ধর্ম শব্দটি ধৃ+অনট প্রত্যয় যোগে গঠিত। যার অর্থ ধারণ করা। অর্থাৎ ব্যক্তি বা বস্তু যা ধারণ করে তাই ধর্ম। পশুর ধর্ম পশুত্ব, আগুনের ধর্ম অগ্নিত্ব আর মানুষের ধর্ম মনুষত্ব। তবে আগুন, পানি, পশুর মতো মানুষ একই ধর্ম নিয়ে গঠিত নয়। মানুষের যেমন আছে মনুষত্ব, দয়া, মায়া, ভালোবাসা, মহত্ব তেমন আছে না পাওয়ার হাহাকার, হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, রাহাজানি, সন্ত্রাস প্রভৃতি বিভৎস চেহারা। যার জন্য সভ্যতা তার দাপটে কাঁপতে থাকে। আর এই গুণাবলি যাদের আছে তাদের মানুষের চেহারা নিয়ে বেঁচে থাকাটা বেমানান দেখা যায়। মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে শ্রেষ্ঠ হিসেবে এবং তাকে এমন জ্ঞান দান করা হয়েছে যা অন্যান্য সৃষ্টির দেয়া হয়নি। কিন্তু এই মানুষ নিজের পরিচয় না পেয়ে সভ্যতাকে জলাঞ্জলি দিয়েছে। এই মানুষের পক্ষে সৃষ্টির রহস্য আজ উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি।
মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে না সে বিবর্তনের মাধ্যমে বানর সদৃশ্য প্রাণী থেকে উদ্ভব ঘটেছে। এই বিশ্ব বরাবর কি বিবর্তনের ফল। না এর পেছনে পরম বুদ্ধিমান সত্ত্বার অস্তিত্ত্ব আছে। দর্শনে সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। কেউ কেউ বলেছে, স্রষ্টা হঠাৎ জগতের সৃষ্টি করেছেন। তিনি কোনো অভাব বোধ থেকে জগৎ সৃষ্টি করেননি। আকস্মিক সৃষ্টিবাদ অনুসারে এটি হঠাৎ সৃষ্টি হয়েছিল। আকস্মিক সৃষ্টিতত্ত্বকে দুইভাগে ভাগ করা যায় যথা-
১. অনপেক্ষ সৃষ্টিবাদ ও ২. সাপেক্ষ সৃষ্টিবাদ।

ইশ^র শূন্য থেকে জগত সৃষ্টি করেছেন। তিনি কোনো অভাব বোধ করেননি। এটি অনপেক্ষ সৃষ্টিবাদ। সাপেক্ষ সৃষ্টিবাদ অনুসারে স্রষ্টা শূন্য থেকে জগত সৃষ্টি করেননি। তিনি পূর্বাস্থিত জড়বস্তু থেকে জগৎ সৃষ্টি করেছেন। জগৎ এবং জীবন বিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্টি। এর পক্ষে যেসব দার্শনিক মত প্রকাশ করেছেন তাদের মধ্যে আছে হার্বাট স্পেসার, ডারউইন, লেমার্ক প্রমুখ। হার্বাট স্পেন্সারের মতে, জড় গতি শক্তির ফলে বিশ^জগত সৃষ্টি। মহাশূন্যের অসংখ্য বস্তুকণিকা আকস্মিক স্বতঃস্ফূর্ত সঙ্ঘাতে ও আকর্ষণ বিকর্ষণে এ জগত সৃষ্টি। তিনি তাঁর First principles, principles of biology, principles of psychology, principles of sociology and principles of ethics গ্রন্থের মধ্যে বিশ্বজগত এবং মানুষের বিভিন্ন বিবর্তন যেমন- জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক প্রভৃতি বিষয়কে ব্যাখ্যা করেন। ডারইউন ক্যামব্র্রিজের ছাত্র ছিলেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি একটি গোবরে পোকা ধরে পরীক্ষা করেছিলেন। তিনি