গ্লোবাল অর্থনীতির অর্ডার বা শৃঙ্খলার দিক বিচারে এশিয়ায় এখন এটা মূলত চীন-আমেরিকার নেতৃত্বের লড়াইয়ের যুগ চলছে বলা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের সময় থেকে আমেরিকা যেভাবে আগের ইউরোপীয় কলোনি শক্তিগুলোর কাছ থেকে দুনিয়ায় অর্থনৈতিক পরাশক্তির কর্তৃত্ব কেড়ে নিয়েছিল, আর সে জায়গায় নিজ নেতৃত্বের এক নয়া গ্লোবাল অর্থনৈতিক নিয়ম শৃঙ্খলা চালু করে নিয়েছিলÑ ঠিক সেটারই তুলনীয় এক পুনরাবৃত্তির সময়কাল এটা যখন চীন এবার আমেরিকার স্থান নিতে যাচ্ছে, তা বলা যায়। এটা এক পালাবদলের যুগ, সারা দুনিয়ার মধ্যে যার মুখ্য পালামঞ্চ হলো এশিয়া। সার কথায় এটা আমেরিকার ধীরে ধীরে প্রস্থান, আর সে জায়গায় চীনের আগমন ও উত্থান। এই লড়াইটা, আমেরিকার দিক থেকে এটা তার প্রভাব ও ক্ষমতার পতন যতদূর সম্ভব ঠেকানোর লড়াই। আর চীনের দিক থেকে ততটাই সেই গ্যাপ পূরণ করে নিজের প্রভাব ও ক্ষমতা বাড়িয়ে নিজে উত্থান নিশ্চিত করার লড়াই। এদিকে এই মূল লড়াইয়ের সাইড-ওয়ার্ক হিসেবে ক্রমশ হারু পার্টি আমেরিকা, এ কাজে বাড়তি সুবিধা পেতে ভারতকে লেজুড় হিসেবে নিজের পক্ষে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
সার কথায় চীনা নেতৃত্বে এক নয়া গ্লোবাল অর্থনীতির অর্ডার জেগে উঠতেছে, যাকে ‘গ্লোবাল অর্থনীতির অর্ডার-টু’ বলা যেতে পারে। কিন্তু এই অর্ডার-টু কোথায় কোথায় অর্ডার-ওয়ানের চেয়ে ভিন্ন হতে পারে, কেন হবে সে সম্পর্কে বদলের বাঁকগুলোকে ধরতে ও বুঝতে পারা জরুরি।
অর্ডার-ওয়ানে আমেরিকা যাত্রা শুরু করেছিল দুটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ে নিয়ে। প্রতিষ্ঠান দুটা হলেও এদের মূল লক্ষ্য একই, ফলে এরা পরস্পর সহযোগী তবে কাজের ‘ক্ষেত্র’ ভিন্ন বলে আলাদা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কেন এই প্রতিষ্ঠান? এটা সেই ১৯৪৪ সালের জন্মের সময় থেকে কমিউনিস্টরা ধরতে বা ব্যাখ্যা করতে পারে নাই, কেন এমন দুটা বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে আমেরিকাকে শুরু করতে হয়েছিল। এর অর্থ তাৎপর্য সে কালের সোভিয়েত ইউনিয়ন না বুঝলেও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এটা তার নিজ চায়ের কাপ হবে না। ফলে ব্রেটনউড শহরের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের লাগাতার ২২ দিনব্যাপী গঠন সভায় সোভিয়েত প্রতিনিধি উপস্থিত থাকলেও পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন এই দুই প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ নেয়নি। কিন্তু কেন নেয়নি তা স্টালিনের সোভিয়েত কোথাও কখনো ব্যাখ্যা করেনি। কিন্তু তার সাফল্য হলো এই যে, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক সোভিয়েত রাষ্ট্রের স্বার্থ নয় বলে বুঝলেও এটা সারা দুনিয়ার কমিউনিস্টদেরও স্বার্থ নয় বলে হাজির করতে পেরেছিল।
