রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসজুড়ে রয়েছে সবুজের সমারোহ। একই সাথে হৃদয়ের কোঠরে মধ্যমণি হিসেবে জায়গা দখল করে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীল-সাদা বাসগুলো, যা ক্যাম্পাসের মাধুর্যতার পূর্ণতা দান করে। এই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাসে চেপে গন্তব্যে আমরা পৌঁছাই স্বাচ্ছন্দ্য আনন্দে।
প্রিয় ক্যাম্পাসের কথা বারবার মনে পড়ে যায়। বারবার হাতছানি দিয়ে ডাকে। যেন কথা বলে স্মৃতির জানালায়। প্রিয় ক্যাম্পাসের স্মৃতিগুলো অল্প কথায় শেষ হবে না। ক্যাম্পাসের ঝকঝকে নীল-সাদা বাস বেশ চোখে পড়ার মতো। জীবনের প্রথম প্রেম ক্যাম্পাসের নীল-সাদা বাস। তার সংস্পর্শে মনটা উদাস হয়ে যায়। নীল-সাদা বাসের কাব্য লিখে ফেলে। বাসের সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে জীবন। এখানে আবেগ, অনুভূতি ও প্রেমাবেগের গভীর মিল খুঁজে পাই। ক্যাম্পাসের বাসগুলো একসাথে ছাড়ে। তখন অসাধারণ দৃশ্যে কে না অবাক হয়! এই দৃশ্যপটে কবিতা লেখাই যায়। ‘সব রুটে সারাদিন নীল-সাদা বাস, সেটা ছিল আমাদের প্রিয় ক্যাম্পাস।’
জীবনটা সময়ের দুর্বার গর্তে বহমান। ক্যাম্পাসের বাসস্ট্যান্ড মনে হয় বিশাল এক খেলার মাঠ। বাসগুলো যাত্রী নেয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে। শুধু দাঁড়িয়েই থাকে না, হাজার হাজার শিক্ষার্থীর গল্প, গান, আড্ডা, যাত্রা স্মৃতির গল্প হয়ে জেগে থাকে। নির্ধারিত সময়ে বাসগুলো ক্যাম্পাস ছেড়ে যায়। তাই বলা যায় ‘সময়ের ছক বেঁধে চলে প্রতিদিন, দুই চোখে ভিড় করে স্মৃতি সীমাহীন। সময়ের আগে বাস আসে রোজ রোজ, মোড়ে মোড়ে হেলপার করে যায় খোঁজ।’
শত ব্যস্ততা নিয়েই এগিয়ে চলতে হয়। ব্যস্ততার মধ্যেই জীবনের পরম আনন্দ। শত স্মৃতি বিজড়িত ক্যাম্পাসের নীল-সাদা বাসগুলো। বাসে আসা-যাওয়া করতাম প্রতিদিন। বাস একটু দেরিতে এলেই মনটা আনচান করে। তাই তো মনে পড়ে ‘প্রতিদিন বাসে উঠি মোড়ে এসে ঠিক, কভু যদি দেখরে খুঁজি চারিদিক।’
আমাদের বাসে কোনো বৈষম্য ছিল না। বাসটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। এ বাসের প্রথম চারটি সিট ছাত্রীদের জন্য নির্ধারিত। কারণ ক্যাম্পাসের ছাত্রীদের বাস নওহাটা পর্যন্ত যায় না। সেখানকার ছাত্রীরা এ বাসে চড়তেন। তবুও আমরা মিলেমিশে থাকতাম। এমন কি কখনো তাদের সিট পূরণ হয়ে গেলে কেউ কেউ ছেলেদের সিটে বসতেন। আমরা তাদের সিট ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে যেতাম। এই দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যেও এক ধরনের আনন্দ অনুভব করতাম।
জীবনের বড় একটি অধ্যায় ছিল ক্যাম্পাসের নীল-সাদা বাস। প্রথম প্রথম পথঘাট চিনতে খুব পেরেশান হতাম। দেখতে দেখতে কখন যেন পাঁচ বছর এখানে পার করেছি। স্মৃতিগুলো এখন হাতড়ে বেড়াই। স্মৃতির ডায়েরি খুলে লিখতে ইচ্ছে করে ‘এখানেই জীবনের বড় এক পাঠ, ক্যাম্পাসে আসি যাই চেনা পথঘাট।’
আমরা নওহাটাগামী বাসে উঠতাম। আমাদের দলে ছিল শফিক, আব্দুল কুদ্দুস, মাইনুল, মুজাফফর, মও আখতার। কখনো কখনো দারুণ অনুভূতি মনের মধ্যে আঁচড় কাটে। ক্লাসের ফাঁকে শহর ভ্রমণের জন্য ঘুরে বেড়াতাম। কবিতার ভাষায় ‘মাঝে মাঝে মনে হয় করি কোলাহল, বাসে উঠে সহপাঠী ছুটি কোনো দল।’
নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে চড়ে শহর ভ্রমণের আনন্দটা অন্যরকম। সাথে একটু ঝটিকা সফর যেন স্বপ্নের মতো। সত্যিই কী যে মজার অনুভূতি তা কাউকে বলে বোঝানো মুশকিল। এই শহরের আলো ও বাতাস আজো যেন অঙ্গে মিশে আছে। এখানে পেয়েছি কবিতা লেখার সুষমা। জীবনের প্রয়োজনে শহরটা ছেড়ে এসে২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। কখনো গেলে নীল-সাদা বাসে শহর ভ্রমণের ইচ্ছে করে। মনে পড়ে যায় কবিতার কথা। ‘ঘুরে ফিরে নিয়ে আসি বুকজুড়ে শ্বাস, হাসি গানে জীবনের যায় বারো মাস।’ এক কথায় রাবির নীল-সাদা রঙের বাসগুলো সৌন্দর্যের রানী।
সাবেক শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়