ইসলামের পুনর্জাগরণ এবং মৌলবাদী ও চরমপন্থী মুসলিম গোষ্ঠী ও সংস্থাগুলোর উত্থানের পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করা সময়ের দাবি। এ দুই প্রক্রিয়ার বিশাল তফাত এবং তা বুঝতে এবং বোঝাতে অমুসলিম পশ্চিমা পণ্ডিত ও গবেষকদের অপারগতা বা অনীহার কথাও উল্লেখ না করে পারা যায় না। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত পশ্চিমা ইসলামি চিন্তাবিদ রোমান ক্যাথলিক ধর্মানুসারী জন এসপজিটোর ইতিবাচক এবং মূল্যবান ভাষ্য ও ভূমিকার কথাও আলোচনা করা প্রয়োজন। জন এসপজিটো যথার্থই বলেন, পশ্চিমা সাম্রাজ্য ও উপনিবেশবাদের অবসানের পর যে পাশ্চাত্য শিক্ষিত ও স্বঘোষিত ধর্মনিরপেক্ষ শ্রেণী দেশ ও সমাজের নেতৃত্ব পায়, তাদের ব্যর্থতা মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে ইসলামকে প্রান্তিক অবস্থান থেকে সমাজ ও রাজনীতির মধ্যমঞ্চের দিকে নিয়ে আসে। আসলে এসব সমাজ থেকে ইসলাম কোনো দিনই অপসৃত হয়নি। পশ্চিমা ধাঁচের শিক্ষায় শিক্ষিত কৃষ্টি ও সংস্কৃতিতে প্রভাবিত রাষ্ট্রের নেতৃত্ব এবং সমাজের অগ্রণী গোষ্ঠীগুলো সুশাসন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। জনকল্যাণ ও উন্নয়নে তাদের কিছুটা সাফল্য থাকার পরও তা যথেষ্ট না হওয়ায় এবং অন্যায়, অনাচার, দুর্নীতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় জনসাধারণ সরকার ও শাসনব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। অশাসন বা অপশাসনের ফলে শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘিœত হয়, জননিরাপত্তাব্যবস্থা হয়ে পড়ে দুর্বল। প্রাণ, সম্মান ও সম্পদের নিরাপত্তার অভাবে তথাকথিত গণতান্ত্রিক উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ নেতৃত্বের ওপরে মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। এর ফলেই মুসলিমপ্রধান দেশের ইসলামি মূল্যবোধের যে অরাজনৈতিক পুনর্জাগরণ ঘটে, তাকে বিকৃতভাবে কাজে লাগায় কট্টরবাদী ও চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো। এরাই সৃষ্টি করে সশস্ত্র সন্ত্রাসের। সরকার ও সরকারি দল যতই ভুলপথে চলতে থাকে এবং কুশাসন ও দুর্নীতির ফলে যতই জনসাধারণের মঙ্গল ও উন্নতি আনতে ব্যর্থ হয়, ততই সন্ত্রাসবাদীদের দাপট বাড়তে থাকে। সুস্পষ্ট ও দৃঢ় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নীতির অভাব থাকলে প্রশাসন হয়ে ওঠে দলীয়কৃত, বিশৃঙ্খল, দুর্নীতিবাজ ও দুর্বল। এই সুযোগেই কট্টর ধর্মীয় উগ্রবাদ জোরদার করে তার অগ্রযাত্রা।
এ কথা যে শুধু মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর জন্য সত্য তাই নয়। অমুসলিমপ্রধান দেশেও এর নজির সাম্প্রতিককালে দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ ভারতে রাজনৈতিক কাঠামো, শাসন ও বিচারব্যবস্থা অনেকটা স্থিতিশীল ও মজবুত থাকা সত্ত্বেও বেশ কিছুকাল ধরেই ধর্মভিত্তিক বিজেপি হিন্দুত্বকে তার প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটেছে এবং সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি এবং তাদের উগ্রপন্থী নেতা গুজরাটের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনী লড়াইয়ে বিপুলভাবে জয় লাভ করেছেন। কংগ্রেসের নেতৃত্বে যে কোয়ালিশন সরকার দু-দু’বার নির্বাচনে জিতে এক দশক ধরে ক্ষমতায় ছিল, তার দুর্বল শাসন এবং একাংশের প্রবল দুর্নীতি; হিন্দিতে যাকে বলে ভ্রষ্টাচার, তার বিরুদ্ধে জনমত প্রবল হয়ে ওঠে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু অধ্যুষিত ভারতে জনসাধারণের এক অংশ তাই বুঝি হিন্দুত্বের মধ্যে খুঁজে পেতে চাইছে অপশাসন, অবিচার ও দুর্নীতির অবসান।
কিন্তু ইসলামের যে পুনর্জাগরণ মধ্যপ্রাচ্যে এবং উত্তর আফ্রিকাসহ অন্যান্য এলাকার মুসলমানদের মধ্যে দেখা গেছে পাশ্চাত্যের পণ্ডিত ও গবেষকেরা তাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারেনি এবং তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব যথাযথভাবে অনুধাবন করতে সক্ষম হননি।
সাম্প্রতিক ইতিহাসের কথা উল্লেখ করে এসপজিটো বলেন, ১৯৭০-এর দশকে আরব ও মুসলিমপ্রধান এবং অন-আরব ও অমুসলিম তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো এই গুরুত্বপূর্ণ জৈব জ্বালানির মধ্যে খুঁজে পান নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি। ১৯৭৩ সালে ‘ইওম কিপুর’ যুদ্ধে মিসর ইসরাইলের বিরুদ্ধে সাফল্য লাভ করে এবং সুয়েজ খালের পূর্ব পাড় ও পরবর্তীকালে শান্তিচুক্তির ফলে সিনাই উপত্যকা ফেরত পায়। এর পরই আরবরা তৎকালীন সৌদি তেলমন্ত্রী জাকি ইয়ামেনির নেতৃত্বে তেলের দাম বাড়ায়। তাদের সাথে অবশ্য পরে অন-আরব তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো যোগ দেয়। এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল পশ্চিমা বিশ্ব প্রথম বিশাল ধাক্কা খায়। কিন্তু এই নতুন বাস্তবতাকে তারা মেনে নেয়। কারণ তা মোকাবেলা করার যথেষ্ট সম্পদ তাদের কাছে ছিল। চড়া দামে তেল থেকে আহরিত অর্থসম্পদ যেমন আরব দেশগুলোকে, তেমন ইরানকেও করে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী।
এর পর পরই পশ্চিমা বিশ্ব অবাক বিস্ময়ে দেখে তাদের সমর্থিত পাশ্চাত্যপন্থী শক্তিশালী শাসকদের পতন। ১৯৭৯-তে ইসলামি পুনর্জাগরণের বিপুল জোয়ারে প্রবল প্রতাপশালী ইরানের শাহানশাহ রেজা শাহ পাহলভি সিংহাসনচ্যুত হন। তাঁর জায়গায় সে দেশে কায়েম হয় শিয়া ইসলামি ধর্মগুরু আয়াতুল্লাহ খোমিনির নেতৃত্বে ইসলামি বিপ্লবী সরকার। এই সরকারের পাশ্চাত্য বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাব ছিল তীব্র। তেহরানে মার্কিন দূতাবাস অবরোধ এবং কূটনীতিকদের পণবন্দী করে রাখা মার্কিনিদের রাজনৈতিক পরাজয়ের এক নতুন নজির সৃষ্টি করে। পশ্চিমাদের বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চোখে ইরানের শাহানশাহ ছিলেন তাদের এক অনুগত মিত্র এবং তাঁর দেশের আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের এক অগ্রণী নায়ক। ১৯৭৯-তে দেশব্যাপী প্রবল ইসলামিক পুনর্জাগরণের জোয়ারে তাঁর ভেসে যাওয়া ছিল পশ্চিমের কাছে এক অকল্পনীয় দুর্ঘটনা।
