১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয় বাংলাদেশীদের জন্য ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অর্জন। তরুণ প্রজন্মের কাছে আমরা মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর কথা বর্ণনা করি। কিন্তু আমরা মুক্তিযুদ্ধ করতে গেলাম কেন এ সম্পর্কে তাদের ততটা বলি না। মুক্তিযুদ্ধ যে অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে একটা সোচ্চার বলিষ্ঠ পদপে ছিল, এ কথাটা সবাইকে বুঝতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোরই চেতনা। অন্যায়টা কত বড় ছিল এবং তা কিভাবে পুঞ্জীভূত হয়েছিল সে কথাটা তরুণ প্রজন্মের জানা দরকার। ইতিহাস স্যা দেয়, এই বাংলাদেশের জনসাধারণই পাকিস্তান আন্দোলনে একটা বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। ১৮৯৭ সালে ভারতে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কয়েক বছর পরে মুসলিম লীগের জন্ম হয় এ ঢাকাতে। বাংলাদেশের বরিশালেরই এক কৃতী সন্তান শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব এনেছিলেন, যা পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য নির্দেশক ছিল। চল্লিশের দশকে আমাদের এ ভূখণ্ডে মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভা গঠন করেছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ ও তার ভগ্নি ফাতেমা জিন্নাহ এ বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) জনসাধারণের কাছ থেকে সর্বাধিক সহায়তা ও সমর্থন পেয়েছিলেন। তা হলে প্রশ্ন জাগে, যে জনসাধারণ একসময় পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের জন্য সর্বাত্মক সংগ্রাম করেছিল (প্রবীণ রাজনীতিবিদ শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যরা এ আন্দোলনে শরিক হয়েছিলেন), তারাই কেন আবার পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটাতে গেল? এ প্রশ্নের জবাব তরুণ প্রজন্মকে দেয়া উচিত। ব্যাপারটা সংেেপ বলতে গেলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কথা এসে পড়ে।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ এ উপমহাদেশ ছেড়ে যাওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। আমরা ছিলাম তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তানের অধিবাসী। পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাষ্ট্্রভাষা কী হবে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলো। জিন্নাহ ঢাকায় এসে একটি মারাত্মক ঘোষণা দিলেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এটি ছিল একটি অত্যন্ত ভুল সিদ্ধান্ত এবং এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা সবাই প্রতিবাদমুখর হলো। ভাষার ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ। আমাদের দাবি ছিল, পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হোক বাংলা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হোক উর্দু এবং উভয় অঞ্চলের মধ্যে সংযোগের জন্য ব্যবহৃত হোক ইংরেজি। আমরা তখন পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও আমাদের এ যুক্তিসঙ্গত দাবি মানা হলো না। শুরু হলো ১৯৪৮ সালেই বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন। ১৯৫২ সালে এ আন্দোলন করতে গিয়ে রক্তপাত ঘটল। ওই সালের একুশে ফেব্র“য়ারিতে সালাম, বরকত, রফিক এবং আরো অনেকেই প্রাণ দিলো বাংলা ভাষার জন্য। আজ আমাদের আনন্দের বিষয় এই, জাতিসঙ্ঘ একুশে ফেব্র“য়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। আমাদের ন্যায্য দাবির কাছে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ঠিকই মাথা নোয়াল কিন্তু দেরিতে। এ সময়ের ভেতর কিন্তু অনেকের মধ্যে ােভ ও বিরক্তির সঞ্চার হয় পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর ওপর। ােভের আরেকটি কারণ ছিল এই, তৎকালীন পাকিস্তানে বৈদেশিক মুদ্রার বেশির ভাগ অর্জিত হতো আমাদের সোনালি ফসল পাট রফতানির মাধমে। তৎকালীন সময় প্রায় ২০০ কোটি টাকার মতো রোজগার হতো পাট রফতানির মাধ্যমে। এ অর্থের বিনিয়োগ এ অঞ্চলে বড় একটা হচ্ছিল না। ােভের আরো কারণ হলো এই, কেন্দ্রীয় সরকার ও সশস্ত্রবাহিনীতে আমাদের