ধর্মতত্ত্বের ছাত্র ছিলেন এবং জগৎ ও জীবনের প্রতি ছিল তার অগাধ ভালোবাসা। পরবর্তীতে তিনি নৌ জরিপ জাহাজ H.M.S Beagle-এ প্রকৃতি বিজ্ঞানীর পদে একটি চাকরি পেয়ে যান। পাঁচ বছর তিনি ওই জাহাজে দক্ষিণ আমেরিকা ও ইস্ট ইন্ডিজের বিভিন্ন অংশে পরিভ্রমণ করেন এবং তিনি বিভিন্ন জ্ঞান সঞ্চয় করেন। তিনি পশু ও মাছের নমুনা এবং জীবশ্ম সংগ্রহ করে তার গবেষণায় ব্যবহার করেন। ডারউইন তার Origin of species এবং descent of Man-নামক গ্রন্থে মানুষের বিবর্তনের কথা বলেন। তিনি বলেন যে, মানুষের পূর্বপুরুষ ছিল বানরসদৃশ্য। তিনি Struggle for existence, Servival of Fittest, Natural selection প্রভৃতির কথা বলেন। জীব জগৎ সদা সংগ্রামে লিপ্ত, এই সংগ্রামে যোগ্যতমরাই টিকে থাকবে। প্রকৃতি নির্বাচন করে কে কোথায় থাকবে। শীতপ্রধান দেশের পশুপাখি এবং গরমপ্রধান দেশের প্রাণী আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এবং তারা যেখানে আছে সেখানেই মানানসই, মনে হচ্ছে ন্যাচার তাদেরকে Selection করে রাখছে। লেমার্ক জীব জগতের পরিবেশের প্রভাব, জৈবিক পরিবর্তন, দৈহিক পরিবর্তন এবং সেই পরিবর্তনের উপর বংশানুক্রমিক পরিবর্তনের ধারার উপর গুরুত্বারোপ করেন। দৈহিক স্বতঃস্ফূর্ত পরিবর্তনের ফলে দুর্ঘটনাবশত চোখ দেখা শুরু করে। কান শোনা শুরু করে, নাক গন্ধ নেয়া শুরু করে। লেমার্ক তার ব্যাখ্যার ডারউইনের এ তত্ত্ব মেনে নেননি। তিনি বলেছেন বহিঃশক্তির প্রভাবের ফলে বিভিন্ন অঙ্গের সৃষ্টি হয়েছে। যেমন- আলোর প্রভাবের ফলে জীব দৃষ্টি সম্পন্ন হয় এবং দেখতে শুরু করে।

প্রকৃতির এমন কোনো শক্তি নেই যে সে নির্বাচন করতে পারে। সৃষ্টি একমাত্র স্র্রষ্টার জন্য, মানুষ কোনো কিছুর স্র্রষ্টা নয়। সে একটি গাছ কেটে কাঠ চিরে টেবিল, চেয়ার তৈরি করতে পারে। খনি থেকে লোহা, সোনা, তামা সংগ্রহ করা হয়। তা দিয়ে সে বিভিন্ন ব্যবহার্য জিনিসপত্র তৈরি করে। অর্থাৎ ব্যবহারের উপযোগী তৈরি করতে পারে। কিন্তু গাছ, সোনা, তামা মানুষের সৃষ্টি নয়। একখণ্ড তৃণখণ্ডও মানুষের সৃষ্টি নয়। এমনকি খেজুরের আঁটির উপর যে পর্দাটা আছে তারও ¯্রষ্টা মানুষ নয়। এগুলো পরম বুদ্ধিমান সত্তার কাজ। এই আকাশ, বাতাস, মাটি, গ্রহ-নক্ষত্র, নিহারীকাপুঞ্জকে সৃষ্টি করল। জগতের ভেতর শৃঙ্খলা, ঐক্য, সামঞ্জস্য কিভাবে হলো? সূর্য পূর্ব গগনে উদিত হয় এবং পশ্চিম গগনে অস্ত যায়। বাগানে ফুল ফোটে, অন্ধকার আকাশে তারকারাজি মিট মিট করে জ্বলে। মাঘে শৈত বাতাস প্রবাহিত হয়। বৃক্ষরাজি এবং প্রাণিজগতে সামঞ্জস্য বিধান করে চলেছে। তাদের আহার, শ্বাস-প্রশ্বাস, নিন্দ্রা, বিচরণ ও বংশবৃদ্ধি ঘটে বলেছে যুগযুগ ধরে। এ সামঞ্জস্য বিধান করল কে? কোনো অন্ধ ব্যক্তি যদি আন্দাজে এলোপাতাড়ি অক্ষর বসাতে থাকে তাহলে শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথ রচনা হবে না। এই বিশ^ চরাচর লিখিল জগতের অপরূপ সৃষ্টি ও সামঞ্জস্য এমনিতেই হলো তার কোনো পরম বুদ্ধিমান সত্তার অস্তিত্ত্ব আছে? এমনকি আমরা যে বায়ুমণ্ডলে বিচরণ করি এই বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেনের উপাদান ২০.