এসপজিটোর ভাষ্য অনুযায়ী, এই ঘটনা মুসলিমপ্রধান সমাজ ও দেশ সম্পর্কে পাশ্চাত্যবাসীর মনে আরো গভীর ও ব্যাপক সংশয় ও ভীতির সৃষ্টি করে। তারা ভাবে, ইসলামের পুনরুজ্জীবন বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে এবং এর কট্টরপন্থী ও জঙ্গি প্রবক্তা এবং সংগঠকেরা তৈরি করতে পারে এক প্রবল নয়া অস্থিতিশীলতা। এসপজিটো ১৯৯৯ সালের মধ্যমার্চের বিকেলে মিনিয়াপোলিসে তাঁর বক্তৃতায় একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, গড়পড়তা সাধারণ পশ্চিমা মানুষ, খ্রিষ্টানেরা যে শুধু খ্রিষ্টীয় ও ইসলাম ধর্মের মধ্যে বড় মিলগুলো সম্পর্কে খুব কম জানে অথবা কিছুই জানে না, শুধু তাই দুই সমাজকে সংশয় ও সন্দেহে বিচ্ছিন্ন করে না। আরো কিছু সত্যও আছে, যার ফলে পশ্চিমারা জানে না যে, তারা এবং মুসলিমরা পরস্পর বিপরীতমুখী আলাদা কোনো সত্তা নয়। কারণ, পশ্চিমের দুই প্রাণকেন্দ্র ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুসারীদের সংখ্যার হিসাবে ইসলাম যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে। এ অবস্থায় এসপজিটো মনে করেন ১৯৯০-এর দশকের শেষ থেকেই পশ্চিমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো এবং শর্তাবলি ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন অতি জরুরি।
সে সময়ে যে কথা এমনকি পশ্চাত্যবাসী এসপজিটোর মতো ইসলামি সমাজবিশেষজ্ঞও চিন্তা করতে পারেনি, তা হচ্ছে ঘটনাপরম্পরায় এক দশকের মধ্যে ইসলামকে কেন্দ্র করে বিশ্বপরিস্থিতি অভাবনীয় মোড় নেবে। তারা আরো ভাবতে পারেননি যে, উগ্রবাদী ইসলামপন্থী কিছু অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠী ও সংগঠন দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠবে। এই শক্তি অর্জনের ফলে তারা নানা সময়ে, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে নানা কায়দায় পশ্চিমা বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রীয় স্থাপনার ওপর আক্রমণ চালায়। তাদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আক্রমণ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মারাত্মক হামলা চালানো।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এককালীন মিত্র এবং সৌদি ভিন্নপন্থী ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বে তার সংগঠন আলকায়েদা ৯/১১-এ আক্রমণ চালিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। বলা হয়ে থাকে, আলকায়েদার আত্মঘাতী সদস্যরা মার্কিন বাণিজ্যিক বিমান নিয়ে নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনে বিধ্বংসী হামলা করে তিন হাজার মানুষকে হত্যা করে। স্তম্ভিত ও বিমূঢ় যুক্তরাষ্ট্র এই আক্রমণের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। ২০০১ সালের নভেম্বরে সে কিছু মুসলিম রাষ্ট্র এবং পশ্চিম মিত্রদের কোয়ালিশন নিয়ে তালেবান-শাসিত আফগানিস্তান আক্রমণ ও দখল করে এবং সেখানে আশ্রিত ওসামা বিন লাদেনকে চলে যেতে বাধ্য করে। শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ তার মিত্রদের অনেকের অনীহা সত্ত্বেও ২০০৩ সালে এক সমাজতন্ত্রী একনায়ক সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বাধীন ইরাক আক্রমণ ও জয় করে মধ্যপ্রাচ্যের এই অঞ্চলে এক অভাবিতপূর্ব অস্থিতি সৃষ্টি করে। এসব ঘটনার ফলে পুরনো রাষ্ট্রীয় সংগঠনগুলো ভেঙে পড়ে এবং এখানকার মুসলিমদের মধ্যে সংখ্যালঘু শিয়া ও সংখ্যাগুরু সুন্নির মধ্যে বিরোধ ও সঙ্ঘাত চরম আকার ধারণ করে।
মার্কিন আক্রমণের ফলে ইরাকে এবং তার আশপাশে যে চরম রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়, তার সুযোগে উগ্রবাদী ইসলামি আন্দোলন এক অভূতপূর্ব রূপ লাভ করে। আলকায়েদা এবং অন্যান্য উগ্রপন্থী গোষ্ঠী ক্রমেই দুর্বল হয়ে আসার সাথে সাথে দেখা যায় যে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাক ও সিরিয়ার এক অংশ দখল করে উগ্রবাদী গোষ্ঠী আইসিসি অথবা ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া নামে এক অভিনব রাষ্ট্রের পত্তন ঘটায়। এখন এই আইসিসিই ইসলামের মূল নীতি, শান্তি ও স্থিতির বিকৃতি ঘটিয়ে চরমপন্থী জঙ্গিবাদের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখানে বিপুলসংখ্যক মুসলিম তরুণ-তরুণী সারা বিশ্ব থেকে জামায়েত হয়ে জঙ্গি আক্রমণে অংশ নিচ্ছে। এরা শুধু দরিদ্র ও অভাবী মুসলিম সমাজের অংশেরই সদস্য নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে তারা সচ্ছল, বিত্তশালী ও শিক্ষিত সমাজেরও সদস্য। এরা কী কারণে প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও এক বিকৃত আদর্শের জন্য এগিয়ে আসছে, তার কারণ খুঁজে বের করা আজকের বিশ্বের জন্য জরুরি। এর মূল কারণ কি বিশ্বের সমৃদ্ধ, প্রবল শক্তিগুলোর অবিচার ও অনাচার? পরাশক্তি ও বৃহৎশক্তিদের শাসকশ্রেণী যেভাবে লোভ ও লাভের জন্য এবং প্রাধান্য বিস্তারের জন্য দুর্বল দেশ ও জাতিগুলোর প্রতি অন্যায় অবিচার করে, তার ফলে কি মুসলিমপ্রধান এসব দেশ থেকে চরমপন্থী সহিংসতা মূর্ত রূপ পায়? একই সাথে পুঁজিবাদী যে অবক্ষয় দেখা যাচ্ছে, তাও কি এ জন্য দায়ী? ধনতান্ত্রিক সমাজগুলোতে আয়-উপার্জন এবং সম্পদের বৈষম্য ভয়াবহভাবে বাড়ছে, সঙ্কুচিত, ক্ষীণ ও দুর্বল হয়ে উঠছে মধ্যবিত্ত শ্রেণী। এর ফলে মুষ্টিমেয় ধনী ও পরাক্রমশালীর হাতে কুক্ষিগত হচ্ছে বিপুল ক্ষমতা। উন্নত, উন্নয়নশীল এমনকি অনুন্নত দেশগুলোতেও দেশ উন্নয়নের যে বৈষম্য ও লুটতরাজ চলছে; তাও কি সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রসারের জন্য দায়ী নয়? এই জিজ্ঞাসায় সুস্পষ্ট উত্তর খোঁজা হিংসায় উন্মত্ত আজকের পৃথিবীতে অবশ্যকর্তব্য।
ইসলামের পুনর্জাগরণ এবং মৌলবাদী ও চরমপন্থী মুসলিম গোষ্ঠী ও সংস্থাগুলোর উত্থানের পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করা সময়ের দাবি। এ দুই প্রক্রিয়ার বিশাল তফাত এবং তা বুঝতে...
