়েছিলেন; সেটাও একটা গল্প। সে গল্প থাক আজ। তবে আফসোস এজন্য তার কলাম সেই থেকে বন্ধ হয়ে যায়; সেটা শুধু তার জন্য নয়, দেশের জন্যও ক্ষতির কারণ তো বটেই।
আমার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের দ্বিতীয় সম্পাদক ছিলেন জনাব আবুল আসাদ। তার কাছ থেকে যেমন বহু কিছু শিখেছি, তেমনি তার স্নেহদৃষ্টি, জ্ঞানসমৃদ্ধ পরামর্শ সাংবাদিকতা জীবনে আমাকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছে। আমি যতগুলো ইন্টারন্যাশনাল ইভেন্ট কভার করার সুযোগ পেয়েছি সেগুলো কভার করার সুযোগ করে দেয়ার ক্ষেত্রে তার অবদান সারা জীবন আমাকে মনে রাখতে হবে। আমার পেশাগত জীবনকে তিনি সমৃদ্ধ করেছিলেন।
আসাদ ভাইকে অহমিকা কখনোই তাকে স্পর্শ করেনি। তার দেহভঙ্গি ও পোশাকে আশাকে কখনো কোনো গরিমা দেখিনি। এত সাধারণ বেশভূষা তাকে অনন্য এক মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছিল।
আমার এ দ্বিতীয় সম্পাদক আবুল আসাদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করে কিছুকাল শিক্ষকতা করাকালে ডাক পড়ে। সে ডাকে তিনি ঢাকায় এসে সংগ্রামে যোগ দিয়েছিলেন। সময় ১৯৭৭ সালেরও বেশ আগে। এ জ্ঞানতাপসকে ১৯৭৭ সাল থেকেই দেখেছি তিনি সারাক্ষণ নীরবে নিমগ্ন থাকতেন লেখালেখিতে। পাঠ ও পঠনে।
তার জ্ঞান তাকে ফলবতী বৃক্ষের মতো ন্যুব্জ মোলায়েম এবং সেটা অকাতরে বিলিয়ে দিতে আনন্দবোধ করতেন। আমার প্রতি তার স্নেহকে আমি কখনো কখনো তার প্রতি একটু বেশি টেকমেশন করেছিলাম, সে জন্য এখনো লজ্জাবোধ করি। তার দূরদৃষ্টি ছিল অপরিসীম। একথা বলে যেটা বোঝাতে চাই, সেটা বেশ দূর অতীতের কথা, নিউ ইয়র্কে যেদিন টুইন টাওয়ারে হামলা হলো। টিভিতে সে দৃশ্য দেখে সংগ্রামের বার্তা কক্ষে অনেকেই উৎফুল্ল। আমি বিরস বদনে সম্পাদক মহোদয়ের কক্ষে ঢুকে এ সংবাদ দিলে তিনি উদ্বিগ্নœ হলেন। শুধু বললেন, এটা অবশ্য মুসলিম বিশ্বের জন্য কোনো ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনবে, তা তো পরিষ্কার হয়েছে। এর হঠকারিতা কাদের অপেক্ষায় থেকে বুঝতে হবে। আমাকে উদ্দেশ করে বললেন, প্রথম পাতায় স্পেস রাখুন সেখানে এটা বিশেষ সম্পাদকীয় যাবে। আমি দ্রুত লিখে শেষ করব। পরদিন প্রথম পাতায় সেই সম্পাদকীয় নিয়ে সংগ্রাম প্রকাশ পেল। আর কোনো পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠায় এমন কোনো সম্পাদকীয় দেখিনি। সংগ্রামের ওই সম্পাদকীয়তে যতদূর মনে পড়ে, দুঃখ প্রকাশ, দুর্ভাগ্যের শিকার হতাহতের জন্য গভীর সমবেদনা এবং ঘটা দুর্ঘটনার ইমপার্শিয়েল তদন্তের দাবি ছিল। আসাদ ভাই অর্থনীতির ছাত্র ছিলেন বটে; কিন্তু খুব সতর্কভাবে জাতীয় স্বচ্ছতা সংহতির পক্ষে সোচ্চার ছিলেন, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের সমস্যাগুলো তার কলামকে সমৃদ্ধ করত। তার ইতিহাস নিয়েও আগ্রহের ফসল হিসেবে অন্তত দুটো ইতিহাস নিয়ে গবেষণামূলক বই রয়েছে। হ্যাঁ, তিনি থ্রিলার লিখতেন। তবে ওই সব জনপ্রিয় থ্রিলারগুলো কখনোই আজগবি কোনো গল্প ছিল না ভূগোল ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু ছিল না। সেখানে একটা জাগরণী মন্ত্র থাকত, যা তরুণদের স্বজাতীয় চেতনা, ইতিহাস জ্ঞানের দিকে আকৃষ্ট করত। দুর্ভাগ্য হচ্ছে এ অজাত শত্রু, নিবেদতি প্রাণ বয়োজ্যেষ্ঠ এবং অসুস্থ সাংবাদিককে অকারণে পতিত সরকারের রোষানলে পুড়তে হয়েছিল। অসুস্থতা নিয়ে জেলজীবন অতিবাহিত করেছেন। প্রার্থনা করি, স্রষ্টা তার নেক হায়াত দান করুন।
দৈনিক সংগ্রামে কাজ করার সময় আর্থিক কষ্টটা কখনোই আমার কাছে খুব বড় কিছু ছিল না। সেখানে সম্পাদক থেকে নিচ পর্যন্ত একজন একজন অফিস সহকারীর কাছ থেকে ভালোবাসা পেয়েছি তা সারা জীবন মনে থাকবে। কর্মকর্তাদের মরহুম সাত্তার, এমদাদ সাহেব, মরহুম মোতাহার সাহেব, আবুল হোসেন চৌধুরী প্রমুখের সার্বক্ষণিক সহযোগিতা পেয়েছি। আমাদের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের মুখে শুনেছি সংবাদপত্রের অফিসের একটা অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো সংবাদপত্র অফিসটা হলো ক্লাবের মতো, সেখানে সিরিয়াস রিপোর্ট হবে, তবে গোমরা মুখে নয়, চা আর ডালপুরি খেতে খেতে।
দৈনিক অর্থনীতির সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়েছিলেন জাহিদুজ্জামান ফারুক ভাই। চা খাওয়ার একপর্যায়ে ফারুক ভাই বললেন, বাবর আসুন আমরা অর্থনীতিতে একসাথে কাজ করি। আমি জবাবে হ্যাঁ-না কিছুই বললাম না। আমি বললাম, ফারুক ভাই আমাকে নিয়ে কাজ করতে আপনি ও আপনার পত্রিকার পরিচালনা পর্ষদ কি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে? আমি সংগ্রামে কাজ করেছি। তার জবাবটা ছিল এমন, আমি তো বাবরকে এখানে কোনো পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি না। আমি মনে করি বাবরকে তো আউট রাইট একজন প্রফেশনালিস্ট হিসেবেই আমাদের সাথে কাজ করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছি। এসব নিয়ে আর কোনো বাক্যালাপ হলো না আমাদের। পরদিনই আমাকে কাজে যোগ দিতে বলা হলো। আমি যার স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছি তিনি শুধু আমার গুরুজন নয়; দেশের প্রখ্যাত একজন সাংবাদিক। মঞ্জুরুল আহমদ, আমাদের শ্রদ্ধেয় মঞ্জু ভাই। তিনি এক সময় দৈনিক বাংলায় চিফ, সিটি এডিটর ছিলেন। মঞ্জু ভাইয়ের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন আহমদ হুমায়ুন।
