রাষ্ট্র পরিচালনায় নানা মত নানাভাবে ব্যবহার ও প্রচার চলমান রয়েছে। দার্শনিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানদের বহুতর মতামতের মধ্যে গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থাকে সন্দেহযুক্ত উত্তম বলে মেনে আসছেন। কিন্তু সেই প্রাচীন কালের এই মতটি যা প্লেটো কর্তৃক খানিকটা অনাস্থা পেয়েছে, এরিস্টটলও ভাবতেন যে, এর ফলে অযোগ্য অপদার্থ, স্বার্থপররা ছলে বলে কৌশলে মতা দখল করতে পারে, এবং রাষ্ট্রকে কল্যাণকামী রাষ্ট্র নির্মাণ না করে তাদের স্বার্থে ধনিকের, বণিকের, ঠকবাজ, লুটবাজ, প্রতারকের অভয়ারণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিতে পারে। ফলে অযোগ্যতা সর্বস্তরে ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং রাষ্ট্র জনকল্যাণমূলক না হয়ে- হয়ে ওঠতে পারে গোষ্ঠীর কল্যাণ হাতিয়ার। আর সামান্য সংখ্যকদের সমর্থনে এই শ্রেণীটি মতা দখল নিতে পারে। বাস্তবে তাই আমরা দেখছি। কোনো একটি দল সরকার বা রাষ্ট্র পরিচালক নির্বাচনে মাত্র ৩০ বা ৩১ শতাংশ সমর্থনে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে নিতে পারছে এবং এক অলিক নির্বাচন দ্বারা এমন কিছু সদস্য নির্বাচন করে শাসন ও আইন প্রণয়নে অন্তর্ভুক্ত করছে, যারা নিজ বিবেক বুদ্ধি গচ্ছিত রাখছে দলের কাছে এবং নিজ স্বার্থের ফাঁকফোকরগুলোতে নজর নিবদ্ধ রাখে। বাকি ৭০ শতাংশ লোক রয়েছে তার বিপরীতে। তাদের মতামতে হেরেছে কেবল মাত্র মেজরিটিহীনতার কারণে, অথচ তারাই রয়ে গেছে মেজরিটি। কালে কালে এই নিয়ম বিস্তার পেয়ে প্লেটো বা এরিস্টটলের আশঙ্কাকেই অনেকটা স্থিতি দিয়েছে। তবুও আজকের বিশ্বে এই পদ্ধতির বিপরীতে আর কোনো পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য বা প্রণয়নযোগ্য হয়নি যা রাষ্ট্রকে দূষণমুক্ত করে জনকল্যাণমুখী করে তুলতে পারে। এখন পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ নেই যার শাসকেরা গণতন্ত্রের কথা বলে না। যদিও সামান্য গণতন্ত্রের একটা ছোঁয়া তারা ছড়িয়ে মূল মতা তাদের ইচ্ছেমতো কুগিত করে নিতে পারছে। কিছু কিছু দেশ গণতন্ত্রের কথা বললেও বাদশাহী তন্ত্রই চালু রেখেছে।
তবুও গণতন্ত্রই আজকে পৃথিবীর মানুষের নিরাপত্তার আশ^াস। সে যতই ত্রুটিযুক্ত হোক, যতই ফাঁকফোকর-ছিদ্রযুক্ত হোক ক্রমাগত চর্চা, নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের মধ্যদিয়ে এটাই যে আগামী তাতে কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়। কেবল কিভাবে এর বিকাশ, শাসনযন্ত্র নির্মাণে শুদ্ধি আনা যাবে তাই নিয়েও ভাবনা রয়েছে চিন্তাশীল মানুষের মধ্যে। তারা মনে করেন যে প্রকৃত গণতন্ত্র নেই বলে সঙ্কট ধেয়ে আসছে এবং পৃথিবী তৃতীয়বার প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণির দিকে এগোচ্ছে। সঙ্কট ঘনিভূত হয়েছে, যুদ্ধ-বিগ্রহ-ধ্বংসের নান্দিরোল উঠেছে। অন্যায় বিধিবিধানসংবলিত সরকারগুলো প্রকৃত ন্যায় প্রয়োগ থেকে নিজদের দূরে সরিয়ে নির্মাণ করছে ধনিকদের বণিকের লুটবাজ ঠকবাজদের স্বার্থবাহী রাষ্ট্র। জনগণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে রাষ্ট্র থেকে, রাষ্ট্রের কল্যাণ থেকে, সুস্থ চিন্তা থেকে। ফলে রাষ্ট্র কল্যাণের প্রতিশ্রুতির