অংশগ্রহণ এ দেশের জনসাধারণের সংখ্যার তুলনায় নিতান্তই নগণ্য ছিল। অথচ আমরাই ছিলাম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণ। শেখ মুজিব যিনি পাকিস্তান আন্দোলনের সময় ছাত্রনেতা হিসেবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন, তিনি, মওলানা ভাসানী ও আরো অনেকে এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন। ষাটের দশকে দাবি উঠল ছয় দফার, যা ছিল মূলত পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্য থেকেই আমাদের জন্য স্বায়ত্ত্বশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। এই দাবির প্রতি পাকিস্তান সরকার কোনো রকম সমর্থন তো দিলোই না, বরং আমাদের নেতাকর্মীকে নানারকম নাজেহাল করতে শুরু করল। আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান যিনি পরে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত হন, তিনি এ আন্দোলনে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেন। সারা দেশে ছয় দফা দাবির প্রতি সমর্থন বাড়তে থাকে। ষাটের দশকের শেষার্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা হয় এবং ১৯৬৯ সালে তিনি কারামুক্তির পর অত্যধিক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। এই সময়ে এ দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনে প্রাণ দেন অনেকেই। উল্লেখ্য, পাকিস্তান তার জন্মলগ্ন থেকে বেশির ভাগ সময় সামরিক শাসনে পরিচালিত হচ্ছিল। গণতন্ত্রের চর্চা খুব একটা ছিল না। কখনো কখনো সরকার গঠিত হলেও কিছু দিন পর সেই সরকারকে উল্টে ফেলা হতো। এবার দাবি উঠল গণতন্ত্র ও নির্বাচনের। তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান শেষ পর্যন্ত জনগণের দাবির মুখে নির্বাচন দিলেন। নির্বাচনের কিছু দিন আগে (১২ নভেম্বর ১৯৭০) এ দেশে ঘটে গেল এক ভয়ানক সাইকোন। প্রায় ১০ লাখ লোকের প্রাণহানি ঘটল। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সেই সময় চীন ভ্রমণে গেলেন, অথচ সাইকোনে বিধ্বস্ত পূর্ব পাকিস্তানকে একবারও দেখতে এলেন না। এ ঘটনাও মানুষের মনে দারুণ ােভের সঞ্চার করে। যা হোক, ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচন হয়। আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পায় এবং শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দাবিদার হন। কিন্তু তার এ ন্যায্য দাবি পাকিস্তানের শাসক ও মিলিটারিচক্র বিভিন্নভাবে প্রত্যাখ্যান করে। এতে প্ররোচনা জোগায় জুলফিকার আলী ভুট্টো। ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে এক ঐতিহাসিক ভাষণে এ দেশের জনগণের মুক্তির ঘোষণা দেন। শুরু হয় সর্বাত্মক স্বাধীনতা সংগ্রাম। পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমান ও তার কর্মীদের সাথে আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু রাতের অন্ধকারে তারা সৈন্য ও অস্ত্র আনতে থাকে। ২৫ মার্চের কালো রাতে সামরিক বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে এ দেশের নিরস্ত্র জনসাধারণের ওপর। এর বিরুদ্ধে জনগণ, বিডিআর ও সামরিক বাহিনীর বীর বাঙালি সন্তানেরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বঙ্গবন্ধুর নামে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতির কান্তিলগ্নে কালুরঘাট থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এই ঘোষণা মানুষের মনে বিরাট সাহস ও উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। শুরু হয় বলিষ্ঠ মুক্তির সংগ্রাম। লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। এই গণহত্যার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নেয় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। বাঙালি বীরসেনানী, ছাত্র ও বিভিন্ন পেশার জনগণ ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিণ নেয়। কিছু বীরযোদ্ধা দেশের সীমানার মধ্যে থেকে অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে যুদ্ধ করতে থাকেন। কাদের বাহিনী এর জ্বলন্ত উদাহরণ। ইতোমধ্যে মুজিবনগরে একটি অন্তবর্তীকালীন সরকারও গঠিত হয়। এই সরকারের সদস্যরা বিভিন্ন দেশে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সপে জনসমর্থন আদায় করতে থাকেন। মুক্তিযুদ্ধে প্রত্য ও পরোভাবে লিপ্ত সবার সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় এবং ভারতের সহায়তায় আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা ৯ মাসের একটি রক্তয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অভ্যুত্থান ঘটায় বাংলাদেশের। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পৃথিবীর পৃষ্ঠে আবির্র্ভূত হয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের পতাকা নিয়ে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দু-এক কথায় বলে শেষ করা যাবে না। এ বিষয়টি ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ শিরোনামে কয়েকটি পুস্তকখণ্ডে ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে। তিনি যখন মুক্তিপ্রাপ্ত হয়ে দেশে আসেন, তখন এ দেশের জনসাধারণ বিপুল উৎসাহে তাকে বরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী ইতিহাস সবারই জানা। এ দেশে হত্যাকাণ্ড, অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান হয়, জেলহত্যা হয়, পরবর্তীতে এসবের বিচারও হয়। কয়েকটি বিচার এখনো অসমাপ্ত। নতুন সংবিধান রচিত হয়, একদলীয় শাসন ও পরবর্তীতে বহুদলীয় মতবাদের রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ইতোমধ্যে কয়েকটি গণতান্ত্রিক সরকারও গঠিত হয়।
এখানে একটি কথা বলা দরকার। তা হলোÑ এই যে, যারা মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন না জানিয়ে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে সমর্থন জানিয়েছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে সঙ্গত কারণে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ গড়ে ওঠে। পৃথিবীর ইতিহাসে নিরস্ত্র জনসাধারণের ওপর গুলি চালানো হয়। এ ঘটনা সত্যি বিরল এবং কোনো সভ্য জাতি তা মেনে নিতে পারে না। এমনকি যুদ্ধকালীন সময়েও কেউ যদি দু’হাত উপরে তোলে তা হলে তাকে বন্দী করা যেতে পারে, কিন্তু তাকে হত্যা করা যায় না। আর এখানে সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করা হলো! তাতে যারা সমর্থন জানিয়েছিল, তারা যে ভুল করেছিল তা বলাই বাহুল্য। এখন পাকিস্তানের জনসাধারণ (যারা অনেকদিন পর্যন্ত প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে অবগত ছিল না) এবং শাসকগোষ্ঠী যখন পেছন ফেরে তাকিয়ে এ ঘটনার জন্য দুঃখ ও লজ্জা প্রকাশ করছে, তখন সেই সময় যারা মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা করেছিল তাদের কি কিছু বলার থাকতে পারে? তারা ভুল স্বীকার করলে মাপ্রবণ বাঙালি জাতি তাদের মাফ করে দিতে পারে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অবশ্য সাধারণ মার ঘোষণা করেছিলেন এবং অনেককেই মা করেছিলেন।
আরো একটি কথা। বাংলাদেশে অভ্যুদয়ের পরপর কিছু কিছু লোক হীনম্মন্যতার পরিচয় দিতে শুরু করল। কাজী নজরুল ইসলাম কলেজকে বলা হলো কাজী নজরুল কলেজ। স্পষ্টতই কিছু লোক ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করতে লাগল। এ ছিল একটি ভুল পদপে। কারণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল অন্যায়-অবিচার ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে। এটাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। মুক্তিযুদ্ধে যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন, তারা যে নামাজ পড়তেন না এবং পূজা করতেন না তা নয়। সব ধর্মের সব রাজনৈতিক দলের লোক একত্রিত হয়ে একটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিল, এটাই বড় কথা। হুমায়ূন আহমদের ’আগুনের পরশমণি’ ছায়াছবিটি যারা দেখেছেন তারা ল্য করেছেন যে, মুক্তিযোদ্ধারা রাতের অন্ধকারে মা-বাবার সাথে দেখা করতে আসত। মা ফজরের আজানের সময় নামাজ পড়ে মুক্তিযোদ্ধা সন্তানকে দোয়া দিয়ে ফুঁ দিচ্ছেন; এটাই আমাদের রীতি, এটাই আমাদের কালচার। মুক্তিযুদ্ধ ধর্মবিবর্জিত কালচার ছিল না। বরং ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের ঊষবপঃরড়হ গধহরভবংঃড় তে পরিষ্কারভাবে লেখা ছিল, কুরআন ও সুন্নাহর বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো আইন প্রণয়ন করা যাবে না। এ দেশের মানুষ ’৭০ সালের ভোটের সময় সে কথাটা মনে রেখেছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও সে কথাটা কেউ ভুলে যায়নি। তাই ধর্ম ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলা মোটেই সমীচীন নয়। এ দেশের বেশির ভাগ মানুষের ধর্ম ইসলাম। সাম্প্রদায়িকতাকে ইসলাম মোটেই প্রশ্রয় দেয় না এবং এ দেশের মানুষও সাম্প্রদায়িক নয়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশ, এটাই আমাদের গর্ব।
