৫ আগস্টকে বলা হচ্ছে, দ্বিতীয় স্বাধীনতা দিবস। আবার কেউ বলছেন- বিপ্লব দিবস। কেউ কেউ দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করছেন। এই বলাবলির মধ্যে যুক্তি আছে, আবেগও আছে। সমসাময়িককালের ঘটনার মূল্যায়ন সঠিক হয় না। আমরা ৫৩ বছর আগের ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা কি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পেরেছি? নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে বিশ্লেষণপূর্বক সর্বজনগ্রাহ্য তথ্যভিত্তিক কোনো ইতিহাস গ্রন্থ প্রণয়ন করতে পেরেছি? না, পারিনি। যারা যখন ক্ষমতায় আসীন থেকেছেন, তারা তাদের দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিহাস লিখিয়েছেন। এমনকি ১৯৪৭-এর ভারত বিভক্তির ওপর নিরপেক্ষ ইতিহাস প্রণীত আজও হয়নি। এ ক্ষেত্রে মুসিলম জনগোষ্ঠীর চরম ব্যর্থতা লক্ষ্য করার মতো। হিন্দুরা ভারত বিভক্তির ইতিহাস নিয়ে ম্যালা গ্রন্থ রচনা করেছেন। যেসব গ্রন্থ মোটেও নিরপেক্ষ নয়। ১৯৪৭-এর দাঙ্গার ওপর আমার কাছেই বেশ কয়েকটি গ্রন্থ আছে, যার ভেতর দাঙ্গার জন্য মুসলিমদের একমাত্র দায়ী করা হয়েছে সরাসরি। এ ব্যাপারে মুসলিম লেখকদের উদ্যোগী হতে দেখা গেছে কম। যাক, আমার আলোচ্য বিষয় ১৯৪৭ পূর্ব ও পরবর্তী ইতিহাস নয়। ১৯৭১ ও ২০২৪-এর দুই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে।
বিগত শতাব্দীতে পৃথিবীবাসী তিনটি ‘বিপ্লব’ দেখেছে। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লব (অক্টোবর বিপ্লব, বলসেভিক বিপ্লব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবও বলা হয়)। ১৯৪৯ সালের চীনে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। এবং ১৯৭৯ সালের ইরানে ইসলামী বিপ্লব। বিশ্ব ইতিহাসে আরেকটি বিপ্লব দুনিয়াকে প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল- ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯-১৭৯৩)। ফরাসি বিপ্লব সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতার সে্লাগান তুলেছিল। কিন্তু সেই বিপ্লব সামন্তবাদকে অপসারিত করে ‘বুর্জোয়া’ শ্রেণীকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছিল। তাই বিপ্লবের সময় উচ্চারিত সে্লাগানগুলো পরবর্তীকালে প্রতারণা রূপেই প্রতীয়মান হয়েছিল। রুশ বিপ্লবও হয়েছিল সাম্য, মৈত্রী, শ্রেণিহীন ও শোষণমুক্ত সমাজের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। লেলিন অক্টোবর বিপ্লবকে বিশ্ব বিপ্লবের অংশ হিসেবে মনে করতেন। তিনি আশা করেছিলেন ইউরোপের কয়েকটি দেশে এ বিপ্লব শুরু হবে। তেমন সম্ভাবনাও ছিল ব্রিটেন ও জার্মানিতে। স্ট্যালিন আবার বিপ্লব রফতানি করায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি মনে করতেন শুধু রাশিয়ায় এককভাবে সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে টিকে থাকবে না। দলভারী করতে হবে। ওই নীতির প্রকাশ ঘটে ধীরে ধীরে বুলগেরিয়া, চেকোসে্লাভাকিয়া, হাঙ্গেরি, পূর্ব জার্মান, পোল্যান্ড প্রভৃতি দেশে সমাজবাদী ধারা গড়ে উঠার মধ্য দিয়ে। কিন্তু ৭৪ বছরের মধ্যে সেই মানচিত্রের (সমাজতন্ত্র) প্রায় বিলুপ্তি ঘটে।
নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশের পতন বিশ্ব ইতিহাসে এক বড় ঘটনা শুধু নয়, চমকে দিয়েছিল বিশ্ববাসীকে। সামন্তবাদ, পুঁজিবাদের উত্থান পর্বে সমাজবাদের উত্থান বিশ্বকে প্রায় দুই ভাগে বিভক্ত করেছিল। তাই, ওই সব দেশে প্রতি-বিপ্লবের দ্বারা গণতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী বিশ্বে শামিল হওয়ার ঘটনাকে ‘নয়া বিশ্ব মেরুকরণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সোভিয়েত ইউনিয়নের আয়তন ছিল তখন দুই কোটি ২৪ লাখ বর্গকিলোমিটার। যা ইউরোপ মহাদেশের প্রায় অর্ধাংশ এবং এশিয়া মহাদেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকাজুড়ে অবস্থান করেছিল (১৯৯১ সাল পর্যন্ত)। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এক একটি রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর গোটা ভূ-খণ্ডের এক-ষষ্ঠাংশ স্থান অধিকার করে রেখেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে বৃহত্তম রাষ্ট্র। সোভিয়েত ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত প্রজাতন্ত্রগুলো- রাশিয়া, কাজাখস্তান, ইউক্রেন, তুর্কেমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, বেলারুশিয়া, কিরঘিজিয়া, তাজিকিস্তান, আজারবাইজান, জর্জিয়া, লিথুনিয়া, লাটভিয়া, এস্তোনিয়া, মলদাভিয়া ও আর্মেনিয়া।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার সময় মিখাইল গর্বাচেভ (১৯৩১-২০২২) ছিলেন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত দেশের সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট এবং কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল। গর্বাচেভ ছিলেন আধুনিকমনষ্ক ব্যক্তি। তিনি চেয়েছিলেন পুরনো চিন্তাধারার (মার্কস-লেনিন-স্ট্যালিন) পরিবর্তন এনে যুগোপযোগী করতে শাসনব্যবস্থা। তিনি তাই অর্থনৈতিক নীতির পরিবর্তন এনে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে শমিল বাজারব্যবস্থা প্রবর্তন করতে ‘পেরেস্ত্রকা’ নীতি এবং রাজনীতিতে সংশোধন এনে ধর্মের স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা যা গণতান্ত্রিক পথে হাঁটার মতো ‘গ্লাসনস্ত’ নীতি প্রবর্তন করেছিলেন। কিন্তু তখন সময় গড়িয়ে গেছে অনেক। ফুঁসে উঠেছে গোটা সোভিয়েত রাশিয়ার জনগণ। হাঙ্গেরি, চেকোসে্লাভাকিয়া তারাও আর দাঁড়িয়ে না থেকে সমাজতন্ত্র থেকে বের হয়ে যেতে গণতন্ত্রের আওয়াজ তোলে। ফলে বিশ্ব দেখতে পেল কী দ্রুত তাসের ঘরের মতো সমাজতন্ত্রের সৌধ ধসে পড়তে একে একে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন তারকা যুদ্ধে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত, তখনো মিখাইল গর্বাচেভ চিৎকার করে বলেছিলেন- ‘We need star peace, not star wars.’ কিন্তু গর্বাচেভের কথা তখন দেশের লোকই শুনছে না, পরদেশ শুনবে কেন! ব্যর্থ অভ্যুত্থানের মুখে গর্বাচেভ ক্ষমতা ছেড়ে দেন (২৫ ডিসেম্বর ১৯৯১)। এ পতন ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের করুণ টার্নিং পয়েন্ট। যা বিশ্বের মানুষকে জানতে দেয়া হয়নি।
সোভিয়েত ইউয়িনের পতনের কারণ বিশ্লেষণ করে অনেক গবেষণা গ্রন্থ প্রণীত হয়েছে। এখনো চলমান রয়েছে। আমাদের দেশেও সমাজতন্ত্রের তাত্ত্বিক বুদ্ধিজীবী ও লেখকরা বিশ্লেষণধর্মী গ্রন্থাদি লিখছেন। পশ্চিমবঙ্গের কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অপর পূর্ব-ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশের ভাঙাভাঙির সময় ওই সব দেশ ভ্রমণ করেন, সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করার জন্য। পরে তিনি একটি বই লেখেন- ‘ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ’। অনেক দেখা ঘটনা তিনি বর্ণনা করেছেন বইতে। ইতিহাসের আলোকে বিশ্লেষণও করেছেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করলে দুর্দান্ত দৃঢ়তার সাথে রুখে দেয়ার জোসেফ স্টালিনের প্রশংসা যেভাবে করেছেন, তেমনি তার নিষ্ঠুর গণহত্যার ইতিহাসও উল্লেখ করেছেন তিনি বইটিতে।