বাজনা বাজিয়ে হয়ে উঠছে শাসন শোষণের যন্ত্র। আর জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে তার মানবিক বিকাশের সুযোগ থেকে। চারদিকে যুদ্ধাস্ত্র প্রতিযোগিতায় রাষ্ট্র খরচ করে ফেলছে বিপুল অর্থ, যা কল্যাণে ব্যবহৃত হতে পারত এবং নতুন পৃথিবী নির্মাণে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রসারে, নতুন আবাসভূমি সন্ধানে ব্যয় হতে পারত। কোটি কোটি মানুষ এখন অভুক্ত, চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত, শিা থেকে নির্বাসিত বিকাশ থেকে আবদ্ধ। রাষ্ট্র তা গ্রাহ্য করে না, আর এ জন্য জবাবদিহিতা থাকে না। যেখানে সব মতামতের প্রতি রাষ্ট্র শ্রদ্ধা দেখাবে সেখানে বিপরীত মতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে রাষ্ট্রশক্তি। বাস্তবে তারা যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তার পেছনে জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা থাকে না। জনগণ জানেই না এই সিদ্ধান্তে, দস্তখত করা চুক্তিতে কী আছে, কী রকম তা তাদের গলায় ফাঁস হবে। অথচ গণতন্ত্রের নিয়মে তা সবারই ভালোভাবে জানার কথা, মতামত দেয়ার সুযোগও থাকার কথা।
এ েেত্র মতাবানরা বলতেই পারেন অতিগোপন ছাড়া আর সব কাজই তো প্রকাশ্য হয়। যা কিছু ঘটে তা নানা মিডিয়া প্রকাশ করে, গণতন্ত্র আছে বলেই তো তা সম্ভব হয়েছে। মিথ্যে নয়, কিন্তু বাস্তবে প্রকৃত সত্য মিডিয়াগুলো প্রকাশ করতে পারে? না কি সেখানেও খবরদারির চোখ লাল হয়ে থাকে। অন্য দিকে নানা ছলে যাদের চেতনাহীন করা হয়েছে তারা এসব শুনবার বুঝবার ফরসুৎ কোথায় পাবে?। আর যারা কিছুটা বোঝে তারা বেশির ভাগই উচু শ্রেণীর যারা যুক্ত মতা কেন্দ্রের সাথে- এতে স্বার্থ আছে। খুব গভীর ভাবে দেখলে প্রকৃত গণতন্ত্র একটি আধুনিক রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি। নির্জীব জনগণকে পুনরুজীবিত করে। তার সক্রিয় অংশগ্রহণ রাষ্ট্রকে রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে সচল করে, সত্য মিথ্যের বেড়াজাল থেকে তাকে রা দেয়। আর এ কারণেই রাষ্ট্রমতা দখলকারীরা জনগণের সামনে মিথ্যের গণতন্ত্র ঝুলিয়ে দিয়ে বাদশাহী তন্ত্র চালিয়ে যায়।
০২.
রাষ্ট্রের চারটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আমরা সবাই জানি। এর কোনো একটির অনুপস্থিতি রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে অস্বীকার করবে। জনগণ তার মধ্যে সমান গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক চিন্তায় জনগণের জন্যই রাষ্ট্র। তাদের বিকাশের জন্য, জীবনমান উন্নয়নের জন্য, সুন্দর শৃঙ্খলাময় জীবন পাওয়ার জন্য, জীবনের নিরাপত্তার জন্য এবং উপযুক্ত শিা,স্বাস্থ্য পাওয়ার জন্য রাষ্ট্র অপরিহার্য। রাষ্ট্রের মধ্যদিয়ে মানুষের সুকুমার বৃত্তিগুলো বিকশিত হয়, মানুষ নিজের অধিকার ও কর্তব্য প্রসঙ্গে সজাগ-সচেতন হয় এবং রাষ্ট্র যে তার নিজভূমি এই চেতনা জাগ্রত হয়। কিন্তু তা কখন, যখন রাষ্ট্র প্রকৃত রাষ্ট্র হয়ে ওঠে এবং মানবকল্যাণে পরিকল্পিত ভূমিকা রাখে। মানুষের মনমানসিকতা গঠনে সহায়ক হয় নিশ্চিত করে মানবীয় অধিকার আর প্রত্যাশা করে যুক্তিযুক্ত নাগরিক কর্তব্য। তেমন রাষ্ট্র চলমান সময়ে মানুষের প্রত্যাশা