হাওড়-বাঁওড়, খাল-বিল এবং ঝিলে চলছে এখন মৎস্য শিকারের মহোৎসব। বড় বড় বিলে হাজার হাজার মানুষের এক সাথে পলো নিয়ে মৎস্য শিকারের চিরচেনা এ দৃশ্যগুলো গ্রামীণ জনপদে যেন আনন্দ উৎসবের বারতাই বহন করে থাকে। প্রতি বছরই শীতে যখন নদ-নদী, হাওড়-বাঁওড়ের পানি কমে যায় তখন শুরু হয়ে যায় দেশীয় প্রজাতি মাছ ধরার মহোৎসব। চলনবিলে শত শত বছর ধরে গ্রামের মানুষ থেকে শুরু করে অনেক দূর-দূরান্ত থেকে মাছ ধরার আনন্দের সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। পাবনা চলনবিলে মাছ শিকার করতে আসেন টাঙ্গাইল জনপদের অধিবাসীরা পর্যন্ত। তাতে নেই কোনো বাধা। এখানে যেন মাছ ধরার আনন্দটাই বড় কথা। প্রকৃতির বিরূপতায় পড়ে অনেক হাওড়-বাঁওড়ে এখন পানিশূন্য থাকে। তাতেই দেশীয় প্রজাতির অনেক মাছ বিলুপ্ত প্রায়। দেশের খ্যাতনামা বিলে পলো ফেলে অনেকেই বোয়াল এবং রুই-কাতল ধরে দড়ি দিয়ে কোমড়ে বেঁধে রাখছে। কেউ পাচ্ছে শোল-গজার। আবার কারো ভাগ্যে জুটছে কই-শিং। বাহারি এবং হরেক রকম মাছ শুধু প্রকৃতির জলাধারগুলোতেই মিলে থাকে। দেশের পাবনা, সিরাজগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের আড়িয়ল বিলসহ আরো কিছু বিল রয়েছে প্রকৃতির মৎস্য ভাণ্ডার হিসেবে খ্যাত।
চলনবিলের বোয়াল আর আড়িয়ল বিলের কৈ মাছের খ্যাতি দেশজুড়ে। এখানকার হলুদ কৈ মাছ চড়া দামে বিক্রি হয়ে থাকে। একশত কৈ মাছের দাম লাখ টাকার ওপরে। আবার চলনবিলের বিশাল বোয়াল মাছের স্বাদও মুখে লেগে থাকে।
বর্ষার টলটলা পানিতে যখন খাল-বিল, হাওড়-বাঁওড় টই-টম্বর হয়ে ওঠে তখনই দেশীয় প্রজাতির মাছ মাটির ভেতর থেকে বেড়িয়ে আসে। প্রকৃতির নিয়মে টলটলা পানিতে মনের আনন্দে লাফিয়ে বেড়ায় এবং সে পানিতে ডিম ছাড়ে। বিলের ন্যাচারাল অর্গান খেয়ে মাছগুলো বড় হতে থাকে। কয়েকটি ঋতু শেষ হলে আসে শীত। শীতের শেষদিকেই নদ-নদীর পানি কমতে থাকে। বেশি কমে বিল-ঝিল বা জলাশয়ের পানি। প্রায় শুকিয়ে যায় ডোবা-নালা। দীর্ঘ সময় প্রাকৃতিক খাবার খেতে পেয়ে মাছগুলোও দ্রুত বড় হয়ে যায়। আর তখনই গ্রামীণ জনপদের মানুষেরা একযোগে খাল-বিল, হাওড়-বাঁওড়ে মাছ শিকারে নেমে পড়ে। এ মাছের স্বাদই অন্য রকম হয়। যা চাষ করা মাছের সাথে অনেক পার্থক্য তৈরি করে।
তবে দেশের বালু খেকোরা নদী-নালা, খাল-বিল ভরাট করে চলছে দেদারছে। তাতেই দেশ থেকে অনেক খাল-বিল হারিয়ে গেছে এবং অনেক দেশীয় প্রজাতির মাছের বিলুপ্তি ঘটতে চলছে। এক সময় দেশী মাগুরের ঝাঁক পাওয়া যেতো নদী বা পুকুর সেচ করলে। কিন্তু এখন আর দেশী মাগুরের দেখা সেরকমভাবে মেলে না। অনেক মৎস্য ব্যবসায়ীই এখন চাষ করা মাগুরকে রং মিশিয়ে দেশী বলে চালিয়ে দিচ্ছে। তাই তো দেশের মানুষ প্রাকৃতিক স্বাদেভরা মাগুরের স্বাদ ভুলে যেতে বসেছে। দেশের নদ-নদী আবার খনন করে প্রাকৃতিক জলাধারগুলো সংরক্ষণ করতে পারলে দেশীয় মাছে আবার খাল-বিল ভরে যেতো। সে উদ্যোগ গ্রহণ করাই এখন সময়ের দাবি।
মিরাপাড়া-রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