কে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল আর কে করেনি এ বিতর্কে দেশের লোক আর যেতে চায় না। প্রত্যেকটি দেশে যুদ্ধ হয়, সাধারণ মাও ঘোষণা করা হয়, কিন্তু আর কেঁচে গণ্ডুষ করা হয় না। যদি কেউ বাংলাদেশের বিরোধিতা করে থাকে, অবশ্যই তার বিচার করা দরকার। বাংলাদেশের মাটিতে তার স্থানও নেই। কিন্তু সব ধর্মের সব মতের দেশ বাংলাদেশে এখন যা দরকার তা হলো জনগণের উন্নয়ন। মুক্তিযুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এই জনগণের উন্নয়ন।
বলতে দ্বিধা নেই যে, বায়ান্নর একুশে ফেব্র“য়ারিতে যে বাংলা অর প্রতিষ্ঠার জন্য রক্ত ঝরেছিল, সেই অর গেঞ্জিতে ও জামায় আমরা লিখি বটে, কিন্তু জনসাধারণের এক বিরাট অংশ এই অর চিনতে পারে না। সালাম, রফিক, জব্বার এ অবস্থা দেখলে কান্নায় ভেঙে পড়ত এটা বলাই বাহুল্য। মুক্তিযুদ্ধের পর এখন আরেকটি যুদ্ধ করা দরকার এই নিররতা দূর করার জন্য। সম্প্রতি নারী শিার জন্য সরকার যে পদপে নিয়েছে, সেটি অত্যন্ত শুভ পদপে। আমাদের শুধু স্বার হয়ে বসে থাকলে চলবে না, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে, যে যুগে আমরা বাস করছি তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে কহড়ষিবফমব ঊপড়হড়সু এর যুগ হিসেবে। কহড়ষিবফমব এখন দ্রব্য হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। আমরা আরো ল্য করছি, আশপাশের অনেক দেশে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল নেই, তারা বিদেশ থেকে কাঁচামাল এনে কহড়ষিবফমব বা জ্ঞান সংযোজন করে ঠধষঁব ধফফরঃরড়হ করছে অর্থাৎ যতই আমরা ঠধষঁব ধফফরঃরড়হ এর কথা বলি না কেন কহড়ষিবফমব ছাড়া ঠধষঁব ধফফরঃরড়হ করা সম্ভব নয়। এই মুহূর্তে আমাদের যা করণীয় তা হলো ঘবি ধহফ ঊসবৎমরহম ঝপরবহপবং ্ঞবপযহড়ষড়মুএর জ্ঞান আয়ত্ত করা। সেই জ্ঞান অর্জনের ল্েয সরকারের বড় ধরনের একটা উদ্যোগ প্রয়োজন। আমরা ল্য করছি, ’৫০ এবং ’৬০-এর দশকে দণি এশিয়ার যে সব দেশ তাদের ছাত্রছাত্রীদের আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাত প্রশিণের জন্য, তারাই আজ এশিয়ান টাইগারস বা এশিয়ার বাঘ নামে পরিচিত হচ্ছে। কয়েক দশকের মধ্যে তারা বাঘ হওয়ার মতা কোথায় পেল? তাদের হাতে কি আলাদিনের চেরাগ ছিল? হ্যাঁ ছিল অবশ্য একটা। সেই চেরাগের নাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। আজকের পৃথিবীতে সমাজ পরিবর্তনের একটা ওহংঃৎঁসবহঃ ড়ভ ঈযধহমব বা হাতিয়ার হচ্ছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। এই মুহূর্তে জাতি গঠনে আমাদের যা দরকার তা হলোÑ শিার বিস্তার ঘটানো, সীমিত জমিতে অধিক ফসল ফলান, মাছ, হাঁস-মুরগি ও গো-পালনে অধিকতর মনোযোগী হওয়া, কৃষির জন্য সরঞ্জাম দেশে তৈরি করা, আমাদের নদ-নদীগুলোকে প্রয়োজনমতো ড্রেজিং করা, এগুলোর নাব্য বাড়ানো, পোশাক শিল্পকে আরো শক্তিশালী করা, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার মান উন্নত করা, দারিদ্র্য নিরসনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করা, সর্বেেত্র দ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং দেশের মধ্যে পণ্যদ্রব্য উৎপাদন তৈরি করার জন্য শিল্পকারখানা স্থাপন করা।
একটা সময় ছিল যখন আমরা গধহঁভধপঃঁৎরহম নিয়ে কিছুটা চিন্তা-ভাবনা করেছিলাম। কিন্তু পীড়াদায়ক হলেও এ কথা সত্য, আমাদের দেশের শহর ও গঞ্জের বিপণীগুলোয় যেসব দ্রব্যাদির বাহার দেখা যায়, তার প্রায় সবটাই বিদেশ থেকে আমদানি করা। অর্থাৎ একটা গধহঁভধপঃঁৎরহম ঈড়ঁহঃৎু না হয়ে আমরা একটি ওহফবহঃরহম ঈড়ঁহঃৎু তে পরিণত হয়েছি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা ওপেন মার্কেটের কথা বলি এবং সাইথ এশিয়ার বেশির ভাগ দেশই ওপেন মার্কেটে যোগ দিয়েছে। কিন্তু কখন যোগ দিয়েছে? জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম জিনিসগুলো বানানোর প্রযুক্তিগত কৌশল যখন তারা আয়ত্ত করে ফেলেছে কেবল তখনই তারা ওপেন মার্কেট বা খোলা বাজার অর্থনীতি গ্রহণ করেছে। আমরা এ কৌশল অর্জন করার আগেই খোলাবাজারে যাওয়ায় আমাদের অনেক দেশীয় শিল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। এ মুহূর্তে আমাদের যা দরকার তা হলেÑ জরুরি ভিত্তিতে একটি দ জনশক্তি গড়ে তুলে প্রয়োজনীয় শিল্পকারখানা স্থাপন করা। তথ্যপ্রযুক্তি সেক্টরে ঝড়ভঃধিৎব উবাবষড়ঢ়সবহঃ ছাড়াও অংংবসনষু তে প্রবেশ করা। এসব কাজগুলো করতে হলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভিতকে অধিক শক্তিশালী করতে হবে এবং আমাদের এঘচ এর শতকরা এক থেকে দুই ভাগ বিজ্ঞান প্রযুক্তি খাতে ব্যবহার করতে হবে। দতা অর্জনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ব্যবস্থা না করা গেলে আমাদের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যাকে দারিদ্র্য সীমার নিচ থেকে উপরে আনা সম্ভব হবে না এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধও অর্থবহ হবে না। আমরা অত্যাচার ও নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেয়েছি বটে, কিন্তু আমরা দারিদ্র্য ও দুর্নীতি থেকে মুক্তি পাইনি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অর্থবহ করতে হলে, দেশকে দারিদ্র্য ও দুর্নীতি মুক্ত করতে হলে এ মুহূর্তে আমাদের দরকার জাতীয় ঐক্যের। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কে সরকারে আছেন আর কে বিরোধী দলে আছেন, তা বড় কথা নয়। একটি জাতির জন্য কোন কাজটা আগে করতে হবে এবং কোন কাজটা পরে করতে হবে সে ব্যাপারে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে অবশ্যই সংলাপ এবং ঐকমত্যের প্রয়োজন এবং এ ব্যাপারে মতপার্থক্যের কোনো অবকাশ থাকতে পারে না। কারণ দেশ তো আমাদের সবারই। দেশের স্বার্থই আমাদের স্বার্থ। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, যে দেশ ও দশের ব্যাপারে আমরা এখনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারছি না। আর সেটাই আমাদের বড় ব্যর্থতা। ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড় এ কথাটা আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম একটি স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্র পাওয়ার জন্য, যে রাষ্ট্রে মানুষ দারিদ্র্য ও রোগ-ব্যাধির অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে শিার আলোকে আলোকিত হয়ে একটি মর্যাদাশীল জীবন যাপন করতে পারবে। এই ল্েয পৌঁছাতে আমাদের অনেকটা পথ বাকি। তাই বিভিন্ন দলের মধ্যে যতই মতপার্থক্য থাকুক না কেন, দেশের স্বার্থে সবাইকে অবশ্যই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। পেছন ফিরে তাকানোর সময় আর আমাদের নেই।
পরিশেষে আরো একটি কথা বলা দরকার। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে দেশের লোকদের বিভক্ত করে ফেলব সেটা ঠিক কাজ নয়, মুক্তিযুদ্ধ তো আমাদের একত্রিত করেছিল। তা হলে আমরা বিভক্ত হতে যাব কেন? আমাদের গণতান্ত্রিক সংগ্রামে, আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামে বহু নেতার ও জনগণের নিরলস প্রচেষ্টা কাজ করেছে, আমরা সবাইকে কেন স্বীকৃতি দিতে পারি না। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে গেলে আমরা একজনের কথা উল্লেখ করে অন্যের অবদান খাটো করে দেখি কেন? এটা কি আমাদের হীনম্মন্যতা নয়? শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, বাঙালির জাগরণের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবর্তক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এ দেশের মানুষের জন্য অনেক কিছু করেছেন। আমরা সবাইকেই বড় ভাবতে পারি না কেন? এখন সময় এসেছে নতুন শতাব্দীতে নতুন প্রজন্মকে সাথে নিয়ে আমাদের সব নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি সুন্দর ও বলিষ্ঠ জাতি গঠনের ল্েয একসাথে কাজ করা। এ কাজে ব্যর্থ হলে ইতিহাস আমাদের মা করবে না। আল্লাহ যেন জাতি গঠনের কাজে আমাদের সবাইকে একত্রিত করেন এবং আমাদের মনমানসিকতাকে সঠিক দিকে পরিচালিত করেনÑ এটাই হোক আমাদের বিজয় দিবসের প্রার্থনা।