কুয়াশার পর্দা ভেদ করা সূর্যের আগমনী ঝলকে রক্তিম হয়ে উঠেছে থোকা থোকা মেঘগুলো। দুতলার ঝুল-বারান্দার গ্রিলে কিচিরমিচির গেয়ে উঠল এক জোড়া চড়ুই। এতক্ষণে ডরোথির ঘুম ভেঙে যাওয়ার কথা। হয়তো ভেঙেও গেছে, কিন্তু ইদানীং তুলতুলে কম্বলের উষ্ণ আদর উপেক্ষা করে বিছানা ছাড়তে কুড়েমি লাগে তার। মায়ের ডাক শুনে বিছানা ছাড়ার পরিবর্তে নাকে-মুখে কাথা মুড়ি দিয়ে শুয়েছিল। মা এসে যখন পায়ের পাতায় সুড়সুড়ি দিলেন, তখন তার পরিকল্পনা ভেস্তে না গিয়ে পারল না। ব্রাশ হাতে বারান্দায় বেরিয়ে এলো ডরোথি। কাচের বোতলে জিইয়ে রাখা মানিপ্লান্ট গাছটায় পানি সেবন করতে গিয়ে তার চোখ পরল আকাশের দিকে উড়তে থাকা এক ঝাঁক বেলুনের উপর। বেলুনগুলো একটি বাংলাদেশী পতাকা নিয়ে উড়ছিল। কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে মানিপ্লান্ট লতার গোড়ায় পানি ঢালা ভুলে ছুটে গেল ঘরের ভেতর, তার বাবার কাছে।

‘বাবা, বাবা দেখে যাও আকাশে কারা যেন আজ বেলুন উড়িয়েছে! দেখে যাও বাবা, দেখে যাও! এা, ওমা দেখে যাও।’
ডরোথির বাবা প্লাবন আহমেদ সোফায় হেলান দিয়ে বসে চায়ের স্বাদ গ্রহণ করতে করতে সংবাদপত্রের পাতায় চোখ বলেছিলেন। হাত ধরে টানাটানি তাকে ঝুল-বারান্দায় বেরিয়ে আসতে বাধ্য করল। বাপ-বেটির ছুটাছুটি দেখে ডরোথির মা রুটি তাতানো বন্ধ রেখে রান্নাঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে এলেন। তারা দেখলেন এক ঝাঁক লাল নীল সবুজ হলুদ কমলা গোলাপি বেগুনি বেলুনের সাথে একটি বাংলাদেশী পতাকা বাতাসে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। আরো অসংখ্য বেলুন বিচ্ছিন্নভাবে আকাশের ঊর্র্ধ্ব সীমানায় উঠে যাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় লেগেছে। বেলুনগুলোর পাশাপাশি বেশ কয়েকটি কবুতরকে কুয়াশার মধ্যে এলোপাতাড়ি সাঁতরে বেড়াতে দেখা গেল।

ডরোথিদের বাসার সামনেই জেলা শহরের সর্ববৃহৎ খেলার মাঠ, যেখান থেকে বেলুনগুলো উড়ানো হচ্ছে। ঝুল বারান্দা থেকে মাঠটা দেখা যায় না সামনের বাড়িঘরগুলোর জন্য। বারান্দায় দাঁড়িয়েই শুনতে পেল তারা মাইকে গান বাজছে- ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি, মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি।’
‘বাবা, ও বাবা..., ওখানে কিসের অনুষ্ঠান হচ্ছে? ওরা বেলুন উড়াচ্ছে কেন?
‘জানিস না আজ শোলই ডিসেম্বর! বিজয় দিবস। বিজয় দিবসকে সাদরে বরণ করতেই তো বেলুন উড়ানো হচ্ছে।’
ডরোথির চোখে-মুখে বিস্ময়- ‘বিজয় দিবস! কাদের বিজয় বাবা?’
প্লাবন সাহেব মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমাদের বিজয়, প্রতিটি বাংলাদেশীর বিজয়, বাংলা ভাষাভাষীদের বিজয়।’
ডরোথির কচি মুখের ভাব দেখেই বুঝা গেল বাবার কথার অর্থ সে কিছুই বুঝতে পারেনি। বাবা আবার বলতে লাগলেন, ‘আমরা আজ স্বাধীন, মুক্ত কিন্তু একদিন পরাধীন ছিলাম। আমরা ছিলাম পাকিস্তানিদের শোষণের শিকার। আমাদের দেশ ছিল পাকিস্তানের অংশ। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শেষে বাংলাদেশ স্বাধীন শত্রুমুক্ত হয়। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় আমাদের স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতাকে বরণ করতে, ৩০ লাখ শহীদের স্মৃতিকে স্মরণ রাখতে প্রতি বছর আজকের দিনে জয়োৎসবের আয়োজন করে দেশের মানুষজন।’