৭১ শতাংশ, নাইট্রোজেন উপাদান ৭৮.০ শতাংশ, কার্বন-ডাই অক্সাইডের উপাদান ০.০৩ শতাংশ। যদি অক্সিজেনের জায়গায় নাইট্রোজেন হতো এবং নাইট্রোজেনের জায়গায় অক্সিজেন হতো তাহলে পৃথিবীতে জীবজগতের কোনো অস্তিত্ব থাকত না। এই সামঞ্জস্য ও নিখুঁত সৃষ্টি এমনিতেই হলো না এর পেছনে কোনো পরম বুদ্ধিমান সত্তার অস্তিত্ব আছে?

পৃথিবীতে বিভিন্ন প্রকার ধর্ম আছে। কোনোটি প্রত্যাদিষ্ট ধর্ম আবার কোনোটি মস্তিষ্কপ্রসূত ধর্ম। মস্তিষ্কপ্রসূত ধর্ম স্থান-কাল-পাত্র ভেদে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন ও সংস্কার করা হয়েছে। ফলে সেটি হয়ে গেছে বিকৃত ও কল্পনাশ্রয়ী। কিন্তু হুবহু প্রত্যাদিষ্ট ধর্ম অবিকৃত অবস্থায় আছে একমাত্র পবিত্র কুরআন। প্রত্যাদিষ্ট ধর্মের দাবিদার তাওরাত, জবুর, ইঞ্জিল। কিন্তু তারা আগের অবস্থায় নেই। অর্থাৎ বিকৃত হয়ে গেছে। যার কারণে old Testamen এর New Testament-এর মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। যার কারণে তা থেকে অবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব পাওয়া যাবে এটি স্বাভাবিক। কিন্তু যেটি অবিকৃত, মস্তিষ্কপ্রসূত না এবং সত্য সেটি গ্রহণ করা যায় কি-না তা নিয়ে বিশে্বর চিন্তাবিদদের অনেকেই স্বীকার করা শুরু করেছে। আর এই কিতাবে সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে বলা আছে। বস্তুর কণা ভাঙলে দেখা যায় অণু, পরমাণু, কোয়ার্ক, কোয়ার্ক ভালে গতি শক্তি আলো (Light, Energy, Motion) পাওয়া যায়। আবার গতি শক্তি আছে (Light, Energy, Motion) বস্তুতে রূপান্তরিত হয়। অর্থাৎ Nothing to existence and existence to nothing. বস্তু থেকে অবস্তু এবং অবস্তু থেকে বস্তুর সৃষ্টি। এটি পরম সত্তার একটি লীলাখেলা, তিনি চিরঞ্জীব এবং চিরস্থায়ী। তিনি সৃষ্ট নন অথচ অস্তিত্বশীল। যেহেতু তিনি সৃষ্ট নন অথচ অস্তিত্বশীল। সুতরাং তার কোনো ধ্বংস নেই। আর মানুষ স্্রষ্টার সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। তিনি উত্তম অবয়ব দিয়ে মানুষকে সৃষ্টি করে তার আচরণের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। গোটা সৃষ্টিজগৎ তার গুণকীর্তন করছে, আমরা শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে তার গুণকীর্তন করব- এটিই বুদ্ধিমান সত্তার পরিচয়।
লেখক : গবেষক, প্রবন্ধকার ও শিক্ষক