জুলাই ২০২৪ ইতিহাসের এক যুগ সন্ধিক্ষণের মাস। সন্তানহারা পিতা-মাতার অশ্রুভেজা চোখ, স্বামীহারা স্ত্রীর গগণবিদারী আর্তনাদ। দুপুরে রাজপথে উত্তাল মিছিল কিংবা কোনো শহীদের রক্তেভেজা লাল শার্ট হাতে গগণবিদারী চিৎকার আর কত লাশ চাও? দেবো লাশ তবু স্বাধীনতা দাও!
জুলাইয়ের বিকেল কিংবা সন্ধ্যায় করুণ রসে ভরা গল্প, অথবা চায়ের আড্ডা। জুলাই কখনো দ্রোহের, কখনো বিপ্লবের, কখনো দ্বিতীয় স্বাধীনতার পথে কালো শোকের কিংবা সাদা শান্তির মিছিল।
জুলাই ব্লাক রেইড, কমপ্লিট শাট ডাউন, মার্চ ফর জাস্টিস, রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের এক যুগান্তকারী ইতিহাস। আবার জেনারেশন জেড আধুনিক প্রযুক্তির চিন্তার ধারক বাহক। জেড জেনারেশনের ভাষা ভিন্ন, চিন্তা ভিন্ন, দর্শন ভিন্ন তারপরেও ঐক্য এক অধিকার চাই।
কি সেই অধিকার?
মুক্তির অধিকার। ন্যায্য দাবির অধিকার। জুলুম নির্যাতন নিপীড়ন থেকে বাঁচার অধিকার। ন্যায় প্রতিষ্ঠার অধিকার, শিক্ষার অধিকার।
মানবতার দাবি প্রতিষ্ঠার অধিকার। এক কথায় ফ্যাসিবাদী সরকার থেকে মুক্তির অধিকার।
৩৬’ জুলাইয়ের ইতিহাস
কোটা সংস্কারের আন্দোলন শুরু হয়েছিল জুলাইয়ের শুরুতেই কিন্তু ধীরে ধীরে এ আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। ১১ জুলাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা সর্বোচ্চ আদালতের বিরুদ্ধে শক্তির প্রদর্শন করছে। এটি অনভিপ্রেত ও সম্পূর্ণ বেআইনি।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা লিমিট ক্রস করছে।’ ১৩ জুলাই সব গ্রেডে কোটার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দেয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করে। ১৪ জুলাই রোববার চীন সফর পরবর্তী গণভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে কোটা আন্দোলন প্রসঙ্গে সাংবাদিক ফারজানা রুপা ও সাংবাদিক প্রভাষ আমীন প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন। তাদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া কোটা, মেধা, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, নাতি-পুতি, রাজাকারের নাতি-পুতি এসব নিয়ে বক্তব্যকে ঘিরে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। ছাত্ররা সরকারকে ২৪ ঘন্টা সময় বেঁধে দেয় তাদের দাবি মেনে নেয়ার।
১৫ জুলাই সোমবার কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের রাজপথে মোকাবেলা করতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেন ছাত্রদের বিরুদ্ধে ফলে কোটা বিরোধী আন্দোলন গণ আন্দোলনে রূপ নেয়। মুখরিত হয়ে ওঠে বিভিন্ন স্লোগানে। ১৬ জুলাই রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পুলিশের গুলিতে নিহত হলে আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। ১৭ জুলাই, বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস ঘোষণা করা হয়। ১৮ জুলাই বৃহস্পতিবার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচি দিয়ে ঢাকাসহ সারা দেশ অচল করে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সারা দেশে মোতায়েন করা হয় বিজিবি। ১৯ জুলাই শুক্রবার প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, ব্যাপক সংঘর্ষ, ভাঙচুর গুলি, অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটে ফলে ছাত্ররা কমপ্লিট শাট ডাউন ঘোষণা দিয়ে সরকারের কাছে ৯ দফা দাবি পেশ করে। অতঃপর ২১, ২৭, ২৮, ২৯, ৩০ জুলাই পর্যন্ত ফ্যাসিবাদী সরকারের পৈশাচিক রুপ হত্যা, গুম, গুলি, জেল চরম মাত্রায় নিয়ে যেতে থাকে। প্রত্যক্ষ করল জাতি লাশের মিছিল! ১ দফার দাবিতে রাজপথ উত্তপ্ত। শুরু হল সরকার পতনের আন্দোলন। নতুন ক্যালেন্ডারে আগমন ৩১ জুলাই, ৩২ জুলাই, ৩৩ জুলাই, ৩৪ জুলাই, ৩৫ জুলাই এর গ্রাফিতি দেয়ালে দেয়ালে। অবশেষে সেই ক্ষণ! ৩৬ জুলাই (৫আগস্ট) বাংলাদেশ অর্জন করল দ্বিতীয় স্বাধীনতা!
