সিফাতদের বাড়ি সুন্দরবনের খুব কাছের একটি গ্রামে। শন দিয়ে তৈরি করা দোচালা একটি মাত্র ঘর তাদের। বাবা, মা আর সিফাত মিলে তিনজনের ছোট্ট সংসার। সিফাতের বাবা জেলে। পাশের খাল আর নদী থেকে মাছ ধরে দূরের বাজারে নিয়ে বিক্রি করেই তাদের সংসার চলে। সিফাত এবার চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। সারা দিন স্কুল, দৌড়ঝাঁপ আর পাড়ার বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করেই তার সময় কাটে। অধিক দুষ্টমির কারণে মাঝে মাঝে মায়ের বকুনি আর কানমলা খাওয়াও বাদ যায় না তার। তবুও দুরন্তপনা যেন থেমে নেই এক দণ্ডের জন্যও। যা হোক, এবার মূল গল্পে আসি।
একদিন বিকেলে সিফাত তার বন্ধুদের সাথে ক্রিকেট খেলছিল। খেলার এক পর্যায়ে বলটি একটি ঝোপের মধ্যে গিয়ে পড়ে। সিফাত দৌড়ে বলটি খুঁজতে যায়। হন্যে হয়ে কিছুক্ষণ খোঁজার পরও যখন বলটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না তখন আরো কয়েকজন দৌড়ে আসে। সিফাত ঝোপের আরেকটু ভেতরের দিকে এগিয়ে যায়। হঠাৎ সিফাতের সামনে দিয়ে খরগোশের মতো কি যেন একটা লাফিয়ে গাছের আড়ালে চলে যায়। সিফাত একটু এগিয়ে দেখতে যাবে অমনি একজন বলটি খুঁজে পেয়ে চিৎকার করে ওঠে এই যে বল, এই যে বল বলে। তখন সবাই আবার মাঠের দিকে ছুটে। সিফাতও আর দেরি না করে মাঠে চলে আসে আর মনে মনে ভাবে খেলার শেষে দেখবে ওটা কী ছিল।
সন্ধ্যার দিকে খেলা শেষ হয়। সবাই চলে যেতে থাকে কিন্তু সিফাত মাঠে দাঁড়িয়ে থাকে। সিফাতকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অন্তু বলে, কিরে বাড়ি যাবি না? সিফাত বলে, তোরা যা, আমি একটু পরে আসছি। অন্তুর মনে সন্দেহ হয়। সেও এক চালাকি করে। কিছুদূর গিয়ে একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকে আর চুপি চুপি দেখে। সবাই চলে গেলে সিফাত আবার সেই ঝোপের কাছে যায়। চার দিকে অন্ধকার নামতে শুরু করলেও তার যেন কোনো ভয়ই নেই। সে একা একাই দিব্যি ঝোপের ভেতরে ঢুকে পড়ে। সেই গাছটার চার দিকে সেই খরগোশজাতীয় প্রাণীটিকে খুঁজতে থাকে। তার দেখার খুব ইচ্ছে যে এটা আসলে কী ছিল। খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ সেটি দেখতে পায় সে। দুটো লম্বা কানওয়ালা আর দেখতে ছাগলছানার মতো প্রাণীটিকে চিনতে অসুবিধা হলো না তার। এটি একটি হরিণ শাবক। সে তার বাবার সাথে অনেকবার সুন্দরবনে গিয়ে অনেক হরিণ আর হরিণের বাচ্চা দেখেছে। কিন্তু কোনো দিন হরিণের বাচ্চাগুলোকে সে ছুঁয়ে দেখতে পারেনি। আদুরে হরিণ শাবকগুলোকে একটু ছুঁয়ে দিতে বড় ইচ্ছে ছিল তার। কিন্তু সুন্দরবনের হরিণগুলো খুবই চালাক। ধারে কাছে কাউকে ঘেঁষতে দেখলেই ছুট লাগায়।
আজ হরিণের বাচ্চা পেয়ে সে যেন মহাখুশি। আনন্দে আত্মহারা। খপ করে যেই হরিণ শাবকটিকে ধরতে গেল অমনি লাফ দিয়ে গা ঢাকা দিলো ঝোপের ভেতর। এতক্ষণে অন্তু এসে হাজির। কিরে সিফাত, এখানে কী করছিস? সিফাত বলে, না কিছু করছি নাতো! অন্তু বলে, দেখ, কিছু লুকাবি না কিন্তু, বল। সিফাত বলে, এখানে একটা হরিণের বাচ্চা ছিল। আমি ধরতে গেলাম অমনি লাফ দিয়ে চলে গেল। অন্তু বলে, তাই নাকি? চল খুঁজে দেখি।