‘এখন সোভিয়েত ইউনিয়নের ঐতিহাসিকরাই নথিপত্র ঘেঁটে এই তথ্য উদ্ধার করেছেন যে, স্টালিনের নির্দেশে তার নিজের দেশের ৫০ মিলিয়ন বা পাঁচ কোটি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।’ (ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ, পৃষ্ঠা-৩২)।
হিটলারের আক্রমণে সোভিয়েত দেশে দু’কোটি মানুষ নিহত হয়েছে, আর স্টালিন মেরেছেন পাঁচ কোটি। এসব তথ্য আগে চাপা দেয়া থাকলেও ৯০-এর পটপরিবর্তনের পর এমন বহু ভয়াবহ তথ্য খোদ রাশিয়া থেকেই উঠে আসছে। রুশ বিপ্লব কৃতকার্যতা লাভের আগে জার-এর বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম আন্দোলনে কত লাখ কোটি জনগণের প্রাণ গেছে, তার হিসাব জানা মুশকিল। তাই মানব সভ্যতার ইতিহাসে সোভিয়েত ইউনিয়নের পৌনে এক শ’ বছরের ঘটনাপ্রবাহ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের এ জন্য জানা দরকার, কি কারণে একটি আদর্শনির্ভর বিপ্লব ধ্বংস হয়ে যায়। যদিও বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে সে বিশ্লেষণে যাবো না।
আমরা অপর বিপ্লবের দিকে (চীনা সমাজতন্ত্র) তাকাই- কী দেখতে পাবো, রুশ বিপ্লবের দ্বারা উৎসাহিত হয়ে মার্কস-লেলিনের আদর্শকে মূল চেতনা করে মাও সেতুঙ দীর্ঘ সংগ্রাম আন্দোলন লড়াইয়ের মাধ্যমে যে বিপ্লব সাধন করে সমাজতান্ত্রিক চীন (গণচীন) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা-ও এখন সংশোধনের পর্যায়ক্রমে সমাজতন্ত্র আদর্শ থেকে দূরে যোজন যোজন সরে গেছে। আজ চীনে সমাজতন্ত্র আদর্শ খুঁজতে গেলে হতাশ হতে হবে। সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পর চীনকেও বিশ্বের গতিপ্রবাহকে মেনে নিতে হয়েছিল। সংশোধনবাদিতার পথে হাঁটতে হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পুঁজিবাদের চালিকাশক্তি দেশগুলো সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে। এগিয়ে এসেছে চীনকে আর্থিক ও প্রযুক্তি সহায়তা দিতে। এ সময়ের চীনা নেতৃত্ব দেং জিয়াও পিং গয়রহ ভুলে গিয়েছিলেন মার্কিনিরা মাওয়ের সদ্য বিপ্লব-পরবর্তী সরকারের ওপর কিভাবে একের পর এক হামলে পড়েছিল। কিভাবে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্য চীনের এককালের চিয়াং কাই-শেককে ছয় হাজার কোটি টাকার অস্ত্র সাহায্য দিয়েছিল বিপ্লবকে ঠেকিয়ে রাখতে। ওই অস্ত্রের জোরে চিয়াং কাই-শেক যদি বিপ্লবকে পরাজিত করতে পারত, তবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরাই চিয়াং কাই-শেকের চীনকে শাসন করত, আর ওই ছয় হাজার কোটি টাকার বহু গুণে তারা উসুল করে দিতে পারত। কিন্তু তাদের দুর্ভাগ্য ওই ছয় হাজার কোটি টাকাই বরবাদ হয়ে গেল, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের সব আশায় ছাই দিয়ে মাও সে-তুঙ আর কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে চীন-বিপ্লব জয়ী হয়।
এরপর ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় বহুবার মার্কিনি ও সাম্রাজ্যবাদী দোসর শক্তি চীনের জন্য বিভীষণ হয়ে আঘাত করেছে- পারেনি চীনাদের তেমন ক্ষতি করতে। শেষ পর্যন্ত ৯০-এর দশকে বন্ধু বেশে (জর্জ বুশ) চীনের ভেতর ঢুকে পড়েছিল মার্কিনিরা প্রযুক্তি হস্তান্তরের কথা বলে। কিন্তু চীনারা চট করে বুঝে নেয় মার্কিনিদের প্রতারণার ফাঁদ। সরে আসে চুক্তি টুক্তি থেকে চীনারা।
