নৈতিকতা কী? নীতির সাথে সম্পর্ককেই বোধহয় নৈতিকতা বলে অভিহিত করার রীতি সমাজে প্রচলিত। আর সামাজিক নৈতিকতা? সম্ভবত ব্যক্তির সামাজিক দায় এই সামাজিক নৈতিকতার সারবস্তু। কিন্তু নীতি আর দায়ের বোধ কি সবার জন্য এক কিংবা অভিন্ন? না। এখানেই ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য। সামাজিক নৈতিকতার প্রসঙ্গ তাই ভিন্ন ভিন্নভাবে উপস্থাপিতও।
সামাজিক দায় দায়িত্বশীল ব্যক্তির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে হ্যাঁ, যেকোনো সামাজিকের কর্মপ্রচেষ্টা অবশ্যই সমস্ত সমাজের জন্য বয়ে নিয়ে আসে অসীম ইতিবাচকতা। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সমাজসেবা এবং প্রতিবেশের পরিচর্যার জন্যও বিশেষভাবে সামাজিক নৈতিকতার ওপর আমাদের নির্ভর করতে হয়। সামাজিক দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠা যেকোনো রাষ্ট্র কিংবা ভূখণ্ডের রাজনৈতিক বিকাশকেও সহায়তা করে। সামাজিক নৈতিকতা একটি সিস্টেমের ওপর ভিত্তি করে তার পথরেখা তৈরি করে। চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাস্তবতা এবং আদর্শ নির্মাণের কলা ও কৌশল এ ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে বিবেচ্য। যদি কোনো চিন্তা, কর্ম বা সিদ্ধান্ত সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয় তাহলে তা হবে অনৈতিক কাজ বা দায়িত্বহীনতা। সত্য ও মিথ্যা অথবা সঠিক ও ভুলের মধ্যে যদি কোনো দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে কারো কোনো ভাবনা তবে ধরে নিতে হবে ওই ব্যক্তি সামাজিক নৈতিকতা থেকে দূরে অবস্থান করছে। মনে রাখতে হবে, সামাজিক নৈতিকতা সব সময় ঠিক জিনিসটিকেই ইঙ্গিত করে।
সামাজিক নৈতিকতা অবশ্যই মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। খাদ্য নিরাপত্তা প্রয়োজনীয় ও ভেজালমুক্ত স্বাস্থ্যকর খাদ্যের সুব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, পোশাক-পরিচ্ছদের অপ্রতুলতা দূর করা, চিকিৎসা সুবিধা হাতের নাগালে নিয়ে আসা, সকল মানুষের আবাসনের ব্যবস্থা করা এবং বাস্তবমুখী কিংবা জীবনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা সামাজিক নৈতিকতা নির্মাণের জন্য জরুরি প্রসঙ্গ। পাশাপাশি মানবাধিকার এখন আধুনিক বিশে^র বিশেষ দাবি। মানুষের চিন্তা প্রকাশের অধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও শিক্ষা অনুযায়ী কর্মসংস্থান এবং মানুষের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে কিছুতেই সামাজিক নৈতিকতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। মানুষ হিসেবে নারীর সামাজিক অবস্থান সম্বন্ধেও ভাবতে হবে সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গকে। খাদ্যের জন্য, চিকিৎসার জন্য, প্রাত্যহিক প্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য আমাদের যেন আর বিদেশনির্ভর হয়ে থাকতে না হয়, তার নিশ্চয়তা প্রদান করার দায়িত্ব সামাজিক নৈতিকতাবোধে দ্বারা তাড়িত মানুষের ওপরে বর্তায়।
ফ্যাশনেবল বস্ত্র সব সময় নৈতিকতাকে সমর্থন করে না। সভ্যতার বিবর্তনের ফলে আর কোনো বিকল্প না থাকায়, পরিবর্তনে তেমন কোনো নতুনত্বের সন্ধান না পাওয়ায়, মানুষ অসভ্যতাকে সভ্যতার আশ্রয় বলে মেনে নিতে বাধ্য হয়। বর্তমানে পোশাকে-পরিচ্ছদে আদিমতার ছাপ দেখে তেমনটাই ভেবে নিতে ইচ্ছা করে। বিশেষ করে ছেঁড়া-ফুটা জামা-কাপড় পরিধান করার প্রবণতা সামাজিককে তেমন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। একদিকে পর্দার বাড়াবাড়ি ও কৃত্রিমতাÑ যেমন ফ্যাশনরূপে হিজাব ও বোরকার অপব্যবহার এবং অপর দিকে কাটা-ফাটা পোশাকে সভ্য হওয়ার অপচেষ্টাÑ এ সবই সামাজিক নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। আবার চিকিৎসা এবং শিক্ষাসেবায় অধিকমাত্রায় বাণিজ্য ঢুকে পড়াটা সামাজিক নৈতিকতার জন্য হুমকিস্বরূপ। সেবা আর ব্যবসা এক কথা নয়। তাই সকল সেবাকে লাভ-লোকসানের বাইরে রাখতে হয়। চাকরির বাজারে টাকা লেনদেন সামাজিক নৈতিকতাকে নানাভাবে বিপর্যস্ত করে। কাজের অধিকার মানুষের মৌলিক দাবি। এটা পেতে হলে যোগ্যতা ও বুদ্ধিমত্তার বিবেচনাই হতে পারে চাবিকাঠি। অন্যথায় সামাজিক নৈতিক স্তর ভেঙে পড়তে বাধ্য। কর্মক্ষেত্রে চেইন অব কমান্ডও অকার্যকর হয়ে পড়ে অনৈতিকতা প্রবেশ করার ফলে। কাজে জবাবদিহিতা তখন অদৃশ্য হয়। বৃদ্ধি পায় কর্মজট ও কর্মহীন কর্মক্ষেত্র। চণ্ডীদাসের কথায় ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’
রাজনৈতিক নৈতিকতা বর্তমান বিশে^ জনপ্রিয় একটি ধারা। রাজনীতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় মাধ্যম। আর এই রাজার নীতিই যদি হয়ে পড়ে অস্বচ্ছ ও প্রতারণাপূর্ণ, তাহলে রাষ্ট্রের জনগণের ভোগান্তির কোনো শেষ থাকে না। জনতার সামাজিক নিরাপত্তা বিধান সামাজিকের অনন্য দায়। এখন আর দু’বেলা ভাতের ব্যবস্থা করার মধ্যে অথবা মাছে-ভাতে জাতি তৈরির মধ্যে রাজনীতির অর্থ ও তাৎপর্য সীমাবদ্ধ নেই। মানুষের কর্মক্ষমতা, কর্ম-কৌশল এবং কর্মঘণ্টা বেড়েছে। খাদ্যাভাসে এসেছে বৈচিত্র্য, চিন্তায় এবং প্রযুক্তি প্রয়োগে বিপ্লব সৃষ্টি হয়েছে। চাহিদা এবং স্বপ্নের ধারায় প্রবেশ করেছে নতুন নতুন খাত ও সম্ভাবনা। তাই রাজনীতির অর্থ বদলে গেছে। এখন দুর্নীতি থেকে মানুষ মুক্তি চায়। রাজনীতিকে দুর্নীতি আচ্ছন্ন দেখতে আর কারো ভালো লাগার কথা নয়। দেশের মানুষের ভাগ্য নির্মাণের দায়িত্ব যে রাজনীতির ওপর, তা কেবল পাঁচ বছর অন্তর একটি ভোট প্রদানের অধিকারের মধ্যে আবদ্ধ নেই। মানুষ এখন প্রতিদিনের চাল ও চিত্রে রাজনীতির শুভবোধের প্রয়োগ দেখতে চায়। কর্মসংস্থানে চায় নতুনত্ব। বেতনে বৈষম্য আর সহ্য করার আওতায় নেই। কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের ও বিদায় নেয়ার বয়স, বিভিন্ন সামাজিক জাতিগত কোটা সংস্কার এবং বিশেষ বিশেষ ভাতা ও সুবিধা চায় মানুষ তার রাষ্ট্রের কাছে। কল্যাণ রাষ্ট্র এখন আর কোনো স্বপ্œ নয়। অভিবাসনপ্রত্যাশী মানুষের ঢল আমাদের প্রতি মুহূর্তে সে কথাই মনে করিয়ে দেয়।
মিডিয়া যেকোনো সমাজের ভিত্তিকে ক্রমাগত মজবুত করে। মিডিয়ার বিচরণ ও প্রকাশে থাকতে হয় স্বাধীনতার বিপুলতা। মত প্রকাশের স্বাধীনতা সামাজিক শান্তির অন্যতম উপায়। রাষ্ট্র তার প্রচারমাধ্যমের জন্য অবশ্যই দরকারি পরিবেশ নিশ্চিত করবে। তার ব্যতিক্রম নৈতিকতার বিপর্যয় ডেকে আনে সহজেই। তৃতীয় বিশে^ মিডিয়া সংখ্যাগতভাবে বিকশিত হয়েছে বটে কিন্তু প্রতিষ্ঠা হয়নি নৈতিক সাংবাদিকতার নিরাপদ পরিবেশ। একপক্ষকে ধ্বংস করার জন্য, কারো কারো চিন্তা ও কাজকে প্রচার থেকে বিরত রাখার জন্য যদি মিডিয়া ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে সমাজের অপরাংশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এতে সার্বিকভাবে সমাজেরই ক্ষতি হয়, ওই ক্ষতি থেকে মিডিয়াও বেশি দূরে থাকে না। ‘নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়?’ এই সত্যটুকু মনে না রাখলে মিডিয়াকর্মীরা সামাজিক নৈতিকতার প্রশ্নে শেষ পর্যন্ত পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়।
সীমান্ত-সিকিউরিটি সামাজিক নিরাপত্তাকে যেমন প্রতিষ্ঠা দেয় তেমনই সামাজিক নৈতিকতার মূল ধারায় এটাও পড়ে যে একটি রাষ্ট্রের নাগরিক সীমান্ত-অধিকার ভোগ করবে। অন্য দেশের নাগরিক বিনা বাধায় হাজারে হাজারে, লাখে লাখে ঢুকে পড়বে, নির্মিত হবে উদ্বাস্তু শিবিরÑ এটা নিশ্চয় কোনো সামাজিক নৈতিক দাবি নয়। তেমনটা ঘটতে থাকলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব হুমকির মধ্যে নিপতিত হয়। রাষ্ট্র পরিচালকদের সামাজিক দায়িত্ব তার নাগরিকের সামাজিক অধিকার সমুন্নত রাখা। রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে, শিক্ষিত বেকার যুব সমাজের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে অন্য দেশের নাগরিকের জন্য মানবতা প্রদর্শন নৈতিকতা বিরোধী কর্মকাণ্ডের মধ্যে পড়ে কি না, তাও ভেবে দেখা দরকার। প্রবিবেশী কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকের জান-মাল বিষয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিত চাপ ও প্রচেষ্টা চালাতে হবে এককভাবে কোনো দায়দায়িত্ব গ্রহণ কোনো নৈতিকতার সীমায় পড়ে না এটা স্রেফ বোকামি কিংবা বাড়াবাড়ি হতে পারে। এখন নৈতিকতার পরিসর স্বল্পপরিসরে আবদ্ধ নয়, এর ভুবন অনেক বিস্তৃত। সমাজের জন্য যা কিছু ভালো, সমাজের মানুষের জন্য যা কিছু অকল্যাণকর নয়, তাই সামাজিক নৈতিকতার আওতায়। আর এই কারণেই এই চিন্তায় বর্তমানে যুক্ত হয়েছে দেশীয় ও বৈশি^ক সার্বিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক প্রসঙ্গ। সম্পৃক্ত হয়েছে ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক নানান বিষয়-আশয়।
বুদ্ধিমত্তা আর চতুরতা এক কথা নয়। সমাজে চতুরতা বেড়েছে। বুদ্ধিমানরা আড়ালে সরে পড়ছে। চতুর ব্যক্তি কেবল নিজেকে নিয়ে ভাবতে পারে সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে সে নিজেকে নিযুক্ত করতে পারে না। ফলে তৈরি হয় সামাজিক বিপন্নতা। যে জাতি যত বেশি চতুর জনতা দ্বারা পরিচালিত, সে জাতি তত বেশি দুর্ভাগা। কেবল নিজেকে জাহির করার কৌশল অবলম্বন করে প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে কর্মহীন, অকার্যকর, পদোন্নতিবঞ্চিত রেখে অপরের চিন্তা-মত প্রকাশকে অবরুদ্ধ রেখে দলের লোককে খালাস আর ভিন্ন মতের বা অন্য দলের লোককে মামলাক্রান্ত করে জনতার রায় দেয়ার অধিকারকে বিপন্ন করে জাতীয়ভাবে আমরা সামাজিক নৈতিকতার মত ও পথ থেকে নিজেকে ও অপরকে বঞ্চিত করছি মাত্র। আর প্রতিদিন নিজেরই অজান্তে নির্মাণ করছি সামাজিক নৈতিকতার বিরুদ্ধে এক মহাপ্রাচীর। হ
নৈতিকতা কী? নীতির সাথে সম্পর্ককেই বোধহয় নৈতিকতা বলে অভিহিত করার রীতি সমাজে প্রচলিত। আর সামাজিক নৈতিকতা? সম্ভবত ব্যক্তির সামাজিক দায় এই সামাজিক নৈতিকতার সারবস্তু। কিন্তু...
