রূপ স্কুল থেকে ফিরেই কোনো রকম খেয়ে-না-খেয়ে পাখিধরা ফাঁদ হাতে নিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। সন্ধ্যার আগে তার হদিস মেলে না। পাখিধরা ফাঁদ পেতে দু-তিনটি পাখি ধরে সন্ধ্যায় হেলেদুলে বাড়ি ফেরে। পাখির প্রতি রয়েছে তার গভীর মমতা। ক’দিন আগে সে বায়না ধরেছে, তাকে পাখির খাঁচা কিনে দিতে হবে। তার বাবার কী সাধ্য আছে, তার কথা ফেলে দেয়? একমাত্র ছেলের দাবি বলে কথা। অগত্যা তাকে পাখির খাঁচা এনে দিতে হলো। বিশাল বড় এই খাঁচায় রূপ প্রতিদিন পাখি ধরে এনে জমা করে। পানি দেয়, খাবার দেয়। প্রতিটি পাখির সে বিচিত্র নাম রাখে। গায়ের রঙ হলুদ হলে তার নাম হলুদিয়া, সবুজ হলে সবু, লাল হলে লালু, কালো হলে কাজলা কিংবা কালু। খাঁচার পাশে দাঁড়িয়ে পাখিদের সঙ্গে মিনমিনিয়ে কথা বলে, হাসে। কিছু দিন পর সে পাখিগুলো ছেড়ে দেয় আবার নতুন পাখি এনে খাঁচাভর্তি করে। এসব নিয়ে তার মা তাকে কম বকাঝকা করেনি, কিন্তু কিছুতেই কাজ হয় না। লেখাপড়ায় ভালো হলেও রূপের অদ্ভুত পাখিপ্রীতি দেখে মা-বাবার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। পাছে না আবার ছেলেটা গোল্লায় যায়। এক সময় তার মা-বাবার সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়। কারণ, রূপ আগের মতো পাখি ধরার ফাঁদ নিয়ে বাইরে যায় না, ফাঁদ পড়ে থাকে ঘরের কোণে। সে আগের মতো পাখি ধরে আনে না, অথচ স্কুল থেকে ফিরেই লাপাত্তা। গুলতি হাতে বেরিয়ে পড়ে। কোথায় যায়? কী করে? কেউ জানে না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে বাসায় ফেরে। ‘কিরে রূপ, তুই তো আগের মতো পাখি ধরে আনিস না, ব্যাপারটা কী?’ প্রশ্নের জবাবে রূপের বিজ্ঞ উত্তর, স্যার ক্লাসে বলেছেনÑ পাখি ধরা অন্যায়। পাখিদের জন্মই হয়েছে মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ানোর জন্য। পাখি ধরলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দেবে। তা ছাড়া, আমি বইয়ে পড়েছিÑ বন্যরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। এই ছোট্ট ছেলের মুখে এই চমৎকার উত্তর শুনে চোখ টিপে হাসেন তার মা-বাবা। হঠাৎ করেই রূপের কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। জ্বরে যেন তার গা ফেটে আগুন বের হয়। সাথে প্রচণ্ড মাথাব্যথা। দুই দিন পর সবাইকে ভয় ধরিয়ে রূপের এক চোখ ও মুখ বেঁকে যায়। রূপের মা-বাবা বিচলিত হয়ে পড়েন। রূপ তার বাবাকে ডেকে বলে, ‘বাবা আমি আর বাঁচব না। আমি মরে গেলে তুমি সুতিয়া নদীর ব্রিজে যেও প্রতিদিন। ওই দস্যুগুলো আমার সব পাখি নিয়ে যাবে।’ তার বাবার মুখ শুকিয়ে যায়, বুক ফেটে কান্না আসে; তবুও তিনি রূপকে অভয় দিয়ে বলেন, ‘এমন কথা বলে না বাবা। তুমি দেখো, তোমার কিচ্ছু হবে না।’ তার বাবা তাকে ময়মনসিংহ শহরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। ডাক্তার রোগের লক্ষণ দেখে রূপকে দ্রুত ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। ওই দিনই রূপকে ঢাকায় নেয়া হয়। ডাক্তার পরীক্ষা করে বলেনÑ ‘হুম, যা ভেবেছিলাম তাই। ডাক্তার রূপের মামাকে ডেকে তার কক্ষে নিয়ে গেলেন এবং বললেন, ‘রোগীর মা-বাবাকে বললে তারা সহ্য করতে পারবে না। হয়তো তারা আপসেট হয়ে যেতে পারে। তাই আপনাকে ডেকেছি। বিষয়টি আপনাকেই বলিÑ রূপের ব্রেন টিউমার হয়েছে। ওর টিউমারের যে পজিশন, এই পজিশনে টিউমার হলে সাধারণত রোগী বাঁচে না। আমার মনে হয়, ওকে আর কোনো চিকিৎসা না করিয়ে যা যা খুশি খাওয়ান। ওকে বাঁচানোর আশা একেবারেই ক্ষীণ।’ রূপকে বাড়ি ফেরত আনা হলো। রূপের মা-বাবা যেন বোবা হয়ে গেলেন। আট দিনের মাথায় রূপ সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেল না-ফেরার দেশে। রূপের বলা শেষ কথাগুলো তার বাবার বারবার মনে পড়েÑ আমি মরে গেলে তুমি সুতিয়া নদীর ব্রিজে যেও প্রতিদিন। ওই দস্যুগুলো আমার সব পাখি নিয়ে যাবে। রূপের বাবা জানেন, সুতিয়া নদীর ব্রিজের নিচে সব সময় অনেক পাখি জড়ো হয়। শীতকালে যোগ হয় অতিথি পাখি। হাজার হাজার পাখির সমাবেশ ঘটে নদী এলাকায়। একদিন বিকেলে রূপের বাবা সুতিয়া নদীর ব্রিজে যান। ব্রিজের পশ্চিম পাশে রূপের বয়সী তিনজন ছেলে গুলতি হাতে কী যেন বলাবলি করছে। ওরা দেখতে যেন রূপেরই মতো। রূপের বাবা ছেলেদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেনÑ ‘বাবা, তোমরা গুলতি দিয়ে কী করো?’ ছেলেরা তাকে চিনতে না পারায় তার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। রূপের বাবা বুঝতে পারলেন তাকে চিনতে পারছে না বলে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তারা। তিনি বললেন, ‘তোমরা কি রূপকে চেনো? আমি রূপের বাবা।’ এবার ছেলেদের মুখে হাসি হাসি ভাব এলো। একজন বলল, ‘আঙ্কেল রূপ কি কোথাও বেড়াতে গেছে? সে ব্রিজের পাড় আসে না কেন?’ আরেকজন বলল, ‘রূপ তো স্কুলেও যায় না।’ রূপের বাবা তাদের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকেন। তিনি আবার প্রশ্ন করেনÑ ‘বাবা, তোমরা হাতের গুলতি দিয়ে কী করো?’ তাদের মধ্যে একজন একদমে বলে চলল, ‘ওই দেখেন নদীতে কত্ত কত্ত পাখি জড়ো হয়েছে। কী চমৎকার সব পাখি! তাই না? কিন্তু আঙ্কেল, পাখি শিকারিরা প্রতিনিয়ত পাখি মেরে ফেলে। তাই আমি, রূপ, নয়ন, নীরবÑ এ চারজন মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি আর একটা পাখিও আমরা মারতে দেবো না। তাই প্রতিদিন বিকেলে যখন পাখি জড়ো হয় তখন আমরা গুলতি নিয়ে পাহারা দিই। যখনই দেখি কোনো পাখি শিকারি আসছে, তখনই আমরা একেকজন একেক জায়গায় অবস্থান নিয়ে গুলতি দিয়ে ইটের টুকরা নিক্ষেপ করি এতে পাখিরা উড়ে চলে যায় আর শিকারিরা পাখি শিকার করতে পারে না।’ রূপের বাবা ছেলেটির দিকে তাকিয়ে থাকলেন পলকহীনভাবে। থাকবেনই বা না কেন, ছেলেটির মাঝে যে রূপের প্রতিচ্ছবি তিনি দেখতে পেলেন।
