রাষ্ট্র এবং সরকার দুটো সম্পূর্ণ আলাদা সত্তা। বৈষম্যবিরোধি আন্দোলনের পেক্ষাপটে স্বাধীনতার নতুন স্বাদ লাভের যে সম্ভাবনা সমুজ্জ্বল হয়ে উঠেছে সে মুহূর্তে দেশের আর্থসামাজিক রাজনৈতিক ক্ষেত্রের সালতামামি ও সুরতহাল পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনায় এ বিষয়টি সর্বাগ্রে উঠে আসে যে, যখন এবং যতক্ষণ রাষ্ট্র এবং সরকার যথা সচেতনতায়, যতেœ ও যৌক্তিকতায় নিজ নিজ অবস্থানে অধিষ্ঠান সম্ভব হয়েছিল তখন সার্বিক উন্নয়ন (মানবাধিকার, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতা ও সামাজিক সংহতি, সার্বভৌমত্ব এমন কি আঞ্চলিক অখণ্ডতা) টেকসই হওয়ার পথে ছিল। প্রকারান্তরে যখনই সরকার সীমালঙ্ঘন করে রাষ্ট্রকে টপকাতে, অধিগ্রহণ বা বশ্যতা স্বীকার করাতে সক্ষম বা বাধ্য করেছে তখনই দেশ জাতি সমাজ ও অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে এসেছে, যার টাটকা উদাহরণ আজ সবার সামনে দণ্ডায়মান।
যে কর্মকাণ্ড নৈতিকতা-বিবর্জিত, সুশাসন, স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিতা যেখানে জবুথবু অবস্থায়, যা সম্পাদনের দ্বারা অন্যের মৌলিক অধিকার হরণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বঞ্চনা ও বৈষম্যের পরিবেশ সৃষ্টি হয়- তা যদি আসে ব্যক্তির মাথা থেকে রাষ্ট্রের গোটা শরীরের জন্য তা সৃষ্টি করে মহা দুর্গতি। সুতরাং ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া (কজ অ্যান্ড ইফেক্ট) উভয়ের মধ্যেই ব্যক্তি স্বার্থের সাথে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সঙ্ঘাতময় সৃষ্টি করবেই। ব্যক্তির চিন্তাভাবনায়, পরিকল্পনায়, সম্পাদনে, ফলাফলে প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রের সর্বত্র ন্যায়নীতি নির্ভরতার অনুপস্থিতির মধ্যেই দুর্নীতির আদি অকৃত্রিম অধিবাস। দুর্নীতি শুধু দৃশ্যমান অন্যায় অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ, তহবিল তছরুফ, ক্ষমতার অপব্যবহার, সম্পদের অপচয়, প্রতারণায় সীমাবদ্ধ নয়- দুর্নীতির ষড়যন্ত্রকেও দুর্নীতির এখতিয়ারভুক্ত করার বিধান রয়েছে। যে পরিবেশে দুর্নীতি সংঘটিত হয়ে থাকে সেই পরিবেশকে এবং সেই পরিবেশ সৃজনকারীকেও দুর্নীতির এজাহারভুক্ত করা যেতে পারে। সুতরাং নীতি ও নৈতিকতার অভাবে ভৌত ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি, অপচয়, অপব্যয়, আত্মসাৎ তছরুফ, চিন্তা কর্মে ধ্যানে-জ্ঞানে অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ- সবই দুর্নীতি। দুর্নীতির বুৎপত্তিগত বিস্তার ব্যাপক, যেমন- প্রতিষ্ঠিত সত্যকে অস্বীকার, প্রচলিত নৈতিক ধ্যান-ধারণাকে এড়িয়ে চলা, মানসিকভাবে প্রতিবন্ধিত্ব বরণ, স্বচ্ছতা ও সুশাসনের অভাব, চিন্তাভাবনায় একদেশদর্শিতা, অসদাচরণ, অসততা, অসাধুতা, অমিতাচার, অনুচিত, অশোভন, অসমীচীন, অন্যায়, দলীয়করণ ও পক্ষভুক্তকরণ, নিষ্ঠুর আচরণ, ন্যায়বিরুদ্ধতা সবই দুর্নীতির সংসারে শরিকানাভুক্ত।