আকাশ কুয়াশাচ্ছন্ন। সেই কুয়াশা গায়ে মেখে বেশ কয়েকটি কবুতর ডিগবাজি মেরে মেরে উড়ছে। ডরোথি তার মাকে আঙুল দিয়ে এ দৃশ্য দেখিয়ে দিলো- ‘মা দেখো দেখো পায়রাগুলো কেমন ডিগবাজি দিয়ে দিয়ে উড়ছে। মা, ওরা কবুতর উড়াচ্ছে কেন?’
মিথিলা জবাব দিলেন, ‘পায়রা হলো শান্তির প্রতীক। ওরা পায়রা উড়িয়ে শান্তির সুবার্তা ঘোষণা করছে।’
একটি নতুন বিষয় জানতে পেরে ডরোথির মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। ততক্ষণে মা চলে গেলেন রান্নাঘরে সকাল বেলার নাশতা তৈরি করার জন্য। বারান্দার গ্রিলে ঝুলে থাকার মতো করে ধরে রেখে উড়ন্ত বেলুনগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে খুব ভালো লাগছিল মেয়েটার। হা করা মুখটিতে মাছি ঢোকার ব্যবস্থা করে দিয়ে ডেব ডেব নয়নে বেলুনগুলো দেখল, যতক্ষণ না সেগুলো আকাশের শেষ সীমানায় হারিয়ে গেছে। তারপর মায়ের ডাকে সোজা নাশতার টেবিলে।
প্লাবন আহমেদ ডরোথির মাকে ফরমায়েশ করলেন, ‘শুনো মিথিলা, মেয়েটাকে একঠু ভালো করে সাজিয়ে দিও তো। ও কখনো বিজয় দিবসের উৎসব দেখেনি। আজ ওকে খেলার মাঠে নিয়ে যাব ভাবছি।

