একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। হাটে-বাজারে, চায়ের দোকানে, অফিস-আদালত, ট্রেন বাসে মূল আলোচনা এখন আগামী সংসদ নির্বাচনের ভবিষ্যৎ! রিকশায় উঠলে রিকশাওয়ালাও জানতে চায়, আগামী নির্বাচন সম্পর্কে। অর্থাৎ কম-বেশি সবাই এখন সচেতন। অন্য দিকে সংসদ নির্বাচন ঘিরে নানা ধরনের অস্থিরতার আভাসও পাওয়া যাচ্ছে। আগামী দুই-তিন মাসে ঠিক কী ঘটতে যাচ্ছে, তা নিয়ে মানুষের শঙ্কার শেষ নেই।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দীর্ঘ দিন ধরে কারাবন্দী। তারেক জিয়া বিদেশে। এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই বিএনপি রয়েছে নাজুক অবস্থানে। তেমন জোরালো কোনো আন্দোলন তারা বিগত দিনে বা এখনো গড়ে তুলতে পারেনি। নির্বাচনকে সামনে রেখে কোণঠাসা অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে বিএনপি। সে জন্য নির্বাচনপূর্ব সময়টাই যথার্থ। জাতীয় পার্টি সংসদে বিরোধী দল হলেও সত্যিকার বিরোধী দল তারা হয়ে উঠতে পারেনি মন্ত্রিসভায় তাদের অংশীদারিত্ব থাকায়। তারাও নির্বাচন নিয়ে ভাবছে। দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বরাবরের মতোই কৌশলী কথাবার্তা বলছেন। শেষ পর্যন্ত তার অবস্থান কী হবে সে বিষয়ে বরাবরের মতো জনগণ সন্দিহান! বিএনপি জাতীয় পার্টির বাইরেও একাধিক প ধীরে ধীরে সক্রিয় হচ্ছে। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে একটি নতুন জোট। কূটনৈতিক বলয়েও শুরু হয়েছে কর্থাবার্তা। মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট এ দেশে আসার পর থেকেই গত সংসদ নির্বাচন নিয়ে কথা বলছেন, কথা বলছেন আসন্ন নির্বাচন নিয়েও। কিছু দিন আগে সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদকের বাসায় নৈশভোজে আমন্ত্রিত হন তিনি। ফেরার পথে বার্নিকাটের গাড়িবহরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনাও রাজনৈতিক অস্থিরতার বার্তা বহন করে।
বিএনপি বলছে, দেশে নির্বাচনের পরিবেশ নেই। নির্বাচনের আগে দলীয় প্রধানকে মুক্তি দিতে হবে। বিএনপি চাইছে ‘নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার।’ আওয়ামী লীগ বলছে, আগামী সংসদ নির্বাচন সংবিধান মেনেই হবে। এ বিষয়ে মীমাংসা হওয়ার আগেই নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করেছে নির্বাচনী রোডম্যাপ।
অন্যেরা এটিকে অভিনন্দন জানালেও বিএনপি তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের অনেকে বলছেন ইসির রোডম্যাপে সহায়ক সরকারসংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা নেই।’ নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার কথা। এ মাসের শেষে রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করার জন্য সময় চেয়ে চিঠি দিয়েছে তারা। এগুলো কমিশনের নির্বাচন প্রস্তুতিরই অংশ। মতাসীন দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনের জন্য সুবিধাজনক অবস্থায়ই রয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট করে বিএনপি। কাজেই সামনের নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী হতে হলে বিএনপিকে কম সময়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
সর্বশেষ তিনটি জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের পরিস্থিতি ছিল খুবই খারাপ। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের ঘটনা এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরের রাজনীতি ভয়াবহ সাংঘর্ষিক আকার ধারণ করেছিল। এবারো যে তেমন হবে না তা আমরা নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি না।
