একুশের প্রথম প্রহর এলেই ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ সঙ্গীতের বিষাদময় সুর আমার ভেতরটা কেমন দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ফাল্গুনের এই বাসন্তী মধ্যরাতে শহীদ মিনারে নামবে লাখো জনতার ঢল। প্রভাত ফেরির শ্রদ্ধার্ঘ্যে সিক্ত হতে ইতোমধ্যে শহীদ মিনারও সম্পূর্ণ প্রস্তুত। সবই ঠিক আছে। রক্তমাখা বর্ণমালায় অর্ঘ্য দিতে এসব আয়োজন তো থাকবেই। কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কিছু। সারা জীবন একুশকে ভুলে থাকা এই আমরা বছরে একটা দিন মেতে উঠি শহীদ মিনারে ধাক্কাধাক্কি করে বড় করে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেয়ার সাথে নিজের দল বা সংগঠন এবং নিজের চেহারাটা বড় করে মিডিয়াগুলোতে দেখানো নিয়ে। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অতি আনুষ্ঠানিকতার স্রোতে ভাসতে ভাসতে আমরা চেতনাদীপ্ত এই দিনটির মূল চেতনা ও তাৎপর্য থেকে বহু দূরে চলে এসেছি। আজ মনের মধ্যে বারবার কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কেমন আছে রক্ত ও ভালোবাসার দামে কেনা আমার প্রিয় দুখিনী ‘বর্ণমালা’? কেমন আছে আমার প্রিয় ভাষা ‘বাংলা’? এতো ত্যাগ আর প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া মুখের ভাষা আজ নিজভূমেই অবহেলিত হচ্ছে না তো?
৮ ফাল্গুন ইতিহাসের রক্তঝরা অধ্যায়ের বাঙালি জাতির সেই দিন, যে দিন মায়ের ভাষার দাবিতে বাংলার বীর সন্তানদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল রাজপথ। আজ রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবহ মহান শহীদ দিবস। একই সাথে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসও। মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় নির্ভয়ে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেয়ার দিন আজ। চেতনাদীপ্ত এই দিনটিতে শত বেদনা স্মৃতির মধ্যেও আমাদের গর্ব এবং আনন্দও আছে সীমাহীন। কালের পরিক্রমায় এই দিনটি আজ গোটা বিশ্ববাসীর জন্য মাতৃভাষাকে সম্মান জানানোর উপলক্ষ। বাংলা এখন শুধু বাংলাদেশের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বিশ্বের সব দেশের স্বীকৃত ভাষা হিসেবে গর্বিত বাঙালির মাথা উঁচু করেছে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই হয়েছিল বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের সংগ্রামের সূচনা। ভাষা আন্দোলনের সড়ক ধরেই আমরা ১৯৭১ সালে পেয়েছি স্বাধীন-সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র, আমাদের কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ। শোক-বিহ্বলতা, বেদনা আর আত্মত্যাগের অহঙ্কারে দেদীপ্যমান ভাষা আন্দোলনের সেই শপথ যুগে যুগে বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধে, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আলোকবর্তিকার মতো মূর্ত হয়ে ওঠে। অমিত সম্ভাবনার যে স্বপ্ন, যে প্রত্যয় জাতির হৃদয়ে বপন হয়েছিল, সেই তেজোদ্দীপ্ত বিদ্রোহের সুর আজো প্রতিটি ক্রান্তিকালে ধ্বনিত হয় বাঙালির হৃদয়ে।
আমরা জানি ভাষা আন্দোলন শুধুই মুখের ভাষার জন্য হয়নি, স্বতন্ত্র বর্ণমালার জন্যই হয়েছিল। আমাদের বাংলা ভাষাকে হত্যা করার পাশাপাশি প্রিয় বর্ণমালাকেও ধ্বংস করার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। সারা দেশে যখন ছড়িয়ে পড়েছিল ভাষা আন্দোলনের জ্বলন্ত শিখা, ছাত্রদের প্রবল প্রত্যাশার মুখে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রকারীদের সব অপচেষ্টা উড়ে গিয়েছিল সে দিন। বুকের তাজা রক্ত আর প্রাণের বিনিময়ে বাঙালি ছিনিয়ে এনেছিল তাদের প্রিয় বর্ণমালাকে, তাদের মায়ের ভাষাকে।
