একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। আগামী ডিসেম্বরের শেষে অথবা জানুয়ারির প্রথমার্ধে এই নির্বাচন হওয়ার কথা। গত ১৫ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে আসন্ন নির্বাচনের তফসিল নিয়ে কথাবার্তা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিব সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, নভেম্বরের প্রথমার্ধেই তফসিল ঘোষণা করা হবে। ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও গণমাধ্যমে একই কথা বলেছেন।
নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও নানামুখী তৎপরতা লক্ষ করা গেছে। সরকারি দল আওয়ামী লীগ জোরেশোরেই নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছে। ট্রেন ও লঞ্চযাত্রা শেষ করে আওয়ামী লীগ জেলা, বিভাগ ও রাজধানীতে গণসংযোগ কর্মসূচি শুরু করেছে। ভোটারদের বাড়ি বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে তারা লিফলেট বিতরণ করছে। দেশের সর্বত্র আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নৌকা প্রতীকের পোস্টারে ছেয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী প্রায় প্রতিদিনই ডজনে ডজনে ‘উন্নয়ন’ প্রকল্পের উদ্বোধন কিংবা ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন করছেন। আগাম নির্বাচনী প্রচারের এই সুযোগ ক্ষমতাসীন দল ও তার সহযোগীরা অবাধে করতে পারলেও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের অবশ্য রাখা হয়েছে দৌড়ের ওপর। যেকোনো সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের পূর্বশর্ত হচ্ছে সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা। যেখানে ক্ষমতাসীন দল ও জোটের প্রার্থীরা অবাধে আগাম নির্বাচনের প্রচার চালাচ্ছে, সেখানে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের আসামি বানিয়ে ঘরছাড়া এবং বাড়িছাড়া করা হচ্ছে। অনেকে গ্রেফতার ও রিমান্ডে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বিএনপি সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছে নির্বাচন সামনে রেখে নতুন করে ৩৫ দিনে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চার হাজার গায়েবি মামলা হয়েছে। এতে আসামির সংখ্যা ৮৬ হাজার ৯৯২ জন। আর অজ্ঞাতপরিচয় আসামির সংখ্যা দুই লাখ ৭৬ হাজার ২৭৭ জন। এ পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছেন ৪৬৪ জন।
তবে অত্যাচার-নির্যাতন, মামলা-হামলা গ্রেফতারের মধ্যেও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা বসে নেই। অবাধে মিছিল, সভা-সমাবেশ ও আগাম প্রচার চালাতে না পারলেও আসন্ন নির্বাচনকে তারা বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেবেন না বলে মনে হচ্ছে। সরকার যাতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠান করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে না পারে সে জন্য তারা এবার খুব সজাগ। সরকারের নিয়ন্ত্রণ এবং অসংখ্য শর্তের মধ্যেও বিএনপি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো মানুষের মহাসমাবেশ করেছে। ইতোমধ্যে বিরোধী রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের অগ্রগতিও হয়েছে। প্রখ্যাত আইনজ্ঞ ও সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে সরকারবিরোধী একটি রাজনৈতিক ঐক্য মোর্চা গঠিত হয়েছে। বেশ কিছু দিন ধরে বিএনপি, গণফোরাম, ঐক্যপ্রক্রিয়া ও যুক্তফ্রন্ট মিলে যে ঐক্যের চেষ্টা চলছিল তার সফল পরিণতি হিসেবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছে। গত ১৩ অক্টোবর জাতীয় প্রেস কাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারবিরোধী এই রাজনৈতিক ঐক্যজোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ঘোষণা দেন ড. কামাল হোসেন। অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাসদ সভাপতি আ স ম আবদুর রব, ঐক্যপ্রক্রিয়ার মাহমুদুর রহমান মান্না, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনসহ বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সাত দফা দাবি ও ১১ দফা লক্ষ্য নিয়ে গঠিত এই রাজনৈতিক জোট শিগগিরই আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করবে বলে জানিয়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ঘোষণা দিয়ে ড. কামাল হোসেন বলেন, দেশের কোটি কোটি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সঙ্কল্প নিয়েই এই জোট যাত্রা শুরু করল। তিনি জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে ঘরে ঘরে ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, গণমানুষের সরকার গঠন করতে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, বর্তমান সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হবে না। ভোট হতে হবে সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। দলীয় সরকারের অধীনে যে ভোট সুষ্ঠু হয় না তা বর্তমান ক্ষমতাসীনরা বারবার প্রমাণ করেছে। তাই ভোট হতে হবে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে।