আমেরিকার অর্ডার-ওয়ানের যেসব বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হয়েছিল তার একটা হলোÑ ‘অবকাঠামো ঋণ’-এর ধারণা। আর এই ঋণ দেয়া মানে এর বিতরণ বা বাস্তবায়নের প্রতিষ্ঠানই হলো বিশ্বব্যাংক। অবকাঠামো বিনিয়োগ বলতে বুঝানো হয় বড় বিনিয়োগ যেমন ব্রিজ, রাস্তাঘাট, বন্দর, বিদ্যুৎ বা পানি ইত্যাদির ব্যবস্থা ধরনের স্থাপনা নির্মাণ আর এদিকে দক্ষ সরকারি প্রশাসন তৈরি, আর শিক্ষা, চিকিৎসায় বিনিয়োগ করাÑ এসব অবকাঠামো সম্পর্কিত কাজ। মনে করা হয় কোনো রাষ্ট্রে অবকাঠামো ব্যবস্থা যত ভালোভাবে গড়া হবে সেখানে শিল্প ও বাণিজ্য খুবই দ্রুত গড়ে উঠবেÑ অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য আসবে। আসলে এখানে অবকাঠামো ফর্মুলার সার কথাটা হলো রাষ্ট্র এসব অবকাঠামো গড়ে দিলে, এতে বড় বিনিয়োগের দায় নিলে আর শেষে খুবই কম লাভে এই অবকাঠামোর সার্ভিসের ক্রেতা শিল্প ও বাণিজ্যের প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করলে তারা দ্রুত বিকশিত হয়। যেমন এটা বুঝা কঠিন না যে আমাদের যমুনা ব্রিজ না থাকলে ঢাকার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের শিল্প ও বাণিজ্যের লেনদেন ঘটতে কত বাধার মধ্যে থাক্তে হতো, কত অবিকশিত থাকত সবাই। আবার একটি ব্রিজ বানানোর মতো বিনিয়োগের ক্ষমতা একালেও কোনো দেশী ব্যবসায়ীর নেই। আরো ব্যাপার আছে। যদি ব্রিজ বানানোর পরে অল্প লাভ ধরে সে ভিত্তিতে টোল নির্ধারণের বদলে, মোট বিনিয়োগ-ব্যয়ের ওপর বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কমপক্ষে ২০ শতাংশ মুনাফা ধরে এবার টোল নির্ধারণ করা হতো তাহলে ব্রিজ নির্মাণ হওয়া সত্ত্বেও এই সুবিধা শিল্প-বাণিজ্য ততটা কাজে লাগাতে পারত না। সেটা বাড়ত হয়তো তবে তড়তড় করে আর বাড়ত না। অতএব অল্প মুনাফা কথাটার মানে সুদসহ ঋণ পরিশোধের কিস্তি যেন দিতে পারা যায়। এ ছাড়া নেয়া বিনিয়োগ-ঋণ যেন রিস্ক না হয়ে যায় এমন ন্যূনতম লাভ ধরাÑ এই ভিত্তিতে টোল নির্ধারণ করা। এই হলো অবকাঠামো ধারণার মূল দিক।
আমেরিকা তার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনীতির (অর্ডার-ওয়ান) চালু করেছিল অবকাঠামো ধারণাকে ভিত্তি করেই। আর আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান দিয়ে এই ধারণা বাস্তবায়ন করে। এ কালে চীন যখন অর্ডার-টু করতে চাইছে সেটাও কিন্তু একইভাবে সেই অবকাঠামো ধারণাকে ভিত্তি করেই। কিন্তু প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক চীনকেও ব্যবহার করতে আমেরিকা দেয় কিনা সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। আইনত ও অন্তত বুঝাবুঝি অনুসারে চীনের অর্থনীতির সাইজ বড় হলে তাকে সে অনুপাতে অর্থ জমা দিয়ে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের আরো শেয়ার মালিকানা কিনে নিতে সুযোগ দেয়ার কথা।