তারপর? রাশিয়ার সাথে গাঁটছড়া বাঁধে চীন। চুক্তি স্থাপিত হয় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন (১৯৩১-২০০৭) এবং চীনের সংস্কারপন্থী নেতা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি সরকারপ্রধান প্রেসিডেন্ট দেং জিয়াও পিং (১৯০৪-১৯৯৭) এর সাথে। মূলত প্রযুক্তি উন্নয়নে সহায়তা দানের ওই ঐতিহাসিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি চীনকে আজ এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। এরপর চীনকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমাগোষ্ঠীর পেছন পেছন ঘুরতে হয়নি চীনকে। ৯০-এর দশকের ধসের মাধ্যমে রাশিয়া যে বিপর্যয়ের মধ্যে পতিত হয়েছিল তা সিকি শতাব্দীর ব্যবধানে রাশিয়াও কাটিয়ে ওঠে। বিশ্বশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবির্ভূত হয় ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বে। রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়। মার্কিন ও পশ্চিমা যৌথশক্তির সাথে লড়াই করে টিকে থাকার সক্ষমতা রাখে তারা। এর পেছনে অবশ্য চীনের সমর্থন এবং ইরানের ড্রোনসহায়তা উল্লেখযোগ্য।
চীন পৌনে একশত বছরে অবিশ্বাস্য ও বিস্ময়কর সাফল্যের ইতিহাস রচনা করেছে। ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের দশকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, চীনের অর্থনীতি ৬.১ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে মধ্য থেকে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। চীন শুধু নিজের উন্নয়ন করে সন্তুষ্ট হয়নি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ৩০ শতাংশেরও বেশি অবদানের পাশাপাশি বন্ধু দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক অংশগ্রহণ করেছে।
চীন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের সাথে সাথে সামরিক শক্তিতেও বলীয়ন হয়ে ওঠে। গ্লোবাল পাওয়ার ইনডেক্সে তৃতীয় অবস্থান বড় কথা নয়, ২০১৬ ও ২০১৭-তে দক্ষিণ-চীন সাগরের কর্তৃত্ব নিয়ে আমেরিকার সাথে সরাসরি বিরোধে জড়িয়ে পড়া এবং তাইওয়ান প্রশ্নে শক্ত ভূমিকা গ্রহণ, প্রমাণ করে তারা মার্কিনিদের সাথে সরাসরি লড়াইয়েও সক্ষমতা অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির সব স্থানে চীন এখন সক্রিয় এবং নিজস্ব মতামত রাখে। তাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতির ব্যাপারে চীনের অবস্থান এবং ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বিগত শতাব্দীতে আরেকটি বিপ্লব সংঘটিত হয়- ইরানে ইসলামী বিপ্লব (১৯৭৯)। ইরান একটি অত্যন্ত প্রাচীন সভ্যতার দেশ। বিশ্ব ইতিহাসে যে কয়েকটি বৃহৎ সাম্রাজ্য দীর্ঘ দিন শাসন কর্তৃত্ব বজায় রাখতে সমর্থ হয়, তার মধ্যে অন্যতম পারস্য সাম্রাজ্য (পারসিয়া)। আজকে আমরা যে দেশটিকে ইরান হিসেবে জানি ১৯৩৫ সাল অবধি যার নাম ছিল ‘পারসিয়া’ বা ‘পারস্য’। খ্রিষ্টপূর্ব নবম শতাব্দীতে দেশটি আর্যদের দ্বারা অধিকৃত হয়। পরবর্র্তীতে গ্রিক বংশোদ্ভূত মেডেস এখানে ‘মিডি’ সাম্রাজ্য গড়ে। ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে ‘ফাঁস’, নামে একটা প্রদেশ ছিল- পারসিক রাজবংশ এখান থেকেই উদ্ভব ঘটে। পরে ফার্সিয়ানরা খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫০ অব্দে তেইস্পেসের নেতৃত্বে গ্রিকদের বিতাড়িত করে নিজেরা ক্ষমতা গ্রহণ করে। কিন্তু ইতিহাসের নানা পরিক্রমায় পার্সিয়ানদের হাত থেকে ইরানের ক্ষমতা অধিকার করে নেয় গ্রিক মহাবীর আলেকজান্ডার (৩৩১ খ্রি: পূ:)। কিন্তু আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তার বিশাল সাম্রাজ্য টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে। সেগুলো শাসন করতে থাকে তার সেনাপতি ও স্থানীয় ক্ষমতাবান রাজবংশের লোক। ৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে ক্যাডেশিয়ার যুদ্ধে সাসানিয়া রাজবংশের মাধ্যমে পারস্যের স্বাধীনতা দীর্ঘকালের জন্য বিপন্ন হয়। এদেরকে উৎখাত করেন মুসলিম আরবরা।
৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে সাসানিয়া রাজবংশ সমূলে উৎপাটিত হয়। তাদের উৎখাত করেন মুসলিম আরবরা কাদেসিয়া যুদ্ধে। আরবরা পারস্য দেশের প্রচলিত ভাষা ও হরফের আমূল পরিবর্তন সাধন করে। ফলে পাহলাভি হরফের পরিবর্তে আরবি হরফে পারস্য ভাষা ও সাহিত্যের প্রয়োগ শুরু হয়।
দশম শতাব্দীতে বাগদাদের রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি সমূলে উৎপাটিত হয় বর্বর মোঙ্গলদের আক্রমণে। বিশাল সাম্রাজ্য ভেঙে তৈরি হলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন দেশ। পারস্যও ফিরে পেল তার রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা। মুসলিম বিজয়ের পর পারস্যের নিজস্ব ভাষা পাহলভি আরবি প্রভাবে বিলুপ্ত হতে বসেছিল। সেই নিজেদের ভাষা, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হলেন ফেরদৌসির মতো ক্ষণজন্মা কবি। তার রচিত ‘শাহ্নামা’ গ্রন্থটি ছিল পাহলভি ভাষায়। এই শাহনামায় তিনি বর্ণনা করেন প্রাচীন ইরানের বিস্মৃত গৌরবের অধ্যায়গুলো। পারস্যের মালেক শাহ, গজনিতে সুলতান মাহমুদ এবং তার উত্তরাধিকারী কাদের বিন ইব্রাহিম এবং তুর্কিস্থানে কাদির খান- এরা প্রত্যেকেই নিজের রাজধানীকে সাহিত্য, ইতিহাস ও বিজ্ঞানের পাদপীঠে পরিণত করেন।
ইরানের আদি ইতিহাসে আমরা বিশাল সাম্রাজ্য বিস্তার দেখতে পাই, এটা দিগিজয়ী প্রতিভাবান পারসীয় বীরদের দ্বারা সম্ভব হয়েছিল। এক দিকে ইরানিরা যেভাবে সাহসী বীরের জাতি, তেমনি সাংস্কৃতিক দিক থেকে উন্নত। ওমর খাইয়াম, শেখ সা’দী, মৌলানা জালালউদ্দিন রুমি, শামসুদ্দিন হাফিজের মতো পারস্য প্রতিভায় সমৃদ্ধ ইরানি সাহিত্য-সংস্কৃতি।
কাজেই বিগত শতাব্দীতে ইরানে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক বিপ্লবের মাধ্যমে যে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, তার সাংস্কৃতিক বুনিয়াদ ছিল সুদৃঢ়। তেমনি ইরানের সামরিক শক্তিও ছিল এশিয়ার মধ্যে অন্যতম। একসময় আমেরিকা ইরানের মিত্র দেশ ছিল। বিশেষ করে ইরানের শেষ সম্রাট রেজা শাহ পাহলভির সাথে মার্কিনিদের নিবিড় সম্পর্ক উল্লেখ করার মতো। আমেরিকা রেজাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল ইরানকে এশিয়ার মোড়ল বানানোর। সে লক্ষ্যে ইরানের কাছে আমেরিকা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার মূল্যের অত্যাধুনিক সামরিক সারঞ্জাম বিক্রি করে। যে কারণে ইরানের পট পরিবর্তনের পর আমেরিকার ঘুম হারাম হয়ে যায়। চীনের ব্যাপারে যা করেছিল আমেরিকা, কোরিয়াকে দিয়ে চীন আক্রমণ করা। সেটাও ছিল মার্কিনিদের দেয়া ছয় হাজার কোটি টাকার অস্ত্র বেহাত হওয়ার বিষয়। ইরানের ক্ষেত্রেও মার্কিনিরা একই ঘটনা ঘটাল- ইরাককে দিয়ে ইরানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত করল। ইরাককে