তফসিল ঘোষণার আগেই বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করছে বিএনপি। সাংঘর্ষিক কর্মসূচির বদলে সমঝোতামূলক কর্মসূচিকেই প্রাথমিকভাবে অগ্রাধিকার দিয়ে দাবি জানিয়ে যাচ্ছে তারা। তবে সব দাবি অগ্রাহ্য করা হলে তারা যে নিশ্চুপ থাকবে সেটাও মনে হয় না। সরকারের মেয়াদের শেষ দিনগুলোতে কঠোর কর্মসূচি দিতেও পারে তারা। সে েেত্র দেশে সৃষ্টি হতে পারে নৈরাজ্য। উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সংঘটিত হতে পারে আরেকটি সংসদ নির্বাচন। দেশের পরিস্থিতি রাজনীতি ছাড়াও সারা বছর উত্তপ্ত নানান কারণে। কোটা আন্দোলনের কারণে দীর্ঘদিন আন্দোলনে ছিল ছাত্রসমাজ। অনেক রক্তক্ষয় হয়েছে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে। কোটা আন্দোলনের নেতাদের অনেকেই বন্দী ছিলেন। শেষাবধি প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর চাকরিতে কোটা অবলুপ্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। কিন্তু তাতে আন্দোলন থামেনি। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানেরা ৩০% কোটা বহালের দাবিতে পুনরায় আন্দোলনে নেমেছে। আন্দোলনে নেমেছে প্রতিবন্ধীরাও।
এ দিকে রমিজ উদ্দীন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু এবং সেই ঘটনায় মন্ত্রী শাজাহান খানের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশে শুরু হয় কিশোর আন্দোলন। টানা বেশ কয়েকটি দিন কিশোরেরা নিয়ন্ত্রণ করেছে দেশের ট্রাফিকব্যবস্থা। আন্দোলনের শেষ দিকে কিশোরদের মধ্যে কিছু যুবক ঢুকে পড়ায় মারাত্মক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। বেশ কয়েকজন কিশোর আহত হয়। এবং একসময় থেমে যায় আন্দোলন।
এ আন্দোলনগুলোকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অনেক চেষ্টা হয় রাজনৈতিক মহল থেকে। এই যুবকেরা কারা আমরা জানি না, তবে আমরা জানি তারা যেই বা যে দলেরই হোক, নিজের ইচ্ছেয় বা অন্য কারো ইচ্ছেয় যদি তারা কোমলমতি শিশুদের এই আন্দোলনে ঢুকে পড়ে থাকে, সেটা তারা খুবই অন্যায় কাজ করেছে।
দেশের পরিস্থিতি এমনিতেও ভালো নয়। খুন জখম রাহাজানি ছিনতাই ডিজিটাল প্রতারণা ইভটিজিং ধর্ষণ লাগাতার চলছে। দুই দিন পর পর যুক্ত হচ্ছে জঙ্গিবাদের ঘটনা। সাগর-রুনি থেকে শুরু করে মাহমুদা পর্যন্ত কোনো খুনেরই বিচার হয়নি। বেশ কয়েকজন ব্লগারকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে বিদেশী নাগরিকদের। অভিজিৎ জুলহাস মান্নান থেকে শুরু করে অনেকেই হয়েছে আততায়ীর হাতিয়ারের শিকার। বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় হতাশ পরিবারগুলো। হোলে আর্টিজানের পর এখনো জঙ্গিবাদী তৎপরতা চলছে। এই পরিস্থিতির সাথে যদি যুক্ত হয় নির্বাচনকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা সাধারণ জনগণের জীবন হয়ে উঠবে দুর্বিষহ।
আগের নির্বাচনগুলোর আগের পরিস্থিতি লক্ষ করলে আমরা দেখি জ্বালাও, পোড়াও, হরতাল অবরোধ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জনজীবন ছিল বিপর্যস্ত। হরতালে গাড়িঘোড়া না পেয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয়েছে পথচারীদের। রাস্তায় মারা গেছে অনেক অসুস্থ মানুষ। প্রাণের ভয়ে ভীত হয়ে চলাচল করতে হয়েছে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা গ্রেফতার আতঙ্কে দিনাতিপাত করেছেন। এবারো বোধহয় তার ব্যত্যয় হবে না।
দেশে যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়েছে। অনেক রায় কার্যকর হয়েছে পরপর। এতে মৃত্যুদণ্ড হয়েছে জামায়াতের আমিরসহ জামায়াতের বেশ কিছু লোকের। জামায়াত বিষয়টি নিয়ে ফুঁসছে। এ দিকে একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলার রায়ে ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। ১৯ জনের মধ্যে তারেক রহমানকেও দেয়া হয়েছে যাবজ্জীবন। এ রায়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয় আওয়ামী লীগ। বিএনপি এ রায় প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলেছে এটা একটি ফরমায়েশি রায়। এ রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সাংবাদিকেরা ক্ষুব্ধ। তাদের আপত্তির মুখেই আইনটি পাস করে ফেলা হয়েছে। এ আইন নিয়েও অনেক ক্ষোভ আছে জনমনে। ইত্যকার উপর্যুপরি ঘটনাবলিতে দেশের অবস্থা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। গ্রেনেড হামলার রায় ঘোষণার পর বিএনপি বিক্ষোভ কর্মসূচি দিয়েছে।