কিন্তু আমেরিকা চীনকে তা দেয়নি। সিনেটে আলোচনাকালে আটকে দিয়েছিল। ব্যাপারটা অনেকটা বাপ মরলে এবার বাপের দোকান বড়ভাই দখলে নিয়ে ছোট ভাইকে বলছে তোর তো এখন অনেক টাকা তুই আরেকটা বানিয়ে নে। চীন তাই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্যারালাল নিজস্ব নানা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেও অবকাঠামো ঋণ দাতা হিসেবে বাজারে হাজির হয়ে গিয়েছিল। এভাবে এখান থেকেই নতুন এক অর্ডার-টু জন্ম নেয়ার কাহিনী শুরু হচ্ছে। দুনিয়াতে এখন বিশ্বব্যাংকের প্যারালাল চীনের অবকাঠামো ঋণ আছে। ফলে বিশ্বব্যাংককেই প্রতিযোগিতায় ফেলে নাচিয়ে প্রধানমন্ত্রীরা বিকল্প হিসেবে চীনের কাছে ঋণ নিয়ে পদ্মা ব্রিজ ধরনের প্রকল্প করছে, এর উপরে রেল ব্রিজ করছে ইত্যাদি। অর্থাৎ দুনিয়াতে অবকাঠামো ঋণের প্রতিযোগিতা জমে উঠেছে বিশেষ করে চীনের তুলনায় যেখানে বিশ্বব্যাংক বা খোদ আমেরিকার ঋণ দানের ক্ষমতা তুচ্ছ, তুলনায় চীনের সক্ষমতা ট্রিলিয়ন ডলারের। আর চীনের উত্থানের সাথে না পেরে ওঠে এখান থেকেই আমেরিকা নিজের তুচ্ছ বিনিয়োগ সক্ষমতার অযোগ্যতা বা খামতি পূরণ করতে এবার চীনের ‘ঋণের কোয়ালিটি’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে; ‘ন্যায়-অন্যায়’ বা ‘ভালোমন্দের’ প্রশ্ন তুলে নৈতিকতা বয়ান হাজির করে চীনকে বিপদে ফেলতে চাচ্ছে।
এখান থেকেই উঠে এসেছে আমেরিকার (সাথে ভারতের) প্রবল প্রপাগান্ডা ক্যাম্পেইন যে চীনের দেয়া ঋণÑ এটা ঋণের ফাঁদ। চীন গ্রহিতা রাষ্ট্রের সামলাতে পারার অতিরিক্ত লোন ধরিয়ে দিয়ে সে ওই রাষ্ট্রকে ঋণফাঁদে ফেলে দাসী বানিয়ে রাখেÑ এই হলো অভিযোগ। চীনের বেল্ট রোড প্রজেক্ট হলো এমনি মক্কেল ধরার ফাঁদ ইত্যাদি ইত্যাদি।
কিন্তু এর আগের প্রশ্ন হচ্ছে আমেরিকার হাত কি পরিষ্কার? তার দেয়া ঋণ? পরীক্ষা করতে নেটে এইচআইপিসি (ঐওচঈ) লিখে সার্চ করলে দেখতে পাওয়া যাবে যে এর মানে হলো ‘হেভিলি ইনডেবটেড পুওর কান্ট্রি’Ñ বাংলা হলো ‘গভীরভাবে ঋণে ডুবে যাওয়া গরিব দেশ’। এখনো আফ্রিকার ৩৭ দেশ এই তালিকায় আছে যাদের ঋণ পরিশোধের কোনো ক্ষমতা নেই। তাই ওই ঋণ এখন মাফ করে দেয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু নানা শর্ত দিয়ে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের আলোচনার পর আলোচনা চলছে গত ত্রিশ বছর ধরে কিন্তু দুই একটা রাষ্ট্র পার হতে পারলেও কেউই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়ে ধুঁকতেছে। তা হলে এগুলো আমেরিকার কেমন কোয়ালিটি ঋণ? এর কোনো দায় কি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক বা আমেরিকা অনুভব করে?