বলা হলো- যুদ্ধের সব ব্যয়ভার বহন করবে আমেরিকা এবং তার মিত্ররা। সব ধরনের অস্ত্রের জোগান তারা দেবে। উপলক্ষ শাতিল আরবের দখল ইরাককে নিতে হবে। দীর্ঘ ৮ বছর ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ হলো। ইরানিরা শৌর্য-বীর্য ও ত্যাগের এক উজ্জ্বল ইতিহাস সৃষ্টি করে ইসলামী রাষ্ট্রটি টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। বরং বেঈমান সাদ্দাম হোসেনের করুণ পরিণতি ঘটে। সেই সাথে ইরাক হারায় লাখ লাখ মানুষ, সম্পদ ও স্বাধীন রাজ্যের মর্যাদা।
ইরান আমেরিকা, ইসরাইল ও পশ্চিমা মিলিত বৈরী শক্তির সাথে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ লড়াই করে আজও টিকে আছে। শুধু তাই নয়, ইরান গোটা বিশ্বের ভূ-রাজনীতিতে সুস্পষ্ট পরিবর্তনের সূচনা করেছে। রাশিয়া বনাম ইউক্রেন যুদ্ধ যেভাবে এক দিন রাশিয়াকে একঘরে করে ফেলেছিল, সে সময় চিরমিত্র চীন ও পরবর্তীতে ইরানের ড্রোন সহায়তা এক নতুন শক্তির মেরুকরণ ঘটে। ফিলিস্তিন-ইসরাইল পরবর্তীতে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়ামেনের হুতি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র বাহিনীর সাথে দীর্ঘ বছরাধিকাল যুদ্ধ নতুন মেরুকরণের আভাস স্পষ্টতর হচ্ছে। ইরানের পক্ষাবলম্বনে রাশিয়া যেভাবে এগিয়ে এসেছে, তেমনি আরব রাষ্ট্রগুলোও মার্কিনিদের কবলমুক্ত হয়ে ইরানকে সমর্থন দিচ্ছে। চীন অনেক আগেই ফিলিস্তিন এবং ইরানের প্রশ্নে সমর্থন দিয়েছে। চীনের সাথে ইরানের সামরিক চুক্তি স্থাপিত হয়েছে বেশ আগেই। অস্ত্র বিক্রির ব্যাপারে রাশিয়াও ইরানের ব্যাপারে উদারনৈতিক নীতি গ্রহণ করেছে। তার মানে রাশিয়া এখন মধ্যপ্রাচ্যে এক ভারসাম্য নির্ধারক প্লেয়ার হিসেবে উপস্থিত।
এবার আসি বাংলাদেশের ২০২৪-এর ৫ আগস্টের ছাত্র - জনতার গণ-অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ধরে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা একক কর্তৃত্ব বজায় রাখে। নির্বাচন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়ে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং পরোক্ষভাবে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে কাজে লাগিয়ে উপর্যুপরি ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এ ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখে। বিরোধী দলগুলোকে দমন-পীড়নের মাধ্যমে কার্যত দলীয় অস্তিত্ব বিলীন করে দেয়। মিথ্যা মামলা, ক্রসফায়ার, গুম, হত্যা, ঘরবাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে, দখল করে সীমাহীন নৈরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের জেলে আটক এবং মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসি দিয়ে Judicial Killing-এর বিরল নজির স্থাপন করেছে।
জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ফাঁসি দেয়া হয়, জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী (১১ মে ২০১৬), সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ (২১ নভেম্বর ২০১৫), কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মুহাম্মদ কামারুজ্জামান (১১ এপ্রিল ২০১৫), অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা (১২ ডিসেম্বর ২০১৩) এবং জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মীর কাসেম আলী (৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬)। এ ছাড়া বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকেও ফাঁসি দেয়া হয়। জামায়াতের আমির অধ্যাপক গোলাম আযম, নায়েবে আমির মাওলানা এ কে এম ইউসূফ, নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, প্রধান রাজনীতিক মাওলানা আব্দুস সোবহান । কারাদন্ড ভোগ করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁদের মৃত্যু নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এক দিকে জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপির নেতাদেরকে মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দিয়ে আটক, অপর দিকে কেন্দ্রীয় দলীয় কার্যালয়সহ সারা দেশের সব কার্যালয় বন্ধ করে দিয়ে একদলীয় স্বৈর ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছিল শেখ হাসিনা। ২০১৪ ও ২০২৪-এর নির্বাচন বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীসহ সব বিরোধী দল বর্জন করে। ২০১৮-তে রাতেই প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে ভোটবাক্স পূর্ণ করার মাধ্যমে ভোটাভুটির এক নিকৃষ্ট নজির স্থাপন করে আওয়ামী লীগ সরকার।
এতদসত্ত্বেও বিরোধী দল ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে পারছিল না। বেগম খালেদা জিয়াকেও আটক করা হয়। মিথ্যা অভিযোগে ক্যাঙ্গারু কোর্টে জিয়া অর্ফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজা দিয়ে জেলে দীর্ঘদিন রাখা হয়। এসব অন্যায় দলন-পীড়ন, নির্যাতন, গুম, খুনের ফিরিস্তি দিন দিন বেড়েই যেতে থাকে।
সরকারের এসব অনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারচুপি, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ পুলিশ ও র্যাবের সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। এরপর ভিসার ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসঙ্ঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো, বিভিন্ন দেশের সাবেক সরকারপ্রধান, নোবেল লরিয়েট ব্যক্তিরা সরকারের ক্রমাগত মানবাধিকার লঙ্ঘন, প্রহসন বিচারব্যবস্থা ইত্যাদির নিন্দা ও কঠোর সমালোচনা করে।
শেখ হাসিনা আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা, পরামর্শ কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে ভারত নির্ভরতা বাড়িয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখে। বারবার বিরোধী দলের ডাকা সরকার পতনের আন্দোলন ব্যর্থ হচ্ছিল। আমেরিকার ভিসানীতি এবং পশ্চিমা দেশগুলোর চাপের মুখে সরকার মিটিং-মিছিল- জনসভার ব্যাপারে কিছুটা শিথিল হওয়ায় ২০২৩-এ বিএনপি-জামায়াতের উদ্যোগে তীব্র গণ-আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। তার পর্যায়ক্রমে ২৮ অক্টোবর ২০২৩ ঢাকায় বিএনপি-জামায়াতসহ সব বিরোধী দল মহাসমাবেশের আয়োজন করে। কিন্তু সেই মহাসমাবেশে সরকারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী,আওয়ামী লীগ-যুবলীগসহ সন্ত্রাসী গ্রুপ অতর্কিতে হামলা করে। বহু হতাহত হয়। আটক করা হয় পাইকারিভাবে শত শত বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের। দেশের মুক্তিকামী মানুষ হতাশার সাগরে নিমজ্জিত হয়ে হাবুডুবু খেতে থাকে। ২০২৪-এর ডামি নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ আবারো উপর্যুপরি চতুর্থবারের মতো ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নেয়।