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ক্ষমতায় আনার ব্যাপারে বিএনপি সঠিক কী ভাবছে তা জানা যাচ্ছে না। অনেকে মনে করছেন তারা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে যাবেন। অনেকে ভাবছেন তারা খালেদা জিয়াবিহীন নির্বাচন করবেন। আবার কেউ কেউ ভাবছেন, বিএনপিকে ‘শক্তিশালী বিরোধী দল’ বানিয়ে মতার পথ আরো প্রশস্ত করার চেষ্টা করবেন। কিন্তু এর সবই চিন্তা। আসলে বিএনপি কী করবে বা করতে চায় তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। তারা খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের ওপরই বারবার গুরুত্ব দিচ্ছেন।
নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে এমন সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচন পর্যন্ত বা নির্বাচনের পরেও দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি হতে পারে। অক্টোবরে ‘সর্বদলীয় নির্বাচনকালীন সরকার’ গঠন করার কথা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই গঠিত হবে এই সরকার। জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সাতটি রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র জোটের এমপিদের সমন্বয়ে গঠিত হবে একটি ছোট আকারের মন্ত্রিসভা। বর্তমান সংসদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় নির্বাচনকালীন সরকারেও তাদের প্রতিনিধি রাখা হবে না। সরকারের নিয়মিত কাজ পরিচালনার পাশাপাশি একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করবে এ নির্বাচনকালীন সরকার।
নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের এই সময়টাই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময়েই গোলযোগের আশঙ্কা রয়েছে। বিএনপি একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। সেটা যদি না হয় তারা কঠোর কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামতে পারে। বিএনপি মনে করছে, সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে সঠিকভাবে এবার মাঠে আন্দোলন করতে পারলে বিফল হবে না তারা। একের পর এক ব্যাংক ডাকাতি, হত্যা রাহাজানি, দুর্নীতি, লুটপাটসহ নানান কারণে সরকারবিরোধী একটা জনমত ইতোমধ্যে দেশে গড়ে উঠেছে। তাই আন্দোলনে থাকলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সরকার একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে। বিএনপি নেতারা মনে করছেন, যদি নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়, তাহলে তাদের জয়ের সম্ভাবনা অনেক।
অন্য দিকে সরকারি দলও আস্থাশীল। বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটেছে। জাতিসঙ্ঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন নীতি সংক্রান্ত কমিটি (সিডিপি) গত ১৫ মার্চ এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক এ তিনটি সূচকের মানদণ্ডেই উন্নীত হয়েছে।
ইকোসক মানদণ্ড অনুযায়ী এ েেত্র একটি দেশের মাথাপিছু আয় হতে হবে কমপে ১২৩০ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১৬১০ মার্কিন ডলার। মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশ অর্জন করেছে ৭২ দশমিক ৯। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক হতে হবে ৩২ ভাগ বা এর কম যেখানে বাংলাদেশের রয়েছে ২৪ দশমিক ৮ ভাগ।
