আসাদ চৌধুরী
না-ফেরার মতো
কেউ ঘরে এলে বড়ো খুশি হই।
সঙ্গে পোঁটলা থাকলে
শিশুরাও আনন্দে লাফায়।
একদিন খালি হাতে
যেতে হবে; জানি।
না ফেরার মতো অনিবার্য
জরুরি কাজটি
ঝটপট শেষ হয়ে যাবে।
এই চরাচরে
এ নিয়ে কতো যে
আশঙ্কার খেলাধুলা।
শাশ্বত হাসান
তাইজুদ্দিন বচন
আমি দুঃখ কুড়াই ব্যথিতের বেদনায়
পশুদের,
মানুষের, প্রেমিকের, উদ্ভিদেরÑ।
এই আমার গাঁও
আমি দুঃখ কুড়াই ফকিরের-
মঞ্চে কবে হবে ফকির বচন।
আমরা সবাই রিফুজি
তবে এত লোভ কেন?
এত যুদ্ধ কিসের?
চার তরিকায় সিলসিলা,
বাবার সরলতায় হন্তারক ভাই
হরণ করে স্পর্শিল সম্পদ
তাইজুদ্দিন আজ ফকির।
এখানে আমরা সবাই রিফুজি
তাইজুদ্দিন ভিখেরি।
বেগম রাজিয়া হোসাইন
মনের ময়ূর
কিছুই করার নেই
দ্বীপান্তরে একাÑ অথচ একটা বিশাল বাড়ি
শব্দহীন, আনন্দ-বেদনার উচ্ছ্বাস নেই
অপেক্ষারা অবসন্ন
থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়
নতুন পুরানো কাগজ বই পেন্সিল খাতা
ভীষণ একঘেয়ে একা
চোখ দু’টো মাঝে মাঝে খুঁজে নেয়
সবুজ গাছের লাবণ্য, পাখিদের কলতান
অথবা আর একটু দূরে এক গুচ্ছ বালকের
বল নিয়ে ছোটাছুটি- ক্লান্ত চোখ
ফিরে আসে ঘরে, সেই বিছানা, সেই টেবিল
কাগজ কলম খাতা
নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে
দু’হাতে চোখ মুখ মাথা চাপটিয়ে
আবার নতুন করে দেখার চেষ্টা করি
সময় এত ভারি আগে জানা ছিল না
আলাপচারিতা নেই যাতে মন পাপড়ি মেলে
শব্দ করে কবিতা-গল্প পড়ে আর কতক্ষণ!
অকারণ লিটুটাকে ডাকি-
কখনো মজার রে তার গ্রামের কথা বলে
কখনো তার ছোট্ট মনের দুঃখ অভিমান
বিষাদের কান্না ঝরে- আরো কষ্ট পাই
আমার মনের ভার কমে না-
কী বলবো কাকে? কেবল সময়টাই আমার
সম্বল, সেই সময়টা...
কে জি মোস্তফা
যুগলবন্দী
প্রকৃতির আদিম অধিকারে
বৃষ্টি আসে বৃষ্টি যায়
শিকড় থেকে ক্ষরিত আলোর কথা ভেবে
অরণ্য প্রচ্ছদ বদলায়, খুলে দেয়
সবুজ পাতার ঝাঁপি
খুলে দেয় কবিতার অভিমুখ।
কী সাবলীলভাবে ওরা প্রকৃতির দূরত্ব জানে
জানে বলেই মাটির গভীরে কত সহজ চলাচল
এ যেন নিশ্চিত এক যুগলবন্দী।
আমাদের কবি ও কবিতা কেন
সংস্কারের পাঠ জানে না
কালি ও কলমে কেন
ঝরে পড়ে শুধু সনির্বন্ধ শরীর!
হে কবি এসো আজ
কোমল ধৈবত থেকে ঋষভে
কবিতায় ছুঁয়ে থাকি শিকড়ে শিকড়।
দিলীপ কির্ত্তুনিয়া
বাবার স্বপ্ন
বাবার স্বপ্ন ছিল আমাদের গ্রামে একটা
পাকা সড়ক দেখবে।
বাবার শিশু চোখ থেকে যৌবন চোখ
আজ এই বৃদ্ধা চোখ।
বাবা তাকিয়ে তাকিয়ে কী দেখল!
বাবার চোখে আমি কোনো পলক পাই না।
আমি চেষ্টা করি বাবার প্রতিটা
পলক গুনতে।
বাবা অনর্গল এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে।
বাবা তাকিয়ে থাকলে
এই বাড়িটা আর নড়ে না।
বাবা তাকিয়ে থাকলে
হাঁস মুরগির পা স্থির হয়ে যায় উঠোনে।
মা বলে- কী, কী হলো তোমার?
পলকে ফুটে ওঠে আকাশ আর বিষণœতা।
পুরো পলকহীন চোখ যেন
এই গ্রামের অথই ভাবনা।
এখনও একটা পাকা সড়ক হলো না-
এই কান্না।
বাবার চোখে পলক পড়ে না
বাবা কী তবে মারা যাবে
এই গ্রামের আদিগন্ত দুঃখ-নীলনদ
কাঁচা সড়ক দেখতে দেখতে?
লুৎফুন নাহার রহমান
সবুজের ঠিকানা
একদিন ঠিক ঠিক তোমাকে ডেকে নেবো
হাতের মুঠোয় তুলে নেবো তোমার দু’হাত
নাগরিক নিকেশের ইতি টেনে
চলে যাবো বহুদূর সবুজের দ্বারে।
এই নাগরিক বরষা নিরেট সূর্যালোক
পত্রবিহীন বৃক্ষ আমাদের নয়
আমাদের নয় এ নগর।
ইট কাঠ কংক্রিট বহুতল ছাদ
ঝলমলে নিয়ন রাতের গল্পে
এখানে চন্দ্রালোক, জোনাক নেই
নেই জ্যোৎস্নায় ভেজা স্নান, সম্মোহন।
সহজিয়া ভালোবাসা নিয়তই হচ্ছে আহত
নাগরিক কোলাহল আর নিপুণ নিঠুরতায়।
চলে যাবো নদী পাখি চিল আর শালিকের বনে
বুড়ো বট মেঠো পথ আকাশের বুকজুড়ে তুলোতুলো মেঘ
ধানের নতুন ঘ্রাণ ফসলের সোনা রঙ হাসি
ঢেউ তোলা বাতাসে পাতার স্বরধ্বনি
আমাদের প্রতিবেশ গাঙচিল পায়রা পাল তোলা নাও।
একদিন ঠিক ঠিক ছুঁয়ে দেবো তোমার এ মন
আমাদের চোখের তারা মনের আকাশ আহত ভালোবাসা
খুঁজে পাবে কাক্সিক্ষত ঠিকানা তাদের।
হাসান হাফিজ
বিদায়ের আসন্ন সানাই
ডর লাগে মরণের ডর
অনিচ্ছায় ছেড়ে যাবো প্রিয় বাড়িঘর,
একলা নাও মাঝগাঙে বৈঠা হাল কই
পৌঁছানো সম্ভব তীরে
এ রকম আশা ভরসা সামান্যইÑ
ডর লাগে, স্বীকার করার মধ্যে
শরমের প্রশ্ন কেন ওঠে
প্রস্থানের পরেও কী আশ্চর্যরকম সত্য
ঠিকঠাকই চন্দ্র সূর্য
স্বাভাবিক ওঠে!
শহীদ সিরাজী
জীবনের খতিয়ান
সবই এখানে আছে যেমন চেয়েছে এ মন
জীবন কবিতা আর কাব্যের রস রসায়ন
সুখের কলস তা'ও ভরভর দুখ অজানা
সময়টা কোন ফাঁকে পেরিয়েছে জীবনের গাঁ
আমিও আছি তবু মন বলে যেন আমি নাই
সময় হৃদ' য়ে পাপড়িরা শুধু ঝরে যায়
মমতা-পাখীরা কোথা মন খুঁজে মনের সীমা
শেখর ছুঁয়েছে সুখ তবু সুখ, সুখ পায় না!
চলার পথে চলে পথ আজ কাঁপে থরথর
চশমায় দ্যাখে চোখ তবু সব শ্যাওলা আঁধার
রস রসালো পেট জয়ঢাক জীবনের য়
জীবনের ভার বেড়ে দুর্ভার যেন হিমালয়
জীবনের খতিয়ান খুঁজে আজ পথ-ঠিকানা
নিজের ভেতরে নিজে জড়সড় দূর্ভাবনা ...!
পুলক হাসান
সার্কাস সুন্দর
ভেবেছি তোমার প্রেম
একটি স্বপ্নযাত্রা
স্বপ্নভঙ্গের উপশম
এখন দেখি দৃষ্টির বিভ্রম
অহেতু দিবানিদ্রার ঢেউ
শুকনো পাতা খরস্রোতা
যে ছায়াটি পুষি
তাকেই মনে হয় গুপ্তচর
মনে হয় খুনি, ছদ্মবেশী
ভাবতে পারি না সহচর
হৃদয়ের আদান-প্রদান করি
ব্যাকুল তিয়াসে আশাবরী
নেই কেউ
কেউ নেই মুক্ত নিঃশ্বাসে
দোর খুলে বেরিয়ে এসে
জানায় স্বাগতম
তবু তুমি নীলাম্বরী
সার্কাস সুন্দর।
হাসান আলীম
ফেরেশতার গল্প
হুসনি মোবারক তুমি চল্লিশ বছর পর মূত্র ত্যাগ করলে
এর পূর্বে তোমার বর্র্জ্য পদার্থ কর্পূরের মত মিশে যেত হাওয়ায়,
মোয়াম্মার গাদ্দাফি তোমার জলযোগ হলো ম্যানহোলে
আইফেল টাওয়ার, হোয়াইট হাউজ হা হা করে হেসে উঠলো
এখন ফুসে উঠছে ক্রেমলিন,
বুর্জ খলিফায় যেন না ঢোকে মিয়া খলিফা।
অটোম্যান প্রাসাদের ড়ায়া জ্বলছে দ্বাদশী চাঁদের চোখ-
আর এদিকের নাফ নদী সহ¯্র ধর্ষিতার সরমের রক্তে
লাল হয়ে যাচ্ছে।
হে বঙ্গোপসাগর তুমি কতকাল
হিমছড়ি পদতলে চুমু খাবে?
বাটালী হিলের কিংবা জাফলংয়ের
সোনালি কপোতগুলোর পাখা কে কেটে দিয়েছে?
অনেক ওয়াজ শুনেছি-
বায়তুল মুকাররম, শাপলা চত্বর তোমার ফরাসে
আসমান থেকে নামে না কেন
রহমের ডানাওয়ালা মাছ?
যমুনা, হে পদ্মা তুমি কতকাল জলত্যাগ করে
লু হাওয়া ছড়াবে এ বঙ্গ দরিয়ায়।
কতকাল তুমি মূত্র ত্যাগ না করে
ফুরফুরে ফেরেশতা হয়ে থাকবে?
মিলন সব্যসাচী
জলের সারোদ
তৃষার আগুনে পুড়ে বিবসনা বাসনার নাও
জলের সারোদে সুর সেধে তুমি কামগীতি গাও
নাগিণী নদীর তীরে আমি একা খুঁজে ফিরি কাকে
মনের আকাশে সেই অস্তগামী সূর্য জেগে থাকে।
নিরবধি পথভ্রষ্ট নদী বহো নীল অভিসারে
বাতাসের আয়ু খেয়ে বেঁচে থাকো কোন অধিকারে
ধূলিঝড়ে শুধু ওড়ে হৃদয়ের রিক্ত হাহাকার
মৃত্যুমুখি জীবনের প্রতীক্ষার খেয়া পারাপার।
কোমল পাড়াড়ে সুপ্ত শিহরণ জাগলে আহারে
নীলালোক জ্বলে ওঠে অন্তরঙ্গ আগুন্তুক আঁধারে
দিবালকেই তুমি ঘৃণ্য পরিত্যক্ত খুব দামি রাতে
কত সোহাগী আদর সোভা পায়- কামরাঙা হাতে।
আমি বিষাদে ঘুমিয়ে পড়ি শুধু তোমাকে জাগাতে
শত ব্যস্ততার ভিড়ে পারোনিতো এ পথে আগাতে
এই আমার আকাশে অভিমানে চাঁদও ওঠেনি
বিষণœ বসন্তে আজো আশাবৃক্ষে স্বপ্নকুঁড়ি ফোটেনি।
বিষবাহী বিরহের লবণাক্ত জ্বিভ চেটে পুটে
নিসিদ্ধ ফাগুনে তুমি ফুল হয়ে আছো ফুটে
ঘুমাচ্ছন্ন পৃথিবীর যত ক্ষত রোগীর মতন
রাতের জলসা ঘরে করে শুধু তোমায় যতন।
আশরাফ মীর
মায়াবী বুনন
ফিরে আসে উড়ে বেড়ায় মায়াবী বুননে মৌচাক ঘর বানায়
সূক্ষ্ম-সুনিপুণ শিল্পকারিগর শব্দের মৌমাছি সঞ্চয় করে
প্রাকৃতিক উপমা-চিত্রকল্পের খাঁটি মোহ-মধু।
মায়াবী আবেশে মুখরিত দু’জনার ভোরের প্রশান্তিময় হাওয়া
রাত্রির মধুচন্দ্রিমা সজীব উৎফুল্ল প্রাত্যহিকতা আবেগ কম্পিত
যৌবন দিনের ভোগবাদী বিলাসী আকাক্সক্ষা
ধানাই-পানাই নাতিদীর্ঘ স্তুতিবচন
মন জয় করার মন মত, মনের মত, মোমের মত মন গলানো
ছোটখাটো ধ্যান-তপস্যা জৈবিককরণ, কৌশল, শিথিলতা
যৌবন তরঙ্গ যৌন প্রক্রিয়ায় অবয়ী দেহ-মন
বহুমাত্রিক নৈরাশ্যে ডুবে যায়
নপুংসক আর ক্লীবলিঙ্গ মিলে
যৌবন শরীরে যৌন তৈল মর্দনের
ব্যর্থ চেষ্টা কর্মে বসন্তকাল পাড়ি দেয়।
আরিফ মঈনুদ্দীন
অনন্তযাত্রা
যতই সম্মুখে এগিয়ে যাই ততই মুগ্ধ আমি
পথ আর ফুরোয় নাÑ এ এক অনন্ত যাত্রা
যেতে থাকি যাচ্ছি
ভূলোক-দ্যুলোক পেরিয়ে আরও কত কী আছে!
বকুলের গন্ধ ছড়ানো রাস্তা মাড়িয়ে চলে যাইÑ
যেতে থাকি যাচ্ছি Ñ
মস্তিষ্কের নিউরনে সতেজ ফুলের গন্ধ
কে যেন বকুল ছড়িয়ে দিয়েছে প্রেমময় যতেœ।
তৃষ্ণাকাতর পথিকে জলের কলস কাঁখে কে একজন অপ্সরা
সস্নেহে সাদরে কাত করে দেয় ভরা কলসের মুখ
ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে সড়ক মাড়িয়ে আবারও চলা
এ চলার শেষ নেইÑ কোথায় হাঁটছি ?
আমি তো নিজের ভেতরেÑ অবাক হয়ে দেখি
সীমানাহীন রাজ্যের অধীশ্বর আমি
কূলহীন তলহীন সমুদ্র মন্থনে বেপরোয়া নাবিকের গুরু
অলৌকিক ইশারায় আমাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন নিজের সামনে
দরোজা খুলে বিস্ময়ে বোবা হয়ে আছি
এ কোন জগৎ এতদিন দেখি নি কেন তা
নিজের ভেতরে এত সম্ভাবনাÑ ত্রিকালজ্ঞ ঋষির ক্ষমতা!
শংকর দাস
আজ ভালোবাসা
কখনো ভালোবাসাহীন হইনি, প্রেমহীন হইনি
কখনো !
নেশাহীন কবিতায় ডুবদিয়েছিলাম যখন,
নেশায় তখনো!
সেদিনও ভালোবাসা ছিল! শর্ট প্যান্টের
ডুরে.....
গোধূলির ঘ্রাণ ওম নিয়েছিল ছেলেবেলার
সব বন্ধু পড়তে বসতাম ভোরে !
অনিবার্য গোপন দুপুরে অসংখ্য ঘ্রাণে,
খোদাই করেছি মন্দির !
স্পর্শময়রা যেন ধারণায় ব’সে ! মাপার
কারখানায় পাঁজরের গন্ধ কতটা গভীর!
অথচ, আমার বুকে সুদূর সেদিন আজও
এসে দাঁড়ায়! পুনরাবৃত্তি অপরাধ!
আবার সাজিয়ে তুলি আমার ভালোবাসার
প্রাসাদ !
মনের গভীরে জমে থাকে মন, একটা দিন
শেষ হয়ে আসে !
মেঘের গভীরে জমে থাকে নদী,
স্রোত হয়ে নির্জন নিরুদ্দেশ ভাসে
ভালোবাসি! শব্দটা পাল্টে নিচ্ছে তার সিদ্ধান্ত!
এখন, ঘুম থেকে উঠে ! ঘুমের আড়াল দিয়ে,
ভাসমান মধ্যকার দূরত্ব !
