ঘুম থেকে উঠেই ছটফট করতে লাগল আনিস! কখন এগারোটা বাজবে আর কখন গাড়িতে উঠবে এই আশায়! প্রায় কয়েক বছর পরে গ্রামে যাবে আনিস। বেশ আনন্দিত দেখাচ্ছে তাকে। সেই ছোট্ট বেলায় শেষ তার দাদুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। তখন সে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ত। বছরের পাল্লা বদলে এখন সে নবম শ্রেণীর ছাত্র। আনিসের কাছে গ্রামে পরিবেশ অনেক ভালো লাগে। এবং গ্রামীণ সৌন্দর্যকে সে অনেক উপভোগ করে। বিশেষ করে গ্রামে প্রতিটি ঋতুর বৈশিষ্ট্যগুলো চোখে দেখার মতো।

আনিস তড়িঘড়ি করে গাড়িতে উঠে বসল সাথে তার পরিবার। মনে মনে ভেবে রেখেছে কোথায় কোথায় যাবে! অগ্রীম পরিকল্পনা গাড়িতে করে রাখছে সে। তার একজন চাচাতো ভাই আছে তার নাম রাফি। রাফি ও আনিস সমবয়সী। দু’জন মিলে সারা গ্রাম ঘুরবে প্লান করে রেখেছে আনিস। একপর্যায়ে দাদুর বাড়িতে এসে উপস্থিত। তাদের আগমনে ঘটা করে আয়োজন করেছে তার দাদুভাই। বিকেল গড়ার সাথে সাথে রাফিকে নিয়ে বের হয়েছে আনিস। রাফি কিছুটা অনিচ্ছুক থাকা সত্ত্বেও আনিসের জোরাজুরিতে যেতে বাধ্য হলো। রাফি আনিসকে বুঝাতেই পারছে না যে তাদের গ্রামের পরিবেশটা সুবিধার না। কিন্তু কে শুনে কার কথা। ইদানীং গ্রামে থমথমে পরিবেশ। গ্রামের নাকি বাঘের আগমন দেখা যাচ্ছে! গ্রামের পাশে একটা ছোট্ট বন আছে। লোকালয় পাশেই বনটি। প্রায় কয়েক বছর আগে মন্ত্রণালয়ের লোক বলেছিল এই বনে কোনো হিংস্র পশু নেই। এত্ত ছোট বনে এর আগে বাঘ কি তেমন কোনো হিংস্র প্রাণী ও দেখেনি গ্রামের মানুষ। কিন্তু হঠাৎ বাঘের উৎপাত। গ্রামের বাসিন্দারা এখন বনের কাছ দিয়েও যায় না। বাঘের উৎপাত সাথে সাথে গ্রামে এখন চুরি ডাকাতিসহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজও বেড়েছে। কে করছে তা কেউ জানে না। কয়েকজন মানুষ নাকি বাঘের পায়ের ছাপ বনের মাঝে দেখেছে। রাতে বনের ভেতর থেকে বাঘের আওয়াজ শুনতে পেয়েছে। কিন্তু কেউ সরাসরি বাঘকে দেখতে পায়নি! এটি নিয়ে গ্রামে কোলাহলের শেষ নেই। গ্রামের মানুষজন একটু সাদাসিধে হয়ে থাকে। গুজবে কান দিতে থাকে। আনিসের মনে কৌতূহল জেগেছে যে।

কেউ গ্রামের মানুষের এমন সাদাসিধের সুবিধা নিচ্ছে না তো! তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। একে একে অনেকের সম্পদ চুরি হচ্ছে। কিন্তু কেউ ধরতে পাচ্ছে না কে করছে। আনিস মনে হচ্ছে কিছু একটা তো হচ্ছেই। কিন্তু কেউ বিশ্বাস করবে না তার কথা সে জানে। আনিস ঠিক করল আজ রাতেই সে বন থেকে ঘুরে আসবে। যে কথা সেই কাজ রাত একটার দিকে রাফিকে সাথে নিয়ে রওনা দিলো। রাফির কিছুটা ভয় কাজ করছে। বাড়ির কাউকে না জানিয়ে চুপচাপ বের হয়ে গেল। বাইরে চমৎকার চাঁদের আলো। কি অপরূপ লাগছে সবকিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে জোছনার রাত। আর জোছনা রাতে বনের ভেতরে প্রবেশ করলে সৌন্দর্য আরো দ্বিগুণ হবে বলে বিশ্বাস আনিসের। দুইজন চাঁদের আলো উপভোগ করতে করতে বনের মাঝে এসে উপস্থিত হলো। দুইজন অনেক সাবধানতার সাথে বনে প্রবেশ করল। বনে প্রবেশ করেই দেখল বড় বড় বাঘের পায়ের ছাপ। পায়ের ছাপ দেখে রাফি আতঙ্কিত হয়ে উঠল। এবং বলল : আনিস তোকে নিষেধ করেছিলাম যেসব কাজে বাড়াবাড়ি করতে নেই। দেখলি তো এখানে বাঘ আছে গ্রামের লোকজন ঠিকই বলেছে। তুই মানতে নারাজ। আবার এখান থেকে ফিরব কিভাবে। যদি সামনে এসে পড়ে।