সরকারের রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নে এটি একটি বড় অর্জন। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়ার ল্য নির্ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ জন্মের ৫০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দ্রুতগতিসম্পন্ন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎপেণের মতো সফলতা দেখিয়েছে। তা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, এমডিজি অর্জন, এসডিজি বাস্তবায়নসহ শিা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গ সমতা, কৃষি, দারিদ্র্যসীমা হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, নারীর মতায়ন, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার ও জন্মহার কমানো, গরিব মানুষের জন্য শৌচাগার ও স্বাস্থ্য সুবিধা প্রদান এবং শিশুদের টিকাদান কার্যক্রমে দেখিয়েছে সাফল্য। রফতানীমুখী শিল্পায়ন, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পোশাক শিল্প, ওষুধ শিল্প, রফতানি আয় বৃদ্ধিসহ নানা অর্থনৈতিক সূচকে সমৃদ্ধি এনেছে। পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, ঢাকা মেট্রোরেলসহ দেশের মেগা প্রকল্পগুলো গ্রহণ ও ক্রমবাস্তবায়ন এই অগ্রগতিরই প্রমাণ।
ুদ্র আয়তনের একটি উন্নয়নশীল দেশ হয়েও বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সারা বিশ্বে প্রাকৃতিক দুর্যোগের নিবিড় সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, ুদ্র ঋণের ব্যবহার এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে তার ভূমিকা, বৃরোপণ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকের ইতিবাচক পরিবর্তন প্রভৃতি েেত্র অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। করেছে এভারেস্ট জয় আর সমুদ্র জয়।
দেশে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। কাজেই জনগণ এই উন্নয়নের মূল্যায়ন করবে বলেই সরকার আশাবাদী। তা ছাড়া সরকারপ্রধান বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করছেন। ভ্রমণ করছেন দেশের আনাচে-কানাচে। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ এগিয়ে চলেছে। নির্বাচনের আগে সরকার জনগণকে খুশি করার জন্য নানা পদক্ষেপও নিচ্ছে।
ব্যক্তি হিসেবে প্রভাবশালী বেশ কয়েকজন রাজনীতিক অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে এমন জায়গাগুলোতে যাতায়াত করছেন তারা।
কূটনৈতিক মহলও বসে নেই। তারা আগামীতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে চায়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন তারা চায় না। তাই নির্বাচন নিয়ে তাদের মধ্যে উদ্বেগ কাজ করছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ ও পারস্পরিক সমঝোতার মধ্য দিয়ে একটি সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব বলে তারা মনে করছেন।
নির্বাচনের আর দেরি নেই। আওয়ামী লীগ নতুন করে সংবিধান সংশোধন করবে না এটা স্পষ্ট। তারা মনে করেন, বিলুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আর বিএনপির দাবি করা সহায়ক সরকারের মধ্যে মূলত কোনো পার্থক্য নেই। উভয়ই অনির্বাচিত সরকার। তারা কখনোই একটা অনির্বাচিত সরকারের হাতে মতা অর্পণ করতে রাজি নয়। তাদের মতে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে যতটুকু মতা প্রয়োজন, তা বর্তমান কমিশনের রয়েছে। সুতরাং বিএনপির কোনো অযৌক্তিক দাবি তারা মেনে নিতে পারবে না। বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও নির্বাচনকালীন সব ভূমিকা পালন করে থাকে নির্বাচন কমিশন। আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দেশের সংবিধানই কমিশনকে সেই গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছে। সংবিধান অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনসহ সব নির্বাচন অনুষ্ঠান করার দায়িত্ব এই কমিশনের।
প্রধান সমস্যা দেখা দিয়েছে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে। বর্তমান বিধানমতে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা; কিন্তু বিএনপি শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। সহায়ক সরকারের দাবি থেকে এক পা পিছু হটছে না তারা।
বিএনপি অনড়। আওয়ামী লীগও অনড়। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। দুটি দলের মধ্যে কখনোই প্রীতিকর সম্পর্ক ছিল না। তাই তাদের পক্ষে সমঝোতায় পৌঁছানো একপ্রকার অসম্ভব ।
সংলাপের কথা আমরা প্রায়ই শুনি। আগেও শুনেছি । কিন্তু সংলাপ করে লাভ কী। দুই দলই যদি নিজ অবস্থানে অনড় থাকে তাহলে এ ধরনের সংলাপ সময় আর চেষ্টার অপচয় ছাড়া আর কিছু না।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় রয়েছে। তাদের কিছুটা ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকা দরকার। ছাড় দেয়ার মানসিকতা বিএনপিরও থাকা দরকার। উভয় পক্ষের এই মানসিকতা থাকলে কিছু কিছু ছাড় দিলে দেশে একটি সঙ্ঘাতবিহীন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চয়ই সম্ভব।
ইসির রোডম্যাপে আমরা মূলত দু’টি উদ্দেশ্য বিদ্যমান দেখতে পাই। প্রথমত, নির্বাচনের প্রস্তুতিমূলক বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা। দ্বিতীয়ত, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেয়া। এ ছাড়া কমিশন রোডম্যাপে যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছে এর বিষয়বস্তু হলো, সর্বদলীয় গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা, নির্বাচনী সীমানা নির্ধারণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন, নির্বাচনী আইন সংস্কার ইত্যাদি। আরো রয়েছে নতুন দলের চূড়ান্ত নিবন্ধন ও আরপিও সংশোধনসহ বেশ কিছু উল্লেযোগ্য বিষয়।
রোডম্যাপ অনুযায়ী কমিশন ধারাবাহিকভাবে সুশীলসমাজ, রাজনৈতিক দল, মিডিয়া ব্যক্তিত্বসহ বিভিন্ন নারী নেত্রীর সাথে বৈঠক করেছে। তারা ইতোমধ্যে সবার কথা শুনেছে । বিভিন্ন দলের সাথে এই সংলাপের মাধ্যমে চূড়ান্ত ঐক্যে পৌঁছতে হবে যে, কিভাবে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা যায়। কারণ এই ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ ছাড়া অবাধ নির্বাচন আশা করা যায় না। ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত হলেই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়। প্রশাসনিক সমতা, নির্বাচনী প্রচারণার স্বচ্ছতা ও হয়রানিমুক্ত অংশগ্রহণ হলো এই ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে’র অন্তর্গত।
বিএনপি বলছে, প্রশাসন তাদের সঙ্গে সমান আচরণ করছে না। তারা অবাধে নির্বাচনী প্রচারণা করতে পারছে না। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে যে কয়টি নির্বাচন হয়েছে তার প্রায় সব ক’টির বিরুদ্ধে তারা অভিযোগ এনেছে। এ বিষয়ে তারা ইসির সহযোগিতা কামনা করছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার আগামী নির্বাচনকে দেশী-বিদেশী সকল প্রকার প্রভাবমুক্ত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। রোডম্যাপের এই বিষয়বস্তুগুলোর বাস্তবায়নে ইসিকে চরম ধৈর্য ও সহনশীল হতে হবে।