জোটের সাত দফা দাবি ও ১১ দফা লক্ষ্য তুলে ধরে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ঘোষণার মধ্যদিয়ে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াই শুরু হলো। এই ঐক্যপ্রক্রিয়া দ্রুত জেলায় জেলায়, থানা-উপজেলায় জনগণের কাছে পৌঁছে যাবে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বর্তমান স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে ১০ বছর ধরে লড়াই করছি। আজ আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি এবং শপথ নিয়েছি যে, গণতন্ত্রের অধিকার আদায় করেই ঘরে ফিরব। এই রাজনৈতিক জোটের দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সরকারের পদত্যাগ, সংসদ বাতিল, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার গঠন, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং সংসদ, সরকার, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা ও সাংবিধানিক কমিশন গঠন। আন্দোলনের প্রথম কর্মসূচি হিসেবে বিরোধী জোট সিলেটে জনসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও সভা করার অনুমতি মেলেনি।
বর্তমান রাজনীতির ময়দানে এই জোট যে প্রবল নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছে তা বোঝা গেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায়। পদ্মা সেতুর অগ্রগতি পরিদর্শন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বক্তব্য দেন তার চুম্বক অংশই ছিল নবগঠিত জোট নিয়ে সমালোচনা। তিনি ড. কামাল হোসেন, আ স ম রব এবং মাহমুদুর রহমান মান্নার নাম উল্লেখ করে বক্তব্যে তার রাগ ঝাড়েন। প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের পর আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী ১৪ দলের বিভিন্নস্তরের নেতারাও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিতে শুরু করেছেন। নতুন জোটকে ‘জগাখিচুড়ি ঐক্য’ আখ্যায়িত করে শেখ হাসিনার মন্তব্য ছিল, ‘নৌকা থেকে নেমে ধানের শীষের মুঠো ধরেছেন ড. কামাল হোসেন। তার সঙ্গে জুটেছে আরও কিছু খুচরা আধুলি। এরা সব ঐক্য করেছে।’ আওয়ামী লীগের শরিক হাসানুল হক ইনু জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার সাত দফা প্রসঙ্গে বলেন, ‘এই সাত দফার প্রথম সার কথা হচ্ছে একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করে ভোটের আগে একটি অস্বাভাবিক সরকার আনা।’
সিপিবির নেতৃত্বাধীন বাম দলগুলো জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাথে না এলেও নির্বাচনের ব্যাপারে তাদেরও অবস্থান প্রায় অভিন্ন। তারাও অংশগ্রহণমূলক একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চায়। নির্বাচনের আগে সংসদ বাতিল এবং নির্বাচনকালীন সরকার চায়। ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন তারাও দেশে হতে দেবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের মহাসমাবেশ থেকেও নির্বাচন নিয়ে একই দাবি উচ্চারিত হয়েছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটও এ ব্যাপারে সোচ্চার।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দেশে প্রকৃত অর্থে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়নি। ফলে আসন্ন নির্বাচনে দেশের ভোটাররা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে উদগ্রীব হয়ে আছেন। সরকার চাচ্ছে আগের মতোই নির্বাচনী প্রহসন করে, র্যাব-পুলিশ ব্যবহার করে পুনরায় ক্ষমতা কব্জা করতে। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ তারা এবার আর দেশে কোনো নির্বাচনী প্রহসন কিংবা একতরফা নির্বাচন করার সুযোগ দেবে না। এ অবস্থায় নির্বাচন নিয়ে শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এলডিপি সভাপতি কর্নেল অলি আহমদ ১৪ অক্টোবর এই শঙ্কার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘দেশে আদৌ কোনো নির্বাচন হবে কি না তা নিয়ে আমি এখনো নিশ্চিত নই। তবে ৫ জানুয়ারির পুনরাবৃত্তি হবে বলে যারা মনে করেন তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। সেটা আর কখনোই হবে না। একটি সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচনের আগে সংসদ বাতিল এবং নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার চায়। এখনই শেখ হাসিনার ক্ষমতাসীন সরকারকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। না হলে আরেকটি রক্তাক্ত পথ হবে। আলোচনার মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। যাতে মানুষের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়। এর বাইরে কিছু করতে গেলে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পরই আরেকটি রক্তপাত অপেক্ষা করছে।’
