মিষ্টুদের বাসায় আজ বৃষ্টিবিলাস চলছে। ভোর থেকে সেই যে টাপুরটুপুর শুরু হয়েছে, থামার নাম নেই। গুড়–ম গুড়–ম বাজের শব্দে আয়েশি ঘুম ভেঙেছে সবার। মিষ্টুর আজ স্কুলে যাওয়ার তাড়া নেই। জল থইথই পথঘাটে স্কুল ঠিকমতো বসে কি না সন্দেহ। রেইনকোট পরে বাবার সাথে কষ্টেসৃষ্টে স্কুলে গেলে দেখা যাবে যে অন্যরাই ঠিকমতো আসেনি। রাস্তাঘাট বৃষ্টির পানিতে ডুবে একাকার।
স্কুল থেকে বাবার মোবাইলে মেসেজ এসেছে, প্রবল বর্ষণের কারণে আজ স্কুল বন্ধ থাকবে। মিষ্টু হাততালি দিয়ে উঠতে বাবা বললেন, আজ আমিও বৃষ্টিবিলাস করি না কেন? অফিসে অনেক ছুটিই পাওনা আছে। বর্ষণে রাস্তাঘাট ডুবে গেছে বলে আমিও...’
মিষ্টু আয়েশি ভঙ্গিতে বলল, বাবা, আম্মু কোথায়?
বাবা একগাল হেসে বললেন, ‘বৃষ্টি হলে তোমার মায়ের কাজ বেড়ে যায় জানো না। কোথাও খোলা জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাঁট ভেতরে ঢুকে পড়ছে কি না, বারান্দার ভেজা কাপড় কোথায় মেলে দেবে এসব কাজেই ব্যস্ত আছে।’
বাবা আমরা বৃষ্টিবিলাস কিভাবে করব?
বাবা সাত বছর বয়সী মিষ্টুর একমাথা ঝাকড়া চুল এলোমেলো করে দিয়ে বললেন, অনেক পদ্ধতি আছে। কাগজ-কলম নিয়ে এসো। আমাদের কী কী করা যায় তা লিখে ফেলি। প্রবল উৎসাহে মিষ্টু স্কুলব্যাগ থেকে কাগজ-কলম আনতে গেল।
মা দরজার ওপর ভেজা কাপড় মেলে দিতে দিতে আপনমনেই বললেন, বৃষ্টির যে ধরন দেখছি তাতে আজ আর থামবে বলে মনে হয় না। কাজের বুয়া আজো নির্ঘাত ফাঁকি দেবে। একটু কিছু পেলেই ছুতোনাতা শুরু করে। আর আজ যে অবস্থা; ঠিকে বুয়া রাখার এই এক ঝামেলা। এখন ঘরের কাজ সব আমাকেই সামলাতে হবে।
বাবা ইতস্তত করে বললেন, ‘ঘরে আজকে চলার মতো বাজারসদাই কী আছে? এই বৃষ্টিতে তো...’
বাবার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে মা বললেন, ‘ফ্রিজে যা আছে তাতে চলে যাবে। তোমরা কী খেতে চাও বলো?
‘শুধু মুখে বলব না, লিখিত দেবো। তোমার মেয়ে কাগজ-কলম আনতে গেছে।’
মিষ্টু কাগজ-কলম এনে বাবার হাতে দিলো। বাবা কাগজে লিস্ট করতে লাগলেন, প্রথমেই খাওয়ার আইটেমের দিকে যাওয়া যাক। বৃষ্টির দিনের সকালটা শুরু করতে হয় গরম গরম পরোটা আর ভুনা গোশত দিয়ে। তার পর ধোঁয়া ওঠা গরম কফি...।
মিষ্টু বলল, ‘কিন্তু বাবা আমি তো কফি খাই না’।
‘ঠিক আছে। তোমার জন্য হরলিক্স। এখন তার পরের লিস্টে আসি। খাঁটি সরিষার তেল দিয়ে মুড়ি মাখানো, চাল ভাজা, ছোলাবুট ভাজা।’
মিষ্টু হাততালি দিলোÑ ও কী মজা! কী মজা!
‘লিস্ট তো এখনো শেষ হয়নি। দুপুরের মেনুতে থাকবে খিচুড়ি আর ইলিশ ভাজা। চাল ভাজা আর ছোলা ভাজা খেতে খেতে আমি পেপার পড়তে পারি অথবা কোনো একটা ইনডোর গেমস খেলতে পারি।
‘ইনডোর গেমস কী বাবা’?
‘এই ধরো, ক্যারম, দাবা, লুডু...।’
‘লুডু, লুডু, লুডু।’ মিষ্টু চেঁচিয়ে বলল, ‘আমরা লুডু খেলব বাবা।’
‘ঠিক আছে। তারপর খেয়ে-দেয়ে আমরা একটা আয়েশি ঘুম দিতে পারি বা কোনো একটা মুভি দেখতে পারি।’
‘মুভি দেখব বাবা। এনিমেশন মুভি। তুমি না বস বেবি দেখাতে চেয়েছিলে।’
‘বস বেবি দেখতে চাইলে এখনই ডাউনলোড দিতে হবে। তবে তার আগে তোমার মাকে রান্নাবান্নার লিস্ট ধরিয়ে দাও। রান্নাবান্না না হলে বৃষ্টিবিলাসের কিছুই হবে না।’
বাবার হাত থেকে লিস্ট নিয়ে মিষ্টু রান্নাঘরে মায়ের কাছে ছুটে যায়। গিয়ে দেখতে পায়, মা এক হাতে ১০ হাতের কাজ করছে। বেসিনে গত রাতের ময়লা প্লেট পানিতে চুবানো, চুলোর ওপর একটা ফ্রাইপ্যান উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ফ্রিজ থেকে বের করা ইলিশ মাছ বঁটির সামনে কোটার অপেক্ষায়, একপাশে বের করা ফ্রিজের গোশতের বরফখণ্ড। মা পেঁয়াজ কাটছে। মায়ের লাল চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। মিষ্টুকে রান্নাঘরে দেখে মা বললেন, ‘বাবার ঘরে যাও মিষ্টু। তোমার চোখ জ্বালা করবে।’
মিষ্টুর আর লিস্টটা মায়ের হাতে দেয়া হলো না। বাবার কাছে এসে বলল, ‘বাবা, মায়ের কোনো বৃষ্টিবিলাস নেই কেন?’
বাবা মিষ্টুর কথা ধরতে পারলেন, সংসারের সব কাজ সামলাতে গিয়ে স্ত্রীর আনন্দের ক্ষণ কখন চলে যায়, তিনি কখনো ধরতে পারেন না। আজ মিষ্টুই সেটা ধরিয়ে দিলো।
বাবা বিছানা ছেড়ে উঠে মুখে হাসি টেনে মিষ্টুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘চলো, আজ আমরা সবাই মিলে বৃষ্টিবিলাস করি। সেই বৃষ্টিবিলাস হবে মাকে সব কাজে সাহায্য করে, সব কাজ ভাগাভাগি করে।
মিষ্টু আনন্দিত স্বরে বলল, খুব মজা হবে বাবা। আজ আমরা সবাই মজা করব।