তোমরা অনেক পাখির নাম জানো, তাই না? আজ তোমরা জানবে, কমলাÑমাথা গায়ক (অরেঞ্জ-হেডেড থ্রাস) পাখি সম্পর্কে। এদের আরো নাম আছে; যেমনÑ গুয়ে হালতি, দামা, মেটে দোয়েল, কমলা দোয়েল ইত্যাদি। খুশির খবর হচ্ছে, এই পাখির ১৪-১৫টি প্রজাতি লক্ষ করা যায় দক্ষিণ এশিয়ায়। এই পাখি বিচরণ করতে দেখা যায় বাংলাদেশেও। কারণ বাংলাদেশের আবহাওয়া, প্রকৃতি এদের খুবই ভালো লাগে।
স্বভাবে এরা লাজুক প্রকৃতির হলেও মাঝে মধ্যে লোকালয়েও চলে আসে। এসে পড়ে গেরস্থ বাড়ির আঙিনায়ও। ধারণা করা হয়, গেরস্থ বাড়ির ফসলের পোকা খেতে এরা উঠোন-বারান্দায় চলে আসে। মানুষের নাগালের এত কাছাকাছি চলে আসে বলে অনেক সময় এরা কৃষকের পাতা ফাঁদে আটকে যায়। কারণ এই পাখির রূপ-বৈশিষ্ট্যে মুগ্ধ হয় মানুষ। এরা মাটিতে হাঁটে লাফিয়ে লাফিয়ে ছন্দময় ভঙ্গিতে।
ছেলে অরেঞ্জ-হেডেড থ্রাসের বুক-পেট-মাথা-ঘাড় লালচে কমলা কিংবা শুধু কমলা রঙের। সাদাভাব আছে লেজের তলায়। এদের পা গোলাপি, গলা সাদা। ঠোঁট মিশমিশে কালো। মেয়ে বা মা পাখিকে দেখতেও কিন্তু প্রায় পুরুষ বা ছেলে অরেঞ্জের মতোই লাগে। এদের মধ্য বয়সে কিংবা তার কিছু আগে বাদামি রঙের ছিট দেখতে পাওয়া যায় ডানার উপরের অংশে। মাথা-ঘাড়-বুকেও একই রঙের ছিট আছে। মেয়ে অরেঞ্জরা ডিম দেয় তিন-চারটি। রঙ গোলাপি। ১৩-১৪ দিন তা দিলেই ডিম ফুটে বের হয় ছানা। মজার বিষয় হলো, তারা উড়াল দিতে শেখে ১২ থেকে ১৫ দিনে। এরা যখন ডাক শুরু করে, তখন মনে হয় মনের সুখে গান গাইছে। এ জন্য অনেকে এ পাখিকে গায়ক পাখি বলে থাকে।
এদের দ্বারা তৈরি করা বাসা দেখলে যে কেউ মুগ্ধ হয়। দুই স্তরে তৈরি করে তা। বাসা বানায় ছোট সুপারি গাছের পাতায়, বিশেষ করে পাতার ডগায়। তা যেন শৈল্পিক গোলাকার। অনেক সময় বাসা বাঁধে গাছের ঝোপের ভেতরে। এ জন্য তারা বেছে নেয় গ্রীষ্ম থেকে শরৎ পর্যন্ত সময়। গোল করে বাসা বানিয়ে তা শৈল্পিক ভঙ্গিমায় গাছের পাতার সাথে শক্ত করে বেঁধে দেয়। যাতে ঝড়ে বা বাতাসে খুলে নিচে পড়ে না যায়। তা হলে দেখো, ওরা কত রকম চিন্তাভাবনা করে বাসা বানিয়ে তা হেফাজত করে।
বিপদ আসার আগেই আওয়াজ করে দ্রুত সেই জায়গা ত্যাগ করে চলে যায় নিরাপদ স্থানে। আশপাশের পাখিরাও তা বোঝে সহজে। ফলে তারাও সতর্ক হয়ে যায়। এরা গভীর ঘুম দেয়। আর এমন সময়েই শিকারিদের হাতে ধরা পড়ে। তবে রাতে আশ্রয় নেয় ঝাকড়া লতাপাতার ভেতরে। শীতে মুখ লুকোয় পাখার ভেতরে। প্রচণ্ড শীতে মা-বাবা এক সাথে জড়াজড়ি করে থেকে ওম বা উষ্ণতা তৈরি করে গভীর ঘুম দেয়।
এরা বেশি খায় কীটপতঙ্গ, পোকামাকড়, ব্যাঙাচি, ছোট ব্যাঙ, টিকটিকি ইত্যাদি। ঠোঁট দিয়ে ঝরাপাতা, ডালপালা ইত্যাদি ওল্টিয়ে এসবের ভেতরে থাকা পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ খেতে খুবই পছন্দ করে। কেঁচো, উইপোকার আন্ডা-বাচ্চাও খুবই প্রিয় খাবার। খাবার বেশি খায় খুব ভোরে এবং সন্ধ্যায়।
এই পাখি টারডিডা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। প্রজাতি জি. সিট্রিনা। আর শ্রেণী হচ্ছে অ্যাভস। সুরেলা কণ্ঠে গান গাইলেও শীতে অন্যান্য সময়ের তুলনায় একটু কমই ডাকে। এ প্রজাতির পাখির বৈজ্ঞানিক নাম জুমেরা সাইট্রিনা। এদের শরীরের দৈর্ঘ্য ২১-২২ সেন্টিমিটার। আর ওজন ৫৫-৬০ গ্রাম।