হলেও মিলছে না। আর আমাদের তো নেই-ই। অথচ গণতন্ত্র সেই অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে বসে আছে। আর তাকে দখল করে জনগণকে নির্জীব করে, তাকে নানা কিছু তামাশা ধরিয়ে দিয়ে ধনিক-বণিক, শোষক-শাসক জনগণের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে। ধনতন্ত্রের উন্নত দেশগুলো যারা এক সময় দসু্যুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে পৃথিবী লুটেছে সরাসরি এখন লুটছে অর্থনৈতিক সঞ্চালন শক্তি বৃত্তির মাধ্যমে মতার ভয় দেখিয়ে, তাদের সমাজে কতগুলো রাব্যুহ থাকলেও আমাদের মতো দেশগুলো কলোনিয়াল শাসন-শোষণমুক্ত হতে পারেনি। নব্যধারায় শাসন-শোষণ চলছে। শোষক ও তাদের পৃষ্ঠপোষক বারবার রূপ বদলাচ্ছে আর রাব্যুহ প্রতিষ্ঠানগুলো নামধারী সাইনবোর্ডের আড়ালে তাদের স্বার্থই রা করছে যারা তাদের ওখানে বসিয়েছে। তাদের জনগণের কাছে কোনো জবাবদিহি করতে হয় না। জনগণও জবাব পাওয়ার মতাও রাখে না। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আচরণ একটি সমাজে বিদ্যমান থাকলে অন্যায়গুলোর প্রতিবাদ গণতান্ত্রিক উপায়ে সম্ভব ছিল, বাস্তবে তা নেই।
কেবল তাই নয়, রাষ্ট্রের ভুল পদপেগুলো, লুটবাজদের কুকীর্তিগুলো রাষ্ট্রের গোচরে পৌঁছে না তা নয়, স্বেচ্ছাচারিতার কারণে রাষ্ট্র তা দেখেও দেখে না। কারণ লোকগুলো তাদের সমর্থক। শিল্পসাহিত্যও এদের দখলে। ফলে সৃজনশীলতা হারিয়ে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে স্তূতিমূলক,অধীনতামূলক, একপেশে যৌনতাড়িত শাসক সমর্থনের সাহিত্য। তারাও জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন, এবং প্রতিনিয়ত রুদ্ধ চেতনার মুক্তকরণের দিশা থেকে জনগণকে চেতনানাশক গিলাচ্ছেন। প্রকৃত গণতান্ত্রিক নিয়ম-আচার জারি থাকলে রাষ্ট্রকেই তার জবাব দিতে হতো, কারণ রাষ্ট্র জনগণের। আর একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই দিতে পারে এর উপশম। যদি সব কিছু অন্ধকারে থাকে এবং রাষ্ট্রশক্তি যদি মতা দখলে রাখার ক্রিয়ায় ব্যস্ত থাকে সে েেত্র মাস্তান,ধর্ষক, পাষণ্ডের আবির্ভাব দলীয় বৃত্তেই বাড়বেই। আর ‘গণতন্ত্র’ এক নাম ও বুলি হয়ে জনগণকে ক্রমাগত অন্ধকারে নিয়ে যাবে ঘুম পাড়িয়ে রাখার জন্য। আজ চারদিকে তারই মহড়া। কী উন্নত দেশে, আর কি গরিব দেশগুলোতে। উন্নত দেশগুলোর কিছু অংশ সজাগ থাকলেও এমন কিছু জাগ্রত নয়; যা ঘটছে, আর যা ঘটবে তা’ তারা জানে। তারা আছে গতানুগতিক জীবন ধারায় আর তারা কতগুলো সামাজিক সুবিধার মধ্যে জীবনযাপন করে, আর হৃদয়হীনভাবে ট্যাক্সগোনে। সেখানকার জনগণও অর্ধচেতন অবস্থায় আছে, আর স্বেচ্ছাতন্ত্র বারবার যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছে তার ভূমির নিরাপত্তার নামে। আসলে নিরাপত্তাটা সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণীর, জনগণের নয়। বাস্তবে সবই ফাঁকি, মূল বিষয়টি হচ্ছে ধনিকদের লুট ভোগ আর তার উদ্যামতা। কিন্তু তবুও একমাত্র শাসনবিধান গণতন্ত্রই পারে রাষ্ট্রীয় সমৃদ্ধি সৃষ্টি করতে, পারে দ জনগোষ্ঠী তৈরি করতে- প্রাণীকে দেশপ্রেমিক মানুষ বানাতে। তবে মানুষকেও জাগতে হবে, সচেতন হতে হবে, বুঝতে হবে তার করণীয়। যদিও তা বন্দী করে রেখেছে অন্যায়কারীরা শক্ত সিন্দুকে।