আগের মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি, চীনা ঋণ যদি বিভিন্ন রাষ্ট্রকে ফাঁদে ফেলা হবে তাহলে সব রাষ্ট্রেরই তো এমন হওয়ার কথা। কিন্তু যেমন ভারত বা বাংলাদেশের বেলায় চীনা ঋণফাঁদ হিসেবে হাজির নয় কেন? ভারতে তো চীনের দেয়া ঋণ কম নয়!
এদিকে পাকিস্তানের ঋণ প্রসঙ্গে আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেওর দাবি যে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্পÑ এতে ব্যাপক ঋণগ্রস্ত হয়ে থাকার কারণে পাকিস্তানকে এখন আবার আইএমএফের কাছে লোন চাইতে হচ্ছে। এ কথার সাথে সুর মিলিয়ে আইএমএফও বলছে স্বচ্ছতার সাথে তারা পাকিস্তানকে সবার দেয়া ঋণ পরীক্ষা করে দেখবে। এর পরেই কেবল তারা নতুন ঋণ অনুমোদন করবে। ইতোমধ্যে ইমরান খানের সরকারের পক্ষ থেকে পম্পেওর দাবি ভুয়া বলে বলা হয়েছে, চীনের দেয়া খারাপ ঋণের কারণে পাকিস্তান এখন দুরবস্থায় পড়ে নতুন ঋণ চাইছেÑ একথা সত্যি নয়। পাকিস্তান জানাচ্ছে, এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের নেয়া মোট বিদেশী ঋণ ৯৫ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে মাত্র ছয় বিলিয়ন ডলার বা ৬.৩ শতাংশ হলো চীনা ঋণ। এ ছাড়া ইমরান বর্তমানে দুই মাসেরও কম সময়ের সরকার। তাই আগের নওয়াজ শরিফের সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবাল, যিনি করিডোর প্রজেক্টের ফোকাল পয়েন্ট ছিলেন সেই মন্ত্রীও বিবৃতি দিয়ে দাবি করেন পম্পেওর দাবি ভিত্তিহীন। কারণ চীনা করিডোর প্রকল্পের ঋণের প্রথম কিস্তি দেয়ার সময় এখনো শুরুই হয়নি, আগামী ২০২২ সাল থেকে হবে। পম্পেওর ওই দাবি করা বক্তব্য ছিল দুই মাস আগের। কিন্তু পম্পেওর মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পম্পেওর সেই বক্তব্যকে আবার তাজা ও বৈধতা দিয়ে হাজির করেন। ফলে এখন সবাই আইএমএফ টিমের সরেজমিন (আগামী ৭ লভেম্বর) পরীক্ষায় কী দেখেন, কী বলেন তা জানতে অপেক্ষা করছেন এবং খুব সম্ভবত পাকিস্তানের দাবি সঠিক বলে প্রমাণিত হতে যাচ্ছে, আর মিথ্যা প্রচারণার দায়ে পম্পেওর মুখে চুনকালি পড়তে যাচ্ছে।
এ ছাড়া একালে দেখা যাচ্ছে, চীনের বিভিন্ন সরকারি ব্যক্তিও আমেরিকান ‘ঋণফাঁদ’ প্রপাগান্ডার জবাব দিচ্ছেন। কানাডার চীনা রাষ্ট্রদূত স্থানীয় পত্রিকায় (দ্যা হিল) এ নিয়ে নিজ স্বাক্ষরিত এক প্রবন্ধ লিখেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, পাকিস্তানের মোট বিদেশী ঋণের ৪২ শতাংশ হলো আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নেয়া। তুলনায় চীনের দেয়া ঋণ মাত্র ১০ শতাংশ। অর্থাৎ পম্পেওর দাবি