সম্পাদক হিসেবে যার যশ-খ্যাতি, জ্ঞান গরিমা ছিল পর্বতের শিখর স্পর্শই। যাই হোক, মঞ্জু ভাই আমেরিকা চলে যাবেন। সেজন্যই আমাকে অর্থনীতির চিফ রিপোর্টারের দায়িত্ব দিলেন। আমার তৃতীয় সম্পাদক ছিলেন জাহিদুজ্জামান ফারুক ভাই। এক সময় তিনি ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের অর্থনৈতিকবিষয়ক তুখোড় একজন সাংবাদিক। তখন আমি দৈনিক সংগ্রাম থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছিলাম মাত্র। তখনো সংগ্রাম থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেইনি। বাসায় বসেই সময় তখন কাটত। এমন সময় একদিন ফারুক ভাই আমাকে ফোন দিলেন। জানতে চাইলেন কেমন আছি। উত্তরে বললাম আলহামদুলিল্লাহ। তারপর বললেন, কাল বেলা ১১টার দিকে দৈনিক অর্থনীতির অফিসে আমার সাথে একবার দেখা করতে পারবেন। উত্তর দিলাম জি ফারুক ভাই পারব। টেলিফোন পাওয়ার পর ভাবছিলাম ফারুক ভাই কেন আমাকে ডাকলেন। কোনো সদোত্তর মন থেকে এলো না। যাক পরদিন সময় মতোই ফারুক ভাইয়ের সাথে দেখা করলাম। তিনি চা খেতে দিলেন, সাথে সাথে উভয়ের একসাথে রিপোর্টিং করার দিন স্মৃতিচারণ করলেন।
অর্থনীতি আমি যাদের নিয়ে কাজ করব। তাদের অনেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বে সাথে অনার্স-মাস্টার্স সব শেষ করেছে। তাদের অন্যতম ছিল সৈয়দ শামসুজ্জামান নিপু। নিপু আজো নয়া দিগন্তে আমার একজন সফল সক্রিয় সহকর্মী। দ্বিধাহীনভাবে বলব সে দেশের একজন অনন্য সাধারণ অর্থনৈতিক প্রতিবেদক। সে এখন দৈনিক নয়া দিগন্তের বিশেষ সংবাদদাতা।
যাই হোক, দৈনিক অর্থনীতিতে সে মূলত অর্থনীতি নিয়েই কাজ করত। আর আমি ছিলাম প্রকৃত অর্থেই রাজনৈতিকবিষয়ক একটি দৈনিক। আমি ছিলাম তার চিফ রিপোর্টার। অর্থনীতি বিষয়ে আমার পুঁজি ছিল। প্রেস ইন্সটিটিউট কর্তৃক আয়োজিত অর্থনৈতিক রিপোর্টিং করা সংক্রান্ত এক সপ্তাহের একটি কোর্সে অংশ নেয়া, যেটা দৈনিক সংগ্রামে থাকাকালীন সময়েই করেছিলাম। তবে আমার সৌভাগ্যই বলতে হবে আমার তরুণ রিপোর্টার সঙ্গীরা। চমৎকার কাজ করে দৈনিক অর্থনীতিকে অর্থনীতির স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত করতে পেরেছিল। তবে অর্থনীতিতে কাজ করার সময় বেশ কিছু সমস্যায় আমাকে পড়তে হয়েছিল। মাত্র দু’মাসের মাথায় ফারুক ভাই একদিন আমাকে ডেকে একজন রিপোর্টারের নাম উল্লেখ করে বললেন। ওকে বাদ দিন। আমি ফারুক ভাইকে বললাম নন্দীকে বাদ দেয়া হলে আপনার ও আমার দু’জনেরই বদনাম হবে। বললাম বাইরে বলাবলি হবে চিফ রিপোর্টারের কূটপরামর্শ আপনি বাদ দিচ্ছেন। নন্দী সনাতন ধর্মাবলম্বী। ওকে তো অযোগ্যতার জন্যই বাদ দিতে বলছেন। মনে মনে ভাবলাম, দোষ তো নন্দীর নয়; যখন ওকে নেয়া হয়েছে তখন সবকিছু যাচাই বাছাই করে নিলেই হতো। এবার আমি ফারুক ভাইকে বললাম, আমাকে তিন মাস সময় দিন। সে তিন মাসে ওকে যোগ্য করার চেষ্টা করব। ফারুক ভাইয়ের কথা শেষে নন্দীকে ডাকলাম, ওর সমস্যাটা বুঝতে চেষ্টা করলাম। ফারুক ভাইয়ের সাথে আমাদের নেপথ্যের আলাপের কোনো কথা কিছুই বললাম না। ওকে শুধু বললাম, একদিন পরপর আমরা দু’জন একসাথে বসে চা খাবো, আলাপ করব। এমন আলাপের দু’মাসের মাথায় নন্দী অর্থনীতির রিপোর্টার হিসেবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। ফারুক নন্দীকে নিয়ে আর কখনোই কিছু বলেনি।