বিন্দু থেকে সিন্ধু
ছোট্ট একটি আন্দোলন কিভাবে দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী সরকারকে ফেলে দিতে পারে! বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে তা প্রমাণ করল বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা। এ আন্দোলনে কতজন শহীদ হল, কত লাশ গুম হল তার তথ্য ধীরে ধীরে বের হয়ে আসছে। প্রকৃত তথ্য বের হতে হয়তো আরো কিছুদিন সময় লাগবে। তবে যত তাড়াতাড়ি হবে তত মঙ্গল। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে অনেক তথ্য জনগণের সামনে আসতে পারে নাই । এখন যার কাছে যেসব তথ্য আছে তা প্রকাশ করা দরকার। ৫ আগস্ট মুক্তির দিন। পালিয়ে গেল ফ্যাসিবাদী জালিম শাসক! দেশবাসী চেয়ে চেয়ে দেখল কিছুই করতে পারল না। এতে স্বৈরাচারী আরো অহঙ্কারী হয়ে উঠবে। তবে মনে রাখতে হবে আল্লাহ ছাড় দেন কিন্তু ছেড়ে দেন না। এখনো সময় আছে তওবার। তওবা করে জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। জনগণ ক্ষমা করলে তবেই না আল্লাহ ক্ষমা করবেন। ১৮ কোটি জনগণের হক নষ্ট করেছেন ১৫ বছর ধরে তার হিস্যা দিতে হবে না? ১৫ বছর ধরে টিকে থেকে দলবল নিয়ে লুটে পুটে ভেবেছিলেন আজীবন থাকবেন । তাই তো কোটা আন্দোলন থেকে এক দফার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদীর পতন হয়েছে। বিশ্বাস করি যত আস্ফালন দেখাক ফ্যাসিবাদী আর ফিরে আসবে না। এটাই বাস্তবতা নব্য ফেরাউন হয়তো জন্ম নেবে কিন্তু আসল ফেরাউন আর ফিরবে না। সুতরাং সাধু সাবধান! ৩৬ জুলাই সেই শিক্ষা দেয়।
২য় স্বাধীনতা অতঃপর
মুক্ত হয়েছে দেশ! জুলুমের অবসান হয়েছে। তবে মুক্তি এখনো বহুদূর। কেননা ফ্যাসিবাদীর কালো ছায়ার শেকড় এমনভাবে বিস্তার লাভ করেছে যে এর শেকড় তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত। উপরে ডালপালা, শাখা প্রশাখা কাটা হয়েছে মাত্র। তাই আরো অপেক্ষা করতে হবে।
সংস্কার করতে হবে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টর। কী কী সংস্কার করা প্রয়োজন তার জন্য কমিটি গঠন করা। তবে গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরগুলোতে আগে করতে হবে। এ সরকারের পক্ষে সব সম্ভব নয় । কিন্তু আবার এখনই সময় !
দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে হলে সবার আগে প্রয়োজন দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে দুর্নীতি মুক্ত করা। এ সেক্টরে সংস্কার করা অতীব জরুরি। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বাদ দেয়া। দুর্নীতি দমন কমিশন যাতে ভবিষ্যতে স্বাধীনভাবে, হুকুমের গোলাম না হয়ে সত্যিকারভাবে সততার সাথে কাজ করতে পারে সে ধরনের সংস্কার হতে হবে।
আমাদের দেশে নির্বাচন ব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে, গণতন্ত্রের নামে স্বৈরতন্ত্র গড়ে তোলার সব ধরনের সুযোগ নির্বাচনব্যবস্থার মধ্যেই লুকিয়ে আছে। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার তা প্রমাণ করেছে। যতদিন এর সংস্কার না হবে ততদিন নির্বাচন না দেয়াই উত্তম। তবে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে সংস্কার হতে হবে। আমার ভোট তাই স্বাধীনভাবে মতামত দেবো। এটি আমার নাগরিক অধিকার। নাগরিকের এ অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
সংসদীয় পদ্ধতির ত্রুটি-বিচ্যুতি পর্যালোচনা করে এখানেও সংস্কার প্রয়োজন। আনুপাতিক হারে প্রতিনিধিত্ব থাকা সংসদে এখন সময়ের দাবি।
প্রশাসনের সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ট্রাফিক সিস্টেম এগুলো সংস্কার না করলে দেশের জনগণ স্বস্তি ফিরে পাবে না।
দ্রব্যমূল্যের লাগাম দ্রুত টেনে ধরতে হবে। তা না হলে জনগণ ধৈর্যহারা হয়ে আবার দেশের মধ্যে অরাজকতা সৃষ্টি করবে। দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থার ফলে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি তখনই ফিরে আসবে যখন দেশের প্রশাসনযন্ত্র সঠিকভাবে নির্লোভ হয়ে সততার সাথে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করবে।
দেশের বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজাতে হবে। ফ্যাসিবাদী সরকার এ বিভাগকে সবচেয়ে বেশি কলঙ্কিত করেছে।
শিক্ষাব্যবস্থার অবকাঠামো, পাঠদান পদ্ধতি, সিলেবাস, পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে যেখানে প্রয়োজন সেখানেই সংস্কার। শিক্ষাব্যবস্থার যে ক্ষতি, জাতির কাছে তা গ্রহণযোগ্য নয়।
সুতরাং বহু ত্যাগের এই ৩৬ জুলাই। এ ত্যাগের সার্থকতা ভোগ করতে হলে ধৈর্য, সাহসিকতা, দৃঢ়তা, কঠোর পরিশ্রম করে এগিয়ে যেতে হবে। আমরা চাই এ দেশের বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, লেখক, কবি সাহিত্যিকরা তাদের আপন আপন মেধা, যোগ্যতা দিয়ে এক ঐক্যবদ্ধ জাতি গড়ে তুলতে সহযোগিতা করবেন। দেশ রাজনীতিবিদরা চালাবেন এটি যেমন ঠিক, তেমন দেশকে সঠিক পথে চালাচ্ছেন কি না সেটি দেখার জন্য প্রয়োজন পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী, লেখক, কবি-সাহিত্যিক ইত্যাদি চোখ। আবার আলেম ওলামাদের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই সবাকেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশ গড়ার লক্ষে কাজ করতে হবে।
ফ্যাসিবাদী বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে আর কোনো ফ্যাসিবাদের জন্ম না হয় সে দিকেও সংস্কার করা। ৩৬ জুলাইয়ে যারা নিহত,আহত, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের তালিকা রাষ্ট্রকে প্রকাশ এমনভাবে করতে হবে; যেন কোনো সুবিধাবাদী প্রবেশ করতে না পারে। আজ মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা পায়নি দেশ। তাই দ্বিতীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রে এ ভুল আর দেখতে চায় না দেশবাসী। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জনগণের সামনে ৩৬ জুলাইয়ের তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশ হবে এটা জনগণের চাওয়া।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আমাদের সামনে পথ চলা শিখিয়েছে। জাতি ঘুমিয়ে ছিল! আজ জেগেছে। তবে জাগ্রত জনতা আর কোনো ভুল দেখতে চায় না। আমাদের পথচলা মোটেই সহজ নয়। সজাগ থাকতে হবে আর কোনো হায়েনা থাবা না মারে। অভ্যন্তরীণ শত্রু, বাইরের শত্রু চেনা খুব বেশি জরুরি। কারো মিষ্টি কথায় গলে না যাই এখানেও সতর্কতার সাথে পদক্ষেপ নেয়া। জঞ্জাল তৈরি হয়েছে তা পরিষ্কার করতে কত দিন লাগবে কে জানে? তবে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে সংস্কার করে নির্বাচন দেবেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এটি আশা করা যায়। হে আল্লাহ! জাতির প্রত্যাশা পূরণে আপনি সহায় হোন। আমিন।
লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক