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ হবে একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র। সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয়ের মাধ্যমে আমরা যে স্বাধীন দেশ পেয়েছি, দেশ পরিচালিত হবে সাম্য, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও মানবিকতার আদর্শে। আজ বিজয়ের ৪৭ বছর পর আমরা যদি পর্যালোচনা করি তাহলে কী দেখতে পাই? আমরা কি পুরোপুরি স্বাধীন? আমরা কি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি। মানবিকতার চর্চা কি করতে পেরেছি। সহজ উত্তর হবে আমরা পারিনি। স্বাধীনতা পেয়েছি সত্য, কিন্তু সেই স্বাধীনতা সাবলীলভাবে আমরা উপভোগ করতে পারছি না।
বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু গণতান্ত্রিক আদর্শ ও রীতিনীতি জলাঞ্জলি দিয়ে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ হাঁটছে একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের পথে, ফ্যাসিবাদ ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের পথে। স্বাধীনতার পর পর ১৯৭৩-এর একপেশে নির্বাচনে যে সংসদ গঠিত হয়েছিল, সেই ধারাও অব্যাহত থাকেনি। মাত্র দু’বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালে সংসদীয় উপলক্ষের মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে একদল প্রতিষ্ঠা করা হয়। নস্যাৎ করা হয় গণতান্ত্রিক চেতনার। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট জিয়ার নেতৃত্বে বহুদলীয় রাজনীতি ও গণতন্ত্র পুনরায় চালু হলেও বেশিদিন তা অব্যাহত থাকেনি। প্রেসিডেন্ট জিয়ার শাহাদতের পর জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসন একে ব্যাহত করে। দীর্ঘ ৯ বছরের সংগ্রামের মধ্যদিয়ে এই সামরিক শাসনের অবসান ঘটে। নব্বুইয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে আবারো গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হয়। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসে। কিন্তু শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন এই সরকারকে একদিনও শান্তিতে দেশ পরিচালনা করতে দেয়া হবে না। তার নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। ১৯৯১-৯৬ সালে আওয়ামী লীগের ১৭৩ দিনের হরতাল-অবরোধ, অসহযোগ, জ্বালাও-পোড়াওয়ে মানুষ ছিল দিশেহারা। গণতান্ত্রিক শাসন অব্যাহত রাখার স্বার্থে খালেদা জিয়ার সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে। নানা রাজনৈতিক বিতর্ক সত্ত্বেও এ ব্যবস্থার অধীনে পরপর তিনটি নির্বাচন হয়। কিন্তু ২০০৬ সালে আবারো গণতন্ত্র হোঁচট খায়। এক-এগারোর সেনাসমর্থিত জরুরি সরকার প্রায় দু’বছর দেশ পরিচালনার পর নির্বাচন হয়। কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তারা সেই পঁচাত্তরের বাকশালের মূলমন্ত্রেরই বাস্তবায়ন ঘটায় সর্বত্র। ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। এই নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবি ছিল আওয়ামী লীগেরই। এই ব্যবস্থার যেকোনো ত্রুটি ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’-এর মধ্যদিয়ে সংশোধিত ও পরিশোধিত হতে পারত। প্রয়োগের মধ্যদিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় পরিলক্ষিত ত্রুটি-বিচ্যুতিও ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সংশোধনের সুযোগ ছিল এবং উচিত ছিল সেটাই করা। কিন্তু সরকার তা না করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেন। জাতীয় নির্বাচন যাতে আর নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে না পারে সে জন্য সংবিধান থেকে সে ব্যবস্থাটি কৌশলের মাধ্যমে উঠিয়ে দেয়া হয়। এ লক্ষ্যেই বহুলবিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী সংসদে পাস করা হয়। আর এটা করার জন্য এর আগে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলসংক্রান্ত ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার বিতর্কিত রায় দেয়ানো হয়। বিচারপতি খায়রুল হক তার অবসরে যাওয়ার কিছুদিন আগে ২০১১ সালের ১০ মে ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার সংক্ষিপ্ত আদেশ দিয়ে যান। সেখানে তিনি সুস্পষ্টভাবে ১৯৯৬ সালে সম্পাদিত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর অধীনে পরবর্তী দুটো সংসদ নির্বাচন করা যেতে পারে বলে অভিমত দিয়েছিলেন। ত্রয়োদশ সংশোধনীতে নির্বাচনের সময়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করার বিধান ছিল। অথচ সুদীর্ঘ ১৬ মাস পর প্রকাশিত রায়ের চূড়ান্ত লিখিত আদেশে তিনি শুধু নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা যেতে পারে বলে নির্দেশনা দেন। অবসরে গিয়ে বিচারপতি খায়রুল হক নিজের দেয়া আদেশ কোনো রকম অতিরিক্ত শুনানি ছাড়াই পাল্টে দেন যা নজিরবিহীন।
সংসদে বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের মধ্যদিয়ে আওয়ামী লীগ দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিধান করে। একতরফাভাবে সংবিধান পরিবর্তন করে তারা জনমতের কোনো তোয়াক্কা করেনি। এতে জনগণের ওপর স্বৈরশাসন চেপে বসেছে। নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রহসনে পরিণত হয়েছে এবং জাতীয় সংসদ কার্যত বিরোধী দলশূন্য হয়ে পড়ে। সরকার, সংসদ, মন্ত্রিসভা, স্পিকার, বিরোধী দল, নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের প্রতিনিধিত্বহীন হয়ে পড়ে। কর্তৃত্ববাদী শাসনে দেশ অনেকটা রাজনীতিহীন হয়ে পড়ে।
পাঁচ বছর পরপর সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের যে প্রচেষ্টা ছিল তা ভণ্ডল হয়ে যায়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একটি একতরফা নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। ৫ জানুয়ারির সেই নির্বাচনটি ছিল দেশে-বিদেশে চরম প্রশ্নবিদ্ধ একটি নির্বাচন। জনগণের ভোটের অধিকারকে এ নির্বাচনে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা হয়। এ নির্বাচনে ভোট ছাড়াই ১৫৪টি আসন অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে চার কোটি ৫৩ লাখ ভোটারকে বঞ্চিত করে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা প্রতিদ্বন্দ্বিহীন অবস্থায় বিজয়ী বলে ঘোষণা করে। বাকি ১৪৬টি আসনে গড়ে ৫ শতাংশ ভোটও পড়েনি। নির্বাচনে শাসক দলের আজ্ঞাবহ কয়েকটি দল ছাড়া দেশের আর কোনো রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেনি। বৃহত্তম বিরোধী দল বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রেখে এবং অর্ধেকের বেশি আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত বলে ঘোষণা দিয়ে এক বিচিত্র এবং অদ্ভুত সংসদ গঠন করা হয়েছে। যদিও সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, ‘প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত ৩০০ সদস্য এবং সংরক্ষিত আসনের ৫০ জন মহিলা সদস্য নিয়ে সংসদ গঠিত হবে।’ অর্ধেকের বেশি আসনে যেখানে প্রত্যক্ষ নির্বাচনই হয়নি, সেখানে সংসদ গঠিত হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তবুও তারা সংসদ গঠন করে, যেখানে বিরোধী দলের সদস্যরা এক সাথে বিরোধী দলেও আছে আবার সরকারের মন্ত্রিসভায়ও আছে। এই অদ্ভুদ সংসদের মেয়াদও শেষ হতে যাচ্ছে। কিন্তু সরকার এই সংসদ বহাল রেখেই আরেকটি একতরফা নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন করতে বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় কারাগারে বন্দী করে রেখেছে।
বর্তমান কর্তৃত্ববাদী শাসনের পরিপ্রেক্ষিতে গণতন্ত্র আজ নির্বাসনে চলে গেছে। সুশাসন শব্দটি দুঃশাসনে পরিণত হয়েছে। মৌলিক মানবাধিকার, বাক-ব্যক্তি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। কোথাও বিচার নেই। আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা পুঁথির কথায় পরিণত হয়েছে। বিচারের বাণী আজ নীরবে-নিভৃতে কাঁদছে।
খুন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, জেল-জুলুম নির্যাতনে কায়েম হয়েছে ত্রাসের রাজত্ব। এই রাজত্বে দুর্নীতিই সুনীতি। ব্যাংকিং সেক্টরকে পুরোপুরি পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে। সেখানে চলছে ‘হরিলুট।’ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, বিচার বিভাগসহ বিভিন্নপর্যায়ে দলীয়করণ পৌঁছেছে চরম অবস্থায়। দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও রাজনীতি বলতে আজ আর কিছু নেই। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার বলয়ের বাইরের কোনো রাজনৈতিক দল তাদের স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে পারছে না। প্রধান বিরোধীদল বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশের প্রায় সব কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখা হয় মাসের পর মাস। বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পাহাড়সম মামলা। আসামির সংখ্যা প্রায় ছয় লাখ। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে রাজনৈতিক সঙ্কট ক্ষমতাসীনরা সৃষ্টি করেছে, সেই সঙ্কট একমাত্র নিরসন হতে পারে একটি গ্রহণযোগ্য অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমেই। কিন্তু সে ধরনের একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ও আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় তার একটি বক্তব্যে বলেছেন, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আরো বেশি আসন পাবে। এর অর্থ কী হতে পারে সহজেই অনুমেয়। অর্থাৎ ২০১৪ সালের সেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকেও ছাড়িয়ে যাওয়া হবে, সেটারই ইঙ্গিত। কিন্তু দেশবাসী দেখতে চায় একটি অংশগ্রহণমূলক সুন্দর, স্বচ্ছ নির্বাচন। এই নির্বাচনই বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটের উত্তরণের পথ হতে পারে।