ফারুক নিজে দৈনিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন কি না জানতে পারিনি। তবে আমার মতো হয়তো অনেকেই স্বপ্ন দেখাতে পেরেছিলেন। একদিন ফারুক ভাই রাতে আমার কাজ শেষে তার চেম্বারে ঢেকে পাঠালেন। আমার হাতে একটি ব্যাংকের চিঠি দিয়ে বললেন পড়–ন। চিঠিটা ফারুক ভাইকে দেয়া হয়েছে। আসলে চিঠিটি ছিল একটি বিরাট অঙ্কের টাকার ঋণদানের অনুমোদনপত্র। হঠাৎ কেন যেন আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগল জানি না, জিজ্ঞাসা করলাম ফারুক ভাই, পত্রিকার জন্য প্রেস কেনা বাবদ এই বিপুল পরিমাণের ঋণ পত্রিকার কোম্পানির নামে না দিয়ে আপনার নামে দিলো কেন। তিনি হেসে বললেন, এ টাকা কি আমরা ফেরত দেবো। কোম্পানির নামে দেয়া হলে ডিরেক্টররা সবাই ঋণ খেলাপি হবেন। আমাদের ডিরেক্টররা তো সব ‘বিগসট’ ঋণখেলাপি হলে তাদের সমস্যা হবে। সেজন্য এটা একটা কৌশল। আমি তো ব্যবসায়ী নই। তার কথায় বেশ ধাক্কা খেলাম। এরপর চিফ রিপোটারীর সাথে আমার আর একটা কাজ শুরু হলো। প্রায় রাতে সরকারের খাসজমি দেখতে যাওয়া মতিঝিলে বিমান বাংলাদেশের অফিস বলাকা ভবন ৮ তলা থেকে অফিস সরানো ও সাথে প্রেস বসানোর জমি দেখা।
ফারুক ভাইয়ের সাথে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ঘরানার অনেকেই বলাকা ভবনের অর্থনীতির অফিসে যাতায়াত করতেন। এক সময়ের অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া সাহেব। একদিন ব্যারিস্টার মওদূদ আহমদ অফিসে এলেন, ফারুক ভাই তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে মওদূদ ভাই বললেন, বাবরকে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে না। ওকে চিফ রিপোর্টার করেছ, ‘ইটস্ ইওর বেস্ট চয়েজ।’ অর্থনীতিতে যোগ দেয়ার পরপরই সাবেক সচিব শাহ আবদুল হান্নান ভাইকে দেখে তো হতবাক। পরে শুনলাম তিনি সপ্তাহে দু-তিন দিন আসেন এবং দৈনিক অর্থনীতিতে এডিটোরিয়াল লেখেন। অফিসে এসে তিনি কাজে ব্যস্ত থাকতেন। আমিও তেমনি, তাতে আমার সাথে তেমন কথা হতো না।
অর্থনীতিতে কাজ করাকালে আমার সময় ভালো কাটছিল। সম্পাদক, নির্বাহী সম্পাদক এবং সব সাংবাদিকসহ অন্য সহকর্মীদের সাথে আমার চমৎকার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। অর্থনীতিতে মোট ১৫ মাস আমি কাজ করেছি। সময়টা আমার জন্য খুবই উপভোগ্য ছিল। তবে দিন তো সমান যায় না। অর্থনীতির সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা নিয়ে অসন্তুষ্টি ছিল। তবে আমার তেমন নয়। আমার সাথে এসব নিয়ে কথা বলেই আমি