ইতোমধ্যে ইসি কমিশনারদের মধ্যে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। একজন কমিশনার ইভিএম ব্যবহারে অনাস্থা দিয়ে সভা বয়কট করে বেরিয়ে এসেছেন। তিনি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ও দিয়েছেন। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের তেমন প্রতিক্রিয়া আমরা দেখিনি। বরং তারা বলছেন, এটাই গণতন্ত্রের বিউটি। যে যার মত প্রকাশ করতে পারে। এস কে সিনহা পদত্যাগ করেছেন এবং দেশত্যাগও করেছেন। এ নিয়ে নানা ধরনের কথাবার্তা ছিল, এখনো আছে। এ পরিস্থিতিতে একজন কমিশনার ইভিএম নিয়ে তার আপত্তি জানালেন আর সরকার হাসিমুখে প্রশংসা করলেন ব্যাপরটা সত্যিই লক্ষ্যণীয়। এর আগে নির্বাচনকালে সেনা মোতায়েন নিয়েও কমিশনাররা পরস্পরবিরোধী কথা বলেছে। বিএনপি নির্বাচন কমিশনের সংস্কারও চেয়েছে।
আসল কথা অন্যত্র। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। এই অবিশ্বাসের জায়গা থেকেই দুইটি প্রধান রাজনৈতিক দলের অবস্থান দুই মেরুতে। তাই জনমনে দেখা দিয়েছে সংশয়, অনিশ্চয়তা। রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ করছি চাপা অস্থিরতা। তাদের এই অনড় অবস্থান ভাবিয়ে তুলেছে আমাদের। আগামী নির্বাচনে কী হবে, কেমন হবে এসব নিয়ে জনগণের ভাবনার অন্ত নেই। সংসদীয় সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের পর থেকে এই দুইটি দলই বারবার সরকার গঠন করেছে। দুইটি দলেরই জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা আছে। কিন্তু সহায়ক সরকারের দাবি পূরণ না হলে বিএনপি নির্বাচনে নাও আসতে পারে। নির্বাচনে না এলে বিএনপির ক্ষতি হবে। যেমন গতবারের নির্বাচন বয়কট করে তাদের যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগেরও ক্ষতি কম হবে না। কারণ পরপর দুইবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য সম্মানজনক ও সুখকর হবে না।
আওয়ামী লীগ যেহেতু সরকারে আছে তাদের নমনীয় হতে হবে বেশি, ছাড় দিতে হবে বেশি। কারণ শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্রের ভিত মজবুত হয় না। কার্যকর বিরোধী দল না থাকলে সরকারি দল একতরফাভাবে অনেক কিছু করতে পারে। বিরোধী দলের কাজ রাজনীতিতে চাপ সৃষ্টি করা। তাদের কাজ সরকারের দোষত্রুটি ধরা, সমালোচনা করা, প্রতিবাদ করা। এটাই গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য, স্বাভাবিক ধারা।
এটা করতে হলে অবাধ নিরপেক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচন একান্তই প্রয়োজন। কারণ সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাই আওয়ামী লীগের প্রথম কাজ হচ্ছে বিএনপিকে নির্বাচনে আনা। এজন্য তাদের যা করা দরকার করা ভালো। তবেই আওয়ামী লীগ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটা সম্মানজনক নির্বাচন উপহার দিতে সম হবে।
সংসদীয় সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের এত বছর পার করার পরও আমরা নির্বাচনকালীন একটি স্থায়ী সরকারব্যবস্থা চালু করতে পারিনি। তাই দেশে কখনো দলীয় সরকারের অধীনে, কখনোবা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়। ফলে যারা জয়ী হয় তারাই বলে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। আজ পর্যন্ত কোনো পরাজিত দল বলেনি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোয় সুষ্ঠু নির্বাচনের বিকল্প নেই। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার অভাবে সেটা হয় না। তাদের মধ্যে হানাহানি কিংবা পারস্পরিক কোন্দল লেগেই থাকে। সেই সুযোগে উত্থানের আশঙ্কা দেখা যায় তৃতীয় শক্তির। তখন সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ দুর্গম হয়ে যায় এবং গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়ে। সুষ্ঠু গণতন্ত্র চর্চার স্বার্থে উভয় পরেই বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত।
প্রত্যেকটি নির্বাচনের আগেই দেখেছি সঙ্কট, সহিংসতা, জ্বালাও পোড়াও সৃষ্টি হতে। আর সমস্যায় পড়ে দেশের আপামর সাধারণ জনগণ। যারা কখনই দেশে কোনো বিশৃঙ্খলা অশান্তি অরাজকতা চায় না। তারা ক্ষমতায় যেতে চায় না, চায় শান্তিময় সুখি জীবন।