মিথিলা এক টুকরো রুটি গোশতের ঝোল মিশিয়ে মেয়ের মুখে তুলে দিতে দিতে বললেন, ‘এই হাড় কাঁপানো শীতে বাবার সাথে বাইরে থাকতে পারবি তো?’ তারপর প্রশ্নের জবাব পাওয়ার আগেই স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে’। মায়ের তাড়া পেয়ে ডরোথির খাওয়ার গতি বেড়ে গেল।
বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার বেলায় মেয়েকে দেখে অবাক হলেন প্লাবন সাহেব। চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়িয়ে ক্লিপ দিয়ে গাঁথা, চোখে হালকা কাজল, ঠোঁট দু’টিতে গোলাপি ঠোঁট-পালিশ, কপালে নীল টিপ আর দুই গালে পাউডারের ছড়াছড়ি শ্যামল বরণ ডরোথিকে উজ্বল রাজকন্যায় পরিণত করেছে। এরই মধ্যে মিথিলা এসে বাপ-বেটির শরীরে বিদেশী সুগন্ধি ছড়িয়ে দিয়ে গেল। সকাল বেলার বাতাসে সুগন্ধ বিলাতে বিলাতে প্লাবন আহমেদ মেয়েকে সাথে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন।
ডরোথি দেখল দোকানগুলোর সামনে বাঁশের খুঁটির মাথায় বাংলাদেশের পতাকা ঝুলানো। শীতকালে বাতাসের জোর থাকে না, তাই সারি সারি পতাকাগুলো রাস্তার দুদিকে উচ্ছলতাহীনভাবে দাঁড়িয়ে আছে। যেন নীরবে মাথানত করে মুক্তিযোদ্ধে শহীদদের আত্মত্যাগের মর্মান্তিকতাকে স্মরণ করছে। ডরোথির বিস্ময়ের অন্ত খুঁজে পাওয়া সাধ্যের বাইরে- ‘বাবা, বাবা তোমাদের স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা মাথায় ও হাতের কব্জিতে ফিতা বেঁধেছে কেন? হাতের কব্জিতে লালসবুজ ফিতা বাধলে কি হয়?’
প্লাবন আহমেদ কলমিতলা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। বিজয় দিবস উপলক্ষে তার স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা রেলি করে মাঠে যাচ্ছে অনুষ্ঠানে অংশ নিতে। তিনি বলেন, ‘লাল সবুজ হলো আমাদের পতাকার রঙ। ছেলেমেয়েরা পতাকার রঙ নিজেদের শরীরে ধারণ করেছে।’ প্লাবন সাহেব একটি সবুজ ফিতা নিয়ে ডরোথির ডান হাতে বেঁধে দিলেন।

মাঠে পৌঁছেই তার প্রথম বায়না- ‘বাবা, আমাকে একটি বেলুন কিনে দাও, আমিও আকাশে বেলুন ওড়াব।’
প্লাবন সাহেব মেয়ের বায়না রক্ষা করলেন। বিজয় দিবস অমর হোক লেখা-সম্বলিত একটি আধা গোলাপি আধা নীল বেলুন বাতাসে পাক খেয়ে খেয়ে অসীমের উদ্দেশ্যে উড়ে গেল। বাবা তার মেয়ের এই দেশপ্রেম দেখে উচ্ছ্বাসে সশব্দ হাততালি না দিয়ে পারলেন না।
কয়েকজন ছেলে-মেয়ে রঙতুলি নিয়ে গালে আল্পনা আঁকছিল। ডরোথির ডান গালে লেখা হলো ‘আজ মহান বিজয় দিবস’ আর বাম গালে লেখা হলো ‘এ বিজয় আমার তোমার, আমাদের সবার’। দুই গালের এই দু’টি লেখা নিয়ে সে যখন তার বাবার দিকে তাকিয়ে গাল ফুলিয়ে হেসে উঠল, প্লাবন সাহেব তখন রুমাল দিয়ে চোখের জল আড়াল করলেন। বাংলাদেশের সব কয়টা ছেলে-মেয়ের চেতনায় কেন এই স্বদেশপ্রেম ও স্বাধীনতাবোধ পাওয়া যায় না! বাবার সহকর্মীদের একজন বললেন- ‘বাহ, খুব চমৎকার মানিয়েছে তো, প্লাবন সাহেব হলফ করে বলতে পারি, এমন একটি কন্যার পিতা হওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।’
প্রথম সারির চেয়ারগুলোতে বাবার সাথে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করছিল ডরোথি। রণসঙ্গীতের তালে তালে কুচকাওয়াজ করে গেল বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা। এবার দলীয় নৃত্যের পালা। ডরোথি দেখল তাদের সামনে নৃত্যের প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার বাবার স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা। ক্যাসেট প্লেয়ারে বেজে উঠল- ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা, আমরা তোমাদের ভুলব না, আমরা তোমাদের ভুলব না’ পরক্ষণেই সুর বদলে গিয়ে বাজল- ‘সূর্যোদয়ে তুমি, সূর্যাস্তেও তুমি, ও আমার বাংলাদেশ, প্রিয় জন্মভূমি।’