ভিত্তিহীন। তিনি একই সাথে শ্রীলঙ্কা প্রসঙ্গে যেটা আমেরিকার চেয়েও ভারতের সবচেয়ে বড় প্রপাগান্ডা ইস্যু হলো হাম্বানতোতা বন্দর, তা তুলেছেন। এই গভীর সমুদ্রবন্দর প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প, যা শেষ হওয়ার পরে ২০১৫ সালের নির্বাচনে আগের রাজাপাকসের সরকার বদল হয়ে যায়। ফলে নির্বাচনে যারা নতুন ক্ষমতায় আসে তাদের প্রভাবিত করে ভারত তার আপত্তি হাজির করে।
ভারতের প্রকাশ্য আপত্তির মূল পয়েন্ট ছিল যে এই বন্দরের জন্য নেয়া ঋণ পরিশোধ শ্রীলঙ্কার জন্য বোঝা হয়ে যাবে। ফলে নতুন সরকারও সেই অবস্থান নিলে পরে, এক চীনা প্রাইভেট কোম্পানি বন্দরের ঋণের দায়ভার কিনে নেয়, ৯৯ বছরের জন্য লিজ পাওয়ার বিনিময়ে। এতে মানে দাঁড়াল এই যে তৈরি হয়ে যাওয়া বন্দর শ্রীলঙ্কার জন্য অপ্রয়োজনীয় বলাতে চীন ওই সম্পদ কিনে নেয়ার ব্যবস্থা করে। আর ৯৯ বছর পরে বিনা পয়সাতে তা শ্রীলঙ্কাকে ফিরিয়ে দেবে এই শর্তে।
যদিও চীনের পালটা যুক্তি ছিল সে শ্রীলঙ্কাকে ঋণের বোঝায় ফেলেনি। কারণ শ্রীলঙ্কার নেয়া মোট বিদেশী ঋণের মাত্র ১০ শতাংশ হলো চীনের দেয়া মোট ঋণ। এই হিসেবে সোর্স হিসেবে সে শ্রীলঙ্কার সেন্ট্রাল ব্যাংকের পরিসংখ্যান কোট করেছিল। ফলে এটা খুবই শক্ত যুক্তি বটে। এ ছাড়া শ্রীলঙ্কার মোট বিদেশী ঋণ ৮৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। কাজেই এই তুলনায় অতিরিক্ত মাত্র এক বিলিয়ন ডলারের বন্দর প্রকল্পটাই শ্রীলঙ্কার জন্য অবহনযোগ্যÑ এটা খুব পোক্ত যুক্তি হয়নি।
তাহলে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন দেশে চীনা ঋণ প্রকল্পগুলো সম্পর্কে, ভারত ও আমেরিকার তেমন শক্ত পোক্ত যুক্তির নয়। যদিও এর তুলনায় প্রপাগান্ডার দিক থেকে ভারত-আমেরিকা সফল। ওদিকে ভারত ও আমেরিকার অভিযোগ বা যুক্তিগুলো তেমন শক্ত পোক্ত প্রতিষ্ঠিত না-ই হয় তাহলে চীনের দেয়া ঋণ-প্রকল্পগুলো কি একেবারে সাচ্চা? কোনো সমস্যা নেই তাতে?
সমস্যা আছে অবশ্যই। কিন্তু ঋণের ফাঁদে ফেলে ওই রাষ্ট্রকে কব্জা করে নেবেÑ ভারতের অভিযোগ এই দাবি একেবারেই অপ্রতিষ্ঠিত এবং অর্থহীন। আর ওপর আমরা দেখলাম কোনো রাষ্ট্রেই চীনা ঋণের দায় ১০ শতাংশের বেশি নয়। তাহলে চীন কিভাবে ওই দেশকে ঋণের ফাঁদে ফেলার দায়ে অভিযুক্ত হতে পারে। এর আগে তো বাকি নব্বই শতাংশ লোন যারা গছিয়েছে তাদের দায়ী করতে হবে।
আসলে মনের কথাটা ভারত-আমেরিকা কেউ সামনে আনতে চাচ্ছে না। আসলে চীনের নেয়া প্রতিটি প্রকল্পেই চীনের সামরিক স্ট্রাটেজিক স্বার্থও আছে। ফলে অর্থনৈতিক দিক থেকে এটা ভায়াবল মানে বিনিয়োগ উঠে আনার যোগ্য কিনা এটা কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। অথবা বলা যায়, চীনের স্ট্রাটেজিক স্বার্থেরও একটা অর্থমূল্য ধরে নেয়া যেতে পারে। আর তা যোগ করলে আমি নিশ্চিত ওই প্রকল্প ভায়াবল হয় উঠবে।