কিন্তু না, সব হতাশা, জল্পনা-কল্পনা আর নীরবতা কাটিয়ে আকস্মাৎ জেগে উঠল এ দেশের তরুণ-তরুণীরা। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ব্যানারে চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে রাজপথ দখলে নেয় ছাত্রছাত্রীরা। ক্রমে মিছিল বড় হতে থাকে। প্রথম দিকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা নামলেও অতি দ্রুত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ-স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা নেমে পড়ে এ আন্দোলনে। অবশেষে ছাত্র-জনতা নেমে আসে সরকারের পতনের লক্ষ্যে এক দফা দাবিতে। শেখ হাসিনার পেটোয়া বাহিনী- আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ যথা সন্ত্রাসী লীগের সশস্ত্র ক্যাডার ও পুলিশ, র্যাব, বিজিবি নামে ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে। পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হয় ছাত্র-জনতাকে। হত্যা করে গুম করা হতো। চলল ছাত্র-জনতার ২৩ দিনের দেশ কাঁপানো আন্দোলন। পতন হলো ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের। ৫ আগস্ট প্রথমে হেলিকপ্টারে কুর্মিটোলা এয়ারপোর্ট, পরে বিমানবাহিনীর পরিবহন বিমানে করে শেখ হাসিনা ভারতে পলায়ন করতে বাধ্য হয়।
এ-ই গণ-অভ্যুত্থানে অন্তত ১৫শ’ ছাত্র-জনতা শাহাদতবরণ করে। আহতের সংখ্যা অর্ধলক্ষাধিক। গণনার কাজ এখনো চলছে। প্রকৃত হতাহতের তালিকা পাওয়া যাবে আরো পরে। ৮ আগস্ট ২০২৪ নোবেল লরিয়েট আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে। নানা সীমাবদ্ধতার ভেতর দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চলছে। এখনো মন্তব্য করার সময় আসেনি।
বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি ক্ষুদ্র দেশ। জনসংখ্যার দিক দিয়ে গরিষ্ঠ দেশগুলোর তালিকা উপরের দিকে অবস্থান। ১৯৭১ সালে পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে নেয়া এ ক্ষুদ্র দেশটিই এখন নানা কারণে গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশের গুরুত্ব যেমন প্রতিবেশী দেশ ভারতের কাছে, চীনের কাছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এমনকি রাশিয়ার কাছে। দুঃশ্চিন্তার কারণ প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারকে নিয়েও। মিয়ানমার চীনের দ্বারা প্রভাবিত। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার পেছনে সুগভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে বৃহৎ শক্তিগুলোর। বর্তমান সরকার যদিও অন্তর্বর্তীকালীন (নির্বাচনের আগ পর্যন্ত) সরকার; কিন্তু তাকে বিশ্বের জটিল ভূ-রাজনীতির প্যাঁচ বুঝতে হবে। অর্থকষ্ট লাঘবের জন্য কোনো দেশের খপ্পরে পড়লে মহাসঙ্কট আসন্ন। বৃহৎ শক্তি লাগবে, অর্থ ও শক্তির জন্য- বুঝে শুনে। ভারতের সাথে আমাদের ‘কাইজ্জা’ মিটিয়ে ফেলার উপায় আছে? নাই। শেখ হাসিনা দলিল দস্তাবেজ যা দিয়ে গেছে তা তো কম না। ওই দলিলগুলো যদি শুধু লেখাঝোকা কাগজই থাকুক এ রকম শিরদাঁড়া খাড়া করতে হলে চীনের সাথে শলাপরামর্শ করতে হবে। আর ১৮ শ’ কিলোমিটার দূরের পাকিস্তান কিন্তু দুসময়ে কাজে আসতে পারে। সম্পর্কটা ঝালিয়ে নিতে দোষ কি! জাপান যদি চীনের সাথে আমেরিকা যদি জাপানের সাথে পারে আমরা পারব না? একটি ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক নীতি এবং সংযত অর্থনৈতিক লেনদেন সর্বোপরি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারার বিকাশ আমাদের গৌরবময় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে সফল করতে পারে।
লেখক : কবি, কথাশিল্পী ও কলামিস্ট
