মানুষ জন্মগতভাবে সমমর্যাদা ও সম-অধিকার ভোগ করার অধিকার রাখে; জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষেরই বিয়ে, পরিবার গঠন, সম্পত্তি অর্জন এবং সঙ্ঘবদ্ধ হওয়ার অধিকার রয়েছে। প্রতিটি মানুষের রয়েছে স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চার, ভোট প্রদানের, চিন্তার ও বাক-স্বাধীনতার অধিকার। প্রতিটি মানুষেরই চাই সামাজিক নিরাপত্তা, বিশ্রাম, বিনোদন ও চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে কর্মসৃষ্টি, কর্মের অনুকূল পরিবেশ ও উপযুক্ত পারিশ্রমিক লাভের অধিকার। ভোটের অধিকার, রাজনীতি করার অধিকার, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার অধিকারসহ নানাবিধ মৌলিক অধিকারই একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য মানবাধিকার। পাশাপাশি অন্যের অধিকার ও স্বাধীনতা লঙ্ঘনের অধিকার কারো নেই। রাষ্ট্র থাকলে নাগরিক থাকবে, রাজনীতি ও রাজনীতিক থাকবে, সরকার গঠনের পদ্ধতি থাকবে, মতবাদ থাকবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে; রাষ্ট্র ও সরকারব্যবস্থা সম্পর্কিত এসব বিষয়ে জনসাধারণের প্রত্য ও পরভাবে অংশগ্রহণ থাকবে। মানুষ স্বাধীনভাবে যার যার অবস্থান থেকে রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে অংশগ্রহণ করতে পারবে। এসব করতে পারার নাম গণতন্ত্র। জনকল্যাণমূলক একটি আধুনিক রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি হচ্ছে মানবাধিকার ও গণতন্ত্র। বাংলাদেশে সেই গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা যায় না। সে জন্য বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে দেখা গেছে বিভক্তি। বিভক্তির এ লণ শুভ নয়। মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রতি উদাসীন হওয়ার কারণে রাশিয়া ভেঙে গেছে। একই কারণে বহু নগর রাষ্ট্র ব্রিটিশদের হাতছাড়া হয়েছে। বর্তমান বিশ্বেও মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের মর্যাদা সমুন্নত না থাকায় বিশ্বপরিস্থিতিও আজ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। চোখের সম্মুখে মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল ভূখণ্ড মানবাধিকারহীন অগণতান্ত্রিক হিংসার আগুনে পুড়ে ছাই হতে চলেছে। এ ছাড়াও তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো গণতন্ত্রহীন স্বৈরশাসনের কবলে পড়ে প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসবাদের চক্রান্তে জড়িয়ে যাচ্ছে।
গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরস্পরে ঘনিষ্ঠ। একে অপরের বন্ধু এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও মানবিক উন্নয়ন সহযোগী। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার জনগণের সাথে সম্পৃক্ত। এ দু’টির ল্য রাষ্ট্র নয়; মানুষ। মানুষের উন্নয়ন মানে রাষ্ট্রের উন্নয়ন। যখন নগর-রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়নি তখনো মানুষের নৈমিত্তিক অধিকার ও উন্নয়নের কথা চিন্তা করা হয়েছে। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়ে চিন্তার যে সীমাবদ্ধতা ছিল মানুষ সেখান থেকে উত্তরণের চেষ্টা করেছে। সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে ধারণাগত চিন্তা ক্রমান্বয়ে পরিচ্ছন্ন রূপলাভ করেছে। মানুষ এখন অনেক বেশি অধিকার সচেতন হয়ে উঠেছে। সে কারণে অধিকার সম্পর্কিত চিন্তাচেতনাগুলোও সাংবিধানিকভাবে আইনের মর্যাদা পেতে চাচ্ছে। মানুষের অধিকারসংক্রান্ত চিন্তাভাবনার সন্ধান পাওয়া গেছে খ্রিষ্টপূর্ব দুই হাজার বছর আগে ব্যাবিলনের রাজা হাম্বুরাবির নিয়মাবলিতে। এটি আইন সম্পর্কিত পৃথিবীর প্রাচীন সঙ্কলন। সপ্তম শতকে পাওয়া যায় হজরত মুহাম্মদ (সা:) কর্তৃক প্রণীত মানবাধিকারের কার্যকর দলিল মদিনার সনদ। একটি রাষ্ট্র কিভাবে মানবাধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে তার দৃষ্টান্ত হিসেবে মদিনার সনদের তুলনা বিরল। পরে মানবাধিকারের ধারণা প্রতিফলিত হয়েছে দার্শনিক রুশো, ভিক্টর হুগো, জন লক, কার্ল মার্কস প্রমুখ মনীষীদের রচনাতে। পৃথিবীর মানুষ মানবাধিকারের দাবিতে কখনোই বসে ছিলেন না। ১২২৫ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ডে তৈরি করা হয়েছিল মানবাধিকারের চার্টার ‘ম্যাগনাকার্টা’। মানবাধিকারের দলিল হিসেবে ১৭৭৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রণীত আমেরিকা স্বাধীনের ঘোষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি বিপ্লবের সনদ ‘ডিকারেশন অব দ্য রাইটস্ অব ম্যান অ্যান্ড সিটিজেন’ মানবাধিকারের কথা পৃথিবীর মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের ডিকারেশনও মানবাধিকার অর্জনের মাইলফলক হিসেবে কাজ করেছে। কাজেই মানবাধিকারকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হলে তার ফলাফল যে ভালো হয় না তারও ভূরি ভূরি প্রমাণ মিলে। মানবাধিকারের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের পরিপ্রেেিত পৃথিবীতে সংঘটিত হয়েছিল দু-দু’টি বিশ্বযুদ্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি থেকেও স্বার্থবাদী রাজনীতিকেরা মানবাধিকারের শিা গ্রহণ করতে পারেনি। ফলে আরো একটি বিশ্বযুদ্ধ (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ) অত্যাসন্ন হয়ে উঠেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯৩৯-১৯৪৫) জার্মানি ও ইতালির মধ্যে জাতিগত বিদ্বেষ সৃষ্টি হলে লাখ লাখ ইহুদি বন্দিশিবিরে থাকাবস্থায় নৃশংস হত্যার শিকার হয়। এই হত্যাকাণ্ডে বিশ্বমানবতা স্তব্দ হয়ে যায়। মানবাধিকার রায় যুদ্ধোত্তর সময়ে মানব বিধ্বংসী সংঘাতকে এড়ানোর ল্েয ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে সানফ্রান্সিসকোতে একটি চুক্তির মধ্যদিয়ে জন্মলাভ করে জাতিসঙ্ঘ। এই সঙ্ঘের ল্য রাষ্ট্র নয়, মানুষকে রা করা। এই ল্যকে সামনে রেখে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ডিসেম্বর সর্বজনীন মানবাধিকারের ৩০টি ধারা নিয়ে প্রতিষ্ঠালাভ করে মানবাধিকার সনদ। এই সনদের ১৯টি ধারা নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আর বাকিগুলো সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার বিষয়ে। জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার সংস্থা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করেছে রাজনৈতিক অধিকার সংবলিত ধারাগুলোর উপরে। কেননা দুর্বৃত্তমনস্ক কোনো রাজনীতিক যদি রাষ্ট্রমতায় একবার আসীন হতে পারে তবে তার কাছে দেশের সমগ্র মানুষ জিম্মি হতে পারে। একজন সাধারণ মানুষ দেশের সব জনগণের চোখে একসাথে ভেল্কি লাগাতে পারেন না। কিন্তু একজন রাজনীতিক (মন্ত্রি, এমপি) ইচ্ছে করলে সমগ্র জনসাধারণকেই একধরনের ধোঁয়াশার ভেতরে রেখে দিতে পারেন। সে জন্যই জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার সনদে রাজনৈতিক ধারাগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচিত হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার সংস্থা জন্মলাভের সত্তর বছর অতিবাহিত হলেও দেশে দেশে নানাভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। এখনো বিশ্বের নানান প্রান্তে চিন্তার স্বাধীনতা, ধর্মের স্বাধীনতা, বিবেকের স্বাধীনতাতে মানুষ বাধাপ্রাপ্ত হয়ে আাসছে। নারী-পুরুষ ও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বেড়েই চলেছে। পুঁজিবাদী দেশগুলো নানা দিক থেকে তৃতীয় শ্রেণীর দেশগুলোর ওপর সাম্রাজ্যবাদী চেতনা নিয়ে আগ্রাসী তৎপরতায় ব্যস্ত রয়েছে। বিভিন্ন দেশে সরকারি দল কর্তৃক দেশের অভ্যন্তরে বিরাজমান বিরোধী দলগুলো নানামাত্রায় নির্যাতনের মুখোমুখি হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরোধী দলগুলো হত্যা, গুম, খুন, মামলা-হামলার মতো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে রাজনীতিতে বিতশ্রদ্ধ হয়ে উঠছে। এমন রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা চলতে থাকলে রাজনৈতিকভাবে একটি দেশ পঙ্গুত্ববরণ করতে পারে এবং সেখান থেকেই গৃহযুদ্ধের সূচনা হতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সময়ে সময়ে ভারসাম্য হারিয়েছে; কিন্তু পরণে তা আবার ফিরে এসেছে। তবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর কিছু কিছু দেশে এর ব্যতিক্রম ল করা গেছে। বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ১৯৭১ খ্রিষ্টব্দে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করলেও স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ কাক্সিক্ষত সেই গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের স্বাদ আজো গ্রহণ করতে পারেনি। দেশটি এখন গণতন্ত্রের ক্রান্তিকাল অতিবাহিত করছে। এ দেশের রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক ধারণা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ব্যাপারটি একশ্রেণীর রাজনীতিকদের কাছে নিজের ইচ্ছা-অনিইচ্ছার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ বরাবরই এমন পরিস্থিতিকে সাথে করেই সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র চর্চা একাত্তর-পরবর্তী সময়ে বহুবার ুণœ হয়েছে। অথচ ত্রিশ লাখ নারী-পুরুষ গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের দাবিতে নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছে। অবাক করার বিষয় হলো, যে জিনিসের জন্য এত মানুষের প্রাণোৎসর্গ সেই গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বাংলাদেশে কখনোই প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেনি; বাংলাদেশের মতো দেশ পৃথিবীতে বিরল।
মানবাধিকারের মতো গণতন্ত্রের ধারণাটিও বহুকাল আগের থেকে মানুষ মনের মধ্যে পোষণ করেছে। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের প্রত্য অংশগ্রহণের ভিত্তিতে গ্রিক নগররাষ্ট্রগুলোতে গণতন্ত্রের উন্মেষ ঘটে। ইংল্যান্ডের মহাসনদ ও বিপ্লব, মার্কিন স্বাধীনতা আন্দোলন ও ফরাসি বিপ্লব আধুনিক গণতান্ত্রিক ধারণার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে ফরাসি বিপ্লবের সাম্য-মৈত্রী ও স্বাধীনতার বাণী গণতন্ত্রকে জনপ্রিয় করার েেত্র অসামান্য অবদান রেখেছে। এ ছাড়াও ইংরেজ দার্শনিক জন লক, ফরাসি দার্শনিক রুশো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসনের মতো বিজ্ঞ তাত্ত্বিক ও প্রবক্তাদের হাতে গণতন্ত্রের তত্ত্ব ও ধারণা বিকশিত হয়েছে।
গণতন্ত্র বিশ্বজনীন রাজনৈতিক একটি পরিভাষা। জনগণের অবাধ ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে সরকার গঠনের পদ্ধতিকেই গণতন্ত্র বলা হয়ে থাকে। অ্যারিস্টটলের মতে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সার্বভৌম মতা সমগ্র জনগণের ওপর ন্যস্ত থাকে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের মতে ‘ডেমোক্র্যাসি ইজ দ্য গভর্মেন্ট অব দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল অ্যান্ড ফর দ্য পিপল’। সাধারণত জনসাধারণের মতামতের ভিত্তিতে যে শাসনব্যবস্থা সেটিই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা।
গণতন্ত্র একটি শক্তিশালী শাসনব্যবস্থার জন্ম দিতে পারে। এ ব্যবস্থায় ব্যক্তির মতাকে বড় করে দেখার অবকাশ থাকে না। এ ব্যবস্থায় জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনগণের কাছে জবাবদিহিতার দায় এড়াতে পারেন না বলে প্রতিনিধিগণের স্বেচ্ছাচারী হওয়ার সুযোগ কম থাকে। তবে উন্নত দেশের গণতন্ত্রের সাথে অনুন্নত দেশের গণতন্ত্রের পার্থক্য রয়েছে। উন্নত দেশের নেতৃবৃন্দের মনমানসিকতা গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার মূল্যবোধসম্পন্ন। কিন্তু অনুন্নত দেশের নেতানেত্রীদের মানসিকতা স্বৈরতন্ত্রে বিশ্বাস করে। সে জন্য অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের নেতৃবৃন্দ ছলে-বলে, কলে-কৌশলে মতায় টিকে থাকতে গিয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে চরমভাবে অবজ্ঞা করে বসেন। অথচ মতা আঁকড়ে ধরার সাথে গণতন্ত্রের আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই। পৃথিবীর বহু দেশের মানুষ মানবাধিকার ও গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামে আন্দোলন করে যাচ্ছে। এ আন্দোলনে যত মানুষ শামিল হতে পারবে গণতন্ত্র হয়তো তত তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে পারে।