সেখানে যোগ দিয়েছিলাম। তবে সেখানে যোগ দেয়ার পরই আর সবার বেতনের বিষয়টি আমি জেনেছি। সেখানে কাজে যোগ দেয়ার কিছু দিন পর ফারুক ভাইয়ের কাছে বিষয়টি তুলে ধরলে তিনি আশ্বাস দিলেন বিষয়টি তিনি দেখবেন। সেই সাথে এ কথাও বললেন আপনি তো বুঝতে পারেন। দৈনিক অর্থনীতির আর্থিক ভিত্তিটা এখনো দুর্বল। এটাকে সবার মাথায় রাখতে হবে। তবে এটা সবার জন্যই স্বস্তির ছিল যে, প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহ অতিক্রম করার আগেই সবাই বেতনটা পেয়ে যেত। আমাকে একটু বেশি সম্মান দেয়া হতো। ক্যাশিয়ার মহোদয় নিজে আমার বেতনটা ডেস্কে এসে দিয়ে যেতেন। ফারুক ভাইয়ের সাথে বেতন নিয়ে কথা বলার পর, পরের মাসে আমিসহ সব সাংবাদিকের বেতন কিছুটা বেড়েছিল। অন্যান্য বিভাগে কী করা হয়েছিল বলতে পারব না, তবে গোল বেঁধেছিল তপন নামের এক সি. রিপোর্টারকে নিয়ে। এবার বেতন বৃদ্ধির সময় তার বেতন তুলনামূলক কম বৃদ্ধি পায়। তবে তার বেতন তখনো সব রিপোর্টারের অনেক বেশিই ছিল। তপনের অসন্তুষ্টিজনিত যে আচরণের কথা আমি শুনেছি, সেটা হয়তো ঠিক ছিল না। তার উচিত ছিল তার অসন্তুষ্টি বিষয়টি প্রথমে আমাকে জানানো। সে সেটা করেনি; বরং কিছুটা অনিয়ম করেছিল। যে অঙ্কের টাকাটা তার বেড়েছিল, সেটা সে সম্পাদক মহোদয়ের চেম্বারের সম্মুখে গিয়ে কাগজি নোটগুলো ছিঁড়ে ফেলে আসে। বিষয়টি আমি শুনেছি, কিন্তু স্বচোখে দেখিনি। এ তথ্য ফারুক ভাইয়ের কানে গেলে তিনি ক্ষিপ্ত হন। দু’দিন পর তিনি আমাকে ডেকে সরাসরি বলে দিলেন ওকে দ্রুত ছ্যাক করুন। আমি কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি কিছুই বললেন না। তবে কারণ যে কী সেটা আমার অজ্ঞাত ছিল না। কিন্তু আবারো একজন সনাতন ধর্মাবলম্বীর বিষয়টা হওয়ায়; আমি কিছুটা বিব্রতবোধ করছিলাম। বিষয়টি যদি নিয়মমতো হতো তবে তার এমন আচরণের জন্য কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়াটাই ঠিক হতো। কিন্তু সরাসরি আমার পক্ষে ছ্যাক করার সিদ্ধান্তটিকে সায় দেয়া সম্ভব ছিল না। আমি তখন সিদ্ধান্ত নিলাম এভাবে একের পর এক এমন সব স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে বিব্রতর পরিস্থিতির মধ্যে থাকাটা আমার জন্য অস্বস্তিকর হবে। তাই ফারুক ভাইকে জানালাম, আমি আর অর্থনীতিতে থাকতে চাচ্ছি না। আমি যেদিন অর্থনীতিতে শেষ অফিস করলাম, ফারুক ভাই রাতে তার গাড়িতে উঠিয়ে আমাকে নিয়ে ঢাকা শহরে অনেক স্থানে ঘুরলেন। আমাকে একটা কথা বারবার বলেছিলেন, ‘বাবর আমরা অর্থনীতির শেষ দিন পর্যন্ত একসাথে কাজ করতে চাই। আমি বিবেচনার আশ্বাস দিয়ে মগবাজারে এসে তার গাড়ি থেকে নেমে পড়ি। তারপর আর আমি অর্থনীতির অফিসে যাইনি। আমার অর্থনীতিতে থাকার দিন ছিল এক কথায় চমৎকার। আর একটা কথা না বলা হলে অর্থনীতিতে আমার সহকর্মী রিপোর্টারদের সাথে চরম অসৌজন্যের হবে। সেটা হলো অর্থনীতির রিপোর্টাররা আমাকে অনাড়ম্বর এক বিদায়ী অনুষ্ঠান করে আমার প্রতি তার ভালোবাসাটা জানিয়েছিল। সেদিনের স্মৃৃতিটা অনন্য।