যেমন পাকিস্তানের করিডোর প্রকল্প এখানে আসলে চীনের দুই স্বার্থ ল্যান্ডলকড উইঘুরবাসীকে অবরোধ মুক্ত করে দেখার অর্থনৈতিক স্বার্থ আর একই সাথে ওই প্রকল্প চীনের স্ট্রাটেজিক স্বার্থও আছে। কারণ তা চীনের বাণিজ্যিক নৌচলাচলের পথে চিকন মালাক্কা প্রণালী যে রিস্ক তৈরি করে রেখেছে এর বিকল্প পথ এই প্রকল্প। ফলে এই প্রকল্প বিনা সুদে করে দিলে অথবা ঋণের একটা অংশ অনুদান হিসেবে ঘোষণা করে দিলেও চীনের লাভ।
দেখা যাচ্ছে, সবাই চীনের বাণিজ্যিক ও স্ট্রাটেজিক স্বার্থকে কেউই গোনায় ধরছে না, আমল করছে না। আর আসলে এই ভুল বোঝার কাজ করতে ভারত ও আমেরিকা সহায়তা করছে।
আর এটা বলার অপেক্ষা রাখে না চীনের স্ট্রাজেজিক লাভালাভ মানেই সেটা ভারত ও আমেরিকার বিপক্ষে যাওয়া।
হাম্মানতোতার বন্দর অবশ্যই অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি কম। কিন্তু চীনের জন্য প্রশান্ত মহাসগরে হাব এটা। আর এর স্ট্রাটেজিক স্বার্থ অপরিসীম। ফলে সামগ্রিক বিচারে এটা ভায়াবল।
কিন্তু ভারত ঠিক কী চাইছে তা কী সে জানে? হাম্মানতোতার আপত্তি তুলে সে আবার চুপ করে গেছে বিনিময়ে ত্রিকোনমালিতে আরেক ছোট পোর্ট গড়তে সে শ্রীলঙ্কার সাথে কাজের ভাগ পেয়েছে তাই। তাহলে কী দাঁড়াল? দাঁড়াল এই যে, ভারত চীনের স্ট্রাটেজিক স্বার্থের বিরুদ্ধে বাধা হয়ে দাঁড়াতে সিরিয়াস নয়, একেবারেই লোকদেখানো। সে আসলে অর্থনৈতিক লাভালাভ চায়, তাই অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়ে সে স্ট্রাটেজিক স্বার্থ ছেড়ে দিলো। অর্থাৎ ভারতের কোনো আপত্তি বা দাবি গুরুত্ব পাওয়ার অযোগ্য।
সবশেষে চীনের নেয়া ঋণ প্রকল্পের এক বড় ত্রুটির কথা। আমাদের যমুনা ব্রিজ প্রকল্পের ঋণ বিশ্বব্যাংকের যে আবার এই বিনিয়োগ জোগাড় করেছে বিভিন্ন দাতার কাছে থেকে। ওদের মধ্যে বেশির ভাগ অর্থের জোগানদাতা হলো জাপান। কিন্তু জাপানের কেউ ওই ব্রিজ প্রকল্পের কোনো কাজ পায়নি। ওপেন টেন্ডার বেছে নেয়া হয়েছে। ঋণদানে বিশ্বব্যাংকের তৈরি এই স্টান্ডার্ড ও স্বচ্ছতায় চীন এখনো পৌঁছাতে পারেনি। এটা চীনের এক বিরাট খামতি। আবার নির্বাচনে যে দল জিতে আসে তাকে খুশি করে সে কাজ নেয় বলে ক্ষমতায় বদল হলে তাকে প্রকল্প আবার কাটছাঁট নেগোশিয়েট করতে হয়। এটাও বিরাট অস্বচ্ছতা।
তাহলে দাঁড়াল এই যে, যারা ঋণের ফাঁদ বলে তারা আসলে বলতে চায় আমি এখানে চীনের স্ট্রাটেজিক স্বার্থের কাছে হেরে গিয়েছি। হ