সংবিধানের অধীনে বিশেষ ব্যবস্থায় চারটি বিশেষ উপকরণ নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়। এই উপাদানগুলো হচ্ছে- নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সার্বভৌমত্ব, নির্দিষ্ট জনসংখ্যা এবং জনগণের দ্বারা গঠিত সরকার। এর মধ্যে সরকার হচ্ছে সবচেয়ে স্পর্শকাতর নিয়ামক এবং একমাত্র পরিবর্তনশীল উপকরণ। বাকি তিনটি রাষ্ট্রের এখতিয়ার এবং স্থায়ী উপাদান। সরকার হচ্ছে একটি দেশের জনগণ এবং সম্পদের পাহারাদার, রাষ্ট্র্র পরিচালনায় ব্যবস্থাপক মাত্র। রাষ্ট্র্রের নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব ছাড়া সরকারের নিজস্ব কোনো সম্পদ বা শক্তি অর্জন বা সৃষ্টি বা দায়িত্ব থাকে না। সাধারণভাবে যাকে সবাই সরকারি সম্পদ বলে মনে করে তা আসলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ, যার জিম্মাদার হচ্ছে সরকার। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হয় সরকারের ওপর। বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় (প্রিঅ্যাম্বল) প্রথমেই উল্লিøখিত ‘আমরা বাংলাদেশের জনগণ’, সেই জনগণ যদি কোনো সরকারকে উপযুক্ত মনে না করে তাহলে সেই সরকার পরিবর্তিত হতে পারে। তবে রাষ্ট্র থাকে অপরিবর্তনীয়। রাষ্ট্রের কোনো পরিবর্তন নেই। কথায় আছে- হাকিম নড়বে কিন্তু হুকুম নড়বে না।
সরকার বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় নিয়ন্ত্রণাধীনে রাষ্ট্র পরিচালনা করে থাকে। সব প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ামক শিরোমনি এমন কিছু মহাপ্রতিষ্ঠান থাকে যা দায়মুক্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত যেমন- প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী বা সুশীল সেবক (পাবলিক সার্ভেন্ট) নিয়োগ সুপারিশের জন্য একমাত্র প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা পাবলিক সার্ভিস কমিশন, রাষ্ট্রের সমুদয় হিসাব সংরক্ষণ ও নিরীক্ষা বিধায়ক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল, নির্বাচন অনুষ্ঠান আধিকারিক নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগের প্রধান বিচারপতি ইত্যাদি- এগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীন। কর্মচারী নিয়োগে, রাষ্ট্রের সম্পদের ব্যবহারের হিসাব সংরক্ষণ ও নিরীক্ষণে, রাষ্ট্র্র পরিচালনার জন্য সরকার নির্বাচনে এবং সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠা প্রয়োগে বিচার ব্যবস্থাপনায় প্রজাতন্ত্র বা রাষ্ট্র্রের একমাত্র এখতিয়ারে কোনোভাবেই সরকার হস্তক্ষেপ, প্রভাব খাটানো, অনুরাগ বা রাগের বশবর্তী হয়ে জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ, বিভাজন সৃষ্টি করতে পারবে না। এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর কোনো সরকার কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে পারে না; বরং সরকারের ওপর এসব প্রতিষ্ঠানের প্রভাব প্রাধান্য থাকাটাই সাংবিধানিক বিধান। যদি সরকার এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব বিস্তার করে, নিয়ন্ত্রণ করে তাহলে তারা তাদের দায়িত্ব পালন প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং এভাবে তারা তাদের দায়িত্ব পালনে অপারগ হলে তাতে রাষ্ট্রের চেয়ে সরকারেরই ক্ষতি বেশি। এ চার প্রতিষ্ঠান ছাড়াও আরো কিছু প্রতিষ্ঠান আছে যেগুলোর ওপর সরকারের প্রভাব বিস্তারের কোনো অবকাশ নেই। যেমন- দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, জনসেবাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনী। সমাজে সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় এসব সংস্থাকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের আবশ্যিকতা অনস্বীকার্য। এসব নিয়ন্ত্রক সংস্থা রাষ্ট্রের পক্ষে সঠিক ভূমিকা পালনের পরিবর্তে তারা তাদের, এসব সংস্থা যদি সরকারের আজ্ঞাবাহক হয়ে পড়ে তখন তাদের পক্ষে ‘রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে’ দায়িত্ব পালন সম্ভব হয় না, ফলে সমাজে নীতি-নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিবেশ প্রতিষ্ঠত হয় না এবং এর জন্য আল্টিমেটলি সরকারই আত্মঘাতী ইমেজ সঙ্কটে পড়ে।

এটি মানতেই হবে, শোষণ বঞ্চনা আর বণ্টন-বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার বাঙালির ঐতিহাসিক মুক্তির সংগ্রামের প্রকৃত অর্জন বা বিজয় বিবেচনার জন্য বিগত পাঁচ দশকের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিবেশ পরিস্থিতিতে ‘আমরা বাংলাদেশের জনগণ’-এর অধিকার রক্ষার প্রত্যয় ও প্রতীতি জাগ্রত রাখার ও থাকার কোনো বিকল্প ছিল না। সবার উপর মানুষ সত্য তার উপরে নাই। মানুষই বড় কথা। এই মানুষের দায়িত্ববোধের দ্বারা কর্তব্যকর্ম সুচারু রূপে সম্পাদনের মাধ্যমে সমাজ সমৃদ্ধি লাভ করে। আবার এই মানুষের দায়িত্বহীনতার কারণে সমাজের সমূহ ক্ষতি সাধিত হয়। মানবসম্পদ না হয়ে সমস্যায় পরিণত হলে সমাজের অগ্রগতি তো দূরের কথা সমাজ মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি সভ্যতার বিবর্তনে সহায়ক হতে হয়। মানুষের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ কিংবা মারণাস্ত্রে মানুষের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। মানবতার জয়গান মানুষই রচনা করে আবার মানবভাগ্যে যত দুর্গতি তার স্রষ্টাও সে। মানুষের সৃজনশীলতা, তার সৌন্দর্যজ্ঞান, পরস্পরকে সম্মান ও সমীহ করার আদর্শ অবল¤¦ন করে সমাজ এগিয়ে চলে। পরমত সহিষ্ণুতা আর অন্যের অধিকার ও দাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার মাধ্যমে সমাজে বসবাস করার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সুতরাং সবার সহযোগিতা ও সমন্বিত উদ্যোগে সমাজ নিরাপদ বসবাসযোগ্য হয়ে উঠে। সমাজবিজ্ঞানীরা তাই মানুষের সার্বিক উন্নয়নকে দেশ জাতি রাষ্ট্রের সব উন্নয়নের পূর্বশর্ত সাব্যস্ত করে থাকেন। সমাজের উন্নতি, অগ্রগতি ও কল্যাণ সৃষ্টিতে মানুষের সার্বিক উন্নতি অপরিহার্য শর্ত। আগে সমাজ না আগে মানুষ এ বিতর্ক সর্বজনীন। মানুষ ছাড়া মনুষ্য সমাজের প্রত্যাশা বাতুলতামাত্র। সুতরাং একেকটি মানুষের উন্নতি সবার উন্নতি, সমাজের উন্নতি। একেক মানুষের দায়িত্ববোধ, তার কাণ্ডজ্ঞান তার বৈধ-অবৈধতার উপলব্ধি এবং ভালো-মন্দ সীমা মেনে চলার চেষ্টা-প্রচেষ্টার মধ্যে পরিশীলিত পরিবেশ গড়ে ওঠা নির্ভর করে। রাষ্ট্রে সব নাগরিকের সমান অধিকার এবং দায়িত্ব নির্ধারিত আছে। কিন্তু দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা অধিকার আদায়ের সম্ভাবনা ও সুযোগকে নাকচ করে দেয়। পণ্য ও সেবা সৃষ্টি না হলে চাহিদা অনুযায়ী ভোগের জন্য সম্পদ সরবরাহে ঘাটতি পড়ে। মূল্যস্ফীতি ঘটে, সম্পদ প্রাপ্তিতে প্রতিযোগিতা বাড়ে। পণ্য ও সেবা সৃষ্টি করে যে মানুষ সেই মানুষই ভোক্তার চাহিদা সৃষ্টি করে। উৎপাদনে আত্মনিয়োগের খবর নেই- চাহিদার ক্ষেত্রে ষোলআনা, টানাপড়েন তো সৃষ্টি হবেই। অবস্থা ও সাধ্য অনুযায়ী উৎপাদনে একেকজনের দায়িত্ব ও চাহিদার সীমারেখা বেধে দেয়া আছে কিন্তু এ সীমা অতিক্রম করলে টানাপড়েন সৃষ্টি হবেই। ওভারটেক করার যে পরিণাম দ্রুতগামী বাহনের ক্ষেত্রে, সমাজে সম্পদ অর্জন ও ভোগের ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রমণে একই পরিবেশ-পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে থাকে। সমাজে অস্থিরতা ও নাশকতার যতগুলো কারণ বিগত পাঁচ দশকে পরিলক্ষিত হয়েছে তার মধ্যে এই সম্পদ অবৈধ অর্জন, অধিকার বর্জন ও আত্মত্যাগ স্বীকারে অস্বীকৃতি মুখ্য। এবারের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে তার তীব্র প্রতিবাদ প্রতিফলিত হয়েছে।

সুশাসনের অবর্তমানে জবাবদিহিতাবিহীন পরিবেশে, আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতার অবয়বের (পধঁংব) অন্যতম প্রতিফল (বভভবপঃ) হলো দুর্নীতি। দুর্নীতি শুধু ব্যক্তিবিশেষ অর্থাৎ যে দুর্নীতি করে তাকে ন্যায়নীতিহীনতার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করে তা নয়, তার দ্বারা সমাজকে নেতৃত্বদান বা যেকোনো ক্ষেত্রে দৃঢ়চিত্ত অবস্থান গ্রহণে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে দেয়। সর্বত্র তাকে দুর্বল করে দেয়। দুর্নীতিবাজ নেতৃত্বের জন্য বা কারণে সমাজে আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হয়। নেতৃত্বের এই অধোগতির প্রেক্ষাপটই প্রত্যক্ষভাবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবজনিত পরিবেশ নির্মাণ করে। নেতৃত্বের কার্যকলাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা না থাকলে সমাজে সংসারে সে নেতৃত্বের অধীনে আস্থার সঙ্কট তৈরি হয়। এটি পরস্পর প্রযুক্ত সমস্যা। স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার অনুপস্থিতির অবসরে আত্মঘাতী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যেমন- যেকোনো সেবা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ। যেমন- স্বেচ্ছাচারিতায়, নানান অনিয়ম ও অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে শিক্ষায়তনে শিক্ষক, সুশীল সেবক, হাসপাতালে চিকিৎসক কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে কর্মিবাহিনী নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি, তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার সবই প্রশ্নবোধক হয়ে দাঁড়ায়। অর্থ বিনিময় ও নানান অনিয়মের কারণে যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে ভালো ও যোগ্য সুশীলসেবক, চিকিৎসক, শিক্ষক, আইনরক্ষক নিয়োজিত হতে পারে না। সুশীলসেবক, চিকিৎসক অমেধাবী ও অযোগ্য শিক্ষক এবং আইনরক্ষকের কাছ থেকে গুণগত মানসম্পন্ন প্রশাসনিক সেবা, চিকিৎসা, শিক্ষা বা তালিম বা অনুসরণীয় আদর্শ লাভ সম্ভব হয় না। অবৈধ লেনদেনে নিয়োগপ্রাপ্ত অযোগ্য সেবক, চিকিৎসক কিংবা শিক্ষকের কাছে কার্যকর সেবা, চিকিৎসা ও শিক্ষা পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। যেসব নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রচুর অর্থ আদান-প্রদানের মাধ্যমে নিয়োগবাণিজ্য চলে সেখানে মেধাবী ও উপযুক্ত প্রার্থীরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না। তাদের বিপরীতে নিয়োগ পায় অদক্ষ-অযোগ্য লোক। এটি একটি দিক। আরেকটি দিক, কেউ বিশেষ গোষ্ঠীর সমর্থক হয়ে এবং অবৈধভাবে অর্থ দিয়ে নিয়োগ পেলে সে প্রথমে চাইবে গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে সেবা, চিকিৎসা ও শিক্ষার পরিবেশকে বিপন্ন করে ওই অর্থ তুলতে। সে ক্ষেত্রে সে প্রয়োজন হলে যেকোনোভাবে (কর্তব্য দায়িত্বহীন হয়ে, প্রশ্নপত্র ফাঁস করা থেকে শুরু করে নানা ফাঁকি জঁকি ও পক্ষপাতিত্ব অবলম্বন করে) ইচ্ছা করে নীতি-নৈতিকতা ভুলে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থ উঠিয়ে নেবে। তখন সে তার চাকরি বা দায়িত্বশীলতার দিকে নজর দেবে না। কোনো পদপ্রাথী কর্তৃক কোনো সংস্থা ও সংগঠনে স্রেফ প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার সময় কিংবা কোনো সংস্থায় নিয়োগ পাওয়ার সময় যে অর্থ ব্যয় করে তা নিঃসন্দেহে একটি মারাত্মক মন্দ বিনিয়োগ। এতে সমাজ দুই দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রথমত, একজন ভালো যোগ্য প্রার্থীর স্থলে একজন দুর্নীতিবাজ অদক্ষের অবস্থান সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং দ্বিতীয়ত, সে চিকিৎসা কিংবা লেখাপড়ার পরিবেশ বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে এমনভাবে কুলষিত করতে পারে তাতে যুগ যুগ ধরে দুষ্ট ক্ষতেরই সৃষ্টি হয়।

এই মুহূর্তে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রাক্কালে সর্ববিধ বিবেচনায় ‘আয়নাঘরের’ নির্যাতন, নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু, রাজপথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে বিরোধ এবং ক্ষেত্র বিশেষে তাদেরও বেপরোয়া আচরণ, বিদেশে বিপুল অর্থপাচারের মতো অর্থনীতির সমূহ সর্বনাশ সাধন, সেবাধর্মী সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির প্রতিকার না পাওয়ার মতো বিষয়গুলো দিন দিনই সাধারণ মানুষকে যাতে আরো উদ্বিগ্ন করে না তোলে, কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কার্যকলাপ জবাবদিহিতার বাইরে চলে যাওয়ার মতো ঘটনার প্রতিকার পেতে একজন সাংবিধানিক ন্যায়পালের আবশ্যকতা উঠে আসবে। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করছেন, ন্যায়পাল সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে, সরকারি প্রতিষ্ঠানকে আনবে জবাবদিহিতার মধ্যে, একজন ন্যায়পাল থাকলে সরকারকে মুখোমুখি হতে হবে না অনেক বিব্রতকর পরিস্থিতিরও। চাণক্য পণ্ডিতের মতো অনেকে এটিও বলছেন, ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠান সরকারের প্রশাসনকে করতে পারে শক্তিশালী। কেননা, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে সরকারের প্রতি আস্থা হারাতে পারে সাধারণ মানুষ- রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি এই আস্থাহীনতাই জন্ম দেয় সামাজিক অনাচার ও রাজনৈতিক সহিংসতার।
লেখক : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান