আজ আবার ঘুমের ভান করে শুয়েছিলাম মায়ের সঙ্গে। তারপর রোজকার মতো মায়ের চোখে ঘুম এলে আমি বেরিয়ে যাই ঘর থেকে। সোজা চলে যাই পাবদা বিলের পাশে আমাদের খেলার মাঠে। এখানে আমরা সবাই না ঘুমানোর দল, দুপুরে মাকে ফাঁকি দিয়ে সবাই জড়ো হই। বল, মার্বেল আর ডাংগুলি খেলি।
আজ কেউ আসেনি। মন খারাপ করে একা একা বসে আছি। খেলতে পারব না, অথচ সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলে মায়ের বকুনি ঠিকই খেতে হবে।
হঠাৎ আমার নাম ধরে কেউ ডাকল। আমি আশপাশে তাকালাম। না, কেউ নেই।
আওয়াজটা দ্বিতীয়বার এলে আমি উঠে দাঁড়াই। কান খাড়া করি।
এবার ডাকটা স্পষ্ট হয়ে আমার কানে বেজে ওঠে।
‘ফাহিম, আমি তোমার বন্ধু পুতিজাম গাছ। আমার কাছে এসো।’
আমি অবাক হলেও ভয় পেলাম না, তা ছাড়া ভরদুপুরে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। পুতিজাম গাছটি তার একটি ডাল নেড়ে আমাকে কাছে ডাকল।
আমি কাছে গেলে সে আবার বলল, ‘উপরে উঠে এসো। আজ তোমার সঙ্গে গল্প করব।’
আমি তরতর করে উপরে উঠে গেলাম। আমাকে কাছে পেয়ে গাছটা যারপরনাই খুশি হলো। পাকা জাম ভরা একটি ডাল আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললÑ ‘খাও বন্ধু, দেখো বেশ সুস্বাদু। একদম রসে টইটম্বুর।’
আমি দুটো জাম মুখে পুরে বললামÑ বাবা বলেছেন, পুতিজাম নাকি পাখিদের খাবার। মানুষেরা সব ফল খেয়ে নিলে পাখিরা কী খাবে?
আমার কথায় পুতিজাম গাছ হাসল, হাসির শব্দ না হলেও পুরো গাছটা কেমন যেন দুলে উঠল, আর তাতেই বুঝে নিলাম সে হাসছে।
হাসি থামলে আরো একটি জামভর্তি ডাল আমার মুখের কাছে ধরে বলল, ‘আরে মিয়া খাও। তুমি তো রোজ এসে আমাকে জ্বালাতন করো না। তোমার বন্ধুরা তো জাম খাওয়ার জন্য আমার ডাল ভেঙে নিয়ে যায়। তুমি তাদের চেয়ে আলাদা। আমাদের কষ্ট বোঝো। পাখিদের কথা ভাবো। আজ থেকে তুমি আমার বন্ধু। রোজ এসে জাম খেয়ে যাবে আর গল্প করবে। তোমার মায়ের গল্প, স্কুলের গল্প, স্কুলের স্যারদের গল্প আর তুমি যে শহর ঘুরে এসেছ তার গল্প।’
পুতিজাম গাছের কথায় আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমি যে শহর থেকে বেড়িয়ে এসেছি, সে জানল কী করে? প্রশ্ন করলাম তাকে।
: শহরের কথা তুমি কী করে জানলে?
: জেনেছি, তবে কিভাবে জেনেছি বলব না।
: না বললে তোমার সঙ্গে আড়ি।
: আচ্ছা বাবা বলছি, শহর থেকে এসে তুমি যে বন্ধুদের সঙ্গে বলেছিলে শহরের কথা, আমি শুনেছি।
: তোমরা কী মানুষের কথা শুনতে পাও?
: আমরা সবার কথা শুনতে পাই। মানুষের কথা। মেঘেদের কথা। বাতাসের কথা। পাখিদের গানের ভাষাও আমরা বুঝি। তবে আমরা কারো সঙ্গে কথা বলি না।
: কেন? কেন?
: কারণ, আমরা পৃথিবীর ভারসাম্য ও পরিবেশ রক্ষার জন্যই জন্ম নিই, আমাদের এত কথা বলার সময় কই! প্রাণিকুলের উপকারের জন্যই আমাদের জন্ম। একমাত্র মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণী আমাদের তেমন ক্ষতি করে না। মানুষ বড়ই বোকা জীব। আমরা তাদের ছেড়ে দেয়া কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে বাঁচার জন্য অক্সিজেন দিই, অথচ দেখো, মানুষই আমাদের বিনা কারণে নিধন করে। আমরা সহ্য করি। যখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন সৃষ্টিকর্তার কাছে অভিযোগ দিই, অভিশাপ দিই। আর তখনই তাদের ওপর নেমে আসে প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
: গাছ বন্ধু তোমরা সত্যিই অনেক ভালো। তোমরা আমাদের পরম বন্ধু। আমি বন্ধুদের বোঝাব, যাতে তারা গাছদের কোনো ক্ষতি না করে। সবাইকে বেশি বেশি গাছ লাগাতে উৎসাহিত করব। আরেক দিন এসে তোমার সঙ্গে শহরের গল্প বলব। আজ তাহলে আসি। ভালো থেকো।
: তুমিও ভালো থেকো ফাহিম। ধীরে ধীরে নামবে কিন্তু, দেখো পা যেন ফসকে না যায়।
বন্ধু পুতিজাম গাছের কথামতো নামতে গেলেও আমার পা ফসকে যায়। আমি নিচে পড়ে যাই। পায়ের গোড়ালিতে প্রচণ্ড ব্যথা লাগে। আমি কঁকিয়ে উঠি।
আমার আওয়াজ শুনে ছুটে এলেন মা। আমাকে টেনে তুললেন। কিন্তু এ কী! আমি ঘরের মধ্যে কেন?
বুঝতে পারলাম আমি খাট থেকে নিচে পড়েছি। আর এতক্ষণ ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখেছি। আজ মাকে ফাঁকি দিয়ে খেলতে যাওয়া হয়নি।
পরদিন শুক্রবার। স্কুল ছুটি। সকালের নাশতা সেরেই ছুটে গেলাম খেলার মাঠে। বন্ধু পুতিজাম গাছের কাছে গেলাম। নিচের ডালে ঝুলে থাকা টসটসে জাম খেলাম। গাছের গায়ে হাত দিয়ে আদর করলাম।
কিছুক্ষণ পর বন্ধুরা এলো। সবাইকে গাছবন্ধুর কথা জানালাম। গাছের প্রতি ভালোবাসায় সবাই এক হলাম। সামনের বর্ষা মওসুমে জনপ্রতি ১০টি করে গাছ লাগানোর জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম সবাই।