আনিস বলল বোকা ভয় পাস কেন! আমরা কি এখন ছোট্ট? বাঘ আমাদের কিছুই করবে না। আমার মনে হয় যে এখানে বাঘ নেই!
রাফির মেজাজ আরো চওড়া হলো বলল যে নিজ চোখে দেখলি বাঘের পায়ের ছাপ তাও তোর এমন মনে হয় কেন?
আনিস বলল তুই দেখতে থাক কেন বলছি..! রাফির মন বলছে আজ কিছু একটা হতে যাচ্ছে। হয়তো আর তাদের বাড়ি ফেরা হবে না। রাফির মনে ভীষণ ভয় কাজ করছে।
চাঁদনি আলোর সাথে সাথে তারা আরো ভেতরে প্রবেশ করতে লাগল। হঠাৎ বাঘের আওয়াজ শুনতে পেয়ে দু’জন থমকে গেল। রাফি আরো ভয় পেয়ে গেল। ভয়ে রাফির মাথা থেকে টপটপ করে ঘাম পড়তে লাগলো। আর অন্যদিকে আনিস সামনে দিকে চলতে লাগলে। রাফি তাকে থামাতে পারছে না..!
এক পর্যায়ে রাফি বিরক্ত হয়ে বলল, তোর মরার প্রয়োজন হলে তুই যা আমি তোর সাথে আর এক পাও আগাব না।
আনিস বলল : ভয় পাস না আমি আছি তো তোর সাথে..! হাতে ধর আর চল।

বাঘের হিংস্র আওয়াজ লাগাতার শোনাই যাচ্ছে। আওয়াজ যেখান থেকে আসতেছে সে জায়গাটা খোঁজার চেষ্টা করছে আনিস এবং সে পেয়ে গেল। দেখলো এখানে কোনো বাঘের পায়ের ছাপ নেই, কিন্তু আওয়াজ ক্রমেই জোরে শোনা যাচ্ছে। একবারে শেষ প্রান্ত বনের এর পরই ভারত সীমান্ত। কিন্তু বাঘের দেখা পাচ্ছে না। চাঁদের আলোর সাথে লাইট আলো দিয়ে খুঁজতে লাগল তারা বাঘের সন্ধান মেলে কি না দেখতে কিন্তু কোনো বাঘের সন্ধান মিলল না। আওয়াজ অনুসন্ধান করতে গিয়ে তারা একবার ভারতীয় সীমান্তে খুবই কাছের একটা স্পটে এসে হাজির হলো। মাটির দিকে তাকাতে চোখে পড়ল সেই বাঘের পায়ের চিহ্ন। আর মাটিগুলোকে কেউ যেন খুঁড়েছে এমন মনে হচ্ছে। আনিসের কৌতূহল আরো বেড়ে গেল। মাটি সরাতে চোখে পড়ল একটা গোলাকার সুরঙ্গ ভেতরে একটি মই লাগানো। হাতে লাইট নিয়ে আনিস ও রাফি ভেতরে প্রবেশ করল। প্রবেশ করতে দু’জন চোখ মাথায় উঠে গেল। রাফি আশ্চর্য হয়ে থ হয়ে গেল। তারা দেখলো চোরাচালান চুরি করা জিনিসপত্র মাদকসহ স্বর্ণ। তারা ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাদকসহ স্বর্ণ প্রচার করে। এইগুলোর সাথে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস দেখতে পেল এবং সাথে আর্টিফিশিয়াল একটি বাঘের পায়ের যন্ত্র পেল। তাদের বুঝতে বাকি রইল না যে এখানে কি হচ্ছে। তড়িঘড়ি করে তারা ভেতর থেকে বের হতে প্রস্তুতি নিলো।

কিন্তু রাফি ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও বাঘের পায়ের যন্ত্রটি হাতে নিয়ে নিলো এমন সময় ঘটনাস্থলে আসামিরা তাদের দেখতে পায়। দুইজন খুব দ্রুত গতিতে দৌড়াতে থাকে এবং সন্ত্রাসীরা তাদের দিকে গুলি ছুড়তে থাকে কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আনিসের হাতে এসে পড়ে একটি রবার বুলেট সাথে সাথে আনিস থমকে পড়ে। পাশেই বিজিবির ক্যাম্প।
গোলাগুলির শব্দে পাশের দায়িত্বর বিজিবি তাদের ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে চলে আসে। আনিস এবং রাফির বক্তব্য শুনে তারা ছুটে যায় ঘটনাস্থলে। সারা গ্রামের লোকজন সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসে। আসামিদের পাকড়াও করে এবং জিম্মিকৃত সব জিনিসপত্র আইনের আওতায় নিয়ে আসে। সবার কাছে যার যার জিনিস হস্তান্তর করে এবং বিশাল একটি রহস্যের অবসান ঘটে। আনিস ও রাফির সাহসিকতায় গ্রামবাসী বাহবা দিতে থাকেন। বিজিবির মহল থেকে এমন সাহসিকতার জন্য আনিস ও রাফিকে পুরস্কৃত করা হলো।