আমরা আজ অমর একুশের গান গাই, শহীদ মিনারে নগ্ন পায়ে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করি, সভা-সেমিনার আর কাব্যের মূর্ছনায় মেতে থাকি। অথচ ভুলে থাকি ৮ ফাল্গুনকে। বাংলা ভাষা দিবস পালিত হয় একটি ইংরেজি তারিখ আর মাসকে ঘিরে। বিদেশী ভাষা আর ভিনদেশী সংস্কৃতির দাপটে বাংলা ভাষা মুখে নিয়ে জন্মানো ছোট্ট শিশুটিও আজ কথা বলছে মিশ্র ভাষায়। ভাষার ব্যবহারে ভিনদেশী ভাষার মিশ্রণে আমার রক্তস্নাত বর্ণমালা আবারো হচ্ছে রক্তাক্ত।
এতো আয়োজন করে একুশ পালন শুধুই আনুষ্ঠানিকতা কি না, একুশের চেতনার প্রভাব আমাদের জনজীবনে সত্যিই কতটা রয়েছে, এসব বেশ ভাবিয়ে তুলছে আমাকে। এই তো সে দিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বাংলা বিষয়ের বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের সমাপনী দিনে আমাদের একজন শিক্ষক অনায়াসেই ইংরেজিতে বক্তব্য দিয়ে গেলেন। বক্তব্য শেষে মুখে একটি গর্বের হাসি ফুটিয়ে বললেন, ‘আপনারা কিছু মনে করবেন না, আমি ইংরেজিতে বলতেই একটু স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।’ তাই বলে বাংলা প্রশিক্ষণে এসেও! আমি খানিকটা অবাক না হয়ে পারলাম না প্রিয় সহকর্মীর এহেন কৃতকর্মে। উপস্থিত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ততক্ষণে শিক্ষকটির ইংরেজি ভাষাজ্ঞানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
আশপাশে প্রায়ই দেখি কেউ কেউ ভাষাকে বিকৃত করছে, বাংলার সাথে ইংরেজি মিশিয়ে ভাষাকে জগাখিচুড়ি বানাচ্ছে যা সত্যিকার অর্থেই হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে আমার সাধের বাংলা ভাষাকে। দেশের এসব অতি আধুনিকতার সাথে আমার প্রায়ই বনাবনি হয় না। আর তাই নীরবে আহত হই প্রতিনিয়ত। মাত্র ক’দিন হলো স্কুল জীবনের এক পুরনো বন্ধুর সাথে দেখা। ওদের ৫+ বয়সী মেয়ে শিশুটি আমাকে আনমনেই জিজ্ঞেস করল, ‘হাউ আর ইউ আন্ট?’ আমি কিছুটা ইতস্ততবোধ করলাম উত্তর দিতে। এরই মধ্যে ইংরেজিতে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন কানে বাজলো। মনে মনে ভীষণ হতাশ হলাম। ভাবলাম বাঙালি রক্তের একটি শিশুর মুখে বাংলা আসছে না, কেমন হতভাগা জাতি আমরা! তবে কেন ভাষার তরে আমার ভাইয়েরা তাদের প্রাণটা পর্যন্ত দিয়ে গেলেন। খুব আক্ষেপ নিয়ে বন্ধুটিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘দোস্ত তোর মেয়ে বাংলা শেখেনি?’ দোস্ত আমার অনেকটা দাম্ভিকতার সুরে বলতে শুরু করল, ‘দোস্ত, মেয়েটা ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ার কারণে বাংলার চেয়ে ইংরেজিতেই বাকপটু, মেয়ে আমার ইংরেজির পাশাপাশি হিন্দিও খুব ভালো জানে। জানিস তো দোস্ত আজকাল ইংরেজি জানা ছেলেমেয়েগুলোর যা কদর বেড়েছে!’ আর যেটা লক্ষ্য করলাম, দোস্ত আমার মেয়েটির ইংরেজি ভাষা দক্ষতা অর্জনে অনবরত সঙ্গ দিচ্ছে। কেন জানি না ওদের কথাগুলো শুনে আমি স্থির হয়ে বসে থাকতে পারছিলাম না। বহু দিনের জমানো কষ্টগুলো মুহূর্তেই আমাকে গলা চিপে ধরল। যেন চারপাশ থেকে রক্তের দামে কেনা প্রিয় বর্ণমালার বুকফাটা আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছিলাম। মনে পড়ে গেল কাছের এক স্বজনের কথা। দিন কয়েক আগে বিদ্যালয়ে যাত্রাপথে তার সাথে দেখা। কুশলাদি বিনিময়ের একপর্যায়ে বলে উঠল, ‘অতি আদরের একমাত্র নাতনীকে এবার ইংরেজি মিডিয়ামে ভর্তি করে দিলাম, ওদের তো দারোয়ানও ইংরেজিতে কথা বলে।’ মনের বিষণœতা আড়াল করার চেষ্টা করে ভাবতে লাগলাম, যে ভাষার আদি নিবাস এই বাংলাদেশ, স্বয়ং বাংলাদেশেই আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলা আজ ভয়াবহভাবে ভিনদেশী ভাষার আগ্রাসনের শিকার। আমার ভাবনায় এবার আরো লোমহর্ষক কিছু চেপে বসল। আমাদের নতুন প্রজন্ম যেভাবে বাংলা ভাষার প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ছে, তাতে করে অদূর ভবিষ্যতে কেমন থাকবে আমার প্রিয় ভাষা! কেমন থাকবে আমার প্রিয় দুখিনী বর্ণমালা!