আমার চতুর্থ সম্পাদক বা আমার বর্তমান সম্পাদক জনাব আলমগীর মহিউদ্দিন এক নিখাঁদ ভদ্রলোক। আমি তার ছায়ার নিচে বসে দীর্ঘদিন কাজ করে আসছি। একান্ত স্বচ্ছন্দ চিত্ত ও নির্বিঘেœ। তিনি এখন বড় একা মানুষ, শিশুর মতো সরল মানুষটি খুব সামান্যতে খুশি হয়ে যান। তার স্ত্রী অর্থাৎ আমাদের ভাবী মৃত্যুর পর তিনি এখন যেন অন্য এক মানুষ। আজ তার সেই মুখরতা আজ নেই।
আমার সাংবাদিকতার জীবন শুরুর আগে মনে কখনো সাংবাদিকতা নিয়ে তেমন কোনো আগ্রহ ভাবনা ছিল না। সংগ্রাম বের হবার পূর্বে সংবাদপত্র সম্পর্কে কিছু ধারণা তৈরির জন্য কয়েক ক্লাসে যোগ দিয়েছিলাম মাত্র। সংগ্রাম কর্তৃপক্ষই তার আয়োজন সেই ১৯৭৬ সালের একেবারে শেষ প্রান্তে। তবে বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউট ১৯৮০ নভেম্বরের প্রথম থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝ দিক পর্যন্ত তিন মাসব্যাপী একটি সাংবাদিকতার বুনিয়াদি কোর্স করাসহ কূটনীতিবিষয়ক এবং অর্থনীতিবিষয়ক দু’টি কোর্স করা সুযোগ আমার হয়েছিল। তখন প্রেস ইন্সটিটিউটের ভাবমর্যাদা অনেক উঁচুতে ছিল। তখন এ প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর জেনারেল ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক আবদুল তোয়াব খান। নতুন দিনের নতুন ধারণা নতুন অঙ্গসজ্জা নিয়ে যে দৈনিক বাংলা তখন প্রকাশিত হচ্ছিল। তার সূচনা হয় যখন দৈনিক বাংলার সম্পাদক আবদুল তোয়াব খান। সেই দৈনিক বাংলার সৌকর্য আর মানের সমৃদ্ধি বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল, যখন আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় আহমেদ হুমায়ুন দায়িত্ব নিয়েছিলেন। সাংবাদিকতা এবং সাংবাদিক ইউনিয়নের সর্বোচ্চ ফোরাম বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে তার অবদান অবিস্মরণীয়। আমার আরো একটা আনন্দের বিষয়। আমি হুমায়ুন নির্বাচিত পরিষদের (তথা বিএফইউজের) বয়োকনিষ্ঠ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলাম। যাক তোয়াব ভাই সম্পর্কে আমার অনেক কথা বলার আছে। সেটা না হয় আজ থাক। তার সেই প্রতিষ্ঠান থেকেই আমি সাংবাদিকতার পাঠটাই গ্রহণ করি। মরহুম তোয়াব ভাই, আমার ব্যক্তিগত জীবনের একটা স্পর্শকাতর জায়গা অবস্থান করছেন এখনো। আমার বাবা ১৯৮১ সালে ৫ মার্চ মৃত্যুবরণ করে। বাবার মৃত্যুর দু’দিন পর ডাকযোগে একটা চিঠি পেয়েছিলাম। সে চিঠিটা ছিল তোয়াব ভাইয়ের কাছ থেকে আসা। বাবার মৃত্যুতে তার স্বহস্তে লেখা একটা শোক বাণী, তাতে তিনি আমার প্রতি পিতার মৃত্যুতে গভীর সমবেদনা জানিয়েছিলেন।