দুজনে মিনিট দুয়েকের মধ্যে হরিণ শাবকটিকে খুঁজে পায় এবং অন্তু খপ করে ধরে ফেলে। সিফাত সহযোগিতা করে। অন্তু এক দৌড়ে হরিণ শাবকটি নিয়ে মাঠের মাঝখানে চলে আসে। সিফাত হরিণ শাবকটিকে ধরতে গেলে সে বাধা দেয়। অন্তু বলে এটা আমি ধরেছি, এটা আমার। সিফাত বলে, না এটা আমার, আমি আগে দেখেছি। এই নিয়ে দুজনের মধ্যে তুমুল ঝগড়া শুরু হয়ে গেল।
এদিকে সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় সিফাতের মা সিফাতকে খুঁজতে খুঁজতে মাঠে চলে আসে। এসে দেখে সিফাত আর অন্তু তুমুল ঝগড়া বাধিয়ে দিয়েছে আর অন্তুর হাতে একটা হরিণ শাবক। সিফাতের মা তাদের ঝগড়া থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে? সিফাত সব খুলে বলে। তারপর সিফাতের মা অন্তুকে বলে, এটা তো সিফাত আগে দেখেছে আর সে ধরতেও গেছে। তুমি এটা সিফাতকে দিয়ে দাও। কিন্তু অন্তু বলে, এটা আমি ধরেছি, দেবো না। অন্তু হরিণ শাবকটি নিয়ে দৌড়ে পালাল। সিফাত রীতিমতো কান্না জুড়ে দিলো। সিফাতের মা বলে, কান্না করিস না, দাঁড়া দেখছি কী করা যায়।
সন্ধ্যার পর সিফাত আর সিফাতের মা অন্তুদের বাসায় যায়। অন্তুর মাকে বিষয়টা বললে অন্তুর মা ক্ষেপে গিয়ে বলে, অন্তু এটা ধরেছে। এটা দেয়া যাবে না।
এই নিয়ে তুমুল হৈ-হুল্লোড় শুরু হয়ে যায়। আশেপাশের বাড়ি থেকে সমানে মানুষজন আসতে থাকে। রাতে সিফাতের বাবা, অন্তুর বাবা এলেও সমাধান হয় না বরং আরো হইচই বেড়ে যায়। অন্তু হরিণ শাবকটিকে যতœ করে পাতা খাওয়াচ্ছে। ঝগড়ার দিকে তার কান নেই। যেন হরিণ শাবকটি তারই হয়ে গেছে। সিফাত দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে আর কাঁদছে। কাছে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না। মাঝরাত হয়ে যায় তবুও তাদের সমস্যার সমাধান হয় না। এদিকে বাড়ি ভর্তি মানুষ। অনেকে অনেক পরামর্শ দেয় কিন্তু কেউ কারও কথা মানতে রাজি না। হইচই আরো বাড়ে। হঠাৎ ভোঁ ভোঁ আওয়াজ করে একটি মোটরসাইকেল উঠোনে প্রবেশ করে। একজন ভদ্রলোক এসে বলে, আমি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা। কে যেন আমাকে ফোন করে বলল, আপনারা নাকি একটি হরিণ শাবক খুঁজে পেয়েছেন। আর এটা নিয়ে নাকি দু’পক্ষের মধ্যে তুমুল ঝগড়া। কই হরিণ শাবকটি দিন। এটা সরকারি সম্পদ। এটা ব্যক্তিগতভাবে পালন করার উপায় নেই। কোথায় শাবকটি?
জিজ্ঞেস করতেই পেছন দিক থেকে অন্তু এসে বলে, এই নিন। এটা নিয়েই যান। এটা পেয়ে আমাদের অনেক সমস্যা হচ্ছে। আমার আর সিফাতের বন্ধুত্বও নষ্ট হচ্ছে।
কর্মকর্তা বলে, ধন্যবাদ বাবু।
কর্মকর্তা তার সাথে আনা খাঁচাটিতে হরিণ শাবকটিকে ভরে, মোটরসাইকেলের সাথে বেঁধে ভোঁ ভোঁ করতে করতে চলে যায়।
তারা তাদের ভুল বুঝতে পেরে সবাই সবার আচরণের জন্য দুঃখিত হয়।