আমি ভাষা আন্দোলন প্রত্যক্ষ করিনি; কিন্তু প্রতিনিয়ত অনুভব করছি বায়ান্নর অমর একুশের প্রথম প্রহরের সেই উত্তাপকে। ক্রমেই মনে হচ্ছে, অন্তহীন প্রেরণার উৎস মহান ভাষা আন্দোলনের সেই উত্তাপ থেকে যেন বঞ্চিত হচ্ছে নতুন প্রজন্ম। অসংখ্য পরিবারের ছেলেমেয়েদের এখন আর বাংলা বলার চর্চা করানো হয় না। এমনকি দেশের বহু সচেতন নাগরিকও বুঝে না বুঝে তাদের সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পাঠানোর চেষ্টায় পিছিয়ে নেই।
মনের মধ্যে আবার উঁকি দিলো বাংলা ভাষার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের একটি কথা। নিউ ইয়র্কে মুক্তধারার এক অনুষ্ঠানে তিনি খুব আত্মবিশ্বাসের সুরে বলেছিলেন, ‘বাংলা ভাষা ভবিষ্যতে যদি টিকে থাকে তাহলে তা বাংলাদেশেই টিকে থাকবে আর তা বাংলাদেশের বাঙালিরাই টিকিয়ে রাখবে।’ এমন সুন্দর বচনে চিত্তখানা কার না আপ্লুত হবে। ভেতরে ভেতরে খুব আশাবাদী হয়ে উঠলাম। এই দেশের দামাল ছেলেরাই তো সে দিন আপন প্রাণের বিনিময়ে উদ্ধার করে এনেছিল তাদের মায়ের ভাষা ‘বাংলা’। যে জাতি নিজ বর্ণমালা আর মায়ের ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সঁপে দিতে পারে প্রাণ, সে জাতি যেকোনো মূল্যে এই ভাষার মর্যাদা রক্ষা করবে এমন প্রত্যাশা আমরা রাখতেই পারি। এই বাংলাদেশেই হবে বাংলা ভাষার যথাযথ লালন আর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ। যাতে ভাষা আপন মনে ডালপালা ছড়িয়ে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিতে পারে এই ভূখণ্ডের সবখানে, সব বাঙালির মননে।
শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলা বলার চর্চা অব্যাহত রেখে বাংলার সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডারকে সঠিকভাবে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেয়ার দায়িত্ব নিতে হবে দেশের কবি, সাহিত্যিকসহ সচেতন মহলকে। আমাদের হাজার বছরের অমূল্য সাহিত্য, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের সিন্ধু রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদেরই। এটা ভুলে গেলে চলবে না- ‘অ আ ক খ..... এই বর্ণমালা আমাদের রক্তে মোড়ানো। আমাদের রক্ত ও ভালোবাসার দামে কেনা এর প্রতিটি অক্ষর।’
জয় হোক মাতৃভাষার, ভালোবাসায় মোড়ানো থাকুক বর্ণমালা। দেশের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ুক একুশের মূল চেতনা। তবেই কিছুটা হলেও পরিশোধ হবে ভাষা শহীদদের রক্তের ঋণ।
লেখক : সহকারী শিক্ষক, দক্ষিণ পশ্চিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কোম্পানীগঞ্জ, নোয়াখালী
একুশের প্রথম প্রহর এলেই ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ সঙ্গীতের বিষাদময় সুর আমার ভেতরটা কেমন দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাতের...
